রাষ্ট্রের সেবক না কি রাজনৈতিক সওদাগর? || ড. জীবন বিশ্বাস, নিউইয়র্ক

ইতিহাসে এমন অনেক সময় আসে যখন মনে হয়, রাষ্ট্র বুঝি এক বিরাট যাত্রাদলÑযেখানে পাত্রপাত্রীরা কেবল সাজঘরে বসে রাজা কিংবা রানির মর্জির অপেক্ষা করে। সম্প্রতি আমেরিকার ক্ষমতার পিচ্ছিল অলিন্দে যে কান্ড ঘটে গেল, তাকে নিছক মন্ত্রিসভার রদবদল বা সাধারণ কোনো প্রশাসনিক ডামাডোল বলে এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। অ্যাটর্নি জেনারেল প্যাম বন্ডি এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোয়েমের এই যে বিদায়ঘণ্টা বাজল, তা আসলে এক গভীর সাংবিধানিক সংকটের প্রতিধ্বনি বলে মন হয়েছে। রয়টার্সের খবর বলছে, গত এপ্রিল প্যাম বন্ডিকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অপরাধ? তিনি নাকি জেফরি এপস্টিনসংক্রান্ত নথিপত্র ঠিক সেই ছাঁচে ঢেলে সাজাতে পারেননি, যা ক্ষমতার শীর্ষবিন্দু থেকে প্রত্যাশা করা হয়েছিল। আরও শোনা যাচ্ছে, প্রেসিডেন্টের সমালোচকদের বিরুদ্ধে যতটা খড়্গহস্ত হওয়া দরকার ছিল, বন্ডি নাকি সেখানে খানিকটা দ্বিধান্বিত ছিলেন। অন্যদিকে, মার্চ বিদায় নিতে হয়েছে ক্রিস্টি নোয়েমকে। সেখানে কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ২২০ মিলিয়ন ডলারের এক বিশাল বিজ্ঞাপনবিলাস এবং দপ্তরের প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা। এই দুই প্রভাবশালী কর্মকর্তার অপসারণ জনগণকে দায়িত্ববোধ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তাঁরা কি সত্যিই জনগণের জন্য নিবেদিতপ্রাণ সেবক ছিলেন, নাকি স্রেফ কোনো এক রাজনৈতিক সওদাগরের আজ্ঞাবহ পেয়াদা ছিলেন? এই নিগূঢ় ধোঁয়াশা আর সত্যের সন্ধান ঘিরেই আজকের উপসম্পাদকীয়।

ঘটনা দুটিকে গুরুত্ব দিতে হবে এই কারণে যে, যে দুটি চেয়ার থেকে এদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেগুলো কোনো রাজনৈতিক বকশিশ নয়। ওগুলো মানুষের বিশ্বাস আর নিরাপত্তার স্তম্ভ। আমেরিকার বিচার বিভাগ যখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তখন তার মূল মন্ত্র ছিল আইনের শাসন সমুন্নত রাখা এবং নাগরিক অধিকারের পাহারা দেওয়া। ১৭৮৯ সালে যখন অ্যাটর্নি জেনারেলের পদটি সৃষ্টি হয়, তখন ভাবা হয়েছিল তিনি হবেন সংবিধানের অতন্দ্র প্রহরী। প্রেসিডেন্টের প্রতি তাঁর আনুগত্য থাকার কথা কেবল আইনি সীমারেখার ভেতরে, কোনো আজ্ঞাবহ ব্যক্তিগত সহকারী বা রাজনৈতিকঅপারেটরহিসেবে নয়। অ্যাটর্নি জেনারেল যদি প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত ইচ্ছাপূরণের হাতিয়ার হয়ে ওঠেন, তখন বুঝতে হবে গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। বিচার বিভাগ কোনো প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি নয় যে তার এমডি যা বলবেন, তা আইন।

একই যুক্তির তরী বেয়ে যদি আমরা হোমল্যান্ড সিকিউরিটির দোরগোড়ায় পৌঁছাই, তবে সেখানেও হতাশার চিত্র। প্রায় লাখ ৬০ হাজার কর্মীর এক বিশাল দপ্তর এই ডিএইচএস (উঐঝ) এদের কাজ আকাশপথের নিরাপত্তা থেকে শুরু করে সীমান্ত সুরক্ষা আর সাইবার হামলার মোকাবিলা করা। এমন এক বিশাল সংবেদনশীল কর্মযজ্ঞকে যদি ব্যক্তিকেন্দ্রিক জেদ বা লোকদেখানো রাজনীতির মঞ্চ বানিয়ে ফেলা হয়, তবে তার চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কিছু হতে পারে না। জননিরাপত্তা রক্ষা করা যেখানে মূল লক্ষ্য, সেখানে কোনো সচিবের ব্যক্তিগত উচ্চাকাক্সক্ষা বা হোয়াইট হাউসের নির্বাচনী উত্তাপকে বড় করে দেখার মানে হলো আগ্নেয়গিরির মুখে বসে বাঁশি বাজানো।

প্রশ্নটা প্যাম বন্ডি বা ক্রিস্টি নোয়েমের ব্যক্তিগত মেধার নয়, প্রশ্নটা হলো সেই দাঁড়িপাল্লারÑযা দিয়ে তাঁদের ওজন করা হয়েছে। বন্ডি সম্পর্কে রয়টার্সের প্রতিবেদনটি পড়লে গা শিউরে ওঠে। একজন অ্যাটর্নি জেনারেলকে যদি এই অপরাধে দন্ড পেতে হয় যে তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে যথেষ্টআক্রমণাত্মকছিলেন না, তবে বুঝতে হবে প্রশাসন নিরপেক্ষ নেই। এটি পরিণত হয়েছে এক বিবাদী শিকারে। ২০২৫ সালের স্টেটস ইউনাইটেড এবং ইউগভএর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৬১ শতাংশ নাগরিক মনে করেন প্রেসিডেন্ট কোনোভাবেই বিচার বিভাগকে নিজের ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা মেটানোর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন না, মাত্র ২০ শতাংশ ধারণাকে সমর্থন করেছেন। কিন্তু ক্ষমতার দম্ভ যখন প্রবল হয়, তখন সাধারণের এই মৃদু কণ্ঠস্বর আর ক্ষমতাধরদের কানে পৌঁছায় না।

