কাগজের ক্যানভাসে পৃথিবীর গল্প—আট ব্যাংকনোটের ক্যানভাসে চিত্রশিল্পী আখতার আহমেদ রাশা, নিউজার্সি

একটি ব্যাংকনোটের সীমাবদ্ধ পরিসর যখন কোনো মহৎ শিল্পীর তুলির আঁচড় কিংবা তাঁর প্রতিকৃতি ধারণ করে, তখন তা আর কেবল কাগজের মুদ্রা থাকে না; হয়ে ওঠে বিশ্বশিল্পের এক একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাঁদের শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পীদের সম্মান জানাতে ব্যাংকনোটে তাঁদের প্রতিকৃতি অমর শিল্পকর্ম স্থান দিয়েছে। এই ক্ষুদ্র কাগজগুলো যেন একেকটিভ্রাম্যমান আর্ট গ্যালারি 

সর্বকালের সেরা বহুমুখী প্রতিভা হিসেবে পরিচিত লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। তিনি কেবল একজন চিত্রশিল্পীই নন, বরং একজন উদ্ভাবক, বিজ্ঞানী এবং ভাস্করও ছিলেন। তাঁর অমর সৃষ্টিমোনা লিসাএবংদ্য লাস্ট সাপারবিশ্বশিল্পের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। ইতালি ১৯৭০ সালের ৫০,০০০ লিরে (খরৎব) ব্যাংকনোটে এই মহামতি শিল্পীকে স্থান দিয়েছিল। নোটটির একপাশে দা ভিঞ্চির আত্মপ্রতিকৃতি এবং অন্যপাশে তাঁর বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক শৈল্পিক রেখাচিত্রের (ঝশবঃপযবং) সংমিশ্রণ দেখা যায়। রেনেসাঁ যুগের ত্রয়ী মহীরুহের অন্যতম একজন হলেন মাইকেলেঞ্জেলো। ভাস্কর, স্থপতি এবং চিত্রশিল্পী হিসেবে তাঁর খ্যাতি বিশ্বজোড়া। ভ্যাটিকানের সিস্টিন চ্যাপেলের ছাদের ফ্রেস্কো এবংডেভিডভাস্কর্য তাঁর অমর সৃষ্টি। ইতালি ১৯৬২ সালে তাঁদের ১০,০০০ লিরে (খরৎব) ব্যাংকনোটে এই মহান শিল্পীর প্রতিকৃতি যুক্ত করে তাঁকে সম্মানিত করে।

উচ্চ রেনেসাঁ যুগের অন্যতম প্রধান শিল্পী স্থপতি রাফায়েল সানজিও দ্য উরবিনো। তাঁর কাজের স্বচ্ছতা, সুসংবদ্ধ গঠন এবং মানুষের মহত্ত্ব ফুটিয়ে তোলার অসাধারণ দক্ষতা আজও শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করে। তিনি প্রাচীন গ্রেকোরোমান ভাস্কর্য প্রত্নতাত্ত্বিক বিদ্যার অনুরাগী ছিলেন, যা তাঁর আঁকা মানবশরীরের গড়নে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইতালির সর্বোচ্চ মানের ব্যাংকনোট ৫০০,০০০ লিরেতে এই মহান শিল্পীকে সম্মান জানানো হয়েছে। নীল বেগুনি রঙের এই নয়নাভিরাম নোটটির পেছনের অংশে রাফায়েলের কালজয়ী ফ্রেস্কোদ্য স্কুল অফ এথেন্স’ (ঞযব ঝপযড়ড়ষ ড়ভ অঃযবহং) চিত্রিত হয়েছে।

ইতালীয় বারোক (ইধৎড়য়ঁব) রীতির জাদুকর মাইকেলেঞ্জেলো মেরিসি দ্য কারাভাজিও পাশ্চাত্য শিল্পকলায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন। আলোর ঝলকানি এবং গভীর অন্ধকারের নাটকীয় বৈপরীত্য বাচিয়ারোস্কুরো’ (ঈযরধৎড়ংপঁৎড়) ব্যবহারের জন্য তিনি চিরস্মরণীয়। তাঁর জীবন ছিল ছন্নছাড়া ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ, যার প্রতিফলন দেখা যেত তাঁর আঁকা বাস্তবানুগ আবেগঘন ছবিগুলোতে। ১৯৯৪ সালের ইতালীয় ১০০,০০০ লিরে ব্যাংকনোটে এই মহান শিল্পীর প্রতিকৃতি স্থান পেয়েছে। নোটটিতে তাঁর প্রতিকৃতির পাশাপাশি তাঁর বিখ্যাত শিল্পকর্মদ্য ফরচুন টেলার’ (ঞযব ঋড়ৎঃঁহব ঞবষষবৎ) এবংবাস্কেট অফ ফ্রুট’ (ইধংশবঃ ড়ভ ঋৎঁরঃ)—এর উপাদানগুলোও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

