সেই দিন নেই || মফিজুল হোসাইন, নিউইয়র্ক
গত কয়েক দিন ধরে বাংলা একাডেমির মিলনায়তনে ছাত্রছাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়, আন্তঃকলেজ বিতর্ক প্রতিযোগিতা চলছে, আজ প্রথম সেমিফাইনালে ভোলা মহিলা কলেজ এবং কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজ প্রতিযোগিতা করছে। ভোলা মহিলা কলেজ থেকে অংশ নিচ্ছে রেহনুমা কবির (দলপতি), মেহেরুনা মিতা, এবং শিউলি বেগম, আর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে তওহিদ আনোয়ার (দলপতি), তাবাসুম তিন্নি, এবং সরোয়ার জামিল। বিতর্ক প্রতিযোগিতা স্পন্সর করেছে হিমাদ্রি গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ এবং শ্রেষ্ঠ বক্তার পুরস্কার স্পন্সর করেছে আনোয়ার গ্রুপ।
বিকেল পাঁচটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়র আইন বিভাগের অধ্যাপক কায়সার আহাম্মেদের সভাপতিত্বে বিতর্ক শুরু হয়, বিতর্কের বিষয় ‘বাংলাদেশে আইন প্রয়োগে বৈষম্য’, এর পক্ষে ভোলা মহিলা কলেজ এবং বিপক্ষে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ। তুমুল বিতর্কের পর ভোলা মহিলা কলেজ জয়লাভ করে ফাইনালে ওঠে এবং শ্রেষ্ঠ বক্তার পুরস্কার পায় মহিলা কলেজের দলপতি রেহনুমা কবির। বিজয়ীদের পুরস্কার দিতে উপস্থিত হয়েছেন উভয় গ্রুপের কর্ণধারেরা। কিন্তু পুরস্কার প্রদানের পূর্ব মুহূর্তে ঘোষণা করা হল আনোয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান সাঈদ আনোয়ার বিশেষ কারণে আসতে পারেননি, পরিবর্তে তার পুত্র, মাসুক আনোয়ার পুরস্কার দেবেন।
দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ঢাকার বদরুন্নেসা কলেজ চট্টগ্রামের হাটহাজারী কলেজকে পরাজিত করে ফাইনালের ওঠে এবং আগামীকাল বদরুন্নেসা কলেজ এবং ভোলা মহিলা কলেজ ফাইনাল বিতর্ক করবে।
একই সময় ও ফরমেটে বিতর্ক শুরু হয়, ফাইনালের বিষয় ‘সমাজ গড়ার দায়িত্ব কার, রাষ্ট্র না ধর্মের’। ফাইনালে ঢাকার বদরুন্নেসা কলেজ বিজয়ী হয়, কিন্তু শ্রেষ্ঠ বক্তার পুরস্কার পায় ভোলা মহিলা কলেজের রেহনুমা কবির। সেদিন আনোয়ার গ্রুপের মালিক সাঈদ আনোয়ার নিজ হাতে পুরস্কার দেয়, যদিও তার সেই ছেলে অডিটোরিয়ামে উপস্থিত ছিল। পরের দিন মফস্বল শহরগুলো থেকে আসা সকল প্রতিযোগী যার যার এলাকায় ফিরে যায়।
দু’সপ্তাহ পর মাসুক আনোয়ার, ২৫ বছর বয়স্ক আনোয়ার গ্রুপের ভাইস প্রেসিডেন্ট, ভোলা শহরে এসে উপস্থিত হয়, সে অনেক মানুষের সাথে কথা বলে রেহনুমা কবিরের বাসার ঠিকানা সংগ্রহ করে এবং সন্ধ্যায় সে বাসায় গিয়ে উপস্থিত হয়। রেহনুমার স্কুল শিক্ষক বাবা তার পরিচয় জানতে চায়, মাসুক নিজের পরিচয় দিলে তাকে ড্রইং রুমে বসতে দেয়া হয়। অতি সাদামাটা সোফা ও টেবিল, আভিজাত্যের কোন ছাপ নেই, কিছুক্ষণ পর রেহনুমা এসে তাকে দেখে অবাক হয়,
— আপনি আমাদের মত মানুষদের বাড়িতে?
— কেন, আসতে কি পারি না?
— পারেন, কিন্তু এখানে তো আপনার কোনো কাজ থাকার কথা না।
— কাজ ছাড়া কি কেউ কারো বাড়িতে যেতে পারে না? বিতর্কের শেষ দুই দিনে আপনার বক্তব্য শুনে আমি ভীষণ অভিভূত হয়েছি, আপনার বাচনভঙ্গি, উদাহরণ, এবং যুক্তি এতটাই অসাধারণ, যে কোনো মানুষই আপনার প্রেমে পড়ে যাবে, প্রেম বলতে ভালোবাসাকে বুঝাচ্ছি না, আপনি সকলের শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে যাবেন, তাই অমন একজন মানুষকে আরেকবার দেখার লোভ সামলাতে পারিনি।
— কিছু মনে করবেন না, আপনার নামটি যেন কি?
— মাসুক, মাসুক আনোয়ার।
— মাসুক ভাই, আপনি কি ‘বালক এবং ব্যাঙ’ গল্পটি পড়েছেন?
— না।
— সে গল্পে অল্প বয়সী একটি ছেলে নোংরা নর্দমায় বসবাস করা কিছু ব্যাঙ দেখে পাথর ছুঁড়ে মারতে থাকে। একটি বৃদ্ধ ব্যাঙ উঠে জিজ্ঞেস করে হে বৎস তুমি কেন আমাদের দিকে পাথর ছুঁড়ছো? ছেলেটি বলে আমি খেলছি। বৃদ্ধ ব্যাঙটি বলে, তোমার কাছে যেটা খেলা, আমাদের কাছে সেটা মৃত্যু। ছেলেটি বুঝতে পেরে চলে যায়।
— আমিতো সেই ছেলেটির মতো পাথর ছুড়তে আসিনি।
— আপনি সেই ছেলেটির মতো ছোট নন, কিন্তু আমরা সেই নোংরা নর্দমায় বসবাস করি, আপনি দেখছেন না আমাদের ড্রইং রুমের আবস্থা, আপনাদের মত মানুষদের এসব নর্দমার আশেপাশে আসা উচিত নয়। তাছাড়া আমরা রাজধানীতে নয়, মফস্বলের ছোট্ট শহরে বাস করি, আমাদের সমাজ আপনাদের মত নয়, আমরা এ সমাজ থেকে বিতাড়িত হলে আমাদের যাবার কোন জায়গা থাকবে না।
— শুধুমাত্র আপনাকে একবার দেখতে আসাতেই আপনাদের এত বড় ক্ষতি হয়ে যাবে?
