গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়— উনিশ রাগের শৃঙ্খলাতেই সুরকে বাঁধেন স্বাচ্ছন্দ্যে শিল্পী অখিলবন্ধু ঘোষ
জীবন বিশ্বাসঃ শিল্পী অখিলবন্ধু ঘোষ রাগাশ্রয়ী গানে স্বাচ্ছন্দ্য থাকলেও শ্রোতার কাছে তা যেন রাগের চর্চা না হয়ে শ্রুতিমধুর ও সহজবোধ্য আধুনিক গান হয়ে ওঠে, সেদিকে ছিলেন প্রচণ্ড সচেতন। তিনি সস্তা হাততালির চটুল হাটে বিকিয়ে যাওয়ার মতো শিল্পী কোনোকালেই ছিলেন না। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে আধুনিক বাংলা গানের বাজার যখন আবেগের তোড়ে ভাসছে, তখন এই মানুষটি নীরব এক কারিগরের মতো ঘরের দরজা বন্ধ করে রেওয়াজের সুতো দিয়ে মেপে নিচ্ছিলেন বিরহের নিখুঁত দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ। তাঁর গায়কি কোনো গমগমে সশব্দ উৎসব নয় বরং বড় কোনো ঝড় থামার পর ভেজা স্তব্ধতায় ছড়িয়ে থাকা এক অলৌকিক সুরের স্থাপত্য। তিনি বাঙালিকে প্রথম শেখালেন, স্বরের মিতব্যয়িতা আর শাস্ত্রীয় অনুশাসনের কঠোর শিকলে বেঁধেও বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসকে অমর শিল্পে রূপ দেওয়া যায়।
১৯২০ সালের ২০ অক্টোবর কলকাতার ভবানীপুরে জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর শিকড় কিন্তু জড়িয়ে ছিল নদীয়া জেলার রানাঘাটের কাছাকাছি এক শান্ত গ্রাম্য আবহে। পিতা বামনদাস ঘোষ ও মাতা মণিমালা দেবীর সংসার হলেও বালক অখিলবন্ধুর জীবনের একটি বড় অংশ কেটেছে চাকদায় মাতুলালয়ে। মামা কালিদাস গুহের সাহচর্যে সুরের প্রতি যে অনুরাগের জন্ম হয়েছিল, তা কেবল সাধারণ গান গাওয়ার শখ ছিল না, ছিল এক জীবনব্যাপী ধ্যানের শুরু। পরবর্তীতে কলকাতায় ফিরে এসে তিনি প্রথাগত তালিম নেওয়া শুরু করেন। ওস্তাদ নিরাপদ মুখোপাধ্যায়, খ্যাতনামা সঙ্গীতাচার্য তারাপদ চক্রবর্তী, পণ্ডিত চিন্ময় লাহিড়ী এবং পণ্ডিত কে. জি. ঢেকনের মতো মার্গসংগীতের শীর্ষ—ওস্তাদদের চরণতলে বসে তিনি কণ্ঠকে নিখুঁতভাবে ঝালিয়ে নেন। এই বৈচিত্র্যময় ও কঠোর তালিমই তাঁর গলায় এনে দিয়েছিল এক দুর্ভেদ্য শাস্ত্রীয় ভিত্তি। ফলে আধুনিক গান গাইতে গিয়েও তিনি কখনোই সুরের সীমানা ডিঙিয়ে চটুলতায় নামেননি, বরং রাগাশ্রয়ী আভিজাত্যকে ধরে রেখেছিলেন শেষ দিন পর্যন্ত। ১৯৮৮ সালের ২০ মার্চ তাঁর জীবনাবসান হলেও বাংলা গানের ইতিবৃত্তে তিনি থেকে গেছেন এক চিরন্তন ও অবিচল আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে।
উত্তাল কলকাতা, বেতারের সুর ও জীবনের প্রথম রেকর্ড
