গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়— নয় সুরের অনন্য আলোকবর্তিকা গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়
ড. জীবন বিশ^াসঃ শহর যখন ক্লান্ত হয়ে বিকেলের ধূসর আলোয় গা ভেজায়, আর নাগরিক কোলাহল ছাপিয়ে দূর থেকে যখন এক মখমলি কণ্ঠের রেশ কানে আসে, তখন বুঝতে হবে সেখানে এক নিভৃতচারী সুর সম্রাজ্ঞীর ছায়া রয়েছে। তিনি আর কেউ নন, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। ১৯৩১ সালের ৪ অক্টোবর সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় কলকাতার ঢাকুরিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০২২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নব্বই বছর বয়সে তিনি কলকাতাতেই পরলোকগমন করেন, সংগীতের এই ধ্রুবতারা। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের এই দীর্ঘ প্রায় আট দশকের সাংগীতিক পথপরিক্রমা আসলে আধুনিক বাংলা গানের উৎকর্ষের এক অখন্ড দলিল। তিনি এমন এক সময় ও সমাজের প্রতিনিধি ছিলেন, যেখানে সংগীত কেবল বিনোদন ছিল না, ছিল এক গভীর মরমী সাধনা। তাঁর কণ্ঠের বিস্তার যেন আকাশের নীলিমাকেও হার মানাত, আর সেই সুরের প্রতিটি প্রকম্পন বাঙালির ড্রয়িংরুম থেকে শুরু করে গহীন মফস্বলের শান্ত দুপুরের নির্জনতাকেও সমানভাবে মাতিয়ে রাখত। তাঁর সেই ধ্রুপদী কণ্ঠ আজও বাঙালির প্রাত্যহিক জীবনের সব কৃত্রিম আবিলতা ঝেড়ে ফেলে এক চিরকালীন মহিমায় ভাস্বর হয়ে আছে। সুরের অনন্ত আকাশে তিনি এক ধ্রুবতারা, যা সময়ের প্রলেপে ম্লান হওয়ার নয়, বরং আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে স্মৃতির খেয়ায়।
ধ্রুপদী তপোবন ও আধুনিকতার মোহনা
সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গায়কি এবং স্বরপ্রক্ষেপণ ছিল একেবারেই আলাদা, বহুদূর থেকে ভেসে আসলেও জানান দিয়ে যেত একেবারে নিশ্চিতভাবে, ‘এ সুর গীতশ্রীর কন্ঠ নিঃসৃত সুর’। সুরের খেলায় তার দখল ছিল অসমান্তরাল; তাঁর কণ্ঠের ব্যাপ্তি ছিল ঋজু অথচ নমনীয়। ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খাঁর পদতলে বসে তিনি যে শাস্ত্রীয় সংগীতের পাঠ নিয়েছিলেন, তাকে তিনি কখনও পান্ডিত্যের বোঝা হতে দেননি। বরং সেই কঠিন তপোবন থেকে আহরিত সুরকে তিনি পরম মমতায় মিশিয়ে দিয়েছিলেন বাংলা আধুনিক গানের মেজাজে। তাঁর কণ্ঠে যে ‘তান’ আর ‘মীড়’ খেলা করত, তা ছিল শরতের মেঘের মতো হালকা কিন্তু গভীরতায় অতল। তিনি যখন গাইতেন, মনে হতো সুরগুলো যেন এক একটি অদৃশ্য পারিজাত হয়ে ঝরে পড়ছে শ্রোতার হৃদয়তন্ত্রীতে।
মায়াবী পর্দার নেপথ্যচারিণী
বাংলা সিনেমার ইতিহাসে সন্ধ্যা ও সুচিত্রা জুটির ক্ষেত্রে যে গায়িকা—নায়িকার মেলবন্ধন ঘটেছিল, তেমনভাবে অন্য কোনো জুটি গড়ে ওঠেনি। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠের সাথে সুচিত্রা সেনের অবয়ব যেন ছিল একেবারে অবিচ্ছেদ্য। রুপালি পর্দায় যখন এক মায়াবী হাসির দেখা মিলত, নেপথ্যে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ তখন সেই মুহূর্তকে এক অতীন্দ্রিয় পূর্ণতা দিত। ‘গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু’—এই গানটি যখন তিনি ধরতেন, তখন সেই রোমান্টিকতা কেবল নিছক আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, তা হয়ে উঠতো চিরকালীন এক আর্তি। তিনি কেবল গান গাইতেন না, তিনি কণ্ঠ দিয়ে পর্দার চরিত্রগুলোর আত্মাকে স্পর্শ করতেন। বিরহের গানে তাঁর সেই সূক্ষ¥ কাঁপন আজও প্রতিটি সংবেদনশীল বাঙালির হৃদয়ে এক নির্জন হাহাকার হয়ে প্রতিধ্বনিত হয়।
