মেলানকলি || স্বপন বিশ্বাস নিউইয়র্ক

সুপর্ণা পায়ে আলতা পরতে পরতে বলল, কাল ভোরে তুমি কিন্তু আমার সঙ্গে যাবে। আমি গাড়ি নিয়ে যাব। শাড়ি পরে ট্রেনে উঠতে পারব না।

রাহুল কোনো উত্তর দিলো না। তার চোখে তখন বাড়ি ভর্তি আত্মীয় স্বজন। পেছনে ব্যান্ডপার্টির সানাই বাজছে। সুপর্ণা বিয়ের পরে প্রথম বাড়ি ঢুকছে। মামাসি কাকিমারা প্রদীপ সাজানো চালন সুপর্ণার কপালে ঠেকিয়ে, মাথায় ধানদুর্বা দিয়ে বরণ পর্ব শেষ করেছে। সুপর্ণা এবার পা রেখেছে দুধের থালায়। দুধের ওপরে ভাসছে ফুলের পাপড়ি। দুধের সঙ্গে পায়ের আলতা মিশে লাল হয়ে উঠলো সেই দুধ। তারপর একটা সাদা কাপড়ের ওপর সেই দুধেআলতা পায়ের ছাপ ফেলে ফেলে সুপর্ণা প্রথম রাহুলের ঘরে ঢুকল।

রাহুল বলল, দুধের সঙ্গে কি আগে থেকেই আলতা মেশানো ছিল নাকি তোমার পায়ের আলতা দু্ধের সঙ্গে মিশে এমন রং হয়েছে?

সুপর্ণা অবাক হয়ে রাহুলের দিকে চোখ তুলে বলল, এখানে দুধ পেলে কোথায়?

না, ওই যে থালায় দুধ ছিল। তুমি যাতে পা ডুবিয়ে ঘরে ঢুকলে।

সুপর্ণা কপট রাগ দেখিয়ে বলল, ওরে আমার কপাল! আমি আলতা পরছি আগামীকালের জন্য আর উনি পড়ে আছেন পঁয়ত্রিশ বছর আগে আমি কীভাবে আলতাপায়ে তার ঘরে ঢুকেছিলাম সেই ভাবনা নিয়ে।

আগামীকাল যেন কী? কোন বিয়ের অনুষ্ঠান?

না রে বাবা, কাল পহেলা বৈশাখ। ভোরে উঠে টাইমস স্কয়ার যাবো। সে কথাই তো তোমায় বলছিলাম। ভোরে ভোরে দুজন গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়বো।

গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়বোমানে কী? আমি গাড়ি ড্রাইভ করে যাব টাইমস স্কয়ার? ওখানে তো পার্কিং পাওয়া যাবে না। পার্কিং খুঁজতে খুঁজতে অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যাবে। আমরা একটা ট্যাক্সি নিয়ে চলে যেতে পারি।

ওসব নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। আমি গাড়ি ড্রাইভ করে নিয়ে যাবো। পার্কিং না পেলে তুমি গাড়িতে বসে থাকবে।

কেন! তোমার ছেলে তো এসেছে। তাকে বললেই তো নামিয়ে দিয়ে আসবে।

তা হলেই হয়েছে! আমি সারাদিন ধরে তার জন্য রান্না করলাম। আর সে মাস পর বাসায় ফিরে বলল, আমি রাস্তায় খেয়ে এসেছি। আর রাতে বন্ধুর বাসায় খাবে বলে বেরিয়ে গেল। সে রাতে কখন ফিরবে আর কখন ঘুম থেকে উঠবে তার কী কোনো ঠিক আছে!

রাহুল সে কথার কোন উত্তর দিল না। বলল, কাল পয়লা বৈশাখ মানে আজ চৈত্র সংক্রান্তি। দেখেছ, কেমন সব ভুলেই গিয়েছি।

থাক, তোমাকে আর চৈত্র সংক্রান্তির স্মৃতি স্মরণ করতে হবে না। ডাক্তার না তোমাকে এইসব পুরনো কথা মনে করতে নিষেধ করেছে?

