কাগজের ক্যানভাসে পৃথিবীর গল্প—উনিশ ব্যাংক নোটে রানী এলিজাবেথ || আখতার আহমেদ রাশা নিউজার্সি

রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ কেবল সিংহাসনেই দীর্ঘকাল রাজত্ব করেননি, বিশ্বের নানা দেশের কাগজের মুদ্রাতেও তিনি তৈরি করে গেছেন এক অবিশ্বাস্য ঐতিহাসিক রেকর্ড। বিশ্বের সবচেয়ে বেশী দেশের ব্যাংক নোটে ছবি থাকার জন্য তিনি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নিজের নাম লিখিয়েছেন। এখানে একটা মজার হিসাব আছে। বিশ্বজুড়ে মোট ৩৩টি দেশের ব্যাংক নোটে রানীর ছবি সরাসরি ব্যবহার করা হয়েছিল। তাহলে গিনেস বুক কেন ৩৭টি দেশের কথা বলে? কারণ হলো, কিছু নোট ছিলযৌথ মুদ্রা যেমন পূর্ব ক্যারিবীয় ডলারের নোটটি একটি হলেও সেটি একযোগে আটটি আলাদা দেশে ব্যবহৃত হতো। এই কারণেই ইস্যুকারী কর্তৃপক্ষ ৩৩টি হলেও রানী এলিজাবেথ ৩৭টিরও বেশি সার্বভৌম দেশের ব্যাংক নোটে রাজত্ব করেছেন।

অনেকেই মনে করেন মুদ্রার ক্যানভাসে রানীর এই অনন্য যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৫২ সালে। কিন্তু আসল বিষয়টি বেশ চমকপ্রদ! ১৯৩৫ সালে মাত্র বছর বয়সে কানাডার ২০ ডলারের নোটে প্রথমবারের মতো তাঁর পোট্রের্ট ছাপা হয়। তখন তিনি কেবলই একজন ছোট্ট রাজকুমারী ছিলেন। এটি রানীর জীবনের প্রথম ব্যাংক নোটের ছবি এবং এই ব্যাংক নোটটি সংগ্রাহকদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান একটি ক্লাসিক নোট।

মানুষের পকেটে ঘুরে বেড়ানো এই ব্যাংক নোটগুলো আসলে রানীর জীবনের এক একটি টাইম মেশিন যা তাঁর তরুণী বয়স থেকে শুরু করে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত প্রতিটি রূপকে ধরে রেখেছে। ১৯৫৩ সালে বাহামা দ্বীপপুঞ্জের নোটে যখন রানীর ছবি ছাপা হয়, তখন তিনি সিংহাসনে বসার মাত্র এক বছর পূর্ণ করেছেনÑ তাঁকে দেখা যায় অত্যন্ত দীপ্তিময় রূপে। অনেক দেশ তাদের কাগজের টাকায় রানীর এই চেনা রূপটি সহজে বদলাতে চায়নি। বেলিজের নোটে তো ১৯৭৬ সালেও রানীকে সেই একই রকম তরুণী দেখাচ্ছিল! অবশেষে ১৯৯০ সালের দিকে এসে বেলিজের ব্যাংক নোটটি নতুন করে ডিজাইন করা হয় এবং সময়ের নিয়ম মেনে রানীর অবয়বে বয়সের ছাপ ফুটিয়ে তোলা হয়। 

রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের এই মুদ্রাভ্রমণ কেবল রাজকীয় ঐতিহ্যের অংশ নয় বরং এটি কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সাথে যুক্তরাজ্যের গভীর ঐতিহাসিক সম্পর্কেরও প্রমাণ। বাহামা থেকে বেলিজ, কানাডা থেকে নিউজিল্যান্ডÑবিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হাত ঘুরে রানীর এই পোট্রের্টগুলো পরিণত হয়েছে ইতিহাসের এক একটি অমূল্য দলিলে। ব্যাংক নোটের ইতিহাসে ফিজি রানী এলিজাবেথের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ভিন্ন ভিন্ন পোট্রের্ট ব্যবহার করেছে। তারা তাদের বিভিন্ন নোটের সিরিজে রানীর মোট ৬টি ভিন্ন বয়সের প্রতিকৃতি ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড, বারমুডা এবং কানাডা ব্যবহার করেছে ৫টি করে ভিন্ন ছবি। অনেক দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও বেশ কিছু বছর তাদের নোটে রানীর ছবি রেখে দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদের অংশ হিসেবে রানীর ছবি সরিয়ে নিজেদের জাতীয় বীর বা স্থানীয় প্রকৃতির ছবি যুক্ত করে। জ্যামাইকা ১৯৬২ সালে স্বাধীন হওয়ার পর রানীর ছবি সরিয়ে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ জাতীয় বীর মার্কাস গারভের (গধৎপঁং এধৎাবু) ছবি যুক্ত করে। সেশেলস রানীর ছবি সরিয়ে তাদের নোটে দ্বীপটির অনন্য বন্যপ্রাণী প্রকৃতির ছবি যুক্ত করে। ১৯৯৭ সালে হংকং চীনের কাছে হস্তান্তরিত হওয়ার পর রানীর ছবিযুক্ত ডলারে স্থান পায় হংকংয়ের আকাশচুম্বী ভবন এবং ঐতিহ্যবাহী ড্রাগনের নকশা।

রানীর ব্যাংক নোটগুলোর আরেকটি চমৎকার দিক হলো তাঁর রাজকীয় সাজসজ্জা। অধিকাংশ নোটে তাঁকে রাজমুকুট এবং জমকালো রাজকীয় পোশাকে দেখা গেলেও, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার ব্যাংক নোটগুলোতে তাঁকে তুলনামূলক সাধারণ পোশাকে এবং গলায় একটি সাধারণ মুক্তার মালা পরা অবস্থায় ফুটিয়ে তোলা হতোÑ যা বেশ প্রশংসিত হয়েছিল। 

কাগজের মুদ্রায় রানীর ছবি মুদ্রণকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে বহু বিচিত্র, কৌতূহলোদ্দীপক এবং আন্তর্জাতিক মহলে তোলপাড় সৃষ্টি করা কাহিনীর জন্ম হয়েছে। ব্যাংক নোটের ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং মজার বিতর্কটি ঘটেছিল ১৯৫৪ সালে কানাডায়। রানী এলিজাবেথের সিংহাসনে আরোহণের পর কানাডা তাদের ডলার থেকে শুরু করে সব নোটে রানীর একটি নতুন প্রতিকৃতি ব্যবহার করে। নোটগুলো বাজারে ছাড়ার কিছুদিন পরই সাধারণ মানুষের মধ্যে তুমুল হট্টগোল শুরু হয়। তীক্ষèদৃষ্টিসম্পন্ন কিছু মানুষের চোখে পড়ে যে, রানীর কানের ঠিক পেছনে তাঁর চুলের ভাঁজ ছায়ার বিন্যাসটি অদ্ভুতভাবে একটি শিংওয়ালা হাস্যোজ্জ্বল শয়তানের মুখের (উবারষ ভধপব) অবয়ব তৈরি করেছে! চারদিকে মুহূর্তেই রটে যায় যে, নোটের ডিজাইনার ইচ্ছাকৃতভাবে এই কান্ডটি ঘটিয়েছেন। বিতর্ক সমালোচনা এতটাই তীব্র রূপ নেয় যে, ব্যাংক অব কানাডা দ্রুত সেই নোটের প্রিন্টিং প্লেট পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। রানীর চুলের সেই অংশটি পুনরায় ডিজাইন (জবঃড়ঁপয) করে শয়তানের অবয়বটি সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়। ব্যাংকনোট সংগ্রাহকদের কাছে ১৯৫৪ সালের এই বিতর্কিতডেভিলস ফেসসিরিজটি এখন অত্যন্ত দুর্লভ, আকর্ষণীয় এবং মূল্যবান এক সংগ্রহ।

