সাহিত্যের চাঁদ এবং আর্টেমিস—২ || খ্রীষ্টফার পিউরীফিকেশন

যুগ যুগ ধরে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে আমরা মুগ্ধ হয়েছি। রাতের গভীর অন্ধকারে অযুত তারার সাথে স্নিগ্ধ আলো ছড়ানো চাঁদ আমাদের মনন কল্পনার এক বিশাল আকাশ জুড়ে অবস্থান করছে। আধুনিকবিজ্ঞান মহাকাশগবেষণার কল্যাণে আমাদের সামনে ক্রমেই এই চাঁদের প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হচ্ছে। কল্পনার রোমান্টিকতার আড়ালে চাঁদের যে এক কঠিন রুক্ষ সত্য লুকিয়ে আছে, তা বড়ই বিস্ময়কর!

আমরা জানি, চাঁদের নিজের কোনো আলো নেই। সূর্যের আলোতেই সে নিজে আলোকিত হয় এবং সেই ধার করা আলো পৃথিবীতে বিকিরণ করে, চাঁদ আমাদের রাতের অন্ধকার দূর করে। অথচ চাঁদের এই ধার করা আলোর সৌন্দর্যে যুগ যুগ ধরে মুগ্ধ হয়ে কালজয়ী সাহিত্য রচনা করেছেন কবিসাহিত্যিকরা। এই চাঁদকে নিয়ে গায়কগায়িকারা প্রাণ উজার করে গেয়েছেন। চিত্রশিল্পীরা সৃষ্টি করেছেন নন্দিত চিত্রমালা! প্রেমিকপ্রেমিকারা চাঁদের স্নিগ্ধ মোহনীয় জোছনায় পরিস্নাত হয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে রচনা করে নিজেদের ভালোবাসার জগত। 

কিন্তু বাস্তবে এইচাঁদমামারনা আছে সেই কল্পিত রূপ, না আছে মনোরম কোনো সৌন্দর্য! দূর থেকে যাকে রূপার থালার মতো মসৃণ আর উজ্জ্বল দেখায়, যাকে সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয় তার আসল রূপটি বড়ই নীরস এবং নির্মম! মহাশূন্য থেকে প্রবল গতিতে ধেয়ে আসা গ্রহাণু আর উল্কাপিন্ড অনবরত চাঁদের বুকে আঘাত হানছে। পৃথিবীর মতো চাঁদের চারদিকে ঢাল সদৃশ বায়ুমন্ডল নেই। ফলে কোনো বাধা ছাড়াই মহাজাগতিক দ্রুতধাবমান কঠিন বস্তু অনবরত আছড়ে পড়ছে তার বুকে। চাঁদ তাই ক্ষতবিক্ষত, অগণিত গর্ত বাক্র্যাটারেভর্তি। কবি নজরুল গেয়েছেন, ‘চাঁদেরে কে চায়, জোছনা সবাই যাচে..!’ সত্যিই তো, মানুষ হিসেবে আমরা বস্তুত চাঁদের রুক্ষ অবয়বকে খুঁজি না। আমরা খুঁজি তার গা বেয়ে ঝরে পড়া সেই মায়াবী জোছনাকে! আবার কবি সুকান্ত পূর্ণিমার জ্বলজ্বলে চাঁদকেক্ষুধার রাজ্যে ঝলসানো রুটিহিসেবে দেখেছেন। বলা যায়, চাঁদের প্রকৃত রুক্ষতার চেয়ে, সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত রূপ তার সৃজনী প্রভাবই আমাদের কাছে বড় হয়ে ওঠে। চাঁদের কমনীয় জোছনা আমাদের নয়নমন জুড়ায়! অমৃতসুধা রূপে আমাদের অন্তরকে বিমোহিত করে। কবিকে কাব্যরসে উন্মাতাল করে। শিল্পীকে করে উদ্বেলিত! আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী এই চাঁদকে জয় করা তাই, মানুষের আজন্ম লালিত স্বপ্ন

