চারু শিল্পীদের চোখে মা

1.মা জননী || তাজুল ইমাম

আমার শৈশব কেটেছে উত্তর বঙ্গের নিভৃত একটি গ্রামে। প্রায় নির্জন একটি রেল স্টেশন। স্টেশন চত্বর পেরোলেই একটা অজ পাড়াগাঁ নাম বানীগ্রাম। সেখানে একটা প্রাচীন ঝুরি নামা বটগাছ আছে। সন্ধ্যা নামলেই শত শত ক্লান্ত পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠত বটের ঘন ছায়া ঘেরা বুক। সেই অন্ধকারে অনেক রহস্যময় গল্প লুকিয়ে ছিল। আমার মা সে সব গল্প জানতেন। মায়ের গা ঘেঁষে শুয়ে থাকলে সে সব গল্প শোনা যেতো ঘুমিয়ে নাপড়া অব্দি। দুপুরের গরমে মেঝেয় শীতল পাটিতে শুয়ে মায়ের সময় কাটতো শরৎউপন্যাসে। কখনো বঙ্কিম, রবি ঠাকুর, কখনো মানিক, মুজতবা আলী। আমাদের সেই দিনগুলিতে প্রাচুর্য বা অনটন কিছু ছিল কিনা মনে নেই তবে আমাদের অনেক বইএর সংগ্রহ ছিল। বাবা মা দুজনেই বই পড়তেন এবং সংগ্রহ করতেন। আমার বর্ণ পরিচয়ের আগেই মা আমাকে শতাধিক ছড়া মুখস্ত করিয়েছিলেন। বাড়িতে অতিথি এলে কুন্ঠিত, লজ্জিত একটি বালক আমিকে ধরে এনে বাধ্য করা হত ছড়া কেটে সবাইকে আমোদিত করতে। আমার জীবনে প্রথম পুরস্কারও পেয়েছিলাম ক্লাস ওয়ানে এক নাগাড়ে একশত দশটি ছড়া মুখস্ত আবৃত্তি করে। পুরস্কার দুটো খাতা আর দুটো কাঠপেন্সিল। মায়ের মুখটা সেদিন হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। তারপর বহুদিন মা সেই ঘটনা সাতকাহন করে সবাইকে শুনিয়েছেন।

মা এমব্রয়ডারিতে সুদক্ষা সুরুচিসম্পন্না ছিলেন। অসাধারণ আলপনা আঁকতেন। মুসলমান ঘরের মেয়ে হয়ে এমন আলপনা আঁকতে কোথায় শিখেছো? মা জানালেন তাঁর শৈশবে শিলং, হাইলাহান্দি করিমগঞ্জের হিন্দু বান্ধবীদের কথা। অতিশৈশবে মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম সামনের বাসার মাসিমা কি সুন্দর ঠাকুর পূজা করেন তুমি করোনা কেন? মা বললেন যে সন্ধ্যায় নামাজ পড়ি ওটাই আমার পূজা। তাহলে তোমার ঠাকুর নেই কেন? মা বললেন আমার ঠাকুরকে চোখে দেখা যায় না। আমার ধর্মনিরপেক্ষ মা জননী চলে গেছেন অনন্তে, তাঁকে দেখতে হয়নি স্বাধীন দেশে ধর্মান্ধ হিংসার গ্লানি।

2.মা—ই প্রকৃত শিল্পী || মুস্তাফা আরশাদ

আমার মা। এক অসামান্য শিল্পী, যাঁর হাতের লেখা ছিল মুক্তোর মতো আর অঙ্কনশৈলী ছিল নিখুঁত। আজ আমি যা কিছু জানি, শিল্প আর সংস্কৃতির প্রতি আমার যে অনুরাগ, তার সবটুকুই আমার মায়ের কাছ থেকে পাওয়া। যদিও আমি শিল্পকলায় স্নাতক, তবুও নিজেকে কখনোশিল্পীবলে পরিচয় দেওয়ার সাহস পাই না; কারণ প্রকৃত শিল্পী তো ছিলেন তিনিই।