আধুনিকতা বিমূর্ত শিল্পের পথিকৃৎ পল সেজান (ফ্রান্স) ইম্প্রেশনিস্ট ধারার এই শিল্পী তাঁর ল্যান্ডস্কেপ এবং স্টিললাইফ চিত্রের জন্য বিখ্যাত। তাঁকে ইম্প্রেশনিজম এবং কিউবিজম শৈলীর মধ্যকারসেতুমনে করা হয়। ফ্রান্সের ১০০ ফ্রাঁ নোটের একপাশে সেজানের প্রতিকৃতি এবং অন্যপাশে তাঁর বিখ্যাত পেইন্টিংদ্য কার্ড প্লেয়ার্সস্থান পেয়েছে। বেলজিয়ান সাররিয়ালিস্ট শিল্পী রেনে মাগ্রিৎ (জবহল্ক গধমৎরঃঃব) তাঁর বৈচিত্র্যময় এবং চিন্তাউদ্দীপক কাজের জন্য বিখ্যাত। তাঁরদ্য সান অফ ম্যানবাদ্য হিউম্যান কন্ডিশন’—এর মতো কাজগুলো ১৯৬০এর দশকে পপ আর্ট আন্দোলনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। বেলজিয়ামের ১৯৯৮ সালের ৫০০ ফ্রাঁ (ঋৎধহপং) ব্যাংকনোটে মাগ্রিৎ এবং তাঁর অনন্য শিল্পশৈলী তুলে ধরা হয়েছে। জেমস এনসর ছিলেন একজন প্রভাবশালী বেলজিয়ান পেইন্টার এবং প্রিন্টমেকার। তাঁকেএক্সপ্রেশনিজম’ (ঊীঢ়ৎবংংরড়হরংস) এবংসুররিয়ালিজম’ (ঝঁৎৎবধষরংস)—এর অন্যতম অনুপ্রেরণা হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময় ওস্টেন্ড (ঙংঃবহফ) শহরে কাটিয়েছেন এবং তাঁর শিল্পকর্মে মানুষের বিচিত্র মুখোশ বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গি ফুটে উঠত। বেলজিয়ামের ১৯৯৫ সালের ১০০ ফ্রাঁ (ঋৎধহপং) ব্যাংকনোটে এই বিখ্যাত শিল্পীর প্রতিকৃতি এবং তাঁর শিল্পরীতির বৈশিষ্ট্যগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

সোফি ত্যোবারআর্প (ঝড়ঢ়যরব ঞধবঁনবৎঅৎঢ়) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিমূর্ত (অনংঃৎধপঃ) শিল্পী, নকশাকার এবং নৃত্যশিল্পী। তিনিড্যাডা আন্দোলন’ (উধফধরংস)—এর একজন অন্যতম পুরোধা ছিলেন। জ্যামিতিক নকশা এবং রঙের নিখুঁত ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি আধুনিক শিল্পকলায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন। সুইজারল্যান্ডের ১৯৯৪ সালের ৫০ ফ্রাঙ্ক (ঋৎধহপং) নোটে তাঁর প্রতিকৃতি এবং পেছনে তাঁর বিখ্যাত শিল্পকর্মরিলিফ’ (জবষরবভ)—এর জ্যামিতিক নকশা স্থান পেয়েছে। নারী শিল্পীদের মধ্যে তিনি অন্যতম, যাঁর অবদান মুদ্রার মাধ্যমে বিশ্ব স্বীকৃতি পেয়েছে।

রিহার্ড ইয়াকোপিচ (জরযধৎফ ঔধশড়ঢ়রč) ছিলেন স্লোভেনিয়ার ইম্প্রেশনিজম ধারার কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব এবং লিউবলিয়ানার আধুনিক শিল্পকলা বিকাশের প্রধান কারিগর। তিনি কেবল প্রথাগত বাস্তববাদের গন্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে রঙের জাদুকরী ব্যবহারের মাধ্যমে প্রকৃতির আবেগকে ফুটিয়ে তুলতেন। তিনি স্লোভেনিয়ার প্রথম আর্ট গ্যালারিইয়াকোপিচ প্যাভিলিয়নপ্রতিষ্ঠা করেন, যা দেশটির শিল্পী সমাজের মিলনমেলায় পরিণত হয়। ১৯৯২ সালে স্লোভেনিয়া তাদের ১০০ তোলারজেভ (ঞড়ষধৎলবা) ব্যাংকনোটে এই মহান সাংস্কৃতিক রূপকারের প্রতিকৃতি স্থান দেয়। নোটটিতে পেছনে তাঁর আঁকাসূর্য’ (ঞযব ঝঁহ) এবং ইয়াকোপিচ প্যাভিলিয়নের পরিকল্পনা নকশা চিত্রিত করা হয়েছে।