তবুও পৃথিবীর চারপাশে ঘূর্ণায়মান ক্ষতবিক্ষত উপগ্রহটিই আমাদের জন্য বড় আশীর্বাদ। তার নিজস্ব আলো না থাকলেও, মহাকাশে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে প্রতিবেশী হিসেবে তার এই নীরব অবস্থান পৃথিবীকে দারুণভাবে উপকৃত করে। চাঁদের মহাকর্ষীয় টানের ফলেই পূর্ণিমাঅমাবস্যায় পৃথিবীর সমুদ্রে নদীতে জোয়ারভাটার সৃষ্টি হয়। এই জোয়ারভাটা সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রকে সচল রাখে এবং পৃথিবীর ঘূর্ণন গতিকে প্রভাবিত করে প্রকৃতির মাঝে এক অপূর্ব স্থিতিঅবস্থা বজায় রাখে। এই চাঁদকে কেন্দ্র করেই ঈদ, পূজাপার্বণ, উৎসবের আয়োজন হয়। আমরা আমাদের সত্তায় পূর্ণিমার অমাবস্যার জোয়ারভাটার অমোঘ প্রতিক্রিয়া অনুভব করি। চন্দ্রগ্রহণের সময় গর্ভবতী মায়েরা বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করেন। এবং এই চাঁদকে উপলক্ষ করেই মানুষের আচরিত সংস্কৃতিতে নানান প্রচলিত আচারউপাচারের আয়োজন হয়ে থাকে।

তো এই রুক্ষ চাঁদ না থাকলে কী হতো আমাদের এই পৃথিবীর? বিজ্ঞানীরা বলেন, চাঁদ না থাকলে পৃথিবীর আহ্নিক গতি প্রভাবিত হতো, আমাদের দিনরাতের হিসাব বদলে যেত। আবহাওয়া হয়ে উঠত চরমভাবাপন্ন এবং হয়তো পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশই অন্যরকম হতো। চাঁদের বুকে যে অগণিত ক্ষত, তা যেন পৃথিবীরই স্থিতিশীলতা বজায় রাখার এক নীরব সাক্ষ্য দিচ্ছে। 

তাই চাঁদ নিজে রুক্ষ হলেও, পৃথিবীকে সে সাজিয়েছে প্রাণের স্পন্দনে। বাস্তবের চাঁদ যতই ক্ষতবিক্ষত আর বায়ুহীন হোক না কেন, পৃথিবীর আকাশে সে চিরকালই এক পরম নির্ভরতা এবং আমাদের কল্পনার অবিচ্ছেদ্য এক সুন্দরতম উপমা হয়েই থাকবে। চাঁদের এই রুক্ষতাই প্রমাণ করে, সৌন্দর্য কেবল বাহ্যিক রূপে নয়, বরং অন্যের জীবনে তার প্রভাব অবদানের মাঝেই প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে। আমরা জোছনা চাই। আর চাঁদ সময়ের পরিক্রমায় নিজেকে ক্রমান্বয়ে প্রকাশ করে, পূর্ণিমায় সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিয়ে অমাবস্যায় নিজেকে আড়াল করে নেয়।

চাঁদ যে কেবল আমাদের রূপকথার সঙ্গী তা নয়, বরং সে এক নীরব প্রহরী হয়ে নিজের বুকে আঘাত সয়ে পৃথিবীকে সুরক্ষিত রেখেছে। তার এই রুক্ষতা পৃথিবীর জন্য এক আশীর্বাদ। চাঁদ নিজে বায়ুমন্ডলহীন বলয়ে বন্ধুর পাথুরে ভূমিতে পূর্ণ হয়েও এক হিতৈষী প্রতিবেশী হয়ে আমাদের পৃথিবীকে, তার জীববৈচিত্রকে সচল রাখছে!

