সম্মিলিত বিশ^বিদ্যালয় এলামনাই’র উদ্যোগে || নিউইয়র্কে হয়ে গেল বর্ণাঢ্য বর্ষবরণ

বাঙালী প্রতিবেদনঃঐক্যের সুতায় নকশী গাঁথুন, নতুন বছরে আনন্দে বাঁচুন’Ñ এই পংক্তি উচ্চারণ করে সম্মিলিত বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই বাংলা নতুন বছরকে বরণ করল বর্ণাঢ্য আয়োজনে। এই বর্ষবরণ শুরু হয় দুই সপ্তাহ আগে শিশু কিশোরদের জন্য আয়োজিত নানান প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে। মূল অনুষ্ঠান হলো গত রবিবার জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টার প্রাংগনে থিয়েটারে। বিকেল থেকে উন্মুক্ত প্রাংগনে ছিল বাঙালিদের প্রাণস্পন্দনে ভরা সমাবেশ, শোভাযাত্রা, এবং নৃত্যগীত। সেই সাথে ছিলটিয়ার ঠোঁটে নতুন বছরের ভবিষ্যদ্বাণী ছিল সাইডওয়াক থেকে জেপ্যাকের সিঁড়ি পর্যন্ত চটের ওপর আঁকা আলপনা। ছিল থিয়েটারের লবিতে বুটিকের কেনাবেচা এবং বেসমেন্টে খাওয়াদাওয়া।

সম্মিলিত এই বর্ষবরণ আয়োজিত হয় জাহঙ্গীরনগর এলামনাই এসোসিয়েশনের নেতৃত্বে। সে কারণে শুরুতেই উদ্বোধনী নাচ পরিবেশন করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা। শুরুতেই পূর্ণ হয়ে যাওয়া মিলনায়তনের মঞ্চে তরুণী হলুদ শাড়ি পরে বৈশাখী নৃত্য পরিবেশন করে স্বাগত জানান। নাচ শেষে জাহাঙ্গীরনগর, ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, প্রকৌশল (বুয়েট) শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতিবৃন্দ যথাক্রমে মেঘনা পাল, এম.এস. আলম, ফতেনূর আলম, সাবিনা শারমিন, রাজ্জাক চোকদার এবং মনোয়ারুল ইসলাম মঞ্চে গিয়ে সংক্ষেপে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন। এই পর্বটি পরিচালনা করেন এই বৈশাখী আয়োজনের আহবায়ক মেঘনা পাল সদস্য সচিব প্রশান্ত মল্লিক অয়ন। 

এর আগে আগেই হয়ে যাওয়া শিশু কিশোরদের মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতার ওপর নির্মিত একটি ভিডিওচিত্র মঞ্চের বিশাল পর্দায় প্রদর্শিত হয়।

পরের পর্বে ছিল প্রধান অতিথি কনসাল জেনারেল মো. মোজাম্মেল হককে ফুল দিয়ে বরণ। সময় মঞ্চে আসেন বিশেষ অতিথি কুইন্স সোশাল এডাল্ট ডে কেয়ার সেন্টারের সিইও ইঞ্জিনিয়ার মাহফুজুল হক, তার স্ত্রী তানিয়া হক, অলকাউন্টি হেলথ কেয়ার গ্রুপ নবান্ন রেস্টুরেন্টের চেয়ারপারসন শিফা ভুঁইয়াসহ মনির জামান, আখতার আহমেদ রাশা, মেঘনা পাল। অনুষ্ঠানে ইঞ্জিনিয়ার মাহফুজুল হক শিফা ভুঁইয়াকে ফুল দিয়ে বরণ করা হয়। তারা তাদের বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের সাবেক শিক্ষার্থীদের এই আয়োজনের ভূয়সী প্রশংসা করে বাংলাদেশের সংস্কৃতি এই ধরনের অনুষ্ঠান বারবার আয়োজনের ওপর জোর দেন। এই পর্বটি পরিচালনা করেন তামান্না শবনম পাপড়ি। কনসাল জেনারেল বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা আমাদের পথপ্রদর্শক। তাদের এই আয়োজনের জন্য ধন্যবাদ।