আমি প্রথাগতভাবে মা দিবস বা বিশেষ কোনো দিন পালন করি না। কিন্তু কৌশিক ভাইয়ের অনুরোধে আজ মায়ের ডায়েরির একটি পাতা থেকে তাঁর কিছু কথা পুনরায় লিখছি।


3.মা ফিরে আসেন সৌন্দর্যের উৎস হয়ে || জেবুননেসা কামাল

শিল্পীর চোখেমাএকটি বহুমাত্রিক বিষয়যেখানে ব্যক্তিগত ইতিহাস, আবেগের গভীরতা, দৃশ্যমান বুনন এবং সৃষ্টি লালনপালনের চিরন্তন রূপ একত্রে মিশে যায়। শিল্পের ইতিহাসেমাবারবার ফিরে আসে শক্তি, সংবেদনশীলতা সৌন্দর্যের উৎস হিসেবে। স্নেহ, যত্ন এবং নীরব ভালোবাসার মুহূর্তগুলোই যেন শিল্পীর তুলিতে জীবন্ত হয়ে ওঠে।

একজন শিল্পীর কাছে মা কখনও গবেষণার বিষয়, কখনও প্রতীকী রূপ, কখনও ব্যক্তিগত সামাজিক বাস্তবতার সংযোগস্থল। মায়ের দৃষ্টি একাধারে আশ্রয়, নিরাপত্তা নিঃশর্ত ভালোবাসার প্রতীক। আবার তাঁকে শিল্পে তুলে ধরা মানে জীবনের অন্তরঙ্গতা, ত্যাগ এবং সহনশীলতার এক অবিরাম কাহিনী প্রকাশ করা।

আমার মা ছিলেন এক অসাধারণ নারীএকজন সত্যিকারেরসুপার মা তিনি আমাদের দশ ভাইবোনকে উচ্চশিক্ষিত করে তুলেছেন, গড়ে তুলেছেন তাঁর নিজের আদর্শ পরিশ্রম দিয়ে। তিনি ছিলেন আমাদের জীবনের প্রথম শিক্ষক।

তিনি কখনও ছেলেমেয়ের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ করেননি। আমরা চার ভাই ছয় বোন ছাড়াও আরও চারজন পালিত সন্তানকে তিনি নিজের সন্তানের মতোই মানুষ করেছেন। আমাদের পরিবারে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে তিনি এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

আমাদের বড় ভাই ইঞ্জিনিয়ার, মেজ ভাই একটি প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট কলেজের প্রিন্সিপাল, ছোট ভাই চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। বোনেরাও দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান, প্রাণিবিজ্ঞান বাংলায় পড়াশোনা করেছেন। আমি সবার ছোট। চারুকলায় পড়েছি, আর আমার শিল্পচর্চার ভিতটি গড়ে উঠেছে মায়ের হাত ধরেই।

আমার বাবা সরকারি চাকরি করতেন এবং সংসারের পুরো দায়িত্ব মায়ের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। সীমিত আয়ের মধ্যেও মা দক্ষতার সঙ্গে সংসার চালিয়েছেন। পাশাপাশি আমাদের ফার্মছাগল, হাঁসমুরগি কবুতরসবকিছুই তিনি সমান দক্ষতায় পরিচালনা করেছেন।

আমাদের বাড়িতে অতিথির কখনও অভাব ছিল না। মায়ের রান্না আতিথেয়তা ছিল অতুলনীয়।

আমার মা ছিলেন অসাধারণ সৃষ্টিশীল। সুইসুতা দিয়ে টেবিলক্লথ, বিছানার চাদর, বালিশের কভারসবকিছুতেই তিনি ফুটিয়ে তুলতেন নান্দনিক নকশা। নকশীকাঁথা, কুশিকাটা ফুল, ফ্রেম করা কারুকাজÑসব কিছুতেই ছিল তাঁর হাতের জাদু।

বিশেষভাবে মনে পড়ে, কালো কাপড়ের ওপর বৈদ্যুতিক ওই বাল্বের ফিলামেন্ট দিয়ে তিনি তাজমহলের এক অপূর্ব চিত্র এঁকেছিলেন এবং তার ভেতরে ক্যালিগ্রাফির মাধ্যমে লিখেছিলেন

তাজমহলের পাথর দেখেছ,

দেখিয়াছ তার প্রাণ?