— শুরুতেই হয়তো হবে না, তবে আপনার উপস্থিতি আমার আশেপাশের মানুষদের মনে প্রশ্ন তুলবে, আমার চরিত্র, আমার বাবার শিক্ষকতা পেশায় আস্তে আস্তে আঘাত করবে।
ভেতর থেকে চা আর বিস্কুট আসে, রেহনুমা বলে,
— চা নিন, প্লিজ আপনি কিছু মনে করবেন না, আমি শুধু আমাদের সমাজ ব্যবস্থাটার কথা বললাম।
— আমি দুঃখিত।
এটুকু বলেই মাসুক উঠে চলে যায়। রেহনুমা একটু অনুশোচনা বোধ করে, লোকটা সম্ভবত অপমান বোধ করেছে, এভাবে সরাসরি বলাটা হয়তো ঠিক হয়নি, চা—ও খেল না, অথচ তাদের কোম্পানির বিরাট অংকের পুরস্কার সে গ্রহণ করেছে। সে ভেতরে গিয়ে মা বাবাকে বিস্তারিত বলে সে কে, কেন এসেছে, সে তাকে কি বলেছে ইত্যাদি।
উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী রেহনুমা পরেরদিন কলেজে গিয়ে তার প্রিন্সিপালের সাথে দেখা করে গত রাতে যা ঘটেছে তা বিস্তারিত জানায়। স্যার তাকে আশ্বস্ত করে যে কলেজ সব সময় তার পাশে থাকবে।
দু’মাস পর মাসুক আবারো ভোলা চলে আসে এবং বিকেল বেলা রেহনুমার বাড়িতে যায়। সেদিন বাড়িতে কেউ ছিল না, তার বাবা মা ডাক্তার দেখাতে গিয়েছে, ভাইয়েরা মাঠে খেলতে গিয়েছে, শুধু ছোট বোনটি বাড়িতে। মাসুককে দেখে রেহনুমা একটু ইতস্তত করলেও বসতে বলে, জিজ্ঞেস করে চা খাবে কি না, নাকি সেদিনের মত না খেয়েই চলে যাবেন। মাসুক খাবে জানিয়ে বলে সেদিন ওভাবে চলে যাওয়ায় সে অনুতপ্ত।
চা নিয়ে রেহনুমা পাশে বসে, চা খেতে খেতে মাসুক বলে,
— আমি আপনাকে কিছু কথা বলতে আবারো এসেছি।
— বলুন, আর আমি আপনার অনেক ছোট, আমাকে তুমি করেও বলতে পারেন।
— ধন্যবাদ, রেহনুমা তোমার জ্ঞান ও ব্যক্তিত্ব আমাকে মুগ্ধ করেছে, আমি তোমাকে আমার পাশে চাই।
— তা কি করে হয়? আপনার সম্পর্কে আমি কিছু জানি না, আপনিও আমার সম্পর্কে তেমন কিছু জানেন না, আপনি শুধু আমার সেই বিতর্ক প্রতিযোগিতার বক্তব্য শুনেছেন এবং আমি শুধু জানি আপনি একজন শিল্পপতির ছেলে, এটুকুই যথেষ্ট নয়।
— তুমি আমার সম্পর্কে জেনে নাও, বল কি জানতে চাও?
— না মাসুক ভাই, এটা সম্ভব নয়, কারণ বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যে কিছুটা সমতা প্রয়োজন, যেমন বিশ— আঠারো বা বিশ—পনেরো হলেও মানিয়ে চলা যায়, কিন্তু বিশ—পাঁচের মধ্যে সম্পর্ক চলে না, আমাকে ক্ষমা করবেন।
— তুমি নিজেকে পাঁচ ভাবছো কেন?
— কারণ আপনাদের আর্থিক, সমাজ, ও সংস্কৃতি সম্পূর্ণ আলাদা। আমি বা আমাদের পক্ষে সে পর্যন্ত পৌঁছা সম্ভব নয়। তাছাড়া আমি আমার বাবার বড় মেয়ে, আমার বাবার আয় খুবই সীমিত, আমার ছোট ছোট ভাইবোনদের প্রতি আমার দায়িত্ব আছে, আমি আপনাদের কাতারে দাঁড়িয়ে সে দায়িত্ব পালনে সক্ষম হব না।
— আমি তোমার পাশে দাঁড়িয়ে যদি সব রকমের সাহায্য করি, তাহলে হবে না?
— না মাসুক ভাই, আপনি সাময়িক সাহায্য হয়তো করতে পারেন, কিন্তু আপনাদের সংস্কৃতি সম্পূর্ণ আলাদা, আমি হাত জোড় করে আপনার কাছে ক্ষমা চাই, এ বিষয়ে আর কোনো কথা বলবেন না।
মাসুক অনেকক্ষন চুপ থেকে উঠে দাঁড়ায়, একটি ভিজিটিং কার্ড রেহনুমার হাতে দিয়ে বলে,
— যদি কখনো মন পরিবর্তন করো, তাহলে আমাকে একটি কল দিও।
— কষ্ট পাবেন না মাসুক ভাই, সাময়িক কষ্ট মেনে দীর্ঘ মেয়াদের শান্তি অনেক ভাল।
— তুমি একজন ভালো বক্তা হতে পার, তোমার একাডেমিক জিনিয়াস থাকতে পারে, কিন্তু তুমি একজন মানুষের শান্তির উৎসের সবক দিতে পার না।
— না তা ঠিক, অত জ্ঞান আমার নেই, কিন্তু আমি সাধারণ জ্ঞান দিয়ে বুঝি সম্পর্ক সুন্দর রাখতে হলে সমতা থাকা প্রয়োজন, আপনাদের কথাই ধরুন, আপানাদের বাড়ি কোন এলাকায় আমি জানি না, কিন্তু আশেপাশে গরীব মানুষ নিশ্চয়ই আছে, তাদের সাথে আপনাদের কতটুকু সম্পর্ক, আবাব বিশ্বের ধনী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বন্ধুত্ব ভালো, কিন্তু কোন গরীব রাষ্ট্র পাশে থাকলে তাকে দমিয়ে রাখতেই চেষ্টা করে যাতে তারা বড় হতে না পারে।
— না তোমার সাথে কথায় পারবো না, তুমি ভালো থেকো ।
মাসুক চলে যায়। রেহনুমা ভাবে সে যথার্থই বলেছে, এত উঁচু নিচুতে সম্পর্ক হয় না, হয়তো আর মাসুক আসবে না, সে নিজের লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করে।
উচ্চ মাধ্যমিক ফাইনাল পরীক্ষার আর তিন মাস বাকি, রাতদিন খেটে চলেছে একটি ভাল ফল করার প্রত্যাশায়, হঠাৎ একদিন আবারও মাসুক চলে আসে, রেহনুমার বাবা তাকে বসতে দিয়ে চা বিস্কুট পাঠায় কিন্তু রেহনুমা তার সাথে দেখা করতে অস্বীকার করে, এক ঘন্টা পরও যখন মাসুক চলে যাচ্ছে না, তখন ছোট্ট বোনকে দিয়ে একটি চিরকুট পাঠায়,
“মাসুক ভাই
আমার মন ও শরীর কোনটাই ভাল নেই, তাই দেখা করতে চাইছি না, তাছাড়া আপনাকে আগেই বলেছি আপনি যেটা চান, তা সম্ভব নয়, আমাকে ক্ষমা করে চলে যান, আমি পরীক্ষার পর আপনার সাথে যোগাযোগ করব।
ইতি
রেহনুমা”।
চিরকুট পেয়ে মাসুক চলে যায়। রেহনুমা তার বাবা মাকে বোঝায় এ বড় লোকের ছেলের সাথে কোন সম্পর্ক হতে পারে না, এসব এদের সাময়িক মোহ, এত উঁচু নিচুতে সম্পর্ক হলে আত্মসম্মান থাকে না। সে আরো জানায় বিষয়টি আর এগোতে না দেবার জন্য সে দু’দিনের জন্য ঢাকা যেতে চায়, পরীক্ষার মধ্যে ঐ ছেলে আবার আসলে তার পরীক্ষার ক্ষতি হবে।
পরের সপ্তাহে রেহনুমা ঢাকা যায় এবং ভিজিটিং কার্ডের ঠিকানা অনুযায়ী আনোয়ার গ্রুপের এমডি সাঈদ আনোয়ারের পিএ’র সাথে দেখা করে বলে স্যারের সাথে একটু কথা বলতে চায়। পিএ কি বিষয়ে কথা বলবে জানতে চাইলে বলে, কোন ব্যবসায়ীক বা চাকরি সংক্রান্ত নয়, একান্ত ব্যক্তিগত। আধা ঘন্টা পর তাকে ভেতরে পাঠানো হয়, ঢুকেই রেহনুমা সালাম দিলে সাঈদ সাহেব তাকে বসতে বলে জিজ্ঞেস করে সে কিভাবে সাহায্য করতে পারে।
রেহনুমা বলে,
— স্যার আমাকে কি আপনি চিনতে পেরেছেন?
