ফেরদৌস সাজেদীনের হৃদ—গদ্য ছড়িয়ে রই
ঝিক ঝিক, ঝিক ঝিক
আমার মন সর্বদাই চঞ্চল হয় ট্রেনশব্দে। উচ্ছাসের ঘন্টা বাজে সবসময় সেই চঞ্চলতার সর্বাঙ্গে। যখন ট্রেন দেখি বা চড়ি, বাস্তবে বা কল্পনায় বা এইরকম কোন সম্ভাবনায়, আমার মন খঞ্জনা পাখির মত এ—ডাল ও—ডাল করে। রেলের চাকার শব্দ, কাটা কাটা বাতাস আর হুইসেল, সব মিলেমিশে যে ছন্দ তৈরি করে, তা আমার চৈতন্যের শিরা উপশিরায় তরঙ্গের দোলা দিয়ে যায়।
ট্রেনের অনেক সুখস্মৃতি রয়েছে আমার শৈশবেরঃ দেখার, পড়ার, শোনার, আর অনুভবের। সেইসব সময়ে সকাল সাতটার ট্রেনের হুইসেল দূর থেকে এসে কানের কাছে হঠাৎ চৌচির হয়ে ফেটে যেত, আর আমার তখন মনে হত, এই হুইসেলের ডাকে অন্তরঙ্গ একটি আমন্ত্রণ আছে— ‘খোকা তুমি তৈরি হয়ে নাও, আমি ফিরে আসছি, তোমাকে তুলে নেব।’ তারপর সেই ট্রেন ফিরে আসে রাত দশটায়, আমাদের মফস্বল শহরের নিস্তরঙ্গ অন্ধকার কেটে কেটে, যেন বড়ই ক্লান্ত ট্রেন, হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে, ধুঁকে ধুঁকে পৌঁছুচ্ছে খুব কাছের, আমাদের শহরের স্টেশনে। আমি তখন জেগে থাকি আমার বিছানায় ট্রেনের শব্দ শুনব বলে। পরের দিন ভোরে উঠতে হবে, স্কুলে যাওয়ার আগে শেষ করে নিতে হবে বাকি রয়ে যাওয়া স্কুলের পড়া, তবুও জেগে থাকি, ঘুমিয়ে পড়লে শোনা হবে না, আমি ট্রেন—চলার শব্দ শুনব না, না, তা হবেনা। ‘কু—উ কু—উ’, দূর থেকে ভেসে আসে এই শব্দ, কী এক আনন্দ—ব্যাকুল ডাক, সেই বয়সে অতশত না বুঝলেও, আমি আত্মহারা হই।
আর ট্রেনে সত্যি সত্যি চড়ে রেল—চাকার যে শব্দ হয়, যে ছন্দের পুনরাবৃত্তি ঘটে, কেমন করে তা ঘটে, এই ভেবে আমি ভাবনার কুল হারাই ! ট্রেনের কামড়ায় বসে আমি যখন বলি, ‘আমি চলি’, রেলের চলন্ত চাকাও তখন বলে, ‘আমি চলি’। আমি যা বলি, রেলও তা—ই বলে। বলি ‘ঝিক ঝিক ময়মনসিং, ঢাকা যেতে কতদিন’, রেলও বলে, ঠিক ঠিক আমার মুখ নিঃসৃত কথা ও স্বরে; যেন অলৌকিক এক মিল! আমার ছোট বয়স আনন্দে ভেসে যায়। ভেসে যাই বড় বয়সেও, আজও আত্মহারা হই। একটা অগ্রসরতার ছন্দ, চোখ বুঝলেই মনে হয়, আমি ছুটছি, ছন্দে ছন্দে মুহূর্তগুলো তৈরি করছে প্রাণস্পন্দনের অনুকুল এক জগৎ, যে জগতে জীবন আরামে, স্বস্তিতে, আনন্দে, নিশ্চিন্তে হেলান দিয়ে আছে। তারপর ছন্দ—আসক্ত সময় একটা নির্দেশ পায় জীবনের অগ্রগামীতার। বর্তমান যেন আগামীর ইশারায় তখন ছুটে যায়।