ক্রিস্টি নোয়েমের গল্পটি আবার ভিন্নধর্মী অসুস্থতার ইঙ্গিত দেয়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি দপ্তরের বিশাল অংকের অর্থ খরচ করেছেন বিজ্ঞাপন অভিযানে। যে বিজ্ঞাপনে তিনি নিজেই মডেল ছিলেন। এপি তথ্যমতে, তাঁর চাপিয়ে দেওয়া খরচসংক্রান্ত কড়াকড়ির কারণে অন্তত ১০০০টি ফিমা (ঋঊগঅ) চুক্তি বা দুর্যোগক্ষতিপূরণ ঝুলে গিয়েছিল। যখন মানুষ বন্যায় ঘর হারায় বা তুষারঝড়ে বিপন্ন হয়, তখন সরকারের কাজ হলো দ্রুত পাশে দাঁড়ানো, নিজের ছবিওয়ালা পোস্টার ছাপানো নয়। তাঁর উত্তরসূরি দায়িত্ব নেওয়ার পর যখন . বিলিয়ন ডলারের বিশাল তহবিল উদ্ধার করলেন, তখন বোঝা গেল অব্যবস্থাপনার জট কতটা গভীরে প্রথিত ছিল। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি পদের মর্যাদা প্রশাসনিক দক্ষতায়, প্রচারের চমকে নয়।

এই সংকট আজ আর কোনো দলীয় গন্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। এটি রক্ষণশীল বা উদারপন্থীউভয় পক্ষের জন্যই এক অশনিসংকেত। বিচার বিভাগে এক লাখের বেশি আর ডিএইচএস আড়াই লাখের বেশি কর্মী কাজ করেন। এরা কোনো নির্বাচনী জনসভার কর্মী নন। এরা এক একটি প্রতিষ্ঠানের স্তম্ভ। যখন এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানেরা স্রেফ আনুগত্যের পরীক্ষায় ফেল করে বিদায় নেন, তখন গোটা কাঠামোর ওপর মানুষের আস্থা চিড় খায়। বছরের শুরুতে যখন খোদ ইন্সপেক্টর জেনারেলের দপ্তর থেকে বলা হয় যে বিচার বিভাগের ওপর জনগণের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, তখন পরিস্থিতি কতটা সঙ্গিন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

প্রেসিডেন্ট তাঁর পছন্দের লোক নিয়োগ দেবেনএটাই রীতি। তাঁরা প্রশাসনের নীতি বাস্তবায়ন করবেন, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই নীতি বাস্তবায়ন আর প্রতিষ্ঠানের গায়ে রাজনৈতিক রঙ মাখানো এক কথা নয়। অ্যাটর্নি জেনারেল যখন প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত উকিলের ভূমিকা পালন করেন, তখন আইনের দেবী তাঁর চোখের পট্টি খুলে লজ্জায় মুখ ঢাকেন। জাতীয় নিরাপত্তাকে যখন ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি গড়ার হাতিয়ার করা হয়, তখন সীমান্তের চেয়ে বড় ফুটো তৈরি হয় মানুষের আস্থার ভেতরে।

গ্যালাপ জরিপ বলছে, আমেরিকার বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের বিশ্বাস এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে মাত্র ৩৫ শতা শে। এই যে বিশ্বাসের আকাল, তার দায়ভার বর্তমান প্রশাসনকেই নিতে হবে। সাধারণ মানুষ যখন ভাবতে শুরু করে যে মামলাগুলো বেছে বেছে করা হচ্ছে, কিংবা সরকারি চুক্তিগুলো আসলে কোনো একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থে করা, তখন রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিটাই নড়বড়ে হয়ে যায়। একটি দেশ হয়তো সাধারণ অদক্ষতা সামলে উঠতে পারে, কিন্তু বিশ্বাসের এই ক্ষয় সহজে সামাল দেয়া যায় না।

বন্ডি নোয়েমের এই অপসারণ কোনো ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং এক প্রাতিষ্ঠানিক বিড়ম্বনা। পদগুলো জনগণের, কোনো নির্দিষ্ট নেতার ক্ষোভ বা ব্র্যান্ডের নয়। ক্ষমতার দম্ভে যখন রাষ্ট্রের সেবকেরা রাজনৈতিক সওদাগরে পরিণত হন, তখন গণতন্ত্র তার প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলে। নির্বাহী ক্ষমতার আসল সৌন্দর্য হলো সরকার আর রাজনৈতিক দলের মধ্যকার সেই সূক্ষ¥ সীমারেখাটি রক্ষা করা। আমেরিকার সংবিধান প্রণেতারা কয়েকশ বছর আগে যে পথ দেখিয়েছিলেন, বর্তমান প্রেসিডেন্সি যেন সেই পথ থেকে বহু দূরে সরে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের কর্ণধারেরা যদি জনগণের সেবক না হয়ে স্রেফ আজ্ঞাবহ ভৃত্য হতে পছন্দ করেন, তবে ইতিহাস তাঁদের ক্ষমা করবে না। এই অপসারণগুলো আসলে এক গভীর অসুখের উপসর্গ মাত্র, নিরাময় নয়।


Related Posts