— না, চিনতে কি পারার কথা?
— স্যার আন্তঃকলেজ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় ফাইনালের দিন আমি আপনার হাত থেকে শ্রেষ্ঠ বক্তার পুরস্কার নিয়েছিলাম এবং তার আগের দিন আপনার ছেলে মাসুক ভাই’র হাত থেকে।
— ও আচ্ছা,
— স্যার, আপনি আমার বাবার মত, আমি আপনার কাছে একটু সাহায্য চাই, কোন চাকরি বা আর্থিক বিষয়ে নয়।
— কি বিষয়ে?
— আপনার ছেলের বিষয়ে। তিনি খুব ভাল মানুষ বলেই আমার মনে হয়। কিন্তু তিনি যা চান তা আমার পক্ষে মানা সম্ভব নয়।
— সে কি চায়?
— তিনি আমাকে বিয়ে করতে চান। তিনি তিনবার আমাদের ভোলা শহরে আমার বাড়িতে গিয়েছিলেন, আমি নিষেধ করা সত্ত্বেও বার বার তিনি আসেন, আমরা গরীব হলেও একটি সামাজিক মর্যাদা আমাদের আছে।
— কি নাম তোমার?
— রেহনুমা, রেহনুমা কবির।
— রেহনুমা, আমার ছেলের বিষয়টি কি আমি পুরোপুরি জানিনা। সম্ভবত ওর আম্মার সাথে সব শেয়ার করে, ওর আম্মা আমাকে একটি মেয়ের কথা বলেছিল।
— স্যার আমার পরীক্ষা সামনে, আমি পরীক্ষা পর্যন্ত একটু নিরিবিলি সময় চাই, তিনি যেন আর না আসেন।
— আমি কি তোমার পারিবারিক পরিচয় জানতে পারি?
— স্যার, পরিচয় দেবার মত তেমন কিছু নেই। আমার বাবা একজন স্কুল শিক্ষক, মা গৃহিণী, চার ভাইবোনের আমিই বড়।
— তুমি ঢাকা কবে এসেছো?
— আজকেই।
— কবে ফেরত যাবে?
— আজকেই যেতে চাই।
— তোমার বাস বা ট্রেন কখন?
— আমাদের শহরে বাস বা ট্রেন যায় না, সন্ধ্যা সাতটায় আমার লঞ্চ।
— তুমি কি আমার ছেলের সাথে দেখা করবে?
— না স্যার প্লিজ, না।
— তাহলে আমার একটু উপকার কর, তোমার হাতে এখনো অনেক সময়, তুমি আমার গাড়িতে করে আমার বাসায় গিয়ে আমার স্ত্রীর কাছে তোমার সমস্যার কথা বল। তিনি আমার চেয়ে তোমাকে ভাল সাহায্য করতে পারবেন।
— মাফ করবেন, আমি আপনার বাসায় যেতে চাচ্ছি না, আপনার ছেলে কোথায়?
— সে তো অফিসেই থাকার কথা, দেখি দাড়াও।
সাঈদ সাহেব ফোন করে জানলেন সে অফিসেই আছে।
— স্যার তাহলে আমি উঠি।
— তুমি তাকে এত ভয় পাও কেন?
— না স্যার, ভয় পাওয়ার মত মেয়ে আমি নই, তবে একজন মানুষকে বারবার নেতিবাচক কথা বলতে আমার অস্বস্তি হয়।
— আমার ছেলে কি তোমার অযোগ্য?
— ছিঃ ছিঃ তিনি অযোগ্য হবেন কেন? আমার বা আমাদের যোগ্যতা নেই বলে আমি এড়িয়ে চলতে চাইছি, স্যার এত উঁচু নিচুতে সম্পর্ক হয় না।
— ঠিকাছে। আমি ওর মায়ের সাথে কথা বলে দেখি কি করতে পারি, আর, আমি তোমার সাহসিকতার প্রশংসা ও দোয়া করি।
রেহনুমা তাড়াতাড়ি উঠে সেদিনই ফিরতে লঞ্চে ওঠে। আর আনোয়ার গ্রুপের কর্নধার সাঈদ আনোয়ার রুমে বসে ভাবে এ কি দেখল সে! সারাজীবন জেনে এসেছে মেয়েরা লোভী ও স্বার্থপর হয়। এ যে এক ব্যতিক্রম। মেয়েটা দেখতেও খারাপ না, মনে করার চেষ্টা করে সে দিনের বিতর্কে এই মেয়েটার বক্তব্য, কিন্তু মনে করতে পারছে না, তারপর ফোন তুলে নিজের স্ত্রীকে ডায়াল করে।
— হ্যালো শুনছো?
— হা বলো,
— আচ্ছা সেদিন তুমি মাসুকের পছন্দের একটি মেয়ের কথা বলছিলে না?
— হাঁ, কি হয়েছে তার?
— মেয়েটি কোথাকার তুমি জান?
— না আমাকে সেটা বলেনি, বলেছে কলেজ বিতর্ক অনুষ্ঠানে একটি আগুন মেয়ে দেখে তার পছন্দ হয়েছে।
— তারপর কি হয়েছে তা জান?
— সে নাকি দু’বার তার সাথে কথা বলেছে।
— সেই মেয়ে কী বলেছে?
— সেটা স্পষ্ট করে বলেনি।
— সেই মেয়েটি আমার অফিসে এসেছিল, আমি তোমার কাছে পাঠাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সে রাজি হয়নি?
— কোথাকার মেয়ে, কি নাম, দেখতে কেমন ?
— মেয়েটির বাড়ি ভোলা শহরে, নাম রেহনুমা কবির, দেখতে মোটামুটি সুন্দরী, কিন্তু প্রচন্ড ব্যক্তিত্বসম্পন্ন।
— তোমার অফিসে কেন এসেছিল?
— মাসুক নাকি তিনবার তার বাড়ি গিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু সে রাজি নয়, তাছাড়া ঢাকা থেকে বারবার কেউ আসলে সেটা নাকি সামাজিক বদনামের বিষয়।
— কেন সে রাজি নয়?
— সে বলে এত উঁচু নিচুতে বিয়ে হতে পারে না। আমার কাছে এসেছিল তার পরীক্ষার আগে মাসুক যেন আর সেখানে না যায়, সে কথা বলতে।
— তোমার ছেলের সাথে কথা বলেছো?
— না, একটু আগেই মেয়েটি চলে গেল, তারপরই তোমাকে ফোন দিলাম।
— মাসুকের সাথে তার দেখা হয়নি?
— না, আমি বলেছিলাম দেখা করতে। কিন্তু সে দ্রুত চলে গেল, এখন তুমি তার সাথে কথা বলে বোঝার চেষ্টা কর সে কি চায়।
— সে তো ইদানীং খুব রাত করে বাসায় ফেরে।
— তাই নাকি! কোন বদভ্যাস হয়নি তো?
— তা আমি জানিনা,
— ঠিকাছে, তুমি দুই একদিনের মধ্যেই সব বোঝার চেষ্টা করো, বাই।
সেদিন রাতেও মাসুক অনেক রাতে বাড়ি ফেরে, তার মা অনেক্ষণ অপেক্ষা করে ঘুমিয়ে পড়ে। সকালে নাস্তার টেবিলে মা জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে তার।
ছেলে বলে,
— কোথায় কি হয়েছে?