দুই
আমি যখন ‘বিভূতি’ পড়ছি প্রথম প্রথম, ঠিক সেই সময়টার একটু আগে—পিছে, সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালী’ দেখি। আমার শিশু ও শৈশব কালের বেশিরভাগ সময় কেটেছে ময়মনসিংহ শহরে। শহর ঘেঁষে ব্রহ্মপুত্র নদ বয়ে গেছে। নদের একপাশে শহর অন্যপাশে খোলা প্রান্তর। শরতে শরতে নদের পানি কমে আসে, সেই সঙ্গে বাতাসে দুলে ওঠে কাশবন। এপারে নদ ওপারে দিগন্ত, মাঝখানে কাশবন। উন্মুক্ত এই সৌন্দর্যের চিত্র আঁকি, সে শক্তি আমার নেই। ‘পথের পাঁচালী’র দুর্গা আর অপুর কাশবনের এদিক—ওদিক—করা সময়টুকুর সঙ্গে কাশবন, হাওয়া, আর দুটি বালক বালিকার অপার বিস্ময় মিলেমিশে হিল্লোলিত হয়ে উঠছে, এই দেখে আমার মন আনন্দে ভরে যায়। তারপর দুই ভাই বোন কাশবনের ফাঁক দিয়ে দৌড়ে দৌড়ে ছুটে যায় রেললাইনের পাশে, ট্রেন আসছে কালো কয়লার ধোঁয়া ভস্ ভস্ করে আকাশ কালো করে। অপু আর দুর্গা জীবনে এই প্রথম দেখছে রেলগাড়ি; শুনছে রেলের ছুটে যাওয়ার শব্দ। আমি মুগ্ধ হয়ে দেখি। তারপর কত কত সিনেমা দেখেছি, আমার বিবেচনায় ‘পথের পাঁচালী’র অপু দুর্গার কাশবন পেরিয়ে প্রথম রেলগাড়ি দেখার সময়টুকু সত্যজিৎ যে অভাবনীয় কৌশলে ও শিশু মনের কৌতুহলের লেন্সে দেখেছেন, তার তুলনা দ্বিতীয়টি নেই। ‘পথের পাঁচালী’, পুরো চলচ্চিত্রটির একটি বিশেষ অংশ এই অখন্ড দৃশ্যটি।
অপুর বাবা হরিহরণ, বেশ কয়েকমাস পরে, নিশ্চিন্দিপুরের তার বাড়িতে ফিরে এসে দেখে বাড়ির দোরগোড়ায় পুরনো গাছটি ঝড়ে ভেঙে পড়ে আছে, ভেতরে গিয়ে অবগত হয় কন্যা দুর্গা মারা গেছে। তার ভিটাবাড়ি ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে আছে। রাতে বিছানায় শুয়ে, দুর্গত, নিরাশ, স্থির ও শূন্য চোখে ঘরের ছাউনির দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে হরিহরণ, শোনে, বুকের ভেতরে শব্দ হচ্ছে ছূটন্ত রেলের; সেই—ই চিরন্তন ছন্দ, যে ছন্দে যে কেউ মিলিয়ে নিতে পারে তার নিজের অন্তর্গত শব্দাবলী। আর যেন সেই—ক্ষণেই অপুর জীবনের আগামী লেখা হয়ে যায় এই রেলের চাকার শব্দে, যা তার বাবার বুকে বেজে যাচ্ছে। নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে তাদের চলে যেতে হবে। ভেঙে পড়া বৃক্ষটির মতই উৎপাটিত হচ্ছে নিশ্চিন্দিপুর থেকে তাদের জীবন।