সম্প্রতি ( এপ্রিল, ২০২৬) আমেরিকারনাসাকর্তৃক আর্টেমিস নামক রকেটে চড়ে চারজন নভোচারী, কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান (নাসার অধীনে দ্বিতীয় মহাকাশযাত্রা), পাইলট ভিক্টর গ্লোভার (নাসার অধীনে দ্বিতীয় মহাকাশযাত্রা), মিশন স্পেশালিস্ট খ্রীস্টিনা কোচ (নাসার অধীনে প্রথম নারী অভিযাত্রী, দ্বিতীয় মহাকাশযাত্রা) এবং মিশন স্পেশালিস্ট জেরেমি হেনসেন (কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সি, নাসার অধীনে প্রথম মহাকাশযাত্রা) এপ্রিল ফ্লোরিডার কেনেডি মহাকাশ কেন্দ্র থেকে আর্টেমিস রকেট উৎক্ষেপণ করা হয়। ওরিয়ন চাঁদের দূরবর্তী পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ,০৪৭ মাইল (,৫১৩ কিলোমিটার) দূরত্বে চাঁদের চারপাশে প্রদক্ষিণ করে। নাসার ভাষ্যমতে, পৃথিবী থেকে তারা প্রায় লাখ হাজার ৭৭১ কিলোমিটার বা লাখ ৫২ হাজার ৭৫৬ মাইল দূরে অবস্থান করেছেন। পর্যন্ত মহাকাশে এত দূরে কোনো মানুষ যেতে পারেনি। পৃথিবীর বাইরে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দূরবর্তী স্থানে মানুষের যাওয়ার নতুন রেকর্ড গড়লেন আর্টেমিস২এর নভোচারীরা। আমরা সচরাচর চাঁদের যে অংশ দেখে থাকি, এই অভিযানের অভিযাত্রীরা তার উল্টো দিকেও পরিভ্রমণ করে অভুতপূর্ব রেকর্ড গড়েছেন। চাঁদের নতুন এই রেকর্ড গড়ার সময় পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন নভোচারীরা। প্রায় ৪০ মিনিট যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর আবার যোগাযোগ স্থাপিত হয়। বিষয়টি নভোচারীদের জন্য ছিল সবচেয়ে বেশি উত্তেজনার। তাঁরা চাঁদের কক্ষপথে পৌঁছে অতি কাছাকাছি দূরত্ব থেকে আরও নিখুঁতভাবে চাঁদের বিভিন্ন তথ্য, ছবি, ভিডিও সংগ্রহ করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। এবারের ওরিয়ন নভোযানটি চার নভোচারী নিয়ে পৃথিবী থেকে চাঁদে যাওয়া আসার যাত্রায় মোট লাখ ৯৪ হাজার ৪৮১ মাইল পথ পাড়ি দিয়েছে। আর্টেমিস৩এর লক্ষ্য হলো, ২০২৮ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে চাঁদে মানুষসহ অবতরণ।

পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (৪৪ বার), রাশিয়া (২২ বার), চীন (১০ বার), জাপান ( বার), ভারত ( বার) এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ( বার) চন্দ্রঅভিযানে অবতীর্ণ হয়েছে। তবে পৃথিবীর বাইরে সবচেয়ে দূরবর্তী স্থানে মানুষের যাওয়ার নতুন রেকর্ড গড়া নাসার আর্টেমিস মিশনের মহাকাশযান ওরিয়নে থাকা নভোচারীরা নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসেন। এই চারজন নভোচারী যাত্রার দশম দিনে ১১ এপ্রিল সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে ক্যালিফোর্নিয়ার কাছাকাছি প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে তাঁদের ঐতিহাসিক সফল চন্দ্রঅভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। পৃথিবীতে ফিরে এসে বিজয়ী চার নভোচারী স্বস্তির প্রশান্তির নিঃশ্বাস নিয়েছেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভিযাত্রীদের অধিনায়ক ওয়াইজম্যান বলেছিলেন, ‘আমরা এমন সব দৃশ্য দেখেছি, যা আগে কোনো মানুষ দেখেনি! এমনকি অ্যাপেলো অভিযানের সময়ও না! আমাদের জন্য তা ছিল সত্যি বিস্ময়কর!’ 

আর্টেমিস২এর নভোচারীদের সংগৃহীত ছবি তথ্য আগের সমস্ত ছবি তথ্যের চেয়ে আরও অনেক বেশি স্পষ্ট এবং নিখুঁত হয়েছে। তাঁরা বিগত পঞ্চাশ বছর পর চাঁদের কাছাকাছি গেছেন, চাঁদকে প্রদক্ষিণ নিবিড় পর্যবেক্ষণ করেছেন। আশা করা যায় তাঁদের পর্যবেক্ষণ, সংগৃহীত তথ্যউপাত্তকে নির্ভর করে অদূরভবিষ্যতে চাঁদে আরো ব্যাপক অভিযান পরিচালিত হবে। এই চাঁদকে ঘিরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য দেশের গবেষণার সফল রূপ, অদূর ভবিষ্যতে বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করবে। আশা করা যায়, চাঁদের বুকে সঞ্চিত সম্পদরাশি মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে। এই চাঁদকে, আমাদের নিকটতম মঙ্গলগ্রহকে এবং আরো গ্রহনক্ষত্রকে কেন্দ্র করে বিশ্বের পরাশক্তিগুলো ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়, বন্ধুসুলভ সহযোগিতার হাত প্রসারিত করবে। এবং বিশ্ববাসীর মঙ্গলের জন্য, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য হাতে হাত মিলিয়ে এগিয়ে আসবে সকলে। তখন এই পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার নতুন দুয়ার উন্মোচিত হবে।


Related Posts