১৯৬৮ থেকে ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভারত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র সেশেলস (ঝবুপযবষষবং) তাদের ৫০ রুপির নোটে রানীর ছবি ব্যবহার করেছিল। সেই নোটের ডানপাশে রানীর ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে চমৎকার কিছু পাম গাছ (চধষস ঞৎববং) আঁকা ছিল। কিন্তু নোটটি বাজারে আসার পর এক অদ্ভুত বিষয় আবিষ্কার হয়। পাম গাছের পাতাগুলো এমনভাবে বাঁকা করে নকশা করা হয়েছিল যা একটু দূর থেকে বা মনোযোগ দিয়ে দেখলে খুব স্পষ্টভাবে ইংরেজিঝঊঢশব্দটি ফুটে উঠত! সেই সময়ে রক্ষণশীল সমাজে এটি তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করে। ধারণা করা হয় স্বাধীনতার ঠিক আগে কোনো ক্ষুব্ধ স্থানীয় ডিজাইনার ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ওপর প্রতিবাদ জানাতে গোপনে এই কান্ডটি ঘটিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে সেশেলস স্বাধীন হওয়ার পর এই সিরিজের নোটগুলো বাজার থেকে তুলে নেওয়া হয়। ১৯৬০ সালের মার্চ প্রথমবারের মতো ব্যাংক অব ইংল্যান্ড রানীর ছবিসহ পাউন্ডের নোট বাজারে ছাড়ে। এই নোটের জন্য রানীর যে প্রতিকৃতি ব্যবহার করা হয়েছিল, সেটি এঁকেছিলেন রবার্ট অস্টিন। মজার ব্যাপার হলো সেই ছবিতে রানীকে অত্যন্ত গম্ভীর, বয়সের চেয়ে অনেক বেশি বয়স্ক এবং কিছুটা প্রাণহীন দেখাচ্ছিল। তৎকালীন ব্রিটিশ মিডিয়া এবং সাধারণ মানুষ এই ছবির তীব্র সমালোচনা করে। স্বয়ং রানী এলিজাবেথও ছবিটি দেখে বেশ অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। বলা হয়ে থাকে রানী রসিকতা করে বলেছিলেনÑ এই নোটের ছবি দেখলে তিনি নিজেই ভুলে যান যে তাঁর বয়স কত! এর পরেই ব্যাংক অব ইংল্যান্ড তাদের পরবর্তী সিরিজগুলোতে রানীর অনেক বেশি সজীব, হাসিখুশি বাস্তবসম্মত পোট্রের্ট ব্যবহার করা শুরু করে।

২০২২ সালের সেপ্টেম্বর ৯৬ বছর বয়সে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর এই বিদায়ের সাথে সাথে বিশ্ব ব্যাংক নোটের ইতিহাসেও এক সোনালী যুগের সমাপ্তি ঘটে।

তাঁর মৃত্যুর পর যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং কানাডাসহ কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলো তাদের মুদ্রায় পরিবর্তন আনার কাজ শুরু করেছে। ইতিমধ্যেই যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি ফকল্যান্ড আইল্যান্ডসসহ আরও বেশ কয়েকটি সহযোগী দেশ অঞ্চলের নতুন মুদ্রায় তাঁর ছেলে বর্তমান রাজা তৃতীয় চার্লসের প্রতিকৃতি স্থান পেতে শুরু করেছে। তবে নতুন নোট বাজারে এলেও রাতারাতি পুরনো নোটগুলো বাতিল হয়ে যায় না। তাই রানীর মৃত্যুর কয়েক বছর পর এখনো বিশ্বের অন্তত ১৫টি দেশে রানী এলিজাবেথের ছবি সম্বলিত কোটি কোটি ব্যাংক নোট মানুষের হাতে হাতে ঘুরছে এবং কেনাকাটায় ব্যবহৃত হচ্ছে। হয়তো একদিন ব্যাংক নোটের বাজার থেকে তাঁর ছবি পুরোপুরি উঠে যাবে কিন্তু কাগজের মুদ্রার ইতিহাসে দীর্ঘতম রাজত্ব করা এই রানীর রেকর্ডটি চিরকাল অম্লান থাকবে।

 


Related Posts