তিন
সত্যজিতের ‘নায়ক’ দেখি ‘পথের পাঁচালী’ অভিজ্ঞতার কএকবছর পরে। তখন আমি বাংলাদেশ থেকে নিউইয়র্কে সদ্যোজাত হয়েছি। একদিন শুনি, কুইন্সের রিগো পার্কের একটি স্কুলে উত্তমকুমারের নায়ক প্রদর্শিত হবে। আমরা কএকজন দেখতে যাই। উত্তমকুমার এসেছিলেন কি? ঠিক মনে নেই। সত্যজিৎ রায় আর উত্তম কুমারের ছবি, আমাদের আগ্রহ বাড়ন্ত। ওপার বাংলার সিনেমা খুব একটা দেখার সুযোগ আমাদের হয়নি দেশে থাকতে। যা কিছু শুনেছি পড়েছি ওদের ছবি সম্পর্কে, তার প্রায় সবটুকুই উল্টোরথ, দেশ বা এই জাতীয় পত্রিকার বদৌলতে পাওয়া। এখন তো অন্য সময়, সব পাওয়ার পৃথিবী। ইচ্ছে হলেই দেখে নাও, যা ইচ্ছে, যতটুকু ইচ্ছে, যেখানে ইচ্ছে।
তা স্কুল অডিটোরিয়ামে দেখার অভিজ্ঞতাতেও ছবিটি আমার কাছে সেদিন সবিশেষ বলে বিবেচিত হয়েছিল। তারপর বেশ কএকবার ‘নায়ক’ দেখেছি। যতবার দেখেছি ততবারই আমার কাছে ছবিটি প্রিয়তর হয়ে উঠেছে। এখন ধারণা করে নিতে পারি যে, সত্যজিৎ রায় কেন উত্তম কুমারের অভিনয় অনেক উঁচু স্তরের এটা অকাট্য বলে অভিজ্ঞানে ধারণ করতেন। সত্যজিৎ রায়, উত্তম কুমারের স্মরণ সভায় বলেছিলেন, উত্তম কুমারে প্রশংসা করে যে, ‘উত্তমের মত কেউ নেই, উত্তমের মত আর হবে না’।
ইানা কারণে ‘নায়ক’ আমার একটি অতিপ্রিয় মুভি, যে প্রসঙ্গে আরো বিস্তারিত আলোচনা কখনই বাহুল্য হবে না। সেসব প্রসঙ্গক্রমে বলার ইচ্ছে রইল। কিন্তু, এই যে অরিন্দম (উত্তম কুমার), বাংলার সুপারস্টার নায়ক, তিনি নিজেকে, তার অন্তরের অব্যক্ত কথাগুলো, সাংবাদিক মিস্ সেনগুপ্তার (শর্মিলা ঠাকুর) কাছে একটু একটু করে খুলে খুলে দিচ্ছেন, সেই বলার আবহের মধ্যে সত্যজিৎ কী অপূর্ব কৌশলেই না ব্যবহার করেছেন ট্রেন! ট্রেন চলছে, সেই চাকার শব্দে ছন্দ, ছন্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে এক নায়কের অন্তর—পীড়ন, খ্যাতির, ভালবাসার, বৈভবের। আর অরিন্দমের চরিত্রের এই কৌলিন্য যা অসীম সাধনার অর্জন, তার আলখাল্লা কেন খুলতে হল ট্রেনের কামরায়! ট্রেনের চাকার শব্দে যে ছন্দ, তা—ই কি সহায় হল অরিন্দমের মনের জানালা খোলার!
