শেষ রক্ষা বড়ই কঠিন
আমেরিকার রাজনীতিতে ডেমোক্রেটিক সোশালিস্ট হিসাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়িয়ে ঝড় তোলেন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স। তিনি মূলত ডেমোক্রেট। কিন্তু নিজেকে স্বতন্ত্র বলে দাবি করেন। তবে সিনেটে ভোট দেয়ার সময় ডেমোক্রেটদের সাথেই থাকেন। ২০১৬ সালে যখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়ান তখন তার বয়স ৭৫ বছর। তাঁর নির্বাচনী এজেন্ডাগুলো ধনিক শ্রেণি ও পুঁজিবাদী ছাড়া প্রায় সকলেরই ভাল লাগবে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও স্বল্প আয়ের মানুষদের জন্য তা সুধার মত। কিন্তু তিনি যে সহসাই জয়ী হতে পারবেন না তা তিনি জানেন। যে আমেরিকা নারী ভোটাধিকার পাওয়ার প্রায় ১০০ বছর পরেও একজন নারী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করার জন্য এখনো মানসিকভাবে প্রস্তুত নয়, সেই আমেরিকার পুঁজির অর্থে গড়ে ওঠা রাষ্ট্র ব্যবস্থা বার্নি স্যান্ডার্সের মত সোশালিস্ট প্রার্থীকে ভোট দিয়ে জেতাবে কেন? ডেমোক্রেটিক পার্টির ২০১৬ সালের প্রাইমারিতে হিলারি ক্লিনটনের কাছে হেরে গেলেও বার্নি স্যান্ডার্স পান ১ কোটি ৩২ লক্ষ ১০ হাজার ৫৫০ ভোট। ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থিতা দেয়ার ঘোষণা দিয়ে পরে প্রত্যাহার করে নেন। কিন্তু যে এজেন্ডা নিয়ে কাজ করছেন দীর্ঘদিন ধরে তাতে তার নিজস্ব বা একক সাফল্য প্রত্যাশিত নয়। তিনি জানেন অর্থ দিয়ে সবকিছু বিচার করার মানসিকতা কোনো মর্যাদাসম্পন্ন মানুষের অভীষ্ট হতে পারে না। একটি রাষ্ট্রের কিছু মানুষ কোটি কোটি ডলারের মালিক আর বেশির ভাগ মানুষ স্বল্প আয়ের। ধনিক শ্রেণি এমনভাবে বাজার ব্যবস্থা তৈরি করে রেখেছে যে সেখানে হাত দিলেই দরিদ্র মানুষের হাত পুড়ে যায়। ফলে বৈষম্য কমে সমতল ভূমি না হোক ৫৫—৪৫ হোক, তাও তারা চায় না। দরিদ্রকে দরিদ্র রেখে পুঁজির পাহাড় গড়ে তুলে সমাজপতি হওয়ার জায়গাটিও তারা নিশ্চিত করে। যেমন নির্বাচনে সুপার প্যাক বা কর্পোরেট মানি দিয়ে ধনিক শ্রেণির প্রতিনিধিদের ক্ষমতায় নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া। কিন্তু আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও কর্টেজ নামক এক দরিদ্র পরিবারের বার—টেন্ডার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তিন ডলারের সাহায্য নিয়ে দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষদের পক্ষে কাজ করার প্রতিশ্রম্নতি দিয়ে কুইন্স ও ব্রংক্সের অত্যন্ত শক্তিধর কংগ্রেস সদস্য জো ক্রাউলিকে ধরাশায়ী করেন। নিউইয়র্কে বার্নি স্যান্ডার্সের প্রথম বড় সাফল্য এওসি। ২০১৮ সালে নির্বাচনে জিতে তিনি আমেরিকার ভিত্তিতে আঘাত করেন। ডেমোক্রেটিক সোশালিস্টস অব আমেরিকার পতাকা যেমন তিনি উড়িয়ে দেন নিউইয়র্কে, অপরদিকে মিশিগানে কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট ১৩ থেকে একই ব্যানারে বিজয় ছিনিয়ে নেন প্যালেস্টাইনি বংশোদ্ভুত রাশিদা তস্নাইব। একই বছর মিনেসোটার পঞ্চম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে নির্বাচিত হন অপর সোশালিস্ট প্রার্থী সোমালিয়ার ইমিগ্রান্ট ইলহান ওমর।
নিউইয়র্কসহ আমেরিকার অন্যান্য স্টেট ও সিটিতে স্থানীয় নির্বাচনে অনেক সোশালিস্ট প্রার্থী জিতেছেন। নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিল এবং স্টেট সিনেট ও এসেম্বলিতে সোশালিস্ট প্রতিনিধিদের সংখ্যা কম নয়। উইকিপিডিয়া বলছে, ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় পুরো আমেরিকায় ডেমোক্রেটিক সোশালিস্টস অব আমেরিকা পার্টির সদস্য সংখ্যা ছিল মাত্র ৬০০০, আর দশ বছরে অর্থাৎ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েছে ১২০,০০০এ। এত দ্রুত এই সংখ্যা বেড়ে যাবে তা হয়ত বার্নি স্যান্ডার্সও ভাবেননি। তবে এই সোশালিস্ট ধারণা জনপ্রিয় হওয়ার কারণ কেবল ব্যক্তি নয়, এর মূল কারণ রয়েছে দুই দিকে। একদিকে পুঁজিবাদের তীব্র বৈষম্য বৃদ্ধির ক্ষতিকর দিক, অন্যদিকে সোশালিস্ট ধারণার জনমুখীনতার প্রচারণা।
