কিছু রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে আশঙ্কা মুত্তালিব বিশ্বাস
যতটুকু মনে পড়ে, গ্রামে থাকাকালীন, রবীন্দ্রনাথের গান প্রথম শুনেছিলাম গ্রামোফোন রেকর্ডে। আমার বয়স তখন দশ—এগারো। সেই গানগুলোর কয়েকটি ছিল: ওরে সাবধানী পথিক, বারেক পথ ভুলে মরো ফিরে; অয়ি ভুবনমনোমোহিনী, মা; আজ সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে; কী পাইনি তার হিসাব মিলাতে মন মোর নহে রাজি; আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান, এবং আরো দুই—একটা (তখন জানতাম না, ওগুলো রবীন্দ্রনাথের গান; এ—ও জানতাম না, রবীন্দ্রনাথের গানকে তখন রবীন্দ্রসংগীত বলা হতো, কি—না)। ‘রবীন্দ্রসংগীত’ নামটার সঙ্গে পরিচিত হতে থাকলাম এবং ওই নামে চিহ্নিত গান শুনতে থাকলাম সতের—আঠার বছর বয়স থেকে, মুর্শিদাবাদের বহরমপুর শহরে, কলেজে পড়তে গিয়ে।
১৯৬২—তে ঢাকার বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে ভর্তি হলাম রবীন্দ্রসংগীত শিখতে। ওই একাডেমির মতিঝিল শাখায় ওই গানের শিক্ষকতাও করেছিলাম ১৯৮২ থেকে ২০০২ পর্যন্ত। রবীন্দ্রসংগীত গাইতামও আসর, মঞ্চ, রেডিও, টিভিতে। শোনা, শেখা, গাওয়া এবং শেখানো— সব মিলিয়ে, নিজের শ্রুতি—স্মৃতি অনুযায়ী, ওই সময়ে শিল্পী ও শ্রোতৃমহলে রবীন্দ্রনাথের যে—সব গান বহুল প্রচলিত এবং জনপ্রিয় ছিল তাদের কয়েকটি হলো:—
অচেনাকে ভয় কী আমার ওরে; অরূপ, তোমার বাণী; অলি বার বার ফিরে যায়; অল্প লইয়া থাকি তাই; আকাশ জুড়ে শুনিনু ওই বাজে; আজ কি তাহার বারতা পেল রে; আজ খেলা—ভাঙার খেলা; আজ সবার রঙে রঙ মিশাতে হবে; আজ তোমারে দেখতে এলেম; আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায়; আজি এ আনন্দসন্ধ্যা; আজি দখিন দুয়ার খোলা; আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে; আজি যত তারা তব আকাশে; আধেক ঘুমে নয়ন চুমে: আনমনা আনমনা; আমরা দুজনা স্বর্গ—খেলনা; আমরা সবাই রাজা; আমাদের যাত্রা হল শুরু; আমায় বাঁধবে যদি কাজের ডোরে; আমার আর হবে না দেরি; আমার এ পথ তোমার পথের থেকে; আমার কণ্ঠ হতে গান কে নিল; আমার দোসর যে জন ওগো তারে; আমার নয়ন ভোলানো এলে; আমার মল্লিকা বনে; আমার শেষ পারানির কড়ি; আমার সকল দুখের প্রদীপ; আমার হৃদয় তোমার আপন হাতের দোলে: আমি চিনি গো চিনি তোমারে; আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান; আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান; আমি তোমার প্রেমে হব সবার; আর কতদূরে আছে সে আনন্দধাম; আলো আমার আলো; আলোকের এই ঝরনাধারায় ধুইয়ে দাও; এদিন আজি কোন ঘরে গো; এপথে আমি যে গেছি বারবার; এ মণিহার আমায় নাহি সাজে; এই কথাটা মনে রাখিস; এই করেছ ভালো, নিঠুর হে; এই তো তোমার আলোকধেনু; এই তো তোমার প্রেম ওগো; এই তো ভালো লেগেছিল; এই লভিনু সঙ্গ তব; এত দিন যে বসেছিলেম; এবার দুঃখ আমার অসীম পাথার পার হল; এলেম নতুন দেশে; এসো এসো ওগো শ্যমছায়াঘন দিন; এসো নীপবনে ছায়াবীথিতলে; ও আমার চাঁদের আলো ; ও নিঠুর আরো কি বাণ; ওই আসন তলের মাটির ‘পরে; ওই মালতী লতা দোলে ; ওগো তোরা কে যাবি পারে; ওগো দখিন হওয়া; ওগো নদী, আপন বেগে; ওযে মানে না মানা; ওরে আগুন আমার ভাই; ওরে নূতন যুগের ভোরে; ওরে বকুল পারুল ওরে; ওরে ভাই, ফাগুন লেগেছে বনে বনে; ওরে সাবধানী পথিক; কতবার ভেবেছিনু; কাল রাতের বেলা গান এল মোর মনে; কী গাব আমি কী শুনাব; কী পাইনি তারি হিসাব মিলাতে; কূল থেকে মোর গানের তরী; কেন চোখের জলে ভিজিয়ে দিলেম না; কেন তোমরা আমায় ডাকো; কেন পান্থ এ চঞ্চলতা; কেন যামিনী না যেতে জাগালে না; কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ; খরবায়ু বয় বেগে; খোলো খোলো দ্বার; গানগুলি মোর শৈবালেরই দল; গানের ভিতর দিয়ে যখন দেখি; গায়ে আমার পুলক লাগে; চোখের আলোয় দেখেছিলেম; ছিন্ন পাতার সাজাই তরণী; ডাকব না ডাকব না; তার বিদায় বেলার মালাখানি; তিমির অবগুণ্ঠনে; তুমি কোন কাননের ফুল; তুমি