ভাংছে পাকিস্তান, ৭১—এর আয়নায় বালুচিস্তানের স্বাধীনতা ড. জীবন বিশ্বাস নিউইয়র্ক

২০২৬ সালের ১৩ জুলাই বালুচ লেখক অধিকারকর্মী মীর ইয়ার বালুচ স্বাধীনবালুচিস্তান প্রজাতন্ত্রপ্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন এবং ভারতসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে স্বীকৃতি প্রার্থনা করেন। তাঁর দ্ব্যর্থহীন উচ্চারণবালুচিস্তান পাকিস্তান নয়’—দীর্ঘকাল উপেক্ষিত একটি জনগোষ্ঠীর ক্ষোভ বঞ্চনাকে বিশ্বজনমতের সামনে নতুন করে হাজির করেছে। বালুচ বাহিনী ভূখণ্ডের ৮৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে কিংবা তাদের পাঁচ লক্ষ সদস্যের সামরিক শক্তি রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেছেন। তবে তথ্যগত নির্ভুলতার স্বার্থে বলা প্রয়োজন যে প্রস্তাবিত প্রজাতন্ত্রটিকে এখনো কোনো রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক সংস্থা স্বীকৃতি দেয়নি। প্রদেশটির প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এখনো পাকিস্তানের হাতে। অতএব এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক ঘোষণা কিন্তু আইনগতভাবে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা নয়। এই ঘটনাটির সংগে বাংলাদেশের একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং প্রতিবেশী দেশ ভারতের সার্বিক সহযোগিতার যে মিল, তা মোটেই কাকতালীয় নয়। অন্যদিকে ভারতেওককরোচপার্টির আন্দোলন যেন সাম্প্রতিক সময়ের বাংলাদেশে ২৪এর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এসব প্রসংগ নিয়েই আজকের উপসম্পাদকীয়।

বালুচিস্তান প্রদেশটি পাকিস্তানের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৪৪ শতাংশ অথচ পাকিস্তানের প্রায় ২৪ কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র কোটি ৪৮ লাখ সেখানে বাস করে। প্রদেশটিতে প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, তামা, সোনা অন্যান্য মূল্যবান খনিজের বিপুল মজুত রয়েছে, আছে ভূকৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গওয়াদর বন্দর। এই গওয়াদর বন্দর বর্তমান চীনের দখলে বললে অত্যুক্তি হবে না। তাই চীনের ভূমিকা স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানি শাসকদের পক্ষে, বালুচদের পক্ষে নয়। তা সত্ত্বেও এটি পাকিস্তানের সবচেয়ে কম জনবসতিপূর্ণ এবং অন্যতম অনুন্নত প্রদেশ। এই বৈপরীত্য থেকেই বালুচ জনগণের মধ্যে এমন ক্ষোভের জন্ম হয়েছে যে ইসলামাবাদ তাদের ভূমির সম্পদ আহরণ করে, কিন্তু তার ন্যায্য সুফল স্থানীয় মানুষের জীবনে ফিরিয়ে দেয় না। যেন একাত্তরপূর্ব পাকিস্তান, শোষিত সেই পূর্বপাকিস্তানেরই নতুন ছবি। কাজেই বালুচিস্তান যে স্বাধীন দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং তা যে এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র, ব্যাপারে বিদগ্ধ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অনেকেই এখন একমত পোষণ করেন।

বর্তমান বিদ্রোহেরও বহু আগে এই সংঘাতের সূচনা। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর কালাত দেশটি বছরখানেকের জন্য স্বাধীন দেশ হিসেবে পৃথক অবস্থান বজায় রেখেছিল। ১৯৪৮ সালের ২৭ মার্চ কালাতের শাসক পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন। এই ঘটনাকে বালুচ জাতীয়তাবাদী জবরদস্তিমূলক বলেই এখনও মনে করেন। এরপর ১৯৪৮, ১৯৫৮৫৯, ১৯৬৩৬৯ এবং ১৯৭৩৭৭ সালে বিদ্রোহ সংঘটিত হয়; বর্তমান সশস্ত্র আন্দোলন নতুন গতি পায় ২০০০এর গোড়ার দিকে। ২০০৬ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অভিযানে প্রবীণ বালুচ নেতা নবাব আকবর বুগতির মৃত্যু দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতাকে আরও বিস্তৃত স্থায়ী বিদ্রোহে রূপ দেয়। পাকিস্তানের বিভিন্ন সরকার উন্নয়নপ্যাকেজ সীমিত ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের প্রতিশ্রুতি দিলেও প্রদেশ পরিচালনার সামরিকনির্ভর কাঠামো খুব কমই বদলেছে।

