যা দেখেছি যা বুঝেছি—১০ || মনিরুল ইসলাম সাবেক রাষ্ট্রদূত


করণীয় 

এখন প্রবাসীদের তথা দ্বিতীয় প্রজন্মের জন্য পূর্বপুরুষের ভাষা, সংস্কৃতি ধর্মকে অর্থবহভাবে সুসংহত করার জন্য আমাদের যা করণীয়, সে ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যদি ইতিহাসের শিক্ষা নিতে চাই, তাহলে চীন জাপান কোরিয়া হল আমাদের জন্য অনুসরণীয় উদাহরণ। ব্রাজিল পেরুতে শত শত বছর যাবৎ জাপানীরা নিজস্ব সত্ত্বা নিয়ে কীভাবে বেঁচে আছে? অস্ট্রেলিয়া আমেরিকায় চীনারা কিভাবে নিজেদের ¦াতন্ত্র্য বজায় রেখেও শক্ত সুন্দরভাবে জীবনযাপন করছে? গোষ্ঠীবদ্ধভাবে ভাষা, সংস্কৃতি পারিবারিক জীবনের বৈশিষ্ট্যকে ধরে রাখতে পেরেছে বলেই এই তিন জাতির মানুষ প্রবাসেও প্রতিষ্ঠিত হয়ে স্বমহিমায় নিজস্ব জীবনধারা নিয়ে বেঁচে আছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। স্থানীয় বৃহত্তর সমাজে তাদের হারিয়ে যাবার সমস্যা তাই গুরুতর নয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো সমৃদ্ধ দেশে আমাদের দ্বিতীয় প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের জন্য চাকরি প্রাপ্তি বা অর্থনৈতিক সচ্ছলতা অর্জনের সমস্যা ভয়াবহ নয়। তাদের যদি কিছু সমস্যা থাকে সেটা মূলত সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক পারিবারিক। এই সমস্যাগুলো এতই সূক্ষ্ম, ব্যক্তিগত এবং জাতিগত যে এদের সমাধানের জন্য কোনো রাষ্ট্রীয় সুবিধা কিংবা হস্তক্ষেপ ফলপ্রসূ হবে না। নিজেদের মধ্যে নিজেদের ভিতর থেকেই এর সমাধান বের করে আনতে হবে। তাই অভিবাসী বাঙালি পরিবার বাঙালি সংগঠনগুলোকেই ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসতে হবে।

দ্বিতীয় প্রজন্মের সমস্যাগুলো মোকাবেলার জন্য এক বা একাধিক কার্যকরী সোসাল নেটওয়ার্কিংএর প্রয়োজন, যেখানে থাকবে তাদের পূর্ণপরিচয়, পরিকল্পনা আশা আকাঙ্খার কথা। এজন্য কোনো প্রতিষ্ঠিত নিরপেক্ষ সংগঠন যথা, বাংলাদেশ সোসাইটি এবং কিছু মহৎ ব্যক্তিউদ্যোগকে এগিয়ে আসতে হবে যারা মাতৃভূমির ইতিবাচক দিকগুলো দ্বিতীয় প্রজন্মের সামনে তুলে ধরবে। নিউইয়র্কে ইতিমধ্যে কয়েকটি সংগঠন দ্বিতীয় প্রজন্মের মধ্যে প্রশংসনীয় কাজ করে যাচ্ছে, যেমন: ক্রীড়ায় বাংলাদেশ স্পোর্টস কাউন্সিল, সংস্কৃতিতে বিপা, ধর্মে মসজিদমন্দির এবং সামাজিক মেলামেশায় আঞ্চলিক সমিতিগুলো। 

দ্বিতীয় প্রজন্মের জন্য শিক্ষাক্ষেত্রে সুখ্যাতির সাথে অর্থপূর্ণভাবে কাজ করছে খান টিউটোরিয়াল এবং মামুন টিউটোরিয়ালসহ আরো কতিপয় প্রতিষ্ঠান, যাদের কারণে আমাদের দ্বিতীয় প্রজন্মের অনেক ছেলেমেয়ে শুধু যে ভাল স্কুলকলেজে ভর্তি হচ্ছে তা নয়, তাদের অনেকেই চিকিৎসক ঔষধবিদ প্রকৌশলী গবেষক ব্যবস্থাপক হয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে। আমি নিজে যা করি, আমার সন্তান হবে পেশাজীবী, ব্যবসায়ী বা শিল্পপতি। মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্তের পরিবারে তারা বিদ্যায়প্রতিষ্ঠায় ভাল করছে, উচ্চবিত্ত শিক্ষিত পরিবারের অনেক সন্তান হেঁাচট খাচ্ছে।

দ্বিতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশীদেরকে পড়াশোনার পাশাপাশি বিবিধ গঠনমূলক সৃজনশীল কাজে ব্যস্তব্যাপৃত রাখতে হবে। সাহিত্যচর্চা, সঙ্গীতানুষ্ঠান, সংস্কৃতি শিক্ষা, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, দেশীয় পার্বণ উদযাপন, এমনকি ধর্মীয় আচারেও তাদেরকে সম্পৃক্ত করতে হবে। এজন্য নিউইয়র্কে বা জাতীয় বড় বড় মহানগরীতে সক্রিয় আমাদের বাংলাদেশী সমিতিগুলোর মধ্যে বিনোদনমূলক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যায়। এবং ক্রমান্বয়ে এই প্রতিযোগিতা ইন্টারস্টেট পর্যায়ে সম্প্রসারিত করা যায়। 