সে তো নিষেধ করেছে গাড়ি চালানোর সময় পুরনো কথা মনে না করতে। এখন তো আর আমি গাড়ি চালাচ্ছি না। মানুষের জীবনে যদি গল্পই না থাকল তবে আর বেঁচে থেকে লাভ কী? আর কিছুদিন পরে হয়তো সবই ভুলে যাবো। তোমার নাম ভুলে যাবো। ছেলেকে দেখে চিনতে পারব না। যেমন আমার বাবা শেষ বয়সে আর আমাকে চিনতে পারত না। দেখো কী অদ্ভুত ব্যাপার, বাবা কিন্তু আমার নাম মনে করতে পারত। কেউ জিজ্ঞেস করলেই বলত, রাহুল তো আমার ছেলে। আমেরিকায় থাকে। অথচ আমি তার সামনে দাঁড়িয়ে, আর আমাকেই চিনতে পারছে না।

সুপর্ণা তাড়াতাড়ি করে প্রসঙ্গ পাল্টানোর চেষ্টা করল। বলল, চৈত্র সংক্রান্তির কথা কী যেন বলতে চাচ্ছিলে সেটা বলো। রাহুল সে কথার কোন উত্তর দিল না। কেমন উদাস হয়ে সুপর্ণার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। তার দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। এটাই তার অসুখ। পুরনো দিনের কথা বলতে গেলেই বর্তমানকে সে পুরোপুরি ভুলে যায়। সেবার নায়েগ্রা ফলসে যাওয়ার সময় সুজয় বলল, বাবা, গাড়িতে একটাও জলের বোতল নেই। সামনের স্টপেজ থেকে এক কেস জলের বোতল তুলে নেবো।

রাহুল গাড়ি চালাতে চালাতে সুজয়ের সঙ্গে গল্প করছিল, জানিস তো, আমার ঠাকুমাঠাকুরদা বোতলের জল তো দূরের কথা কোনোদিন টিউবওয়েলের জলও খায়নি।

কেন! তোমাদের বাড়িতে তখন টিউবওয়েল ছিল না?

ছিল। তবে সেটা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পরে। তার আগে ছিল ইন্দারা। যুদ্ধের পরে আমরা ভারত থেকে ফিরে এসে জানলাম, পাকবাহিনী এসে আমাদের গ্রামের কয়েকজন মানুষকে মেরে ইন্দারাতে ফেলে দিয়েছিল। তখন ইন্দারা ভরাট করে বাড়িতে টিউবওয়েল বসানো হলো কিন্তু আমার ঠাকুমাঠাকুরদা সে জল খাবে না। তাদের এক ছেলে, মানে আমার এক কাকা কিশোর বয়সে মারা যায়। তার নাম ছিল সমীরণ। সেই সমীরণ কাকা দূরে কোথায় বেড়াতে গিয়ে টিউবওয়েলের জল খেয়েছিল। মৃত্যুর সময় তার ইচ্ছা হলো সে টিউবওয়েলের জল খাবে। তখন আশেপাশের গ্রামে কোন টিউবওয়েল ছিল না। ফলে তাকে আর টিউবওয়েলের জল দেয়া সম্ভব হয়নি। সেই গল্প করতে করতে রাহুল গাড়ির ব্যালেন্স হারিয়ে পাশের আইল্যান্ডে ধাক্কা দিলো। একটা মারাত্মক দুর্ঘটনা হতে পারত তবে তারা সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিল। গাড়িটার বেশ ক্ষতি হয়েছিল। সবকিছু ঠিকঠাক হওয়ার পর রাহুল বলেছিল, গল্প করতে করতে ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমি গাড়ি চালাচ্ছি। সুজয় সেবার জোরাজুরি করে রাহুলকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। বলেছিল, বাবা তোমার এখন বয়স বাড়ছে। এসব বিষয়ে সিরিয়াস হওয়া উচিত। তাছাড়া তোমার তো ডিমেনশিয়ার একটা ফ্যামিলি হিস্ট্রি আছে।