— তুমি এত রাত করে বাড়ি ফের কেন?
— আমার তাড়াতাড়ি ফিরতে ভালো লাগে না।
— কোথায় থাক?
— গুলশানে ক্লাবে,
— কি কর?
— আম্মা ওসব প্রশ্ন কর না, ক্লাবে মানুষ যা করে আমিও তাই করি,
— মাসুক কোন কারনে কি তুমি হতাশাগ্রস্ত? রেহনুমা কবির নামে কোন মেয়ের সম্পৃক্ততা আছে কি?
— কি নাম বললে?
— রেহনুমা কবির,
— এই নাম তুমি কোত্থেকে জানলে?
— সেটা বড় কথা নয়, তোমার কি এই মেয়েকে খুব পছন্দ?
— আম্মা আমি সিরিয়াসলি বলছি, এই নাম তুমি কোথায় পেলে?
— তোমার আব্বা বলেছে,
— আব্বা জানল কেমন করে?
— তা আমি জানি না, তুমি কি এই মেয়েকে বিয়ে করতে চাও?
— আমি চাইলেই তো হবে না, ঐ মেয়েকে তো রাজি হতে হবে।
— সেটা আমাদের বিষয়, তোমার মত কি?
— আম্মা আমি চেয়েছিলাম, কিন্তু সে রাজি নয়, রীতিমতো আমাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছে।
— এত বড় সাহস! কোন এমন জমিদার সে? আমি দেখতে চাই।
— না আম্মা, এমন করে বলো না। তার কথায় যুক্তি আছে। অতি সাধারণ ঘরের মেয়ে সে। জীবনবোধ সম্পর্কে প্রচুর জ্ঞান রাখে।
— ঠিকাছে, তুমি ঠিকানা দাও, দেখি আমরা কি করতে পারি।
— না এখন ওসব নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না, তার এখন পরীক্ষা।
— কি পরীক্ষা?
— উচ্চ মাধ্যমিক।
— ঠিকাছে, আমি তোমার বাবার সাথে কথা বলে দেখি কি করা যায।
রাতের বেলা সাঈদ আনোয়ার সাহেব এবং তার স্ত্রী ছেলের প্রসঙ্গ তোলে, মা নিশ্চিত করে মাসুক এ মেয়েকে পছন্দ করে এবং বিয়ে করতে চায়। আর ছেলে অনেক রাত পর্যন্ত গুলশান ক্লাবে কাটায় কিছুটা হতাশা থেকে। সাঈদ সাহেব জানায় এ মেয়ে আমাদের মত পরিবারে বিয়ে করতে চায় না, অত্যন্ত বাস্তববাদী মেয়ে। স্ত্রী বলে আমাকে একটু চেষ্টা করতে দাও, আমি মেয়ের বাবা মায়ের সাথে কথা বলে দেখি, তাছাড়া আমাদের ছেলেটাকে নষ্ট হতে দিতে পারি না।
পরের দিন তার আম্মা মাসুকের কাছে মেয়ের ঠিকানা চায়, মাসুক ঠিকানা দিয়ে বলে এখন ভোলা যাবার দরকার নেই। পরীক্ষা শেষ হলে যেও। মা জানতে চায় পরীক্ষা কবে শেষ হবে, মাসুক জানায় জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে। তিনি একটু অবাক হন যে তার ছেলে মফস্বল শহরের একটি মেয়ের পরীক্ষার আদ্যপান্ত খবর রাখে।
জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহের শুক্রবার, একটি গাড়ি এসে থামে রেহনুমার বাড়ির সামনে, গাড়ি দেখেই রেহনুমা বুঝতে পারে কি ঘটতে চলেছে। সে তার গচ্ছিত টাকা থেকে তাড়াতাড়ি বেশ কিছু টাকা মায়ের হাতে দিয়ে বলে, ভাইদের বাজারে পাঠাও, ঢাকা থেকে বড় মেহমান এসেছে। রেহনুমা তার বাবাকে পাঠায় মেহমানদের অভ্যর্থনার জন্য। সে তাড়াতাড়ি একটু তুলনামূলক ভাল কাপড় পরে নেয়। সবাই ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলে রেহনুমা অবাক হয় ভোলারই একজন রাজনৈতিক নেতা এদের সঙ্গে এসেছে। তবে স্বস্তি পায় মাসুক না আসাতে, সে তাড়াতাড়ি নিজের রুমে ঢুকে যায়। সবাই ড্রইংরুমে বসলেও মাসুকের মা ঘরের মধ্যে ঢুকে তার মায়ের সাথে কথা বলে, জিজ্ঞেস করছে মা রেহনুমা কোথায়? মা রুমের কথা বললে, তিনি রেহনুমার রুমে ঢুকে জিজ্ঞেস করেন,
— মা কেমন আছো?
— আমি ভালো আন্টি, আপনাকে তো চিনতে পারলাম না?
— ও, আমি মাসুকের আম্মা।
— ও আচ্ছা, আপনি কেমন আছেন? আমাদের ভোলা আসতে কষ্ট হয়নি তো?
— কষ্ট হয়নি, তবে নদী পথে কখনো ভ্রমণ করিনি তো।
— আন্টি আপনি বসুন।
— তোমার পরীক্ষা কেমন হলো মা?
— মোটামুটি ভালোই হয়েছে,
— এখন কি পড়বে?
— বাবা মায়ের ইচ্ছা ডাক্তারি পড়ি, তবে আমার ইচ্ছা বায়ো—কেমেস্ট্রিতে পড়ি।
— মা, তোমার কাছে আমি একটি ভিক্ষা চাইতে এসেছি,
— আন্টি, এ বিষয়ে আমরা একটু পরে কথা বলি, আসুন মায়ের ঘরে যাই।
তারা এসে মায়ের ঘরে যায়, রেহনুমা ড্রইংরুমে গিয়ে সাঈদ সাহেবসহ সবাইকে সালাম দেয়, তারপরে রান্নাঘরে গিয়ে চা নাস্তা তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে যায়।
ওদিকে ড্রইংরুমে সাঈদ সাহেব, রাজনৈতিক নেতা এবং রেহনুমার বাবা বিয়ের প্রসঙ্গ তোলেন। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা মধ্যস্থতা করে বলেন উভয় পরিবারকে তিনি চেনেন, এ সম্পর্ক হলে খুবই ভালো হবে। রেহনুমার বাবা বলেন, তার কোন আপত্তি নেই, সব কিছুই নির্ভর করবে মেয়ের উপর। মেয়ে খুবই স্বাধীনচেতা। তার ইচ্ছা সে লেখাপড়া শেষ করার আগে বিয়ে করবে না। ড্রইংরুমে চা—নাস্তা পাঠানো হয়, মাসুকের আম্মা রেহনুমার মাকে মেয়ের বিয়ে সম্বন্ধে বললে তিনি বলেন তার সৌভাগ্য হবে এমন একটি পরিবারের সাথে তার মেয়ে বিয়ে দিতে পারলে। কিন্তু মেয়ের উপরই সব নির্ভর করে। নাস্তা খাওয়ার পর মাসুকের মা আবারো রেহনুমার সাথে কথা বলতে চাইলে রেহনুমা বলে,
— আন্টি সময়তো চলে যায়নি, দুপুরের খাবারের পর এ বিষয়ে কথা বলি।
— না না আমরা দুপুরে খাব না, তোমাদের এত কষ্ট করতে হবে না।
— সেটা হয় না, আমাদের সংস্কৃতিতে কোনো মেহমানকে না খাইয়ে ছাড়া যায় না, গরমে আপনাদের কষ্ট হবে, একটু বসুন রান্না করতে আমাদের কোনো কষ্ট হবে না।
দুপুরে বেশ ভালো মেহমানদারি করে বিকেলে রেহনুমা ও মাসুকের আম্মা বাগানে এসে বসে। মাসুকের আম্মাই শুরু করে,
— মা আমি একটা ভিক্ষার কথা বলেছিলাম,
— আন্টি, আমি স্বীকার করি আপনারা খুব ভাল পরিবার। মাসুক ভাই তিনবার আমাদের বাড়িতে আসলে আমি দেখেছি, তিনিও খুব ভদ্রলোক। কিন্তু আমার সমস্যাটা অন্য জায়গায়, আমার সামাজিক জ্ঞান হবার পর আমার সিদ্ধান্ত যে আমি আমার সমসাময়িক কাউকে বিয়ে করব। কোন অবস্থাতেই অনেক উঁচু নিচুতে যাব না। দ্বিতীয়তঃ, আমার বাবার আয় খুবই সীমিত এবং আমিই তার বড় সন্তান। আমার ছোট ভাইবোনদের প্রতি আমার একটা দায়িত্ব আছে, সুতরাং আপনারা আমাকে ক্ষমা করুন।
— তুমি কি আমাদেরকে তোমাদের পরিবারের সহযোগী ভাবতে পার না?