বালুচদের দাবির শক্তিশালী নৈতিক ভিত্তি যে শুধুমাত্র তাদের পতাকা, মুদ্রা কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত ঘোষণাপত্র নয় বরং দমনপীড়নের নথিবদ্ধ মানবিক মূল্যÑ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণের সুযোগ নেই। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বালুচ অধিকারকর্মী সন্দেহভাজন জাতীয়তাবাদীদের গুম, নির্বিচার আটক, নির্যাতন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ নথিভুক্ত করেছে। বালুচ সংগঠনগুলোর হিসাবে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা কমপক্ষে ,০০০ যা পাকিস্তানের সরকারি তদন্ত কমিশনের হিসাবে সঠিক নয় বলে জানানো হয়েছে। অপেক্ষাকৃত কম সরকারি সংখ্যাটিও এমন এক ভয়াবহ সংকটের কথা জানান দেয় যে যাকে কোনো দায়িত্বশীল রাষ্ট্র কেবলসন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমবলে উপেক্ষা করতে পারে না।

রাষ্ট্রীয় নৈতিক বিচার সর্বক্ষেত্রে যে সমানভাবে প্রয়োগ করতে হয়, সে ধারণা পাকিস্তানের যে নেই, তা বাংলাদেশের মানুষের চেয়ে আর কে বেশি জানে! বালুচ লিবারেশন আর্মির মতো সশস্ত্র গোষ্ঠী নিরাপত্তা বাহিনী, অবকাঠামো, চীনা কর্মী এবং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে বলে পাকিস্তান প্রশাসন জানিয়েছে। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দিয়ে যেমন বেসামরিক মানুষ হত্যাকে বৈধতা দেওয়া যায় না, তেমনি জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তিতে গুমকে বৈধ করা যায় না। বিশ্বাসযোগ্য বালুচ আন্দোলনকে নির্বিচার সহিংসতা থেকে গণতান্ত্রিক মুক্তিসংগ্রামকে পৃথক রাখতে হবে। অন্যদিকে পাকিস্তানকেও শান্তিপূর্ণ কর্মী, শিক্ষার্থী নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারকে সশস্ত্র বিদ্রোহের সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে বিবেচনা করা বন্ধ করা জরুরী। শান্তিপূর্ণ বালুচ সমাবেশে সংযম প্রদর্শনের জন্য হিউম্যান রাইটস ওয়াচের আহ্বান প্রমাণ করে, ইসলামাবাদ কতটা ধারাবাহিকভাবে এই সীমারেখাটি লঙ্ঘন করে চলেছে।

বাংলাদেশ স্বাভাবিকভাবেই এখানে ১৯৭১ সালের প্রতিধ্বনি শুনতে পায়। দুটি পরিস্থিতি মোটেই অভিন্ন নয় এবং তাদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য রয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক ক্ষমতা, অর্থবহ প্রতিনিধিত্ব অস্বীকার, অর্থনৈতিক শোষণ, সাংস্কৃতিক অবজ্ঞা এবং মূলত রাজনৈতিক একটি সমস্যাকে সামরিক শক্তি দিয়ে সমাধানের চেষ্টাই জানিয়ে দেয় সেই আদি সামরিকপাকিস্তানের চরিত্র। যেন সেই পাকিস্তান একাত্তরে যারা রাতের আঁধারে স্বাধীনতাকামী নিরপরাধ সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করতে দ্বিধা করেনি পূর্বপাকিস্তানে। স্মরণ করা যেতে পারে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নির্বাচনী সংখ্যাগরিষ্ঠতা মেনে নিতে অস্বীকার করে এবং অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে নৃশংস দমনাভিযান শুরু করে। ফলে গণতান্ত্রিক কর্তৃত্বের দাবি জাতীয় মুক্তিযুদ্ধে পরিণত হয়। প্রায় দেড়কোটি শরণার্থী তখন ভারতে আশ্রয় নেয়। সেই বিপুল মানবিক বোঝা বহনের পর ভারত মুক্তিবাহিনীর পাশে সিদ্ধান্তমূলকভাবে যুদ্ধে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত করে।

বাংলাদেশের পক্ষে ছিল সুস্পষ্ট নির্বাচনী ম্যান্ডেট, প্রবাসী সরকার, সংগঠিত সশস্ত্র প্রতিরোধ, ভূখণ্ডের ওপর কার্যকর উপস্থিতি এবং শেষ পর্যন্ত অনুকূল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি। মীর ইয়ার বালুচের ঘোষণায় এখনো তেমন প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা, ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব কিংবা কার্যকর সরকার দৃশ্যমান নয়। বহুল স্বীকৃত মন্টেভিডিও মানদণ্ড অনুযায়ী, রাষ্ট্র হওয়ার জন্য স্থায়ী জনসমষ্টি, নির্ধারিত ভূখণ্ড, কার্যকর সরকার এবং অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের সামর্থ্য প্রয়োজন। একটি ঘোষণা জাতির আকাঙ্খা প্রকাশ করতে পারে কিন্তু কেবল ঘোষণাই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে না। কাজেই বাংলাদেশের মতই বালুচিস্তানকেও স্বাধীন রাষ্ট্রগঠনের সমস্ত উপকরণ নিয়ে এখনই ভাবতে হবে।