দ্বিতীয় প্রজন্মের মধ্যে সামাজিক মিথস্ক্রিয়া বাড়ানোর জন্য ইতিমধ্যে প্রচলিত বনভোজন, মিলাদদোয়ামাহফিল, বার্ষিকী উদযাপনকে উৎসাহিত করা যায়। নিজেদের মধ্যে মেলামেশা যত বেশি বাড়বে, বিভেদবিদ্বেষের কলোছায়া ম্লান হয়ে বাঙালিয়ানার প্রকাশ বিকাশ তত বেশি শক্ত ভিত্ পাবে। নতুন প্রজন্মকে চিরায়ত বাঙালি কৃষ্টিঐতিহ্যমূল্যবোধের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয় এসব সামাজিকসাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর অনুষ্ঠান। নবীনপ্রবীণের পারস্পরিক জানাশোনায় যে সেতুবন্ধনের সৃষ্টি হয়, তাতে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া পিতৃমাতৃভূমির প্রতি মমত্ববোধ সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি পায়।  

বিভিন্ন ধরনের সংগঠন পরিচালনার জন্য দ্বিতীয় প্রজন্মের মধ্যে নেতৃত্বের বিকাশ হওয়া দরকার। প্রথম প্রজন্মের প্রবীণ সংগঠকদের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার কাজ এগিয়ে নিতে হবে, যারা দ্বিতীয় প্রজন্মকে সুচারুভাবে সমাজ পরিচালনার উদাহরণ হবেন। তবে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, নেতৃত্বের দৃঢ়তা এখনো মজবুত নয় বলে প্রথম তো নয়ই, দ্বিতীয় প্রজন্মেরও দেশীয় এবং স্থানীয় রাজনীতিতে সার্বক্ষণিক ব্যস্ত থাকা হবে অপরিণামদশীর্ কাজ। কেউ হয়ত নিজ স্বার্থে আমাদের উঠতি ব্যবসায়ী উৎসাহী যুবকযুবতীদেরও ব্যবহার করতে চাইবেÑদরকার নেই ব্যবহৃত হওয়ার, সময় অর্থ শ্রমের অপচয় করার। রাজনীতি সবার জন্য নয়, আপনার সম্ভাবনা ভেবে দেখুন।

ফিরে দেখা মানেই ফিরে পাওয়া। তাই সম্ভব হলে প্রতি বছরে একবার, তা না হলে প্রতি দুই বছরে একবার অবশ্যই সন্তানকে নিজদেশে, নিজ এলাকায়, নিজগ্রামে নিয়ে যেতে হবে। নিয়ে যাওয়া জরুরি না হলেও যারপরনাই উপকারী। আত্মীয় পরিজনদের সাথে পরিচয় করিয়ে আত্মার বন্ধন সুদৃঢ় করুন। নিজ এলাকার ভাল ইতিবাচক দিকগুলো অবহিত করুন, নিবিড়ভাবে শেকড়ের সাথে সম্পৃক্ত করুন। এতে তারা তাদের পূর্বপুরুষদের ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে নিজেকে একাত্ম করতে শিখবে, আপন ভাবতে শিখবে, নিজের মনোবল বৃদ্ধি পাবে।

আমরা সহজাতভাবে সবাই চাই আমাদের নতুন প্রজন্মকে স্থায়ী করতে, অন্তত নিজ জীবৎকালে পরবর্তী প্রজন্মকে সুশৃংখল, সুসংহত সুরক্ষিত দেখে যেতে চাই। কখনো পারিÑসাময়িক হলেও, কখনো পারি নাÑএকদমই না। কারণ আমি জানি না, আমার দ্বিতীয় প্রজন্ম কি আমার চেয়ে শক্তিশালী হবে, না দুর্বলতর হবে। রবীন্দ্রনাথের ছেলে রবীন্দ্রনাথ হয় না, কিন্তু অন্য রবীন্দ্রনাথের জন্ম হয় অন্যত্র, অন্যরূপে। তবু চেষ্টার ত্রুটি নেই। জীবনে আমাদের কর্ম ভাবনার কেন্দ্রে থাকে একটি মুখ্য উদ্দেশ্য: আমাদের দ্বিতীয় প্রজন্মকে প্রতিযোগীদের চেয়ে শক্তিশালী করে যাওয়া।

তাই এশীয় এবং বিশেষত বাঙালি দর্শন বলে: আমার জীবন তো প্রায় শেষ, সন্তানদের জন্যই সব করে যাচ্ছিÑওরা মানুষ হলেই আমি খুশি, আমার জীবন সার্থক। এই জীবনবোধ থেকেই দ্বিতীয় প্রজন্ম নিয়ে আমাদের এতবেশি ভাবনা, কামনা আর প্রার্থনা। হয়ত এজন্যই এত সহ¯্র বছর ধরে নিজস্ব সত্ত্বা নিয়ে টিকে আছে বিভিন্নস্থানে বিভিন্ন মানবগোষ্ঠী। ব্যক্তিআমিনয় কিন্তু সমষ্টিআমরাটিকে থাকব অনন্তকাল। বাঙালিরাও তাই বাঙালি হয়েই টিকে থাকবে যতদিন থাকবে বৃহত্তর মানবজাতির অপরাপর প্রজাতি। 


Related Posts