অন্তরে তার মমতাজ নারী,

বাহিরেতে শাহজাহান।

স্মৃতির ভেতর জীবন্ত মা

মাকে নিয়ে লিখতে গেলে শেষ করা যায় না। লিখতে লিখতে আজও চোখ ভিজে ওঠে। তিনি আজ আমাদের মাঝে সশরীরে নেই, তবুও প্রতিটি কাজে, প্রতিটি অনুভূতিতে তাঁর উপস্থিতি অনুভব করি। আমার জীবনের যা কিছু অর্জন সবই তাঁর কাছ থেকে পাওয়া।

আমার জীবনে আরেকজনমাআছেনআমার শাশুড়ি। জন্মদাত্রী মাকে আমিআম্মুবামা মনিবলে ডাকতাম, আর বিয়ের প্রথম দিন থেকেই শাশুড়িকেমাবলে সম্বোধন করেছি। তাঁর কাছ থেকেও আমি গভীর স্নেহ ভালোবাসা পেয়েছি।

উপসংহার

একজন মা যে ত্যাগ স্বীকার করেন, তা ভাষায় সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। মা শুধু জন্মদাত্রী নন, তিনি আমাদের প্রথম শিক্ষক, সবচেয়ে কাছের বন্ধু এবং জীবনের শ্রেষ্ঠ অনুপ্রেরণা।

শিল্পীর চোখে মা কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি এক অনন্ত আলোর উৎস, জীবনের প্রথম রংতুলি, যার স্পর্শে পৃথিবী রঙিন হয়ে ওঠে।


4.মা, অনন্ত রঙের ক্যানভাস || দীপা দেবনাথ

মাএই ছোট্ট শব্দের ভেতর লুকিয়ে আছে এক বিশাল পৃথিবী। একজন শিল্পীর চোখে মা শুধু একজন মানুষ নন, তিনি এক অনন্ত রঙের ক্যানভাস, যেখানে ভালোবাসা, ত্যাগ, শক্তি আর সংগ্রামের রেখাচিত্র একসাথে মিশে থাকে।

আমার মা একজন চাকুরীজীবী নারী। প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই তার দিন শুরু হয়। ঘরের কাজ, পরিবারের যত্ন, আর তার নিজের দায়িত্বÑসবকিছু একসাথে সামলান তিনি অবলীলায়। বাইরে অফিসের ব্যস্ততা, ভেতরে সংসারের অগণিত কাজÑদুটো জগতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি যেন এক অবিচল সেতু।

শিল্পীর চোখে আমি তাকে দেখি এক চলমান চিত্রকর্ম হিসেবে। তার ক্লান্ত চোখে লুকানো থাকে অসীম মমতা, তার হাতের স্পর্শে থাকে আশ্রয়ের নিশ্চয়তা। কখনো তিনি ঝড়ের মতো দৃঢ়, আবার কখনো নরম বৃষ্টির মতো কোমল। তার জীবন যেন রঙের এক অসাধারণ মিশেলকখনো গাঢ় লাল শক্তির প্রতীক, কখনো নীল শান্তির ছোঁয়া।

আমার শিল্পচর্চায়, নারীত্বের যে শক্তি সৌন্দর্য আমি খুঁজে পাই, তার মূল উৎস আমার মা। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়, কীভাবে ক্লান্তির মাঝেও হাসতে হয়। তার প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি ত্যাগ, আমার ক্যানভাসে নতুন গল্প হয়ে ফুটে ওঠে।

মা দিবসে আমি শুধু তাকে শুভেচ্ছা জানাতে চাই না, বরং তার এই নিরলস যাত্রাকে সম্মান জানাতে চাই। তিনি আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক, প্রথম অনুপ্রেরণা, আর সবচেয়ে সুন্দর শিল্পকর্ম।

আমার কাছে, আমার মা আমার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিযাকে আমি প্রতিদিন নতুন করে আবিষ্কার করি, নতুন করে আঁকি, হৃদয়ের গভীরতম রঙ দিয়ে।