ভারতের সামনেও এখন একই সঙ্গে সুযোগ বিপদ উপস্থিত। ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল পাহেলগামে সংঘটিত হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর ভারতপাকিস্তান সম্পর্ক নতুন করে বিপজ্জনক সংঘাতের দিকে এগিয়ে যায়। ভারত হামলাকারীদের সঙ্গে সীমান্তপারের যোগাযোগের অভিযোগ তোলে যা পাকিস্তান অস্বীকার করে। পরবর্তী সময়ে নয়াদিল্লি কূটনৈতিক সম্পর্কের মাত্রা কমিয়ে দেয় এবং সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করে এই প্রেক্ষাপটে বালুচ মানবাধিকারের প্রতি ভারতীয় সমর্থন নীতিনিষ্ঠ সংহতির পরিবর্তে পাকিস্তান কর্তৃক কৌশলগত প্রতিশোধ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যেমনটি হয়েছে একাত্তরে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেও একই সময়ে দেশের ভেতরে একটি কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, বেকারত্ব সরকারি জবাবদিহিতার দাবিতে গড়ে ওঠা তরুণনেতৃত্বাধীন ককরোচ জনতা পার্টি আন্দোলন বেশ জোরদার হয়েছে। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার বিতর্কে প্রায় ২০ লাখ পরীক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা যায়। আন্দোলনটির পেছনে ডিপস্টেটের ইন্ধন রয়েছে বলে ভারত ইতোমধ্যেই অভিযোগ করেছে। তবে সময়ই বলে দেবে এরা কারা, যেমনটি এখন জানা গেছে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে।

ভারতপাকিস্তান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবশ্যই নৈতিকতার প্রয়োজনে, একাত্তরের কথা মনে করে শোষিতের পক্ষেই থাকা উচিত। গুমের স্বাধীন তদন্ত, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, সম্পদের ন্যায়সংগত বণ্টন এবং শান্তিপূর্ণ বালুচ প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার পক্ষে আন্তর্জাতিক পরিসরে কথা বলাই হতে পারে বাংলাদেশের যথার্থ ভূমিকা। নিজের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কারণে নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানোর বিশেষ দায়িত্ব বাংলাদেশের ওপর নীতিগতভাবে অর্পিত হয়েছে। একাত্তরের সেই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মুক্তির বৈধতা আসে জনসমর্থন, প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব এবং বেসামরিক জীবনের প্রতি অবিচল সম্মান থেকে।

বালুচিস্তান হয়তো রাষ্ট্র নির্মাণের আগেই একটি পতাকা উড়িয়েছে, স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছে; কিন্তু একথা অস্বীকার করার উপায় নেই তারা নিষ্পেষিত, উপেক্ষিত এবং পাকিস্তানের সংগে সহাবস্থানে কখনোই স্বেচ্ছায় সায় দেয়নি। এর যথার্থ প্রতিক্রিয়া নৈরাশ্যবাদী নীরবতাও নয়, আবেগনির্ভর স্বীকৃতিও নয়, প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ। পাকিস্তানকে যেমন দমনপীড়নের জবাব দিতে হবে, তেমনি বালুচ নেতৃত্বকে গণতান্ত্রিক বৈধতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ভারতকে ভূরাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রেও যথাযথ ভূমিকা নিতে হবে। আর বাংলাদেশকে ১৯৭১এর স্মৃতিকে মানবাধিকারের স্বাধীন কূটনীতিতে রূপান্তর করতে হবে। ইতিহাস বলে, পাকিস্তান রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার উত্তর সামরিক বলপ্রয়োগ দিয়েই নিবৃত্ত করে থাকে। বালুচিস্তানের ক্ষেত্রেও সেরকম শক্তিপ্রয়োগেরই নমুনা দৃশ্যমান। সন্দেহ নেই, পাকিস্তান আবার সেই ঐতিহাসিক ভুলের পুনরাবৃত্তির পথে চলেছে। এই একই কারণে একাত্তরে বীর বাঙালি যারযা ছিল তাই নিয়েই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করে এবং পাকিস্তান তার পূর্বাঞ্চল হারায়। মানুষের আস্থা ধ্বংস হওয়ার পরও কেবল শক্তি দিয়ে ভূখণ্ড ধরে রাখা যায়, পাকিস্তান তার চিরাচরিত এই বিপজ্জনক বিশ্বাস নিয়েই বালুচদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে স্তব্ধ করার চেষ্টায় মত্ত। তারা বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের যেমন রুখতে পারেনি, বালুচস্বাধীনতাকামিদের পারবে না। সামরিক বল প্রয়োগ কখনোই মুক্তিযুদ্ধের সমাধান নয়।

Related Posts