ডাক দিয়েছ কোন্ সকালে; তুমি যত ভার দিয়েছ সে ভার; তুমি যে সুরের আগুন; ঝড়ে যায় উড়ে যায় গো; তোমার বীণায় গান ছিল; তোমার মোহন রূপে; তোমার গেহে পালিছ স্নেহে; তোরা যে যা বলিস ভাই; দূরদেশী সেই রাখাল ছেলে; ধ্বনিল আহ্বান মধুর গম্ভীর; নিশিদিন ভরসা রাখিস; পুব সাগরের পার হতে; পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে; প্রমোদে ঢালিয়া দিনু মন; প্রাঙ্গণে মোর শিরীষ শাখায়; প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে; ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে; বড়ো আশা করে এসেছি গো; বনে এমন ফুল ফুটেছে; বল দাও মোরে বল দাও; বসন্তে কি শুধু কেবল; বাহিরে ভুল হানবে যখন; বুক বেঁধে তুই দাঁড়া দেখি ; ভালোবাসি ভালোবাসি; ভালো যদি বাস সখি; মধুর তোমার শেষ যে না পাই; মনে রবে কি না রবে; মম চিত্তে নিতি নৃত্যে; মম দুঃখের সাধন; মেঘের কোলে রোদ হেসেছে; যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে; যদি বারণ কর তবে গাহিব না; যাবই আমি যাবই; সখি, বহে গেল বেলা; সংকোচের বিহ্বলতা; সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে; সুনীল সাগরের শ্যামল কিনারে; হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী; হিমের রাতে ওই গগনের ; হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে; হে ক্ষণিকের অতিথি; হে নিরুপমা; হে নবীনা হে নবীনা; ইত্যাদি। (এটা অবশ্যই কোনো সম্পূর্ণ তালিকা নয় এবং ব্যক্তিভেদে এই তালিকা ভিন্ন—ভিন্ন হতে পারে, যেটা খুবই স্বাভাবিক)।
সম্প্রতি (বছর—পনের যাবৎ) শিল্পীদের পরিবেশনায় এই গানগুলো তেমন আর স্থান পাচ্ছে না, কিংবা শ্রোতাপক্ষ গানগুলো শোনার তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে বলেও আমার মনে হচ্ছে না। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাপ্রসূত এই মন্তব্যের সাথে যদি আর সবাই দ্বিমত পোষণ করেন, তবে আমার আর কিছুই বলার থাকে না। তবে তালিকাভুক্ত গানগুলোর পঞ্চাশ শতাংশ ব্যাপারে যদি শতকরা পঞ্চাশ জনও আমার মতে মত দেন তবে আমার মনের মধ্যে জাগা, উত্তর দুটো প্রশ্ন রাখতে চাই, যেমন, (১) সংশ্লিষ্ট গানগুলো কি, কোনো—না—কোনো কারণে অজনপ্রিয় হতে চলেছে এবং সেই কারণে সেগুলো অচর্চিত—অগীত থেকে যাচ্ছে? (২) যদি তাই হয়, তবে তার ফলে কি গানগুলো গায়কের কণ্ঠ ছেড়ে শুধু স্বরবিতানের পাতায় শোভা পাবে?
অতীতে, ইত্যকার কারণে, অন্যান্য বহু ক্ষেত্রের মতো, সংগীত—ক্ষেত্রেও বহু পরিমাণ বিলুপ্তি ঘটেছে বলেই আমার এই আশঙ্কাপূর্ণ জিজ্ঞাসা। ‘আশঙ্কার কোনো কারণ নাই’— এমন সান্ত্বনাপূর্ণ বাণী শোনাবার মতো কেউ আছেন বলেও তো মনে হচ্ছে না।
গীতবিতানে যত গান আছে, স্বরলিপি না—থাকার/ না—পাওয়ার কারণে, স্বরবিতানে আছে তার চেয়ে প্রায় শ—দুয়েক কম। স্বরবিতানে যত আছে, গাওয়া হয় তার চেয়ে অনেক কম— বড়—জোর শ—চারেক। একাদিক্রমে বেশিদিন ধরে অচর্চিত থাকার কারণে পরিবেশন—তালিকা থেকে অনেক রবীন্দ্র—গানের ঝরে—পড়ার সমূহ সম্ভাবনা—(অতীতের অন্যান্য শ্রেণীর অনেক গানের ক্ষেত্রে যেমন ঘটেছে— যাকে বিলুপ্তিই বলা যায়)। অন্তত আমি তেমনটাই ভাবি।
বস্তুত এবং বাস্তবত, গান জীবিত থাকে একমাত্র গায়নে (অনুশীলন ও পরিবেশনে)— খাতায়, স্বরলিপিতে, যান্ত্রিক বাদনে বা বৈদ্যুতিন (বষবপঃৎড়হরপ) প্রযুক্তিতে যে—ভাবে থাকে, সে—ভাবে থাকাকে গানের প্রকৃত বেঁচে—থাকা বলা যায় না।
ঐতিহ্যবাহী শিল্প—সংস্কৃতির যথাযথ সুরক্ষার ব্যাপারে আমাদের অলসতা, বিমুখতা এবং মূল্যবোধহীনতা যে ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা ইতিমধ্যেই নানানভাবে পরিলক্ষিত। উপরন্তু ইংরেজিতে বলা হয়ে থাকে: ঊরঃযবৎ ঁংব রঃ ড়ৎ ষড়ংব রঃ. তাই, একান্ত ভয়: দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় থাকার কারণে কিছু রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রে সেই অভাবিতপূর্ব, অনাকাক্সিক্ষত অঘটন ঘটে যাবে না—তো?