জাহাঙ্গীরনগর এলামনাই এসোসিয়েশন আয়োজিত এই সম্মিলিত বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে প্রতি বছর শিল্পসাহিত্যসংস্কৃতি সংবাদপত্র জগতের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সম্মাননা জানানো হয়। বছর এই সম্মাননা প্রদান করা হয় কবি শামস আল মমীনকে। এই পর্বে প্রথমে কবির ওপর একটি ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়। এরপর কবিসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশনের সভাপতিবৃন্দ মঞ্চে সমবেত হন। কবিকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান আখতার আহমেদ রাশা আর উত্তরীয় পরিয়ে দেন জামান মনির। শামস আল মমীনের কবিতার ওপর সংক্ষেপে আলোচনা করেন সাপ্তাহিক বাঙালী সম্পাদক কৌশিক আহমেদ। সম্মাননার উত্তরে কবি মমীন তাকে এই সম্মাননা দেয়ায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং একটি নাতিদীর্ঘ কবিতা পাঠ করে শোনান। সকলে মিলে কবিকে একটি ক্রেস্টও প্রদান করেন।

এরপর শুরু হয় ৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃথক পৃথক সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। শুরুতেই বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি বা বুয়েট এলামনাইএর উদ্যোগে প্রকৌশলী সাবিনা হাই উর্বির পরিচালনায় সংগীত পরিবেশন করেন প্রকৌশলী দীপ্তি বড়য়া মৌসুমী বড়য়া। নৃত্য পরিবেশন করে উদিতা তন্বী।

দ্বিতীয় পরিবেশনা নিয়ে আসে জাহাঙ্গীরনগর এলামনাই। এই পর্বে ছিল অনেকগুলি আয়োজন। যেমন শিশুদের যন্ত্র সংগীত পরিবেশন। বেহালা, বাঁশি, কিবোর্ড, অক্টোপ্যাডে তারা বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত বাজিয়ে আপ্লুত করে। পরের পর্বে ছিল নব্বইয়ের দশকে বিটিভির প্রচারিত কয়েকটি অত্যন্ত জনপ্রিয় বিজ্ঞাপন চিত্র অনুকরণে নতুন করে পরিবেশনা। তারপর ঢোল বাজিয়ে নেচেগেয়ে বর্ষবরণ। তৈমুর শাহরিয়ার অন্য শিল্পীরা পাঁচটি জনপ্রিয় লোকসংগীতের মুখ গেয়ে মুগ্ধ করেন। গানগুলি ছিল লোকে বলে বলেরে, যে জন প্রেমের ভাব জানে না, সাধের লাউ বানাইল, সোনা বন্দে তুই আমারে করলি রে দিওয়ানা এবং আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম। দুই কিশোরীর নৃত্যের পর ৩২ শিশুকিশোর বাংলাদেশের পতাকা হাতে মঞ্চে এসে বংলাদেশকে তুলে ধরে। পুরো থিয়েটার তখন করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে। এই পুরো অংশই হেসে গেয়ে, কথা বলে, অভিনয় করে উপস্থাপন করেন দূররে মাকনুন নবনী নোভা ফিরোজ।

এই উৎসবমুখর মনকাড়া পর্বের পরে মঞ্চে আমন্ত্রণ জানানো হয় এটর্নি এবং মূলধারার রাজনীতিক মঈন চৌধুরীকে। তিনি দুই সপ্তাহ পরে জ্যাকসন হাইটসে অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশ প্যারেডে যোগ দেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান সবাইকে। উল্লেখ্য তিনি এই প্যারেড কমিটির চেয়ারম্যান। এরপর বক্তব্য রাখেন পরেশ সাহা।

সাংস্কৃতিক আয়োজনে এরপর পৃথক পৃথক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশন (বৈশাখে বাঙালিয়ানা), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশন (বিয়ার বাদ্য আলা বাজে রে), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশন (গান আবৃত্তি) শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশন (গান)

পুরো অনুষ্ঠানের নির্দেশনা পরিচালনায় ছিলেন রনি ভৌমিক। বর্ষবরণ উপলক্ষে আখতার আহমেদ রাশা রুহুল আমিনের সম্পাদনায় একটি অত্যন্ত সুন্দর ব্যতিক্রমধমীর্ স্যুভেনির প্রকাশিত হয়েছে। এতে ছয়টি ছোট লেখা ছাড়াও নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের তিনটি কবিতা একটি গদ্য ছাপা হয়েছে। সেই সাথে ২০১৯ সালে জামান মনিরের প্রয়াত পুত্র মুহতাদী জামান রোহানের ওপর একটি ট্রিবিউট ছাপা হয়েছে।

সব মিলিয়ে নিউইয়র্কে যতগুলো বর্ষবরণের অনুষ্ঠান হয়েছে, এই আয়োজন ছিল সবচেয়ে আনন্দমুখর।

Related Posts