ডাক্তার পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বলেছিল এটা একটা মানসিক অসুখ। তিনি যখন কোনো স্মৃতি স্মরণ করেন কিংবা কোনো গল্প বলেন তখন এমন ভাবে অতীতে ঢুকে পড়েন যে তার বর্তমান অবস্থাকে একেবারেই ভুলে যান। আশেপাশে যারা থাকবেন তাদের উচিত হবে তাকে সবসময় আনন্দের স্মৃতির মধ্যে রাখা। বারবার দুঃখের স্মৃতির মধ্যে তলিয়ে গেলে উনি অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়বেন।

সুপর্ণা পায়ে আলতা দেয়া থেকে উঠে এসে সোফায় বসা রাহুলের গায়ে ধাক্কা দিয়ে বলল, কী হলো তোমার? চৈত্র সংক্রান্তির কী যেন একটা গল্প বলতে চাচ্ছিলে সেটা বলো।

রাহুল সম্বিত ফিরে পেয়ে বলল, হ্যঁা, ওই গল্পটা হয়তো তোমাকে আগেও বলেছি।

তাতে অসুবিধা নেই তুমি আবার বলো। তোমার ছোটবেলার গল্প শুনতে আমার সবসময়ই ভাল লাগে।

এখনকার চৈত্র সংক্রান্তিতে আর আগের মতো জাঁকজমক নেই। একসময় আমাদের পূজা মন্ডপে চড়কগাছ ঘুরতো। তার আগে সাতদিন ধরে শিব ঠাকুরের পূজো হতো। শিবের পূজো মানে সব ভৌতিক ব্যাপারস্যাপার। নানান রকম সঙ সেজে দল বেঁধে একেকটা মন্দির থেকে চলে যেত আরেক মন্দিরে। তখন হয়তো গভীর রাত। সেখানে তারা শিঙে ফুঁকে, শাঁখ বাজিয়ে জানান দিত আমরা এসে গেছি। এবার ওই মন্দিরের পূজারী সন্ন্যাসীরা ঢাক বাজিয়ে ধুপধুনো দিয়ে আহ্বান জানাত আগত সন্ন্যাসীদের। তারপর ঢাকের বাজনার সঙ্গে মন্দির চত্বরে চলতো উদ্দাম নৃত্য। এইভাবে সারা রাত তারা এক মন্দির থেকে অন্য মন্দিরে নেচে বেড়াত। আর দিনের বেলায় বের হতো গানের দল। শিবের আসন মাথায় নিয়ে বাড়িতে বাড়িতে যেত আর শিবপার্বতীকে নিয়ে গান গাইত। কিছু গানের কথা তো আমার এখনো মনে আছে, একদিন কৈলাসেতে শিবের সনে বসিয়া পার্বতী কয়, দয়াময়

নাইওর যাইতে আমার মনে লয়।

সেসব গানে ছিল মজার মজার রঙ তামাশা। যেমন একটা গান ছিল,

শিব বলে, সুন্দরী, তুইতো বড় রূপসী। আমি একটু হইছি বুড়া তাতে তোর ক্ষতি কি?

সুপর্ণা বলল, বেশ মজার তো! এর ভেতরে তো কোন ধর্ম নেই। গ্রামের মানুষদের বানানো গান।

সবই তো মানুষের বানানো। কিছুটা বিপদে আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা, একটু মঙ্গল কামনা আর বেশিরভাগই আনন্দ বিনোদন। তবে বিনোদন কখনো কখনো মর্মান্তিক হয়ে ওঠে। চড়কগাছ ঘোরানো ছিল তেমন একটা কাজ। চিন্তা করতে পারো! ইলেকট্রিক খাম্বার মতো লম্বা একটা গাছের মাথায় আড়াআড়ি একটা বাঁশ বেঁধে তার এক পাশে একজনকে দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। ঝুলিয়ে দেওয়া হয় মানে লোহার বড় বড়শি পিঠের চামড়ার ভেতরে গেঁথে দেওয়া হয়। আর বাঁশের অন্য পাশে দড়ি বেঁধে ঘোরানো হয়। একসময় সেই চৈত্র সংক্রান্তির এই চড়ক উৎসবকে কেন্দ্র করে মেলা বসতো। আমাদের গ্রামের নাড়ুকাকা চড়ক ঘুরত। তার সারা পিঠ জুড়ে ছিল সেই বরশির দাগ। নাড়ুকাকা একবার ওই চড়ক থেকে পড়ে গেল। তারপর কয়েক বছর পঙ্গু জীবন কাটিয়ে মারা গেল। এখন চড়ক ঘোরার মানুষের অভাবে আর চড়ক ঘোরে না তবে মেলা বসে।

সুপর্ণা বলল, তাহলে তোমরা পয়লা বৈশাখে কী করতে?

