পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার দুর্গে গেরুয়া প্রভাত || ড. জীবন বিশ্বাস নিউইয়র্ক
পশ্চিমবাংলার বসন্ত বাতাসে এবার পলাশের লালের চেয়েও তপ্ত, আরও গাঢ় হয়ে ফুটে উঠেছে রুদ্র গেরুয়া। ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন কেবল একটি সাধারণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন নয়, ইতিহাসের নিরিখে এ এক দীর্ঘস্থায়ী বিপ্রতীপ স্রোতের মহোৎসব, যা সমকালীন ভারতীয় গণতন্ত্রের মানচিত্রকে ওলটপালট করে দিয়েছে। ২৯৪ আসনের এই মহানাটকীয় বঙ্গ—রঙ্গমঞ্চে ২৯৩টি আসনের যে চিত্রনাট্য চূড়ান্ত হলো, তাতে দেখা যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ২০৭টি আসনের একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে রাইসিনা থেকে রাইটার্স অবধি এক দীর্ঘ ছায়া বিস্তার করেছে। বিপরীতে, দীর্ঘ পনেরো বছরের অপ্রতিদ্বন্দ্বী মহীরুহ তৃণমূল কংগ্রেস মাত্র ৮০টি আসনের এক শীর্ণকায় রাজনৈতিক শাখায় রূপান্তরিত হয়েছে। এই যে মহাবদলের রণধ্বনি, তা কেবল রয়টার্সের সংবাদভাষ্যে বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা এক দুর্ভেদ্য দুর্গের রাজনৈতিক পতন হিসেবেই সীমাবদ্ধ নয়, এর অন্তরালে লুকিয়ে আছে বাংলার সমাজ—মানসের এক নিগূঢ়, জটিল এবং হয়তো বা কিছুটা বেদনাদায়ক বিবর্তন। এ প্রসঙ্গেই আজকের উপসম্পাদকীয়।
পশ্চিমবাংলার রাজনীতির এই আমূল বাঁকবদলকে কোনো একটি বিশেষ ‘জোয়ার’ দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা হবে রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা। এটি আসলে এক জরাজীর্ণ প্রাসাদের কার্নিশ খসে পড়ার শব্দ। দীর্ঘ শাসনের একঘেয়েমি, প্রশাসনিক শ্যাওলা, আর নারীর নিরাপত্তা নিয়ে জমাট বাঁধা এক রুদ্ধকণ্ঠ দীর্ঘশ্বাসেরই প্রতিচ্ছবি এই জনরায়। ২০১১ সাল থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে জাদুকরী সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্কে ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন, ২০২৬—এ এসে সেই পাটীগণিত যেন ব্যাকুলভাবে ভুল প্রমাণিত হলো। ২০২১—এর ২১৫ আসনের দাপট আজ অতীতের ধূসর স্মৃতি। ভোটাররা শুধু একটি দলের বিরুদ্ধে বোতাম টেপেননি; তাঁরা সম্ভবত রায় দিয়েছেন সেই শাসনরীতির বিরুদ্ধে, যা স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকতা, দুর্নীতির নিগড় আর ব্যক্তিকেন্দ্রিক আবর্তে পড়ে ক্রমাগত তার প্রাণশক্তি হারাচ্ছিল। জনতা যখন শাসকের দর্পকে তুচ্ছ করে নিঃশব্দে বিপ্লব ঘটায়, তখন ইতিহাসের পাতায় কেবল সংখ্যার রদবদল হয় না, একটি যুগের অবসান ঘটে।
এই রাজনৈতিক ভূমিকম্পের প্রথম ফাটলটি দেখা দিল সেই জনপদে, যাকে একসময় তৃণমূলের ‘অক্ষয় তূণ’ মনে করা হতো সংখ্যালঘু ভোটব্যাংককে। মুর্শিদাবাদের আম্রকানন থেকে মালদহের জনপদ, কিংবা উত্তর দিনাজপুরের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে যে সংহতি একদা বর্তমান সরকারের প্রধান বর্ম ছিল, এবার তা যেন শরৎকালের মেঘের মতো টুকরো টুকরো হয়ে রাজনৈতিক দিগন্তে আছড়ে পড়েছে। মুসলিম ভোট আজ আর কোনো একক নৌকার যাত্রী নয়; তা ভাগ হয়ে গেছে কংগ্রেস, সিপিআই(এম), আইএসএফ কিংবা