— এই কথাটা আপনার ছেলেও আমাকে বলেছিল, কিন্তু আত্মসম্মানবোধ বলে একটা কথা আছে, আমার ভাইবোনেরা কতটুকু আগ্রহী হবে আমি তা বলতে পারি না। আচ্ছা আন্টি আমি আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি, আপনারা শিল্পপতি, ঢাকা শহরে আপনাদের সমসাময়িক কোনো সুন্দরী মেয়ে কি নেই?
— আছে হয়ত, কিন্তু আমার ছেলে যে তোমাকে চায়।
— আমিতো সেটারই কোনো কারণ খুঁজে পাইনা। তিনি শুধু সেই বিতর্কের দিন আমার হাতে পুরস্কার তুলে দিতে গিয়ে দেখেছেন, তার আগে কোনোদিন আমাদের দেখা হয়নি, আমার মধ্যে আকর্ষণীয় তেমন কিছু নেই, কেন যে তিনি আমাকে চাচ্ছেন আমি বুঝতে পারি না,
— তুমি তাকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর।
— না আন্টি আমি আর তার সামনে যেতে চাই না,
— তাহলে আমরা কি খালি হাতেই ফিরে যাব?
— আন্টি আমি মন থেকে তৈরি নই। আমাকে আপনারা ক্ষমা করবেন, আমি সর্বান্তকরণে আপনাদের মঙ্গল চাই, আপনার ছেলের ভাল চাই। আঙ্কেল সহ সকলের কাছে আমার ক্ষমা পৌছে দেবেন।
আনোয়ার পরিবার খালি হাতে ফিরে আসে, কিছুতেই রেহনুমাকে রাজি করানো যায়নি।
একমাস পর একদিন সকালে মাসুকের মা আবার ভোলা শহরে এসে রেহনুমাদের বাড়িতে আসে, তিনি ঘরে ঢুকেই রেহনুমার হাত ধরে কেঁদে ফেলে,
— মা, আমার ছেলেটাকে তুমি দয়া কর।
— কি হয়েছে আপনার ছেলের?
— তোমাকে না পাওয়ায় আমার ছেলে বিপথে চলে যাচ্ছে।
— এটা কোন ধরনের পুরুষ যে একটি মেয়ের জন্য সে বিপথে যাচ্ছে? আমার সাথে যদি তার প্রেম থাকত, তাহলেও কথা ছিল। আচ্ছা আন্টি আপনারা কি তাকে ছোট বেলা থেকে কোন কিছুতেই না বলেননি?
— মা এটা ঠিক, একমাত্র ছেলে বলেই যখন যা চেয়েছে তাই দিয়েছি, কোন কিছুতেই না করিনি।
— সেখানেই সমস্যা, সে এখনও ভাবে যেটা চাইবে সেটাই তার পেতে হবে, না পেলেই উল্টাপাল্টা করবে,
— মা তোমার কাছে তার জীবনটা ভিক্ষা চাই।
রেহনুমার মা বাবাও অনুরোধ করে একটু বিবেচনা করার জন্য। রেহনুমা আস্তে উঠে চলে যায়। মাসুকের মা ছেলের জন্য কাঁদতেই থাকে। একটা সময় পরে রেহনুমার মন নরম হয়। এসে বলে,
— ঠিকাছে আন্টি, আমি আপনার ছেলের সাথে কথা বলব, আপনি আপনাদের ঠিকানা ও আপনার ছেলের ফোন নাম্বার দিয়ে যান।
— আল্লাহ তোমার মঙ্গল করন, আমার সাথেই চল মা।
— না আন্টি, আপনি যান আমি দু’দিন পরে আসছি, আর আপনার ছেলেকে বলবেন আমার ফোন ধরতে।
— ঠিকাছে মা।
মাসুকের মা দুপুরের খাবার খেয়ে বিকেলে ফিরে গেলে রেহনুমা নিজের রুমে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। তার দীর্ঘ লালিত স্বপ্ন ভেস্তে যেতে বসেছে, তার মা বাবাও চায় এই ছেলেকে বিয়ে করতে। সে জানে বিয়ে করলে লেখাপড়া করা আর হবে না।
দু’দিন পর রেহনুমা ঢাকা গিয়ে তার মামার বাসায় ওঠে এবং ফ্যাক্স ফোনের দোকান থেকে মাসুকের মাকে ফোন করে জানতে চায় তার ছেলে কোথায়, তার মা ছেলের হাতে ফোন ধরিয়ে দিলে রেহনুমা বলে,
— মাসুক ভাই আমি ভেবেছিলাম আপনি একজন পরিপক্ব যুবক, কিন্তু এখন দেখছি সেই “বালক ও ব্যাঙের” গল্পের মত বালকই রয়ে গেছেন।
— কবে এসেছো?
— এইতো সকাল বেলায়,
— কেমন আছো?
— ভালো থাকতে চাইলেই কি পারা যায়?
— কোথায় উঠেছো?
— কল্যাণপুর,
— আমরা দেখা করতে পারি কি?
— দেখা করতেই তো আমার আসা,
— কোথায় দেখা হবে?
— আপনিই বলুন, তবে বেশি দূরে না হলেই ভাল হয়।
— তুমি তোমার ঠিকানাটা বল, আমি তোমাকে তুলে নিয়ে কোথাও বসব।
রেহনুমা তার মামার বাসার ঠিকানা দিলে দেড় ঘন্টা পর মাসুক তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসে, রেহনুমাই শুরু করে,
— আচ্ছা আপনার সমস্যাটা কি?
— আমার তো কোনো সমস্যা নেই।
— তাহলে তিনবার আপনি, দু’বার আপনার মা আমার বাড়িতে যাওয়ার মানে কি?
— তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছে এবং সেটা আমার আব্বা আম্মার মধ্যেও সংক্রামিত হয়েছে, তাই তোমাদের বাড়িতে যাওয়া।
— ঢাকা শহরে আর কি কোন মেয়ে নেই?
— থাকবে না কেন?
— তাহলে আমাকে কেন?
— সে উত্তর একটু পরে দিচ্ছি, তার আগে বল তোমার পরীক্ষা কেমন হয়েছে?
— মোটামুটি ভালোই,
— কি পড়বে এখন?
— হয় মেডিকেল, না হয় বায়ো—কেমেস্ট্রি,
— মেডিক্যাল পড়লে কোথায়?
— ঢাকা মেডিকেল।
— ঢাকা মেডিকেল কেন? কেন বরিশাল নয়?