চার
আমার প্রথমবার পথের পাঁচালী দেখার সময়টাতে আরেকটি কালজয়ী সিনেমা দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। রুশ ছবি, ‘ব্যালাড অব এ সোলজার’! ছবিটি তখন ঘুরে ফিরে বছরে বছরে ঢাকার ‘নাজ’—এ আসত। মাঝে মাঝে ‘বলাকা’ বা ‘মধুমিতায়’, বেলা দেড়টার স্পেশাল শো’তে। যুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত ছবিটি। গোলা—বারুদ, কামান, ট্যাঙ্ক, আর অযুত সেনা নিয়ে ক্যানভাস। রাশিয়ার প্রায় সকল যুবক তখন যুদ্ধ ময়দানে। গ্রামের শহরের সব ঘরবাড়ি প্রায় পুরুষশূন্য। না—কিশোর—না—যুবক উনিশ বছরের অ্যালিওশা যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে অনেকটা অলৌকিকভাবে শত্রুর দুটি যুদ্ধ—ট্যাঙ্ক ধ্বংস করে দেয়। এজন্য তার কমান্ডার তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি স্বীকৃতি দিতে চাইলে অ্যালিওশা বলল, ‘স্বীকৃতি আমার চাইনা’। কমান্ডার জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে কী চাও’। অ্যালিওশা বলল, ‘আমি আমার মাকে দেখতে চাই। মাকে দেখেই চলে আসব। মাত্র একদিনের জন্য, আসার সময় মাকে বলে এসেছি, তার ঘরের ভাঙা ছাদ আমি এসে ঠিক করব’। কমান্ডার অ্যালিওশা—কে যেতে দিল। বলে দিল, বাঁধা সময়ের মধ্যে ফিরে আসতে। অ্যালিওশা কথা দিল সে যুদ্ধে ফিরে আসবে।
তারপরের সমস্ত গল্পটাই ট্রেনের কামরায় বিধৃত হয়েছে। ট্রেনেই ঘটনাচক্রে ‘শুরা’ নামের তারই বয়সী মেয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ। পরস্পরের ভয়, খুনসুটি, ভাললাগা এবং বয়সের—দুরন্ত—আশা ট্রেন যাত্রার সারা অঙ্গে কঙ্কনের মত বেজে উঠল। তারপর একসময় শুরাকে তার গন্তব্যে ট্রেন থেকে নেমে যেতে হয়। দুজনের মধ্যে জেগে উঠল অপার চরের মত বিচ্ছেদ। তবু, চলন্ত ট্রেনের সঙ্গে প্ল্যাটফর্মে দৌড়ে যাচ্ছে শুরা, বলছে, ‘আমি থাকব এখানে, তুমি ফিরে এসো’। অ্যালিওশা ট্রেনের খোলা দরজার প্রান্তে দাঁড়িয়ে বাইরে অর্ধেক—শরীর—ঝুঁকে চিৎকার করে বলল, ‘আমি আসব শুরা, শুরা। শুরা’। ট্রেন অ্যালিওশাকে নিয়ে চলে যায়। শুরা চেয়ে থাকে আকুল ব্যাকুল শূন্য চোখে, অ্যালিওশার চলন্ত ট্রেনের দিকে।
ট্রেন থেকে নেমে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অ্যালিওশা তার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখে ঘরে তালা দেয়া। অ্যালিওশা হতাশ হয়। উদ্বিগ্ন হয়। কেউ বলল, তার মা জমিতে কাজ করছে। পড়শিরা খবর দেয় মাকে যে, তার ছেলে এসেছে। মা ছেলে দুজনেই দৌড়ে দৌড়ে ছুটে এসে আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়। কয়েকটি মুহূর্ত বাহুডোরে পরম প্রাপ্তিতে কেটে যায়, চুম্বনে আদরে দুজনেই সিক্ত হতে থেকে। অনন্ত কিছু মুহূর্ত—পরে অ্যালিওশা মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘মা, আমাকে চলে যেতে হবে’। মা স্তম্ভিত। মাত্র এই কটি মুহূর্তের জন্য আসা! মা ছেলেকে চলে যেতে দিতে চান না, বুকে ধরে রাখেন। নিরুপায় মা ছেলে ফিরে আসবে এই প্রতিশ্রুতি পেয়ে তাকে চলে যেতে দেন। এক নজর মাকে দেখেই, অ্যালিওশা যুদ্ধ ময়দানে ফিরে যায়।
তারপর সময় বয়ে যায়, মা বৃদ্ধ হয়; আজো শাদা চুল মাথায় মা দাঁড়িয়ে আছে পথ সামনে রেখে, যে পথে চলে গেছে তার সন্তান, সে পথেই সে আবার ফিরে আসবে এই আশায়।
সারা ছবিতে ট্রেন—যাত্রা, জীবন অভিমুখে, জীবনেরই প্রয়োজনে, ছন্দে ছন্দে।
জুন ২৪, ২০২৬
লং আইল্যান্ড, নিউইয়র্ক