পয়লা বৈশাখ সকালে উঠোন লেপা হতো। লাঙ্গল জোয়াল ধামা কুলো সব ধুয়ে উঠোনে রাখা হতো। উঠোন থেকে শুরু করে ঘর পর্যন্ত আল্পনা দেওয়া হতো। আল্পনা মানে লক্ষ্মীর পা আর ধানের শীষ আঁকা হতো। আর মন্দির চত্বরে হতো ধান বোনা, ধান কাটার মহড়া। অভিনয় করে জমি চাষ করা হতো, ধান বোনা হতো, কাটা হতো, মাড়াই করা হতো। তারপর সেই ধান কাঠায় ভরে ঘরে তোলা হতো। আমার ঠাকুরদা মারা যাওয়ার পরের বছর যখন ঘরে ধান তুলতে যাবে তখন একটা কাক ঘরের চালে এসে বসল। ঘরে ধান তোলা শেষ হলো। কাকটা কা কা করে ডাকতে ডাকতে উড়ে গেল। ঠাকুমা বলল, তোদের ঠাকুরদা কাক হয়ে ধান তোলা দেখতে এসেছিল। তাই নিয়ে আমরা ঠাকুমার সঙ্গে অনেক হাসি ঠাট্টা করেছিলাম। পরের বছর ঘরে ধান তুলতে যাবে এমন সময় ঠাকুমা এসে বলল তোমরা একটু অপেক্ষা কর, কাকটা আসবে। ঠাকুমা বাড়ির বয়োজ্যোষ্ঠ মানুষ। তার কথা কেউ বিশ্বাস করল বলে মনে হল না। তবে অমান্য করল না। সবাইকে অবাক করে দিয়ে একটা কাক ঠিকই আসলো এবং ধান তোলা শেষ হলে সেটা উড়ে গেল। সেই বছর আমাদের ঠাকুমা মারা গেল। পরের বছর ধান তোলার সময় কেউ কাকের কথা মনে করেনি। অপেক্ষাও করেনি। তবে অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটল। সেবার ঘরের চালে আর একটা কাক না একজোড়া কাক এসে বসলো।

সুপর্ণা বলল, তোমরা এসব বিশ্বাস করো?

বিশ্বাস তো একেক জনের কাছে একেক রকম। সেই যে রবি ঠাকুর লিখছেন, সেই সত্য যা রচিবে তুমি, ঘটে যা তা সব সত্য নহে।

পরদিন ভোরে উঠে সুপর্ণা লুচি বানালো। সেটা ঠিক পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে না। সুজয় লুচি খেতে পছন্দ করে তাই। সুজয় লুচির গদ্ধ পেয়ে ঘুম থেকে উঠে এসে বলল, হ্যাপি নিউইয়ার!

সুপর্ণা উত্তর দিলো, হ্যাপি নিউইয়ার, বাবা।

রাহুল বলল, হ্যাপি নিউইয়ার কী রে। বল, শুভ নববর্ষ।

সুজয় দুবার চেষ্টা করল, হ্যাপি শুভ নববর্ষ, হ্যাপি শুভ নববর্ষ।

সুপর্ণা হেসে বলল, হ্যাপি বলতে হবে না বাবা। তুই বরং তাড়াতাড়ি খেয়ে নে। তাতেই আমি অনেক হ্যাপি হবো। আমরা এখন টাইমস স্কয়ারে যাব পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠান দেখতে।

সুজয় বলল, তোমরা ইচ্ছা করলে আমার সঙ্গেও যেতে পারবে। আমিও টাইমস স্কয়ার যাব। আমাকে একটা পাঞ্জাবি দিতে পারবে?