মুক্তির সংগ্রামে এক অগ্নিস্বর
সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় সুরের আকাশে যে শুধু কোকিল ছিলেন তা নয়, তিনি ছিলেন ঝড়ের পাখিও। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর কণ্ঠ হয়ে উঠেছিল এক শাণিত অস্ত্র। শরণার্থী শিবিরের সেই ধুলোবালি আর বিপন্নতার মাঝে তিনি গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন দৃঢ় চেতনায়, শানিত বোধে। তাঁর সেই কালজয়ী গান—‘বঙ্গবন্ধু ফিরে এলে তোমার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলায়’—তখন সাত কোটি মানুষের বুকের ভেতরে স্বাধীনতার স্পন্দন বাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, শিল্পের দায়বদ্ধতা কেবল সুরের কারুকার্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তা মানুষের মুক্তির লড়াইয়ের সাথেও একীভূত হতে পারে।
প্রচারের আলো নয় শিল্পে্র শুদ্ধতা
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অসম্ভব দৃঢ়চেতা এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন। প্রচারের আলোর চেয়ে শিল্পের শুদ্ধতা তাঁর কাছে সবসময় বেশি দামী ছিল। ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে পদ্মশ্রী পুরস্কারপ্রাপ্ত হিসেবে তার নাম ঘোষণা করা হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। জীবনের শেষবেলায় তাঁর সেই রাজকীয় অস্বীকৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সত্যিকারের শিল্পী কোনো তকমার কাঙাল নন, বরং শিল্পই তাঁর শ্রেষ্ঠ পরিচয়।
সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের বিখ্যাত কয়েকটি গান
১। গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু, ২। মধু মালতী ডেকে আয়, ৩। এ শুধু গানের দিন, ৪। তুমি না হয় রহিতে কাছে, ৫। আয় বৃষ্টি ঝেঁপে ধান দেব মেপে, ৬। চন্দন পালংকে শুয়ে, ৭। মায়াবতী মেঘে এল তন্দ্রা, ৮। উজ্জ্বল এক ঝাঁক পায়রা, ৯। হয়তো কিছুই নাহি পাবো, ১০। আমি তার ছলনায় ভুলবো না, ১১। কে তুমি আমারে ডাকো, ১২। বঙ্গবন্ধু ফিরে এলে তোমার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলায়, ১৩। সজনী গো সজনী দিন রজনী কাটে না, ১৪। ঝরা পাতা ঝড়কে ডাকে ১৫। এ গানে প্রজাপতি, ১৬। আমি তোমারে ভালো বেসেছি, ১৭। কেন এ হৃদয় চঞ্চল, ১৮। কি মিষ্টি দেখো মিষ্টি, ১৯। নতুন সূর্য আলো দাও আলো দাও, ২০। যদি ভুল করে ভুল মধুর হল, ২১। এই সুন্দর রাত্রি আকাশ পারে, ২২। ওগো মোর গীতিময়, ২৩। ফুলের কানে ভ্রমর আনে, ২৪। আমি স্বপ্নে তোমায় দেখেছি, ২৫। এ মধু রাত শুধু ফুল পাপিয়ার
পরিশেষ
সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় কোনো একটি বিশেষ সময়ের গায়িকা নন, তিনি একটি অবিনাশী সাংগীতিক চেতনার নাম। তাঁর কণ্ঠের সেই ধ্রুপদী বুনন আজও আমাদের রুচির মানদন্ড নির্ধারণ করে দেয়। সুরের এই নীলিমা আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন তাঁর সেই বিশুদ্ধ সংগীতের উত্তরাধিকার নিয়ে। যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, যতদিন বাঙালির মনে সন্ধ্যার শান্ত আকাশ আর সুরের তৃষ্ণা থাকবে—ততদিন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবেন। কারণ সন্ধ্যা মানে কেবল সময়ের অবসান নয়, সন্ধ্যা মানে এক অবিনাশী সুরের অনন্ত বিস্তার।