— ঢাকা মেডিকেল সবচেয়ে ভালো।
— যে কারণে তুমি ঢাকা মেডিকেলে পড়তে চাচ্ছো, একই কারণে আমি রেহনুমাকে চাচ্ছি।
— না এ দু’টার তুলনা চলে না।
— চলবে না কেন? আমি সত্যিই বলছি, তোমার বিতর্কের দিন তুমি যেভাবে তথ্য দিয়ে বক্তব্য দিচ্ছিলে, আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনছিলাম। তুমি যেসব বৈষম্যের উদাহরণ দিয়েছিলে, আমি ইন্টারনেট ঘেঁটে তার সত্যতা যাচাই করেছি। যেমন তুমি তারিখ দিয়ে বলছিলে লক্ষ¥ীপুর, ভালুকার কৃষকরা সামান্য কিছু কৃষি ঋণ পরিশোধ করতে পারেনি বলে জেলে যেতে হয়েছে, অথচ কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে শত শত শিল্পপতি ঋণ খেলাপি হয়েও দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। আবার কোন মানুষ পেটের দায়ে চুরি করলে বেদম মার খায় বা জেল খাটতে হয়, অথচ এ দেশের আমলা, ইঞ্জিনিয়ার বা রাজনীতিবিদরা প্রোজেক্টের নামে লক্ষ লক্ষ টাকা চুরি করলেও কোন কিছুই হয় না। বিশ্বাস কর, আমি কখনো সমাজ বা রাষ্ট্রের এসব বৈষম্য নিয়ে ভাবিনি, আমার জগৎ ছিল, পশ্চিমা মিউজিক, হলিউড মুভি, ক্রিকেট ইত্যাদি নিয়ে। কিন্তু আব্বার অফিসে বসার পর বহু মানুষ চাকরি চাইতে গিয়ে কত ধরনের সমস্যার কথা বলে। আমি অবাক হই, আমি আস্তে আস্তে সমাজ নিয়ে ভাবতে শুরু করি, ঠিক সে সময়েই বিতর্কে গিয়ে তোমার বক্তব্য শুনে আমার মধ্যে নতুন এক ভাবনার জন্ম হয়, ঐ দিন বিতর্ক অনুষ্ঠানে আমার যাওয়ারও কথা ছিল না। বেলা তিনটায় আব্বা বললেন তিনি যেতে পারবেন না, আমাকে যেতে। পরেরদিন শুধু তোমার বক্তব্য শুনতেই আবারো গিয়েছিলাম।
— এটা ভালো লক্ষণ, আপনি সাধারণ মানুষ নিয়ে ভাবেন, তাদের জন্য প্রাণও কাঁদে, কিন্তু আমাকে চাওয়া কেন?
— প্রথমবার ভোলা গিয়ে ভেবেছিলাম তোমার সাথে ঐসব বৈষম্য নিয়ে আলাপ করব। তখনও ভাবিনি তোমাকে চাইব, কিন্তু তুমি যেভাবে অবজ্ঞা করলে, আমার জেদ ধরে যায়। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম বিয়ে করব। দ্বিতীয়বার, সে সিদ্ধান্ত আরো দৃঢ় হলো, তৃতীয়বার হতাশায় আক্রান্ত হলাম। তারপর তুমি নাকি আমাদের অফিসে গিয়েছিলে, সেখান থেকেই মা বাবা।
— তাহলে এটা একটা জেদাজেদি?
— হাঁ শুরুটা সেরকম ছিল, কিন্তু এখন ভালোবাসি, মন ও গভীরভাবেই তোমাকে চাই।
— মাসুক ভাই আপনার সরল স্বীকারোক্তি আমার ভালো লেগেছে। আপনার মধ্যে কোন ভনিতা নেই। কিন্তু আপনি যদি আমাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে বেছে নিতেন, তাহলে আমার স্বপ্নগুলোর মৃত্যু হয় না।
— তুমি না চাইলে জোর করে তো কিছু হবে না। আমার প্রতি কি তোমার সামান্য অনুভূতিও নেই?
— নেই বললে মিথ্যা বলা হবে, কিছুটা না থাকলেতো আমি এখানে আসতাম না। তবে সে অনুভূতির চেয়ে আমার স্বপ্নগুলো অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং তাদেরকে অগ্রাধিকার দিতে চাই,
— আমি কি তোমার স্বপ্নগুলোর অংশীদার হতে পারি না?
— ভালোবাসা, সংসার, ভবিষ্যৎ ইত্যাদিতে অংশীদার হওয়া যায়, কিন্তু কিছু ব্যক্তিগত বিষয় থাকে, যা চাইলেও পাওয়া যায় না।
— তাহলে তোমার এটাই সিদ্ধান্ত, তুমি তোমার স্বপ্ন নিয়েই থাকবে, আমার, আমার পরিবার, তোমার বাবা মায়ের ইচ্ছার কোন মূল্য নেই?
— দেখুন, আপনার দৃষ্টিভঙ্গি এক রকমের। আপনি দীর্ঘদিন থেকে যে আমাকে চেনেন এমনও নয়। আমি আমার সামাজিক বলয়কে সুরক্ষা করতে কিছু কঠিন কথা হয়তো বলেছি। আর তাতেই আপনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন আমাকে বিয়ে করবেন। এটা ভালোবাসা নয়। এটা আপনাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ। আপনারা ভাবেন যে কোন জিনিস চাইলেই পাওয়া যায়। আপনার আম্মা আব্বা কোন দিনই আমার পরিবারের মত মেয়েকে পুত্রবধূ হিসেবে চাইতেন না। আপনার ইচ্ছার জন্য তারা সেটা মেনে আমাদের বাড়িতে গিয়েছেন। তারা একটিবার খোঁজখবর করলেন না তাদের ছেলেটি মফস্বলের একটি গরীব মেয়েকে কেন বিয়ে করতে চায়। আর আমার বাবা—মা সব সময় সীমিত আয় দিয়ে জীবন যাপন করে আমাদেরকে মানুষ করার চেষ্টা করছেন। এখন তারা একজন শিল্পপতির ছেলে পেয়ে ভাবছেন তাদের মেয়ে সুখেই থাকবে। আপনারা কেউই আমার দৃষ্টিভঙ্গি বা আমি কি চাই চিন্তা করেননি। পুরুষ শাসিত সমাজ বলে আপনারা যা চাইবেন তাই হবে? আপনি না জানলেও এটা সত্য এ ধরনের অসম সম্পর্ক সময়ের আবর্তে ভাল থাকে না। সিনেমা গল্পে দেখেন না বড়লোকের মেয়ে বিয়ে করে ছেলেরা আত্মসম্মান সব হারিয়ে ফেলে। মেয়েরা এর ব্যতিক্রম নয়।
— তুমি কি বলতে চাচ্ছো দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের সংসার ভালো থাকবে না?
— মাসুক ভাই আপনি ব্যতিক্রম হতে পারেন, কিন্তু সাধারণতঃ ভালো থাকে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেয়েটিকে নানারকম অপমান ও গঞ্জনা সহ্য করে জীবন কাটাতে হয় অথবা একাকী জীবন কাটাতে হয়।
— আমাদের ক্ষেত্রে ওসব কিছু হবে না, আমি কিভাবে নিশ্চিত করতে পারি?
রেহনুমা অনেক্ষণ চুপ থেকে বলে,
— আপনি কি নিয়ে লেখাপড়া করেছেন?
— আমি এমবিএ করেছি।
— এ পর্যন্ত কি আপনি আমাকে ছাড়া কাউকে পছন্দ করেননি?