এজেইউপি—র অলিন্দে। ১৪২টি সংখ্যালঘু—প্রধান আসনের মধ্যে বিজেপি যখন ৭২টি আসনে জয়লাভ করে, তখন বুঝে নিতে হয় যে এটি কেবল আদর্শগত রূপান্তর নয়, বরং ‘ফাস্টর্—পাস্ট—দ্য—পোস্ট’ পদ্ধতির এক নিষ্ঠুর গাণিতিক পরিহাস। টিএমসি সংখ্যালঘুদের ওপর তার একচ্ছত্র অধিকার হারিয়েছে, আর বিরোধী ভোটের এই ছিন্নভিন্ন দশা বিজেপির জন্য রাজপথ সুগম করে দিয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি মঞ্চস্থ হলো কলকাতার চিরন্তন আভিজাত্যের প্রতীক ভবানীপুরে। শুভেন্দু অধিকারীর কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাজয় কেবল এক প্রার্থীর হার নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ‘মিথ’ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাওয়ার প্রলয়। ১৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে যখন ভবানীপুরের দেওয়াল থেকে ‘ঘরের মেয়ে’—র নাম মুছে যায়, তখন বোঝা যায় নন্দীগ্রামের সেই আদি ক্ষত আজ এক বর্জ্য—ডোবায় পরিণত হয়েছে। যে শুভেন্দু একদা ঘাসফুলের সেনাপতি ছিলেন, আজ তিনিই গেরুয়া শিবিরের শাণিত তলোয়ার হয়ে সেই দুর্গাপালের দর্প চূর্ণ করলেন। এটি কেবল দলবদল নয়, বরং সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার এমন এক প্রয়োগ যা উৎস দলকেই ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। এখানেও দেখা গেল, ক্ষমতার লড়াইয়ে সম্পর্কের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে টিকে থাকার নির্মম বাস্তবতা।
এই নির্বাচনের গায়ে লেগে আছে এক অদ্ভুত ও রহস্যময় কুয়াশা, যার নাম ‘এসআইআর’ বা ভোটার তালিকার বিশেষ প্রগাঢ় সংশোধন। প্রায় ৯০ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়া কিংবা ২৭ লক্ষ ভোটারের ভাগ্য ‘বিচারাধীন’ থাকা নিয়ে যে বিতর্ক, তা গণতন্ত্রের শুভ্র ললাটে এক চিন্তার রেখা ফুটিয়ে তোলে। এনডিটিভি ও দ্য ওয়্যারের তথ্যানুযায়ী, ২৫টি আসনে জয়ের ব্যবধান যখন বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যার চেয়েও কম হয়, তখন জয়—পরাজয়ের কাব্য খানিকটা মলিন মনে হতে পারে। তবে এই পরিসংখ্যানকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা হবে ইতিহাসের প্রতি অবিচার। এই কারিগরি বিভ্রাটের চেয়েও গভীরে ছিল মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ।
শিক্ষক নিয়োগের কেলেঙ্কারি ছিল সেই ক্ষোভের বারুদ। বাংলার মধ্যবিত্ত গেরস্থ ঘরে একটি সরকারি চাকরি ছিল এক সম্মানের শিরস্ত্রাণ, নিরাপত্তার শেষ আশ্রয়। সেই শিরস্ত্রাণ যখন দুর্নীতির হাটে নিলামে ওঠে, তখন বাংলার সাধারণ মানুষ আর ক্ষমা করতে পারে না। ২০২৫ সালের সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ মানুষের মনে সেই অন্যায়ের ক্ষতকে জীবন্ত রেখেছিল। তার ওপর আরজি কর হাসপাতালের সেই পৈশাচিক কালরাত্রি ছিল কফিনে শেষ পেরেক। বিশ্বের ১৩০টি শহরে যখন প্রতিবাদের মোমবাতি জ্বলেছিল, তখন বাংলার সাধারণ মানুষ বুঝে নিয়েছিল যে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ আর নারীর নিরাপত্তাÑএই দুটির মধ্যে যোজন যোজন তফাত। নারী ভোটদাতার হার পুরুষকে ছাপিয়ে গেলেও, সেই মৌন প্রতিবাদ ইভিএম—এ তৃণমূলের অনুকূলে বর্ষিত হয়নি। কিছু কিছু নীরবতা অনেক বড় ঝড়ের পূর্বাভাস দেয়, সে পূর্বাভাসে মমতা ও তৃণমূল একেবারেই ধরাশায়ী।
