মমতার ক্ষমতাচ্যুতি; বাংলাদেশের শাপে বর! || আনিস আহমেদ

পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতিতে একটা লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে বিজয়ী দলগুলো দীর্ঘদিন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার পর অকস্মাৎ ক্ষমতা থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়। বিশেষত বামপন্থি সরকার ১৯৭৭ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত, প্রায় ৩৪ বছর রাজ্যে ক্ষমতাসীন ছিল। তার পর ২০১১ সালে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নেতৃত্বধীন তৃণমূল কংগ্রেস দল ক্ষমতায় আসে এবং সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে, প্রায় ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর বিদায় নিতে বাধ্য হয়। তবে এই ক্ষমতাচ্যুতি কোনো বিপ্লব বা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ঘটেনি, নির্বাচনের মাধ্যমেই ঘটেছে। অবশ্য এবারে নির্বাচনের পর মমতা বন্দোপাধ্যায় যদিও কারচুপির অভিযোগ এনেছেন। সেটা তেমন একটা ধোপে টেকেনি। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপারে এমনকি নির্বাচনের সময়েও মমতার যে পরোক্ষ প্রভাব থাকতো এবারের নির্বাচনে মমতাকে সে প্রভাব রাখতে দেয়া হয়নি, সেখানে কেন্দ্র থেকে আসা আইন শৃঙ্খলা বাহিনী মূখ্য ভূমিকা পালন করেছে। অভিযোগ করা হয় যে প্রায় এক লক্ষ ভোটার ভোট দিতে পারেননি। তবে পাশাপাশি কথাও শোনা গেছে যে এরা ছিলেন ভুয়া ভোটদাতা। কাজেই মমতা বন্দোপাধ্যায় যে নির্বাচনের মাধ্যমেই ক্ষমতাচ্যুত হন সেটাই সত্য কথা। মমতা বন্দোপাধ্যায়ের এই পরাজয়ের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। যে মমতা ব্যক্তিগতভাবে সাদামাটা পোশাক পরে থাকেন এবং সেই ভাবে চলাফেরা করেন, সেই মমতা বন্দোপাধ্যায় যখন দুর্নীতি স্বজনপ্রীতিতে লিপ্ত হন তখন তাঁর সকল পোশাকি সারল্য বিলীন হয়ে যায়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পশ্চিমবঙ্গের কিছু উগ্রবাদী মুসলমানকে খুশি করার জন্য এবং শেখ হাসিনার বিরোধিতায় তৎপর এই মমতা জামায়েতে ইসলামির সূক্ষ্ম সমর্থক হয়ে ওঠেন। মুসলিম মৌলবাদি দলটির প্রতি মমতার সমর্থন এবং পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের ভোট ব্যাংক হাতিয়ে নেয়ার অভিপ্রায়ে তাঁর যে অপকৌশল তাতে সতর্ক হয়ে ওঠে হিন্দু মৌলবাদীরাও। বাংলাদেশে জামায়েতে ইসলামের আস্ফালন বিজেপিকে পশ্চিমবঙ্গে শক্ত অবস্থানে নিয়ে আসে। বিশেষত যখন বাংলাদেশে আগস্টের পর থেকে সেভেন সিস্টার এবং চিকেন নেক দখল নিয়ে নানান রকম হুমকি দিতে থাকে অর্বাচীন একদল লোক। তবে বাংলাদেশে যেমন কোনো ধর্মীয় মৌলবাদী দলের আস্ফালন সমর্থনযোগ্য নয়, তেমনি সমর্থনযোগ্য নয় ভারতেও হিন্দুত্ববাদীদের আস্ফালন; মানবিক নৈতিক কারণে কোনোটাই সমর্থনযোগ্য নয়। 