— দু’চার জনকে যে পছন্দ করিনি তা নয়। তারা সকলেই উঁচু ক্লাসের মেয়ে, তারা সকলের সাথেই গভীরভাবে মেশে, যা আমার পছন্দ নয়। আমি তোমার মত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কাউকে চাই।
— আপনি আমার জন্য কতদিন অপেক্ষা করতে পারবেন?
— আমিতো অপেক্ষা করতে চাই না,
— আমাকে কি আজই মতামত দিতে হবে?
— না না, আজকে না বললেও চলবে।
— তাহলে আমি আমার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সুবিধা অসুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে দু’সপ্তাহ পর বলি?
— ঠিকাছে, আমি অপেক্ষায় থাকব।
— আরেকটা কথা জিজ্ঞেস করি, যদি আমি নেতিবাচক অবস্থানেই থাকি, তাহলে আপনি কি করবেন?
— তোমার সিদ্ধান্তকে আমি সম্মান করব। তারপর আমি কি করি না করি সেটাতো তোমার কোন বিষয় হতে পারে না।
খাওয়া শেষ হলে রেহনুমা বিল দিতে চায়, মাসুক ভীষণ রাগ করে। বিদায়ের আগে মাসুক বলে,
— তোমাকে আরেকটা অনুরোধ করব?
— বলুন,
— আমি তোমাকে একটা ফোন কিনে দিতে চাই,
— না মাসুক ভাই।
— আমার কথাটা শেষ হয়নি, যদি তুমি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নাও, তাহলে তো কোন কথাই নেই, আর যদি নেতিবাচক হয়, ফেরত পাঠিয়ে দিও, আমি নিয়ে নেব।
— না মাসুক ভাই, আপাতত আমি কিছুই নিতে চাচ্ছি না, আমাকে ক্ষমা করবেন।
রেহনুমাকে মাসুক কল্যাণপুরে আবার নামিয়ে দেয়। সেদিন সন্ধ্যায় সে ভোলা ফিরে যায়।
বাড়ি ফিরে বাবা মায়ের সাথে বসে জানতে চায়,
— তোমরা এখন কি চাও?
মা বলে,
— আমরা কি বলব, তুমি যেটা ভাল মনে কর।
— আমিতো ভাল মনে করেই ওদেরকে না বলে দিয়েছিলাম, কিন্তু তোমরা ঐ মহিলার সামনে আমাকে অনুরোধ করলে কেন? তোমাদের অনুরোধের পরও যদি আমি মুখের উপর না বলতাম, তাহলে উনি ভাবতেন মেয়েটি বেয়াদব, বাবা মায়ের কথাও শোনে না অথবা আমি অন্য কোথাও প্রেম করি।
বাবা বলে,
— মা আমার মনে হয় পরিবারটি ভালো, তুমি রাজি হলে খারাপ হবে না।
— বাবা, তুমিতো জান আমি বিতর্ক করি, প্রচুর পড়াশোনা করতে হয়, এ ধরনের উঁচু নিচুর বিয়েতে মেয়েরা কখনোই ভাল থাকে না। নিজস্ব কোনো স্বাধীনতা থাকে না, আমার লেখাপড়াও বন্ধ হয়ে যেতে পারে, তোমাদের কোন বিপদে আমি চাইলেও কিছু করতে পারবো না। আমি চাই আমার পড়াশোনা শেষ করি, তারপর আমার সমসাময়িক কেউ বা তোমাদের পছন্দ থাকলে বিয়ে হতে পারে, তাতে আমার স্বপ্ন ও ইচ্ছা শক্তির মৃত্যু ঘটবে না।
মা বলে,
— তুমি কি ওদেরকে না বলে দিয়ে এসেছো?
— না, হাঁ না কিছুই বলিনি, বলেছি বাড়ি গিয়ে তোমাদের সাথে আলাপ করে বলবো।
বাবা বলে,
— মা তোমার স্বাধীন চিন্তাকে আমি সম্মান করি, জীবনটা তোমার, তোমার ভালমন্দ তুমিই ভালো বোঝ। তুমি যা ই সিদ্ধান্ত নাও, তাতে আমার দ্বিমত নেই।
পরের দিন রেহনুমা মাসুককে একটি চিঠি পাঠায়,
“মাসুক ভাই,
আমার কি সৌভাগ্য যে আপনার মত একজন যুবক আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল! শুধু আমার কেন, আমার গোটা পরিবারটি খুশীতে উৎফুল্ল হয়েছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে আমি ও আমার পরিবার সে সৌভাগ্য বহন করার সক্ষমতা রাখি না, আপনি আমাকে এবং আমার পরিবারকে ক্ষমা করবেন। আপনি শিক্ষিত, বিত্তবান, এবং সর্বগুনের একজন চৌকস যুবক। আপনি একজন সুন্দরী ও বিত্তশালী স্ত্রী ডিজার্ভ করেন, আমি নই, আমার দেবার ক্ষমতা খুবই সীমিত।
আবারও আপনার ও আপনার পরিবারের কাছে আমি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টি প্রত্যাশা করে বলছি, অনুগ্রহ করে আর কখনো আমার বা আমাদের সাথে যোগাযোগ করবেন না।
আপনার সর্বোচ্চ সুখ ও শান্তি কামনা করছি।
ইতি
রেহনুমা কবির
১০ই সেপ্টেম্বর”।
মাসুক চিঠি পেয়ে তার মাকে দেখায়, মা বলে, ভুলে যাও ঐ গ্রাম্য মেয়েকে। আমি অন্য মেয়ে দেখছি। মাসুক বলে ওকে একটি শিক্ষা দিতে চাই। মা বলে, খবরদার ওসব কাজ করো না।
সময় গড়িয়ে রেহনুমা তার বাবা মায়ের ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানিয়ে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হয়। মাসুক বারবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় রেহনুমার প্রতি মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। তার সব খবর সে রাখে, কোথায় বা কোন রুমে থাকে, কোথায় টিউশনি করে, কোনদিন কয়টা ক্লাস ইত্যাদি সব। রেহনুমা সব ভুলে গেলেও এক শুক্রবার বিকেলে তার হোস্টেলে মাসুক একটি চিরকুট পাঠায় যে সে দেখা করতে চায়। রেহনুমা অস্বস্তিতে পড়ে তার রুমমেটকে নিচে পাঠায় বলতে যে রেহনুমা রুমে নেই। কিন্তু মাসুক চ্যালেঞ্জ করে বলে যে সে রুমেই আছে এবং কিছুক্ষণ আগে টিউশনি থেকে ফিরেছে। রেহনুমা দেখা করতে না চাইলেও ভাবে যে এটা ঢাকা শহর, তারা শিল্পপতি ও প্রভাবশালী, তারা চাইলে অনেক কিছুই করতে পারে, তাদের সাথে চ্যালেঞ্জ করা ঠিক হবে না, সে নেমে আসে।
— সরি মাসুক ভাই, আমি খুবই ক্লান্ত, তাই ঐ মিথ্যাটা বলে পাঠিয়েছি, কেমন আছেন?
— তোমাকে আমি যে শ্রদ্ধার চোখে দেখতাম, আজকের ঘটনাটা তার সঙ্গে যায় না।
— ভাই বললাম তো দুঃখিত, সত্যি বলতে কি আমি আশা করেছিলাম আর কখনও আপনার সাথে দেখা হবে না।
— খুব বেশি হতাশ করে ফেললাম?
— না হতাশ নয়, ভেবেছিলাম বিয়ে করে সংসারী হয়েছেন,
— যা হোক, কিছুক্ষন সময় দিতে পারবে?
— হাঁ চলুন, কোথায় বসবেন?
— শহীদ মিনারে চল।
শহীদ মিনারে গিয়ে বসে রেহনুমা বলে,
— কেমন আছেন বললেন না তো?
— এ অহেতুক প্রশ্নটি কেন কর? তুমি কি আমাকে ভাল থাকতে দিয়েছো?