5.মায়েরাই আসল শিল্পী || মোহাম্মেদ হাসান রোকন

মায়েরাই আসল শিল্পী, মায়ের শিল্পচর্চার মাধ্যম একটা জায়গাতে আটকে থাকে না, শরীরে বহন করা থেকে জন্ম দেয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত একজন অদক্ষ মা হিসেবেই তৈরি হতে থাকে মা। 

মা নিজের কথা ভাবেন না। আরেকজনকে নিজের ভেতরে সুরক্ষা করেন তিনি। নিজের খাওয়ার অরুচি থাকলেও ভিতরের মানুষটির প্রতি গুরুত্ব দেন প্রতিমুহূর্ত। 

মা তখনো জানেনা শিশুর ভাষা! মা তৈরি করে নিজের ভাষা, নিজের ভাষায় শুরু করে কখন খাবার দিতে হবে, কখন পরিস্কার করতে হবে।

ঘুম আসছে না তাতেও কান্না। ঘুমটাও পাড়িয়ে দিতে হবে। ঘুম পাড়ানোর গানটাও করে তৈরি করে মা।

একসময় ধীরে ধীরে মায়ের ঘুমটা উধাও হয়ে যায়। মাকে ঘুম পাড়ানোর গানটা কেউ শিখিয়ে দেয় না। 

মা তো ভীষণ খুশি তার শিশু সন্তানকে হাঁটি হাঁটি পা করে চলতে দেখতে পেয়ে। তিনি জানেন, এই সময়টাতে আরো চোখে চোখে রাখতে হবে। তার মানে পিছে পিছে দৌড়ানা।

হঠাৎ একদিন মা বলে ডাক শুনতেই মায়ের কী আনন্দ!

আমার মনে হয় সারা দুনিয়ার মায়েদের বেঁচে থাকা, সারা জীবনের নিজের জন্য একটি বারের জন্য মা ডাক শুনতে পারাটাই শুধু মায়ের সন্তানদের কাছ থেকে চাওয়া। এছাড়া বাকি জীবনে মায়ের আর কিছু চাওয়া থাকে না।

 মায়েরা সন্তানদের সমান ভাগে বণ্টন করে তার ভালোবাসা। সবাই সবাইকে ভুলে গেলেও একজন কখনো ভোলেনা তার সন্তানদেও, সে আর কেউ না সে হলো মা। মায়েদের জন্য একটি দিন দিয়ে দায়িত্ব শেষ করার মতো কোনো অবস্থাই তৈরি হতে পারে না। আবার ভাবতেও ভালো লাগে পৃথিবীতে মায়েদের জন্য একটি স্পেশাল দিন আছে। এই দিনটি শুধুই মায়েদের জন্য উৎসর্গ করা।

পৃথিবীর সকল মায়েদের জানাই মা দিবসের শুভেচ্ছা।


6.মায়ের অনুপ্রেরণায় আমি শিল্পী || খুরশীদ আলম সেলিম

নিউইয়র্কে আমার পৌঁছানোর মাত্র ৩০ দিনের মাথায় মায়ের আকস্মিক মৃত্যুতেআমেরিকান ড্রিমআমার কাছে এক বেদনাদায়ক কাহিনীতে পরিণত হল। তখন উপলব্ধি করলাম যে, অধিকাংশ অভিবাসীই তাঁদের বাবামায়ের মৃত্যুর সময় তাঁদের পাশে উপস্থিত থাকতে পারেন না। 