আমেরিকার বড় বড় শহরগুলোতে এই বৈষম্য চোখে পড়ার মত। বিষয়টি আমেরিকার তরুণদের বিপুলভাবে আলোড়িত করে। রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান লোভ এবং অর্থের প্রভাব যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছিল, তা লক্ষ্য করে ২০১১ সালে শুরু হয় ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলন। এই আন্দোলনের মূল কথা ছিল এদেশে দরিদ্র ও বিত্তবানদের মধ্যে দূরত্ব হচ্ছে ১% থেকে ৯৯%। আন্দোলনকারীরা জানান তারা ৯৯% এর পক্ষে। ঐ বছর সেপ্টেম্বরে লোয়ার ম্যানহ্যাটানের জুকোটি পার্কে আন্দোলনকারীরা অবস্থান ধর্মঘট করে তাদের শর্তাবলী মেনে নেয়ার দাবিতে। মেয়র মাইকেল ব্লুমবার্গ রাতের অন্ধকারে তাদের উচ্ছেদ করেন।
নিউইয়র্কের পক্ষ নিয়ে বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে পড়া ৯৯% এর সেই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত আপাতভাবে স্তিমিত হয়ে গেছে মনে হলেও ভেতরে ভেতরে সেই ক্ষোভ জমা হচ্ছিল। এর প্রভাবে নিউইয়র্ক স্টেট সিনেট ও এসেম্বলিতে এবং সিটি কাউন্সিলে বেশ কয়েকজন প্রার্থী নির্বাচিত হন যারা সোশালিস্ট ধারণা নিয়ে নির্বাচনে অবতীর্ণ হন। সবাইকে চমকে দিয়ে তারা জয়ী হলেও তাদের কর্মকান্ডে তেমন কোনো পার্থক্য লক্ষ্য করা যায় না। কিন্তু ২০২৫ সালের শুরুতে জোহরান মামদানির নিউইয়র্ক সিটির মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণাটি জনাকীর্ণ প্রার্থীদের ভিড়ে তাকে পৃথকভাবে চিনতে শেখালেও অনেকেই সন্দিহান ছিলেন। কারণ তিনি সোশালিস্ট ডেমোক্রেটদের ধারা মতো সব সময় গাজা হত্যাকান্ডের বিরোধিতা করেছেন রাস্তায় নেমে। এক সময় তার লেগাল স্ট্যাটাস কেড়ে নিয়ে ডিপোর্ট করার ভয়ও দেখানো হয়। কিন্তু দিন যত গেছে জোহরান তার স্মার্টনেস প্রমাণ করেছেন এবং সবাইকে টপকে জয়ী হয়েছেন।
এখন যেটা বলা হচ্ছে তাহলো, আমেরিকাকে সোশালিস্ট বা সমাজতান্ত্রিক দেশে রূপান্তরের ষড়যন্ত্র চলছে। সত্যিই কি তাই? পৃথিবীর অধিকাংশ সমাজতান্ত্রিক দেশে এই পদ্ধতি ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থ হওয়ার নানা কারণ রয়েছে। সেসব আলোচনার জায়গা এটা নয়। প্রথম কথা হচ্ছে, ডেমোক্রেটিক সোশালিস্টস অব আমেরিকা কোনো রাজনৈতিক দল নয়। তাদের নির্বাচনে অংশ নেয়ার কানো সুযোগ নেই। কিন্তু তাদের ব্যানারে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীরা নির্বাচন করেন। তাদের মূল এজেন্ডা আমেরিকার ধনী ও দরিদ্রের পার্থক্য কমিয়ে আনা। দরিদ্রদের সুবিধা বঞ্চিত না রেখে তাদের হাতে প্রায় সব কিছুই ‘এ্যাফোের্ডেবল’ বা সহজলভ্য করে তোলা। সাধারণত অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানো সম্ভব নয়, কারণ এর পিছনে কাজ করে পুঁজিবাদী কৌশল ও মেশিন। এর জন্য প্রয়োজন সরকারী কর্মসূচী। যাতে দরিদ্র মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্য, পণ্য ক্রয় এবং বাসস্থান, শিক্ষা ও বিনোদনের সুযোগ পায়। সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, কংগ্রেসউয়োম্যান আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও কর্টেজ কিংবা মেয়র জোহরান মামদানি সে কথাই বলতে চাচ্ছেন। কিন্তু আমেরিকার গণমাধ্যমও নিয়ন্ত্রণ করে পুঁজিবাদ। যদিও নিউইয়র্ক টাইমস একটু ব্যতিক্রমধমীর্ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছিল। কিন্তু যারা পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে তারা বারবারই বলছেন ডেমোক্রেটিক সোশালিস্টরা আমেরিকাকে কম্যুনিস্ট দেশে পরিণত করতে চাচ্ছে। সংবাদ মাধ্যমও প্রধানত এদের বিরুদ্ধে।
অপপ্রচার অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর হয়। হিটলার সেটা প্রমাণ করেছে। কিন্তু সেটা সাময়িক। এখন অপপ্রচার যেমন বেশি, মানুষ বিভ্রান্তও বেশি। তবে অবাধ তথ্য প্রবাহের কারণে এবং সামাজিক মাধ্যমের কারণে ভাল—মন্দ বাছার অধিকার তৈরি হয়েছে।
এই অপপ্রচারে কি পুঁজিবাদের দোসর ছাড়া অন্য কেউ গুরুত্ব দিচ্ছেন? অপপ্রচার মানুষ পছন্দ করে। এ কারণে অপপ্রচার নিয়েও ব্যবসা করতে চায় পুঁজির মালিকরা। সত্যি সত্যিই সাধারণ জনগণ অসহায়। তবে তারা জেগে উঠলে শেষ রক্ষা বড়ই কঠিন।