সুপর্ণা শুনে তো অবাক। বলল, তোর সেই ছোট বেলা থেকে কত পাঞ্জাবি ঘরে পড়ে থেকে থেকে নষ্ট হল। একদিনও একটা পাঞ্জাবি পরাতে পারলাম না, আর আজ নিজের থেকে পাঞ্জাবি পরতে চাচ্ছিস, নববর্ষের অনুষ্ঠানে যেতে চাচ্ছিস, ঘটনা কী? কিছুই তো বুঝছি না।

ঘটনা কিছুই না মা। চৈতি এসেছে নিউইয়র্কে। আজকে শাড়ি পরে টাইমস স্কয়ার যাবে তাই আমাকে পাঞ্জাবি পরতে বলেছে।

চৈতিকে তো আমাদের এখানে আসতে বলতে পারতি। একসঙ্গে বেরিয়ে যেতাম।

সুজয় বলল, আমাকে আজ রাতে ওদের বাড়িতে ডিনার করতে বলেছে। চৈতি আমাদের বাড়িতে আসবে না। তোমারা নাকি বড্ড বেশি কিউরিয়াস, পার্সোনাল ম্যাটার নিয়ে কোশ্চেন কর।

সুপর্ণা বলল, আমি আবার কী পার্সোনাল ম্যাটার নিয়ে কোশ্চেন করলাম? গতবার যখন আমাদের বাড়িতে এলো, আমি শুধু বলেছিলাম, বয়স হয়ে যাচ্ছে এবার বিয়েটা করে ফেল। তাতেই মেয়ের রাগ হয়ে গেল!

রাহুল বলল, টিভিতে তোদের কিউরিয়াস জর্জ দেখাতে দেখাতে তোর মা কিউরিয়াস হয়ে গেছে। আমরা যখন প্রথম এদেশে আসি তখন এখানকার মানুষ বক্স টিভি ফেলে দিয়ে সবাই ফ্লাট টিভি কিনছিলো। আমি রাস্তা থেকে একটা বক্স টিভি কুড়িয়ে এনেছিলাম। সেই কুড়িয়ে আনা টিভিতে তো আর তেমন কোনো চ্যানেল দেখা যেত না। তুই আর চৈতি তো তখন অনেক ছোট। আমরা পাশাপাশি বাসায় থাকতাম। চৈতির মা কাজে বেরনোর সময় ওকে আমাদের বাসায় রেখে যেত। তোরা দুজন বসে পিবিএস কিডস চ্যানেলে কিউরিয়াস জর্জ সিরিজটা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতিস। সময় কত দ্রুত পার হয়ে যায়। বাড়ি কিনে লংআইল্যান্ডে উঠে আসার পর আমদের দুপরিবারের দূরত্ব বাড়ল। আমরা এসে উঠলাম নিউ হাইড পার্কে আর ওরা গেল ডিয়ার পার্কে। আর তোরা একসঙ্গে লেখাপড়া করে চাকরি করতে গিয়ে ছিটকে পড়লি আমেরিকার দুই প্রান্তে। একজন মিশিগান তো আরেকজন ক্যালিফোর্নিয়া।

সুপর্ণা তাড়া দিলো, তাড়াতাড়ি এসো তো লুচি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।

টেবিলে বসতে বসতে রাহুল বলল, লুচি যাতে ঠান্ডা না হয়ে যায় তার জন্যেই তো আজ এতো বছর বেঁচে আছি। তা না হলে তো কবেই মরে ভূত হয়ে যেতাম।

সুজয় অবাক হয়ে বলল, হোয়াট ডাজ ইট মিন?