অবশ্য কথাও সত্যি যে সদ্য সাবেক মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় বাংলাদেশের স্বার্থের অনুকূলে প্রকল্পগুলির বিরোধিতা করে গেছেন অতীতে। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আদৌ পছন্দ করতেন না। মমতা বন্দোপাধ্যায় গত এক দশক ধরে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি সম্পাদনের বিরোধিতা করে আসছেন। ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় মমতার আপত্তির কারণেই চুক্তিটি হয়নি। যেহেতু তিস্তা নদীর সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের সংযোগ রয়েছে এবং নদীটি দুদেশেই পানির অন্যতম উৎস সেহেতু ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মূখ্য মন্ত্রীর প্রবল আপত্তির কারণে চুক্তি সম্পাদিত হয়নি। এবারে বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভারতের কেন্দ্রীয় শাসকদল বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের প্রচারাভিযানের সময়ে এমন ইঙ্গিত দিয়েছিল যে বিজেপি জিতলে তিস্তা চুক্তির একটা গতি হবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও বার বার বলেছেন যে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে এই চুক্তি সম্পাদন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এবার দেখার বিষয় যে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল যখন খোদ বিজেপি হতে চলেছে তখন বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ বিবেচনা করে ব্যাপারে ভারত কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। গঙ্গা চুক্তি সম্পাদনের ব্যাপারেও মমতা বন্দোপাধ্যায়ের প্রবল আপত্তি ছিল ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রথম বার সরকার গঠনের পর পরই, ১২ ডিসেম্বর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবেগৌড়ার সঙ্গে গঙ্গার পানিবন্টন বিষয়ক ৩০ বছর মেয়াদি এক চুক্তি স্বাক্ষর করেন। বাংলাদেশের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই দেশপ্রেম বিচক্ষণতাকে, তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় চতুরতা বলে উল্লেখ করেন। এখানে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ না করে পারছি না। ১৯৯৭ সালে আমি একটি আন্তর্জাতিক বেতারের পক্ষে কোলকাতায় মমতা বন্দোপাধ্যায়ের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সেই সময়ে তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘আপনাদের প্রধানমন্ত্রী (শেখ হাসিনা) অত্যন্ত চতুর। দুই বুড়োর কান লে তিনি গঙ্গার সব জল বাংলাদেশে নিয়ে গেলেন মমতা বন্দোপাধ্যায় উল্লিখিত এই দুই বুড়ো হচ্ছেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেবেগৌড়া এবং পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু। আসলে জ্যোতি বসু ১৯৭৭ সালে মূখ্যমন্ত্রী পদে আসীন হলে তিনিও গঙ্গা চুক্তির পক্ষেই কথা বলেন। নিয়েই মমতার রাগ। আর শেখ হাসিনার বিরোধিতা করতে গিয়ে তিনি জামায়েতের প্রতি তাঁর সমর্থনও জ্ঞাপন করেন। বাংলাদেশ থেকে সীমান্ত অতিক্রমকারীদের রেশনের কার্ড দিয়ে ভোটার বানাতেন ঠিকই কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টের পর আওয়ামী লীগের যে সব নেতা কর্মী পশ্চিমবঙ্গে চলে যেতে বাধ্য হন, তাদের প্রতি তিনি বিরাগভাজন ছিলেন। সে জন্যেই অনেকে বলছেন যে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এই পট পরিবর্তন বস্তুত বাংলাদেশের জন্য সুখবর বয়ে নিয়ে আসতে পারে কারণ জামায়েতে ইসলামি বিরোধী বিজেপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্ভবত মমতা থেকে ভিন্ন ভাবে দেখতে চায়। 

অবশ্য এর বিপরীতটাও ঘটতে পারে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই উত্থান, এবং পশ্চিমবঙ্গ এখন যখন হিন্দুত্ববাদী শ্লোগানে উত্তাল তখন বাংলাদেশের জামায়েতে ইসলামি দল এই যুক্তিতে আরও শক্তি অর্জন করতে পারে যে ভারতে, এমনকি এতদিন ধরে যে রাজ্যটিকে উদারপন্থি অসাম্প্রদায়িক রাজ্য বলে মনে করা হতো, সেখানে সাম্প্রদায়িক দলের এই উত্থান জামায়েতে ইসলাম দলের অস্তিত্বকে আরও শক্ত করে তুলতে পারে। বাংলাদেশে যারা সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাস করে, যারা এখনও হিন্দু মুসলিমকে ভিন্ন ভিন্ন জাতি হিসেবে আখ্যায়িত করার ভুল তত্ত্বে বিশ্বাস করে, তারা পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদের উত্থানকে যুক্তি হিসেবে প্রয়োগ করে বাংলাদেশে কথিত ইসলামি শাসন ব্যবস্থার পক্ষে আওয়াজ তুলতে পারে। তবে এখানে একটা কথা মনে রাখা প্রয়োজন বিজেপি (ভারতীয় জনতা পার্টি) এবং জামায়েতে ইসলামি দল ধর্মকে কেন্দ্র করে রাজনীতি করলেও, বাংলাদেশে জামায়েতে ইসলামি দল যেভাবে শারিয়া আইন প্রয়োগ করে দেশের খোল নলচে পাল্টে দিতে চায়, বিজেপি কিন্তু তাদের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা বিষয়ে কোনো রকম পরিবর্তন আনেনি, তাদের দলের নামকরণেও হিন্দু মহাসভার মতো হিন্দু শব্দটি যুক্ত নয়। অবশ্য রাজনীতিতে না হলেও সমাজে তারা হিন্দুত্বের প্রভাব বিস্তার করতে চায়। 

তারপরও বিজেপির বিজয়কে শাপে বর বলার প্রধান কারণ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অস্তিত্বকে বজায় রাখা এবং জামায়েতে ইসলামি দলসহ বাংলাদেশে সকল সাম্প্রদায়িক দলের উত্থানকে রোধ করার প্রয়োজন রয়েছে। কাঁটা দিয়েই তো কাঁটা তুলতে হবে


Related Posts