চল্লিশের দশকের কলকাতা তখন ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিনগুলোর এক বিভীষিকাময় সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালো মেঘ, মন্বন্তরের বীভৎসতা আর দেশভাগের ট্র্যাজেডিতে শহর যখন ক্ষতবিক্ষত, ঠিক তখনই ১৯৪৪—৪৫ সাল নাগাদ কলকাতা বেতারে অখিলবন্ধুর কণ্ঠ প্রথম ভেসে আসে। তৎকালীন সামাজিক অস্থিরতার বিপরীতে তাঁর সংযত ও নিভৃত গায়কি এক অদ্ভুত মলমের মতো কাজ করেছিল। ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড—‘একটি কুসুম যবে’ এবং ‘আমার কাননে ফুটেছিল ফুল’। তবে ১৯৫৩ সালে রেকর্ডকৃত ‘মায়ামৃগ সম’ এবং ‘কেন প্রহর না যেতে’ গান দুটি বাংলা আধুনিক গানের ইতিহাসকে আমূল বদলে দেয়। কোমল ও শুদ্ধ স্বরের অদ্ভুত মেলবন্ধন এবং মিড় ও তানের পরিমিত ব্যবহারে তিনি প্রমাণ করলেন যে, উচ্চাঙ্গ সংগীতের ক্লাসিক্যাল ব্যাকরণ বজায় রেখেও কীভাবে সাধারণ শ্রোতার হৃদয়ে গভীর নাড়া দেওয়া সম্ভব।
বাণীর সততা ও স্বরের মিতব্যয়িতা
অখিলবন্ধু ঘোষের গায়কিকে বুঝতে তাঁর ‘স্বরের মিতব্যয়িতা’র দর্শনকে বোঝা জরুরি। তিনি কখনো সুরের আড়ালে গান বা বাণীকে ঢাকা পড়তে দেননি। তান কিংবা গমক তাঁর গানে ব্যাকরণের চাতুরি হয়ে আসেনি, এসেছে অন্তরের আর্তি ফুটিয়ে তোলার হাতিয়ার হিসেবে। ‘ও দয়াল বিচার করো’ গানটির কথাই ধরা যাক—সেখানে যে বিচার চাওয়ার হাহাকার রয়েছে, তার ভেতর কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে কেবল বহু বছরের পুঞ্জীভূত বেদনাকে এক পরম সমর্পণে প্রকাশের ব্যাকুলতা। আবার ‘বাঁশুরিয়া বাঁশি বাজাইয়ো না’ গানে যে আকুতি, তা বাঁশির সুরের বিরুদ্ধে নালিশ হলেও তার ভেতরে জড়িয়ে থাকে এক নিবিড় ভালোবাসার স্বীকারোক্তি। ‘তোমার ভুবনে ফুলের মেলা’ গানটি খাম্বাজ রাগের আশ্রয়ে তৈরি হলেও খেয়ালের প্যাঁচানো ঢঙে তা হারিয়ে যায়নি। প্রতিটি স্বরবর্ণকে পরিষ্কার এবং দরদ দিয়ে উচ্চারণ করার এই বিরল ক্ষমতাই তাঁকে অনন্য করে তুলেছিল।
শচীনকর্তার মুগ্ধতা ও বাংলা রাগপ্রধানের স্বর্ণযুগ
অখিলবন্ধু ঘোষের সাঙ্গীতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে শচীন দেব বর্মণের প্রভাব ছিল গভীর ও শ্রদ্ধাপূর্ণ। এই দুই মহারথীর সম্পর্ক নিয়ে সংগীতজগতে এক চমৎকার ইতিহাস প্রচলিত আছে। শচীনকর্তা নিজের সুর করা একটি গান অখিলবন্ধুর কণ্ঠে শুনে এতটাই বিমোহিত হন যে, সানন্দে সেই গানটি তাঁকে নতুন করে রেকর্ড করার অনুমতি দেন। অখিলবন্ধুর পরিবেশনায় শচীনকর্তার সহজ লোকরসের একটু ছোঁয়া থাকলেও তিনি কখনোই অনুকরণপ্রবণ ছিলেন না, বরং নিজস্বতায় তাকে গড়ে তুলেছিলেন। বাংলা রাগপ্রধান গানকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অবিসংবাদিত। কেদার রাগে ‘আজি চাঁদিনি রাতি গো’, ভাটিয়ারে ‘জাগো জাগো প্রিয়’, সুরদাসী মল্লারে ‘বরষার মেঘ ভেসে যায়’ এবং মরু বেহাগের সকরুণ সুরে ‘আমার সহেলী ঘুমায়’ গানগুলো প্রমাণ করে যে বাংলা ভাষায় শাস্ত্রীয় সুরের বিস্তার কতটা কাব্যিক হতে পারে। নজরুলগীতিতেও শ্যামকল্যাণ রাগে ‘রসঘন শ্যাম’ তাঁর অসামান্য রাগবোধেরই এক উজ্জ্বল দলিল।