আমি ছিলাম আমার মায়ের প্রথম সন্তান; তাই তাঁর কাছ থেকে আমি পেতাম বিশেষ আদরযত্ন। শৈশবের একটি কথা আমার বেশ মনে পড়ে: গরুর দুধ সম্পর্কে মায়ের ধারণা ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট; তিনি বিশ্বাস করতেন যে, শিশুদের সুস্থ শরীর মস্তিষ্কের বিকাশে দুধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই তিনি আমাকে লক্ষ্য হিসাবে স্থির করলেন। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর সন্তান যেন একজন অত্যন্ত মেধাবী অসাধারন বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। সেই লক্ষ্যে, প্রতি রাতে তিনি বড় কাপে করে গরম দুধ নিয়ে আমার কাছে আসতেন এবং আমাকে তা পান করতে দিতেন। আমি গরুর দুধ একদমই পছন্দ করতাম না। কিন্তু মা আমার আপত্তিতে কখনোই কান দিতেন না। অগত্যা, অধিকাংশ রাতেই আমি জানালার বাইরে দুধটুকু ফেলে দিতাম। এখন আমি বুঝতে পারি, যদি আমি প্রতি রাতে নিয়মিত দুধ পান করতাম, তবে হয়তো আমার মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পেত এবং একজন আরও বেশি সৃজনশীল শিল্পী হিসাবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারতাম। আমার শৈশবে, আমি বাবামায়ের সাথে সিনেমা হলে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ পেতাম। সেখানেই আমি প্রথমবারের মত বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি তারকাদের বিশেষ করে উত্তম কুমার সুচিত্রা সেন অভিনীত চলচ্চিত্রগুলো দেখার সৌভাগ্য অর্জন করি।

অবচেতনভাবেই আমার মনে শিল্পী হওয়ার এক সুপ্ত বাসনা জেগে উঠেছিল। এর পেছনে মূল অনুপ্রেরণা ছিলেন আমার মা। তিনি পাটের চটের ওপর অত্যন্ত বর্ণিল নিপুণ হাতেট্যাপেস্ট্রিবা বুননশিল্পের কাজ করতেন। যার বিষয়বস্তু হিসেবে থাকত বিচিত্র সব ফুল, গাছপালা কিংবা আরবি লিপি নকশা। আজ প্রায় চল্লিশ বছর কেটে গেছে। আজো আমি তাঁকে গভীরভাবে অনুভব করি এবং একজন অসাধারণ মানুষ আদর্শ মা হিসেবে তাঁকে সর্বদা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি।

7.আম্মার আঙুলের বাজনা || রাকীব হাসান

আমার শৈশব ছিলো রঙিন একটি বিশাল ক্যানভাস। মায়ের দেহ থেকে জন্ম নিয়ে পৃথিবীর আলোতে শিশুর বেড়ে ওঠার যে জীবন, তা মায়ের আঙুলে মাতৃত্বের বাজনায় মুখর থাকে, আমারও ছিলো। আমি মাবাবার পরিপূর্ণ আদর এবং যত্ন পেয়ে বেড়ে উঠেছি। আমার দেখা বা বোঝা জীবনের সবকিছুই শিল্পে মোড়ানো। তাই মায়ের সাথে আমার যে জীবন আমি পেয়েছি তা সহস্র গল্পের কাহিনী, অথবা হাজার ক্যানভাসের অবিরল প্রদর্শনী। 

আমাদের বাড়িতে নানারকম ফেরিওয়ালা আসতো, বেদিনীরাও আসতো দাঁতের পোকা বের করতে। আমার খুব ইচ্ছে করতো এদের বাড়িতে নিয়ে আসতে, কিন্তু আম্মা চাইতেন না, বিশেষ করে বেদিনীদের একদমই নয়! একবার শুধু একজনকে আম্মা ডাকতে বলেছিলেন, তার ছিলো এক দারুণ পেশা, ট্রাংকে রং করা। আম্মার বহু পুরনো একটি ট্রাঙ্ক ছিলো, তালা দেয়া থাকতো, যখন খুলতেন আমরা দেখতাম তাঁর রত্নভান্ডার। নানার দেয়া সোনার হাতের বালা, ঝুমকা, বিয়ের শাড়ি, আব্বার শেরওয়ানি এবং আম্মার সব প্রিয় ব্যক্তিগত সংগ্রহ।

ট্রাঙ্কটি উঠানে নিয়ে এসেছি, শিল্পী তার ঝুলি থেকে কয়েকটি ছোট রঙের কৌটা আর দুতিনটা তুলি বের করলেন। অতি যত্নে পুরো ট্রাঙ্কটি রঙ করলেন, তারপর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলেন রঙ শুকানোর জন্য, শেষে ট্রাংকের উপরে আঁকলেন একটি ময়ূর এবং কয়েকটি পাতা। এই দিনটি ছিলো আমার জীবনের প্রথম কোনো শিল্পীর আঁকা দেখার সৌভাগ্য! রঙ মিশিয়ে রঙ সৃষ্টির সেই দিনটি আমি এখনও মনে করে উচ্ছ্বসিত হই।