রাহুল বলল, তখনও তোর জন্ম হয়নি। আমি আর তোর মা গিয়েছি ঢাকার রমনা পার্কে ছায়ানটের অনুষ্ঠান দেখতে। সেখানে আমার এক কোওয়ার্কার, ফেন্সি গান গাইবে। ওদিকে তোর মাসি আগে থেকেই বলে রেখেছে, পয়লা বৈশাখ তাদের বাসায় লুচি বানাবে। সকালে তাদের বাসায় খেতে হবে। রমনায় অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পর আমরা অপেক্ষা করছি ফেন্সির গানের জন্য। ফেন্সির গান শেষ হলেই আমরা তোর মাসির বাসায় যাবো লুচি খেতে। এর মাঝে তোর মাসি কয়েকবার ফোন দিয়ে ফেলেছে। আমার খুব রাগ হচ্ছে। এমন সময় তোর মেসো, মেজর সাহেব ফোন দিলেন, লুচি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, তাড়াতাড়ি চলে আসেন। মেজরের কমান্ডিং ভয়েস শুনে রাগ করে যখন রমনা থেকে বেরিয়ে এসে রিকশা ঠিক করছি তখন শুনলাম ফেন্সি গান গাচ্ছে,

কি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লীজননী আমরা মাইকে গান শুনতে শুনতে রিকশায় উঠলাম। গানটার শেষের দিকে একটা লাইন আছে, ‘কীর্তন শোনো রাতে মা এরপরে বাঁশিতে কীর্তনের সুর বাজে। আমাদের রিকশা তখন শাহবাগ মোড় পার হয়ে পিজির সামনে। বাঁশিতে কীর্তনের সুর বাজছে। হঠাৎ একটা গাড়ির চাকা বাস্ট হওয়ার মতো শব্দ হল। বাঁশির সুর থেমে গেল। আমরা তখন বেশ কিছুটা এগিয়ে এসেছি। এমন সময় তোর মাসি আবার টেলিফোন দিলো। বেশ বিরক্তি নিয়ে টেলিফোন ধরতেই জানলাম রমনায় ছায়ানটের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা হয়েছে এবং অনেক মানুষ মারা গেছে। পরে তোর মাসির বাড়িতে গিয়ে টিভিতে খবর দেখে তো অবাক হয়ে গেলাম। আমরা ঠিক যেখানটাতে দাঁড়িয়ে ছিলাম ঠিক সেখানেই বোমাটা ফেটেছে।লুচি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছেএই ডাক না শুনে যদি ফেন্সির গানটা শেষ করার জন্য অপেক্ষা করতাম তবে সেদিন আমাদের মৃত্যু নিশ্চিত ছিল।

গাড়িতে উঠে সুজয় বলল, আমি তোমাদের টাইমস স্কয়ারে নামিয়ে দেবো। অনুষ্ঠান শেষ হলে আমাকে কল দিও। আর বেশি ভিড়ের মধ্যে যাবে না। ধাক্কা ধাক্কিতে একবার পড়ে গেলে ডাক্তারের কাছে দৌড়াতে দৌড়াতে জীবন শেষ হয়ে যাবে।

সুপর্ণা বলল, টাইমস স্কয়ার তো খোলামেলা জায়গা। তাছাড়া এই সকালে খুব বেশি ভিড় হয় না।

সুজয় বলল, বাঙালিদের অনুষ্ঠানে লোক কম হলেও ধাক্কাধাক্কি হয়। কেউ তো কাউকে স্পেস দিতে চায় না। সবাই ধাক্কা দিয়ে আগে যেতে চায়।

রাহুল বলল, তবে বাঙালিদের ধাক্কাধাক্কির একটা মজার গল্প বলি শোন।

সুপর্ণা মৃদু আপত্তি তুলল। বলল, সবকিছু নিয়েই তোমাকে গল্প বলতে হবে কেন?