— আমি কি করে আপনার ঘুম নষ্ট করলাম?
— তুমি জানো না?
— আমি এটুকু জানি আমি এখন বিয়ে করব না। তাতে আপনার কি? আপনার সাথে কি আমার প্রেম ছিল?
— তোমার না থাকলেও আমার ছিল, তা নাহলে এতবার তোমাদের বাড়িতে যাওয়া হয়?
— একতরফা প্রেম বা বিয়ে কোনটারই মূল্য নেই। ঠিকাছে বলুন কেন ডেকেছেন?
— তুমি আরেকবার বিবেচনা করো, আমি যে কোন শর্তে রাজি।
— না মাসুক ভাই, আমার লেখাপড়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছুই করতে পারবো না,
— তুমি কিন্তু আমাকে ধৈর্য্যর শেষ প্রান্তে ঠেলে দিচ্ছো।
— আপনি কি আমাকে হুমকি দিচ্ছেন?
— দিচ্ছি, প্রয়োজনে আরো নিচে নামব,
রেহনুমা চুপ করে থাকে, সে জানে এখানে সে যথেষ্ট নিরাপদ নয়, এ হুমকির মোকাবিলা কিভাবে করবে তাও তার জানা নেই, তারপর নরম সুরে বলে,
— আমার মৃত্যু হলে যদি আপনার তৃপ্তি হয়, তাহলে তাই করুন।
— মৃত্যুর কথাতো আমি বলিনি?
— আমার স্বপ্ন ভঙ্গ মানেই আমার মৃত্যু।
— তোমার তথাকথিত স্বপ্নের জন্য তুমি বিয়েও করবে না?
— কেন করব না, আমার সময় সুযোগ হলে অবশ্যই করব।
— কিন্তু আমাকে করবে না?
রেহনুমা চুপ থেকে বলে,
— মাসুক ভাই, আমার আগামীকাল একটি পরীক্ষা আছে, আমাকে একটু পড়াশোনা করতে হবে। আমি উঠি।
— আমাদের কি আবার দেখা হতে পারে?
— আসুন মাঝে মধ্যে, কথা বলব।
রেহনুমা উঠে চলে যায়, মাসুক আরো কিছুক্ষণ হতাশায় বসে থেকে ভাবে মফস্বল শহরের একটি মেয়ে, এত অহঙ্কার কেমন করে হয়!
চৌদ্দই ফেব্রুয়ারি রেহনুমা এনাটমি ক্লাস থেকে বের হয়ে দেখে একটু দুরে মাসুক দাঁড়িয়ে আছে, হাতে একটি ছোট্ট ব্যাগ, সে না দেখার ভান করে চলে যেতে চাইলে মাসুক পেছন থেকে ডাক দেয়,
— রেহনুমা,
— আরে মাসুক ভাই, আপনি এখানে?
— তোমার কি একটু সময় হবে?
—না, মাসুক ভাই আমার ল্যাব আছে,
— ল্যাব কতক্ষণ?
— দু’ঘন্টাতো অবশ্যই লাগবে।
— ঠিকাছে এ ব্যাগটা রাখো, আমি আরেক সময় এসে দেখা করব?
— এটা কি?
— রুমে নিয়ে খুলে দেখো,
— এটা কি ভ্যালেন্টাইনের কিছু, আজতো চৌদ্দই ফেব্রুয়ারি?
মাসুক চুপ করে থাকে,
— মাসুক ভাই কেন মিছেমিছি সময় নষ্ট করছেন? এটা আপনার কাছেই রাখুন, ল্যাবে নিয়ে যাওয়া যাবে না,
— এটা একটা আইফোন, সঙ্গে রাখলে কিছুই হবে না,
— ওমা! এত দামি আইফোন কেন?
— আমি মাঝে মধ্যে তোমার সাথে একটু কথা বলতে চাই, তাই তোমার একটা ফোন দরকার।
— ঠিকাছে, আমি পরে নেব, কারণ ল্যাবে চুরি বা কেউ নিয়ে যেতে পারে, আপাতত রাখুন, আমার ল্যাব শুরু হয়ে যাবে, আসি মাসুক ভাই, ভাল থাকবেন।
রেহনুমা চলে যায়, মাসুক অপমানে লাল হয়ে ফিরে যায়। সে ভাবে আর সহ্য করা যাবে না, প্রয়োজনে মাস্তান দিয়ে তুলে নিয়ে বিয়ে করবে।
পরের দিন রেহনুমা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ডিজির সাথে দেখা করে বলে, কোন এক শিল্পপতির ছেলে তাকে দীর্ঘ দিন থেকে বিরক্ত করছে। সে পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে চায় না, কারণ তাতে তার জীবন বিপন্ন হতে পারে। সে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে চট্টগ্রাম বা রাজশাহী মেডিকেলে বদলি চায়, তা সম্ভব কি না। ডিজি জানালো সম্ভব, রেহনুমা জানায় সে বাড়ি থেকে ফিরে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে। সে সপ্তাহে বাড়ি গিয়ে বাবা মাকে জানায় মাসুক তার পিছু ছাড়ছে না, সুতরাং তাকে অন্য কলেজে বদলি নিতে হবে। প্রথম প্রথম কিছু খরচের টাকা দিতে হবে, স্থায়ী হলে সে নিজেই টিউশনি জোগাড় করে নেবে, বাবা রাজি হয় এবং সে চট্টগ্রাম মেডিকেলে কলেজে বদলি নিয়ে নেয়, কিন্তু রুমমেটদেরকে বলে যায় সে বাড়ির কাছের বরিশাল মেডিকেল কলেজে বদলি নিচ্ছে।
মাসুকের কাছে খবর পৌঁছে যায়, সে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করলেও আর রেহনুমার হদিস করতে না পেরে বেপরোয়া জীবনে পা বাড়ায়।
পাঁচ বছর পর রেহনুমা ডাক্তার হয়ে ইন্টার্নশিপের অর্থপেডিক্স বিভাগের রোটেশনে পঙ্গু হাসপাতালে যেতে হয়। একদিন ওয়ার্ডে রাউন্ড দিতে গিয়ে দেখে একটি লোকের পা বেঁধে উঁচু করে রাখা হয়েছে এবং সে ঘুমাচ্ছে, একটু খোঁচা খোঁচা দাড়ি কিন্তু চেনা চেনা মনে হয়, একটু ভালো করে দেখতে গিয়ে দেখে মাসুক আনোয়ার। তাড়াতাড়ি তার মেডিকেল প্রোফাইলের ফাইলটি খুলে দেখে গাড়ি চালাতে গিয়ে বাসের সাথে ধাক্কা খেয়ে ডান পা গুড়া গুড়া হয়ে গেছে, তার রক্তে তখন .২৫% এলকোহল ছিল, এখন পা কেটে ফেলতে হতে পারে। তার চিৎকারের জন্য মরফিন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়। তার মনে পড়ে যায় তার মা ভোলা গিয়ে বলেছিল তার ছেলের প্রতি দয়া করতে। কারণ তার ছেলে বিপথে চলে যাচ্ছে। রেহনুমার মনটি খারাপ হয়ে যায় এবং চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে। চোখ মুছে ওয়ার্ড বয়ের কাছে জানতে চায়, এই রোগী এখানে কতদিন এবং পরিবারের কেউ আসে কিনা। ওয়ার্ড বয় জানায় তিন দিন আগে এখানে আনা হয়েছে, তিনি একজন শিল্পপতির ছেলে, তার মা, বাবা, ও স্ত্রী আসেন। রেহনুমা তার উর্ধতনের কাছে গিয়ে পঙ্গু হাসপাতালের রোটেশন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়।