ছোটবেলায় রঙ করার যে কোনো দৃশ্য দেখলে তাকিয়ে থাকতাম, এমনকি বাজারে দোকানের ঝাঁপে রঙ করা কিংবা সাইনবোর্ড লেখার কাজও মনে হত মহা আনন্দের। রঙের ধারায় ডুব দেয়ার অনুভূতি তীব্র হচ্ছে আমার। তখন অষ্টম শ্রেণীতে, বিয়ে বাড়ি সাজানোর ডাক পড়ল প্রথম, রঙিন কাগজ কেটে কত রঙের সেই নকশা, শুধুগায়ে হলুদরঙ দিয়ে লিখতে গিয়ে মনে হয়েছিলো সদ্য জন্ম নেয়া অসংখ্য হাঁসের বাচ্চার জন্ম হচ্ছে আমার হাতে

আম্মার টিয়া রঙের একটা শাড়ি ছিলো, টিয়া পাখির রঙ কীভাবে শাড়িতে আসে, তা ছিলো আমার এক গভীর কৌতূহল! ঈদের দিনে ফিরনি সেমাইয়ের পাশে জর্দার রঙ দেখে খাওয়ার চেয়ে দেখতেই ভালো লাগতো। আমার রঙের সঙ্গে সম্পর্ক শুরু আম্মার কাছে, এমনকি তার বানানো পিঠার নকশা দেখে মনে হত ঘরের দেয়ালে এবং রাস্তার ইটের কেন এমন নকশা হয় না!

এই লেখায় মা এবং আম্মা এই দুটি সম্বোধন কেন? এর একটু ব্যাখ্যাও দিতে হচ্ছে, আমরা মাকে আম্মা ডাকতাম, আমার মেয়েরা মা ডাকে। এখন আমি যখনই ডাক দেই আম্মাকে মা বলে ডাকি। মা শব্দের ভিতরে বাঙালির মাতৃত্বের সব রঙ সত্য হয়ে ওঠে।

আম্মাকে কখনো সাজতে দেখিনি, পান খেয়ে ঠোঁট লাল করা জীবনের গৃহবধূ ছিলেন মা আমার! আম্মার কথা মনে হলে কবি শামসুর রাহমানের কবিতাকখনো আমার মাকেবিড়বিড় করে পড়ি। আসলেই তো আমি কখনো আমার মাকে গান গাইতে শুনিনি, আমার বুকের ভিতরে তিনি তাঁর সকল গান জমা রেখে গেছেন। মা আমার আঁকা কোনো ছবি দেখে কিছু ভাবতে পারেননি, তিনি জীবনের শেষ দিকে এসে চিন্তা শক্তির অবচেতনে চলে গিয়েছিলেন। তবু আমি আমার আঙুলে তাঁর জীবনের রঙ এবং আঁচড় বহন করি, আমার হৃদয়ে নিরন্তর বাজে আম্মার আঙুলের বাজনা। তাঁকে আগলে ধরেই আমার শ্বাসের ধারা, আম্মা বেঁচে আছেন।


8.পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী শব্দ মা || কায়সার কামাল