সুজয় বলল, গল্প বললে অসুবিধা কোথায়? বলো বাবা, তোমার মজার গল্পটা বলো। আমি শুনবো।

রাহুল বলল, গল্পটা শুধু মজারই না। রীতিমতো একটা রোমান্টিক গল্প। তুই ধাক্কাধাক্কির কথা বললি তাই মনে পড়ল। তখনও আমার বিয়ে হয়নি। এই ধর তোর মতো বয়স। তোরই মতো বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করে ঢাকায় চাকরি করি। তো এমনই এক নববর্ষের দিন ভোরে রমনার বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান দেখতে গিয়েছিলাম। পার্ক জুড়ে অনেক মানুষের ভিড়। অনুষ্ঠানের শেষের দিকে একে একে মানুষ বেরনো শুরু করেছে। তখন শাহবাগের দিকে আরও বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। ফলে সব মানুষ ওই এক গেট দিয়ে বেরনোর চেষ্টা করছিল। আমি গেটের দিকে এগোতেই জমজমাট ভিড়ের মধ্যে পড়ে গেলাম। ইচ্ছে করলেও তখন আর সেই ভিড় থেকে বেরনো সম্ভব না। তখন আমিও শক্ত সমর্থ যুবক। শরীরের শক্তি দিয়ে ভিড়ের মধ্যে এগিয়ে চলেছি গেটের দিকে। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম আমার বাম হাতের ডানা কেউ যেন শক্ত করে চেপে ধরেছে। তার নরম হাতের স্পর্শ পেয়ে আমি ভিড়ের মধ্যে একবার তার দিকে ঘাড় ঘোরানোর চেষ্টা করলাম। দেখলাম সুন্দরী এক যুবতী পরম নির্ভরতায় আমার হাত ধরে আছে। আমি তার হাত ছাড়িয়ে দিলাম না। বরং যতটা সম্ভব তাকে নিরাপদে গেটের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেলাম। গেট পার হয়ে ফুটপাথ ধরে শাহবাগের দিকে এগিয়ে চলেছি। রাস্তার বিপরীত পাশে তখন ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠীর অনুষ্ঠান চলছে। সেখানে ফকির আলমগীর গাইছেন, ‘ সখিনা, গেছস কিনা ভুইলা আমারে আর সেই সুন্দরী তখনও আমার হাত শক্ত করে ধরে আছে। আমি হতবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছি। এক সময় হঠাৎ সে আমার দিকে তাকাল আর বিদ্যুতের বিকর্ষণে মতো সে আমার হাত ছেড়ে ছিটকে গেল। আমি কিচ্ছুটি না বলে আরও কিছুটা সামনে এগিয়ে এসে ফিরে দেখলাম সে উদ্ভ্রান্তের মতো কাকে যেন খুঁজছে। অপেক্ষা না করে আমি রাস্তা পার হয়ে টিএসসির দিকে হাঁটা দিলাম।

সুপর্ণা রসিকতা করে বলল, গল্প পুরোটা সত্যি হলেও শেষের অংশটি মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। তোমার উচিত ছিল তার সঙ্গীটিকে খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা। আরও কিছুটা সময় সঙ্গ দেওয়া। তাতে হয়তো গল্পটা একটা সিনেমাটিক টার্ন নিতে পারতো। তোমার জীবনটাই হয়তো অন্যরকম হয়ে যেতো।

রাহুল খুব সিরিয়াস হয়ে বলল, কেউ সাহায্য প্রত্যাশা করলে তাকে সাহায্য করা উচিত কিন্তু কেউ যখন অন্য কাউকে খুঁজে ফিরছে তার পেছনে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না।

কথাটা সুপর্ণার কাছে খুব একটা ন্যায়সঙ্গত মনে না হলেও কখনও কখনও বেশ কার্যকরী মনে হলো। সে বেশ ক্ষোভের সাথে রাহুলকে বলল, তোমার এই জ্ঞানের কথাটা তোমার ছেলেকে বুঝিয়ে বলতে পারো না? যদি কোনো কাজেই না আসে তবে সে জ্ঞান মনের মধ্যে পুষে রেখে লাভ কী?

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে ভেবে সুজয় বলল আমাকে কোনো জ্ঞান দিতে হবে না মা। আমি সময় মতো ঠিক গন্তব্যে পৌঁছে যাবো।

সুপর্ণা আক্ষেপের সঙ্গে বলল, বুঝিনা বাপু, তোদের সময় কখন আর তোদের গন্তব্য কোথায়? শুধু মনে হয়, আমরা সবাই যেন কোথাও একটা বিভ্রমের পেছনে ছুটে চলেছি।

Related Posts