সুরের নিজস্ব গৃহকোণ
অখিলবন্ধু ঘোষ কেবল কণ্ঠশিল্পীই ছিলেন না, ছিলেন একজন চৌকষ সুরস্রষ্টা। তাঁর গাওয়া জনপ্রিয় গানগুলোর বড় একটি অংশের সুর তিনি নিজেই করেছিলেন। তাঁর সহধর্মিণী দীপালি ঘোষের রচনা ও সুরের মধ্যেও সেই যৌথ ও সুশৃঙ্খল সাঙ্গীতিক পরিবেশের ঘ্রাণ পাওয়া যায়। তিনি চলচ্চিত্রের তীব্র আলো কিংবা বাণিজ্যিক প্রচার থেকে সবসময় নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিলেন। ‘শ্রীতুলসীদাস’, ‘মেঘমুক্তি’ ও ‘বৃন্দাবনলীলা’র মতো হাতেগোনা কয়েকটি চলচ্চিত্রে কাজ করলেও তাঁর মূল জায়গা ছিল রেডিওর সুরসভা ও একনিষ্ঠ শ্রোতাদের নিভৃত আসর। জীবদ্দশায় হয়তো বাণিজ্যিক সাফল্যের চড়া আলো তাঁর গায়ে পড়েনি, কিন্তু সময়ের বিচারে তাঁর গানগুলো প্রমাণ করেছে যে বিশুদ্ধ শিল্প আবহমান কাল ধরে টিকে থাকে।
অখিলবন্ধু ঘোষের গাওয়া কয়েকটি বিখ্যাত গান
১। ও দয়াল বিচার করো, ২। পিয়াল শাখার ফাঁকে ওঠে, ৩। তোমার ভুবনে ফুলের মেলা, ৪। ওই যে আকাশের গায়, ৫। কেন তুমি বদলে গেছ, ৬। যেন কিছু মনে কোরো না, ৭। সেদিন চাঁদের আলো, ৮। মায়ামৃগ সম, ৯। কেন প্রহর না যেতে, ১০। শিপ্রা নদীর তীরে, ১১। বাঁশুরিয়া বাঁশি বাজাইয়ো না, ১২। আজি চাঁদিনি রাতি গো, ১৩। জাগো জাগো প্রিয়, ১৪। বরষার মেঘ ভেসে যায়, ১৫। আমার সহেলী ঘুমায়, ১৬। আমি কেন রহিলাম, ১৭। ওগো শ্যাম বিহনে বৃন্দাবনে, ১৮। মরমে মরিগো লাজে, ১৯। শোনো শোনো যেওনা চলে, ২০। সে কুহু যামিনী, ২১। যেতে যেতে সে চুরি করে চায়, ২২। মিলন নিশীথে গেলে ফিরে, ২৩। কেমনে জানাব বল, ২৪। সারাটি জীবন কী যে পেলাম, ২৫। কোয়েলিয়া জানে সে
পরিশেষ
প্রচারের আলোতে তেমন না থাকলেও অখিলবন্ধু ঘোষের গান বাংলা সংগীতে দীর্ঘকাল রয়ে যাবে। কারণ সত্যিকারে যা শুদ্ধ ও আভিজাত্যময়, তা কোনোদিন শেষ হয় না। বাংলা গানের অলিন্দে তাঁর সৃষ্টি এক নির্জন মণ্ডপের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। যেখানে কোলাহল নেই, নেই কোনো কৃত্রিম আলোর রোশনাই—আছে কেবল সুর আর বাণীর এক নিটোল বন্দনা। আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল যান্ত্রিক যুগে, যখন সংগীত প্রায়শই পণ্যে পরিণত হতে বসেছে, তখন তাঁর গায়কি মনে করিয়ে দেয় যে শিল্পীর আসল শক্তি তাঁর অধ্যবসায়ে এবং ধ্যনমগ্নতায়। তাঁর সুরের রূপরেখা কোনো পুরনো দিনের স্মৃতিকাতরতা নয় বরং আধুনিক বাংলা গানের হারিয়ে যাওয়া গাম্ভীর্য, সংযম ও খাঁটি ব্যাকরণের মুখোমুখি হওয়ার এক দুর্লভ আত্মিক অভিজ্ঞতা। অখিলবন্ধু ঘোষের রাগাশ্রয়ী অথচ সরল পরিবেশনায় স্বরের জ্যামিতিতে গড়া গানগুলো তাই প্রসঙ্গিক রয়ে যাবে অনাদিকাল।