মেক্সিকোর শিল্পকলার ইতিহাসে দিয়েগো রিভেরা ফ্রিদা কাহলো দুটি অবিচ্ছেদ্য নাম। ল্যাটিন আমেরিকার বিপ্লবী শিল্পধারায় তাঁদের অবদান অনন্য। একদিকে রিভেরা তাঁর বিশালকায়, রাজনৈতিক এবং সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শের ম্যুরাল (গঁৎধষ) পেইন্টিংয়ের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। অন্যদিকে, ফ্রিদা কাহলো তাঁর ব্যক্তিগত যন্ত্রণা, আবেগ এবং মেক্সিকান লোকজ সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছেন নিজস্ব এক ধারায়। ফ্রিদার শিল্পকর্মকে প্রায়ই সুররিয়ালিজম (ঝঁৎৎবধষরংস) বা পরাবাস্তববাদী ধারার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১৭ সালের মেক্সিকান ৫০০ পেসো (চবংড়ং) নোটের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এর একপাশে দিয়েগো রিভেরা এবং অন্যপাশে ফ্রিদা কাহলোর প্রতিকৃতি চিত্রিত করা হয়েছে, যা মেক্সিকোর জাতীয় ইতিহাসে তাঁদের গুরুত্বকেই ফুটিয়ে তোলে। হোয়ান ম্যানুয়েল ব্লানেস উরুগুয়ের জাতীয় শিল্পী। তিনি উরুগুয়ের ইতিহাস গাউচোজীবনচিত্র আঁকার জন্য বিখ্যাত। উরুগুয়ের ১০০ পেসো ব্যাংকনোটে তাঁর প্রতিকৃতি বিখ্যাত চিত্রকর্মআল্টার ডেল রিও ডি লা প্লাটাদেখা যায়। 

 জাপানি উকিও (টশরুড়) প্রিন্টমেকিংয়ের বিশ্বখ্যাত জাদুকর হোকুসাই। তাঁরদ্য গ্রেট ওয়েভ অফ কানাগাওয়াবিশ্বশিল্পের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় কাজ। জাপানের নতুন প্রবর্তিত ১০০০ ইয়েন (ণবহ) নোটের পেছনে হোকুসাইয়ের সেই বিখ্যাতগ্রেট ওয়েভ’—এর ছবি যুক্ত করা হয়েছে। এটি জাপানি সংস্কৃতির এক অনন্য প্রতিফলন। দেবোরা আরাঙ্গো পেরেজ (উল্কনড়ৎধ অৎধহমড় চল্কৎবু) ছিলেন কলম্বিয়ার একজন প্রথিতযশা শিল্পী, যিনি মূলতফিগারেটিভ এক্সপ্রেশনিজম’ (ঋরমঁৎধঃরাব ঊীঢ়ৎবংংরড়হরংঃ) শৈলীতে কাজ করতেন। ১৯৪০এর দশকে তিনি তাঁর তুলির মাধ্যমে সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি এবং বিতর্কিত বিষয়গুলোকে সাহসের সাথে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।জাস্টিস’ (ঔঁংঃরপব) এবংআমানসার’ (অসধহবপবৎ)—এর মতো কালজয়ী চিত্রকর্মের মাধ্যমে তিনি সমাজে নারীর অবস্থান এবং অধিকারকে জনসমক্ষে তুলে ধরেন। শিল্পের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসার প্রমাণ দেবোরা আরাঙ্গো হিসেবে ১৯৮৬ সালে তিনি তাঁর নিজের তৈরি ২৩৩টি শিল্পকর্ম মেডেলিন মিউজিয়াম অফ মডার্ন আর্টকে দান করে দেন। কলম্বিয়ার ,০০০ পেসো (চবংড়ং) ব্যাংকনোটে এই মহীয়সী শিল্পীর প্রতিকৃতি স্থান পেয়েছে। নোটটির পেছনের অংশে কলম্বিয়ার ক্যানো ক্রিস্টালেস (ঈধশ্ছড় ঈৎরংঃধষবং) নদীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে তাঁর শিল্পের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ দেখা যায়। 

 বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের মুদ্রাতেও মহান শিল্পীদের শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পকলার পথিকৃৎ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের বিখ্যাত দুটি চিত্রকর্ম আমাদের দুটি ভিন্ন মানের ব্যাংকনোটে দেখা যায়। তাঁর তুলিতে আঁকা বাংলার সাধারণ মানুষের জীবন সংগ্রামের ছবি মুদ্রার মাধ্যমে পৌঁছে গেছে সবার হাতে। ব্যাংকনোটের এই শিল্পকলা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সম্পদ কেবল অর্থে নয়, বরং সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত। এই শিল্পীগণ তাঁদের তুলির ছোঁয়ায় বিশ্বকে যেভাবে রাঙিয়েছেন, মুদ্রার মাধ্যমে দেশগুলো তাঁদের সেই অবদানকেই প্রতিনিয়ত কুর্নিশ জানাচ্ছে।


Related Posts