বিজেপির এই অভাবনীয় উত্থানের নেপথ্যে কাজ করেছে এক গভীর সামাজিক ও জাতিগত রসায়ন। জঙ্গলমহল থেকে উত্তরবঙ্গের পাহাড়—তফসিলি জাতি ও উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে বিজেপির জয়জয়কার যেন এক নতুন ব্রতকথার জন্ম দিল। আদিবাসী হৃদয়ে যে উপেক্ষার গ্লানি জমেছিল, তাকে গেরুয়া রঙে রাঙিয়ে বিজেপি এক নতুন পরিচয়ের রাজনীতি উপহার দিয়েছে। এটি কেবলমাত্র হিন্দুত্ব নয়, বরং এক আদিম ও অকৃত্রিম অংশগ্রহণের আকাঙ্ক্ষা, যেখানে দলিত ও অবহেলিত ভোটাররা নিজেদের অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে সচেষ্ট হয়েছে।
পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র আমাদের বাংলাদেশের অস্থিরতাও এই নির্বাচনের পটভূমিতে এক নিদারুণ ভূরাজনৈতিক ছায়া ফেলেছে। ২০২৪—এর ষড়যন্ত্রমূলক ছাত্র আন্দোলনের পর শেখ হাসিনার প্রস্থান সীমান্ত বাংলার রাজনৈতিক কল্পনাকে ওলোটপালট করে দিয়েছিল। অনুপ্রবেশের শঙ্কা আর নাগরিকত্বের অনিশ্চয়তা সীমান্ত জনপদে যে মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করেছিল, বিজেপি তাকেই তাদের তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করেছে। হাসিনার পতন পশ্চিমবঙ্গের জনমতকে হয়তো সরাসরি বদলে দেয়নি, কিন্তু এক ধরনের অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছিল যা শেষ পর্যন্ত গেরুয়া ছাউনিকেই নিরাপদ মনে করিয়েছে। তবুও নির্বাচনের ফলাফলের চিত্রটি গভীর মনোযোগের দাবী রাখে। তৃণমূলের ৮০ জন নির্বাচিত বিধায়কদের মধ্যে ৩১ জন মুসলিম, কংগ্রেসের ২ জন নির্বাচিত বিধায়কদের ২ জনই মুসলিম, আমজনতা উন্নয়ন পার্টির ২ জন নির্বাচিত বিধায়কদেরও ২ জনই মুসলিম, সিপিআইএম পার্টির ১ জন নির্বাচিত যিনি মুসলিম, এআইএসএফ পার্টির ১ জন নির্বাচিত যিনি মুসলিম, কিন্তু একমাত্র ব্যতিক্রম মোদির ঝড়তোলা বিজেপি। বিজেপি’র ২০৭ জন নিবার্চিত বিধায়কদের মধ্যে একজনও মুসলিম নেই, এ বার্তা কিসের ইংগিত দেয়?
পরিশেষে, ২০২৬—এর এই মহাবদলকে বিজেপির একটি আদর্শিক জয় হিসেবে দেখা মোটেই সমীচীন নয়। এটি আসলে এক জরাজীর্ণ সামাজিক চুক্তির অবসান এবং এক নতুন সন্ধির সূচনা। তৃণমূলের জনকল্যাণমূলক প্রকল্প আর নেত্রীর ব্যক্তিগত কারিশমা আর যথেষ্ট ছিল না সেই আধুনিক রণকৌশলের কাছে—যেখানে মোদির জাতীয় মহিমা, সুসংহত সংগঠন এবং প্রান্তিক মানুষের জাতিগত পরিচয় এক মোহনায় এসে মিলেছিল। এই পরিবর্তন কি এক স্থায়ী নতুনের আবাহন, নাকি এক প্রবল নীরব—ক্ষোভের ক্ষণিক বহিঃপ্রকাশ? সময় এর উত্তর দেবে। তবে একটি সত্য আজ ধ্রুব—বাংলার রাজনৈতিক দুর্গ আজ নতুন করে সাজানো হয়েছে। ক্ষমতা আর মানুষের সেই চিরন্তন তর্কের নতুন অঙ্ক কেবল শুরু হলো মাত্র। ২০২৬—এর প্রকৃত অর্থ কোনো পরিসংখ্যানের টেবিলে নয়, বরং বাংলার গ্রাম—গঞ্জের সেই সাধারণ মানুষের চোখে নিহিত, যারা আজ এক নতুন ভোরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। ক্ষমতার অলিন্দে যে রদবদল ঘটল, তা কেবল শাসনদন্ড বদল নয়, বরং বাংলার রাজনৈতিক দর্শনের এক নতুন ধারাপাতের সূচনা বলেই মনে হয়।