মা শব্দটি এক অক্ষরের। এই পৃথিবীর সব থেকে শক্তিশালী শব্দ। আমার জন্য প্রতিটি দিন মা দিবস। আম্মা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন দুবছর হয়ে গেল। কিন্তু আম্মা কি আসলে চলে গেছেন? সকালসন্ধ্যা প্রতিদিন আমাকে ঘিরে রেখেছে। আদর ভালোবাসা জড়ানো আঁচলে। সন্তান সবসময় মায়ের লালনে পালনে বেড়ে ওঠে। আর দশজনের মতো আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। তবে একমাত্র সন্তান হওয়ায় আমার পাওয়ার পরিমাণ অনেক অনেক বেশী। আমার আম্মাকে আমি দেখেছি শক্ত মানসিকতার এক নারী অসুখে ভুগে ভুগে শেষ সময়ে শিশু হয়ে যেতে। অসুখের সাথে যুদ্ধ করতে দেখা মায়ের পাশে অসহায় হয়ে বসে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না আমার। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হল আমার জন্ম দিনের দিন আম্মার সাথে আমার শেষ কথা হয়। সে রাতেই তিনি কোমায় চলে যান। শেষ দিকে তার পুত্রবধূ জেবুন তার আসল মেয়ে হয়ে ওঠে। আপন মায়ের মতো করে তার সেবা যত্ন করে গেছে আম্মার শেয দিনটি পর্যন্ত। শিল্প শিক্ষার হাতেখড়ি আম্মার হাত ধরেই। আম্মা আমাকে ছোটবেলায় কচিকাঁচার মেলা কিংবা চাঁদের হাটের ছবি আঁকা প্রতিযোগিতায় নিয়ে যেতেন। কখনও শিশু একাডেমি, কখনও চারুকলায়, অনেকটা জবরদস্তি করেই। নব্বই দশকে চারুকলায় পড়াশোনা করাকেছেলে বখাটে হয়ে গিয়েছেবলাটাই রেওয়াজ ছিল। চারপাশের তীব্র সমালোচনার মুখে আমার আম্মা আমাকে পুরোপুরি সাপোর্ট করে গেছেন। যাদের চারুকলার শিক্ষার সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা আছে তারা জানেন এটি একটি ব্যয়বহুল শিক্ষা। যখন আমার সহপাঠীরা কিছুটা আয়ের চেষ্টায় (আমাদের ভাষায় ক্ষ্যাপ মারা) এদিক সেদিক ছোটাছুটি করতো, আমি মনেপ্রাণে ছবি এঁকে যেতাম। অর্থ যোগান দিতেন আম্মা। প্রায়ই আম্মা আমার মডেল হতেন। যতদিন সুস্থ ছিলেন আমার প্রদর্শনীগুলোতে উৎসাহ নিয়ে যেতেন। শেয দিকে উৎসাহ নিয়ে প্রদর্শনীর গল্প শুনতেন। অভাগা আমি, এখন আমার গল্প শোনার মানুষটি আর নেই। তবে এখন আমার দুই মেয়ে আরিয়া এবং জারিয়া আমাকে দুই পাশে মায়ের মতো আগলে রাখে। জীবন চক্রে মা চলে যায়, থেকে যায় তাঁর অপার ভালোবাসা। ভালো থাকুক আজ কাল আর আগামীর সব মায়েরা।্

প্রথম ডাকে, প্রথম আশ্রয়ে, প্রথম ভালোবাসায়—‘মাশব্দটাই আমাদের পৃথিবীকে গড়ে তোলে। এই চিত্রকর্ম সেই অনুভূতিরই নীরব স্পন্দন। স্তরিত রঙ, দাগ, আর আলোঅন্ধকারের ভেতর দিয়ে ইমপাল্স অব দ্য মেমোরি মায়েদের অদেখা পরিশ্রম, কোমলতা আর শক্তিকে তুলে আনে।


9.মায়ার আঁচলে রঙের ছোঁয়া.. || কানিজ হুসনা আকবরী

মা এই ছোট্ট ডাকের ভেতর কতো বিশালতা! ছোটবেলায় আমি আমার মাকে নানা নামে ডাকতাম আম্মু ঠিক উত্তর দিতো।

এই যে আমিÑ তার পেছনে আমার বাবা মা পরিবার বন্ধু শিক্ষক অনেকের অবদান রয়েছে। কিন্তু শিল্পী হিসেবে আমার আম্মু সবসময় অনুপ্রেরণা দিয়েছিল, ছোটবেলা থেকে চারুকলা ভর্তি মাস্টার্স শেষ করা পর্যন্ত আম্মুর অবদান লিখে শেষ করার না। শুধু এমফিল শেষ করতে পারিনি আমেরিকায় চলে আসি সেই কষ্টটা এখনও আছে। 

একটা পেইন্টিং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমি আম্মুকে কাছে পাই। যেন পাশে বসে আছে, আম্মু জানতো না আমি সব সময় আমার তুলি পরিষ্কারের পর যে নরম কাপড় দিয়ে তুলির পানি মুছেছি সেই নরম কাপড় আজও আম্মুর শাড়ির আঁচল।

আমার আম্মু আমাদের সাত ভাইবোনকে বড় করেছে, সংসারের দায়িত্বের ভেতরেও নিজের শৈল্পিক মনটাকে ধরে রেখেছে চিরকাল। সূচিশিল্প, কবিতা, গজল লেখালেখি, ছোট থেকে দেখেছি কাগজ কলম হাতে পেয়েই কিছু না কিছু আঁকতো। তারমধ্যে গোলাপ ফুল থাকতোই।

ছবি আঁকার সেই অনুপ্রেরণা আমার আম্মুর কাছ থেকে পাওয়া। 

চারুকলায় পড়ে কি হবে? পরিবারের সবাইকে এক দিকে করে আম্মু সাহস যুগিয়ে ছিল আমাকে। যেন নিজের সুপ্ত প্রতিভা খুঁজে পেয়েছিলেন আমার ভেতর প্রকাশ করার জন্যে!

ছাত্র জীবনে রাত জেগে ছবি আঁকতাম। সব সময় আমার পাশে থাকতো আম্মু, সারাদিন চারুকলায় কি কি করতাম গল্প করতাম।

আমার ভেতরের সব ভালো কিছু আমার আম্মুর থেকে পাওয়া, খুব ছোটবেলায় ঘুম পাড়ানোর সময় আম্মু রাজকুমারীর গল্প বলতো। সেই গল্পগুলো কখনো কোনো ঠাকুরমার ঝুলি গল্প বইতে পাইনি। 

এখন মনে হয় সেইগুলো শুধু আম্মুর গল্প ছিল! তারপর গল্পের ভেতরেই নবীরাসুল (সাঃ) থেকে বুদ্ধ, রাধাকৃষ্ণ, মহামানবদের জীবনের গল্প বলে জীবনের মানে বোঝাতেন। মানব ধর্ম বড় ধর্ম, মানবিকতা এবং শুদ্ধ মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার জন্যে মানুষের বেশি কিছু লাগেনাÑ সেই বোধের বীজ বপন করেছিল আমার ভেতরে।

আম্মুকে সংসার জীবনের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। আমাদের পড়াশোনা, দেখাশোনা, চাকরি করতে দেয়নি তাকে। তারপরও ছোটবেলায় সাথে যেতাম মহিলা সমিতিতে, মেয়েদের সেলাই শেখাতো। বাড়িতেও পাড়ার মেয়েদের সেলাই শেখানোর ক্লাস নিতো, বড় ব্লাকবোর্ড ছিল চক দিয়ে আমি ছবি আঁকতাম এখনো মনে পড়ে। আম্মুর সেলাই খাতা আমার কাছে এখনো আছে, জ্যামিতির মতো লাগতো ছোটবেলায় কতো মেয়ের সুপ্ত প্রতিভা জাগিয়ে তুলেছিল আমার আম্মু।

আজ সেই দিনগুলো মনে হলে আমি অবাক হয়ে যাই। কতো ব্যস্ততায় জীবন কাটানো আম্মু এখন ফেসবুকে সবাইকে কাছে পায় আর মোবাইলে কথা বলে সময় কাটায়। ভুলে যায় ইনসুলিন নিতে। এখন বিরক্ত হয় শাসন করলে। ভুলে যায় আম্মুর শাসনে আর ভালোবাসায় আমাদের বড় হয়ে ওঠার দিনগুলো। শরীরের যন্ত্রণা সহ্য করে গলা ছেড়ে গজল গেয়ে চলে একটার পর একটা। মেডিটেশন করে চলে যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যথা থাকে। এখন বাড়ির বাইরে একা যেতে পারে না। হাঁটা চলা ধীরে। মোবাইলে আর ঘন্টার পর ঘণ্টা কথা হয় না। সারাদিনের ব্যস্ততার গল্প করিনা, কোনো সমস্যার কথা বলিনা। কারণ আম্মুর টেনশন হয় বাকি সময়টা অস্থির থাকে কি হলো কি হবে ভেবে।

প্রতিটা মা ভালো থাকুক এই পৃথিবীতে আগলে রাখুক সন্তানকে মায়ার আঁচলে।


Related Posts