শেষ রাতের ফোন || রিমি রুম্মান, নিউইয়র্ক

অবশেষে তীব্র বিরক্তির সঙ্গে ঘুমঘোরে সাইডটেবিলের দিকে হাত বাড়ায় চৈতালি। তার বুক ধড়ফড় করছে। শেষ রাতের দিকে ঘুমটা যখন গাঢ় হয়ে এসেছে, ঠিক তখনই সেলফোনের রিং বেজে ওঠে। এতো ভোরে কে ফোন করলো, স্ক্রিনে নামটা পর্যন্ত দেখল না সে। হাতের ছোঁয়ায় রিং থামিয়ে দিলো। তারপর ঘুমন্ত চোখ আধো খুলে স্ক্রিনের দিকে তাকাল এক পলক। অচেনা নম্বর। অচেনা নম্বরের ফোন আজকাল রিসিভ করে না চৈতালি। ক্রেডিটকার্ড কোম্পানিগুলো নানান রকম লোভনীয় অফারের জন্যে মূলত কল করে থাকে। নয়ত বিলিং ডিপার্টমেন্ট। চৈতালি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে কেনাকাটা করে না। সুতরাং তার কোনো বিলও বাকি নেই। ফলে এমন ফোনকল তার জন্য জরুরি নয়। কিন্তু এসব কল তো শেষরাতে আসে না। তবে? কাঁচা ঘুমটা ভাঙাল কে

বিরক্তি আর উত্তেজনায় টং করে ওঠে মস্তিষ্কের মধ্যাংশ। চোখ কচলে বিছানা ছেড়ে নেমে আসে চৈতালি। লিভিং রুমের জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকায়। এপার্টমেন্ট বিল্ডিঙের ছয় তলার জানালা দিয়ে দূরে ম্যানহাটনের এম্পায়ারস্টেট বিল্ডিং দেখা যায়। তখনও ইস্ট রিভারের ওপারে হাইরাইজ বিল্ডিংগুলোর কোথাও কোথাও বাতি জ্বলছে। আচমকা শোবার ঘরের ভেতরের নিস্তব্ধতার বুক চিরে সেলফোনে বেজে ওঠে ফজরের আজান, ‘আসসালাতু খায়রুম মিনান নাওম..’ ঘুম থেকে নামাজ উত্তম,.. আল্লাহ মহান.. বাংলা তর্জমা বিড়বিড় করতে করতে আশংকায় তড়িৎ গতিতে বেজে ওঠা আজানের ধ্বনি হাতের ছোঁয়ায় থামিয়ে দেয় চৈতালি। স্বামী, সন্তানের ঘুম ভেঙে যাওয়ার আশংকা। ভারি পর্দাটানা অন্ধকার ঘরে বাপবেটি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। খুব সন্তর্পণে চৈতালি ফিরে আসে বসার ঘরে। জানালার বাইরে সড়কের দুপাশে ল্যাম্পপোস্টের বাতিগুলো জ্বলছে তখনও। নিচে, সড়কের দুপাশে স্তূপীকৃত শুভ্র তুষারে সোডিয়াম বাতির আলো প্রতিফলিত হয়ে চারপাশটা আরও আলোকিত করে তুলেছে। 

গত সপ্তাহেও হঠাৎ এমন মধ্যরাতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটেছিল চৈতালির তিন সদস্যের পরিবারের। চারটা বাজতে তখনও মিনিট কয়েক বাকি। আকস্মাৎ অদ্ভুত তীব্র এক অচেনা হাতুড়িপেটা আওয়াজ দরজায়। চৈতালির স্বামী আলতাফ ধড়ফড় করে উঠে চোখ কচলাতে কচলাতে দরজার পিপিং গ্লাসে চোখ রাখতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই বিরামহীন বিকট ধড়াম ধড়াম আওয়াজ আবারও। যেন মুহূর্তেই ভেঙে ফেলা হবে দরজা। দরজা খুলতেই ইমিগ্রেশন এন্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট এজেন্ট (আইস) এর সাত/আটজন বিশালদেহী মানুষ পাড়ভাঙা নদীর উত্তাল স্রোতের মতো হুড়মুড় করে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে বিনা অনুমতিতে। দুজন আবার কালো মস্তকাবরণ পরা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক বেডরুমের ছোট্ট এপার্টমেন্ট ঘরটি তন্নতন্ন করে কিছু খুঁজল তারা। সকলের হাতে টর্চ লাইট। বাথরুম, রান্নাঘর, ক্লোজেট, খাটের তলা, টেবিলের তলা, সর্বত্র খুঁজলো প্রকট আলো ফেলে। কিচ্ছু বাদ যায়নি। অতঃপর একজন মধ্য বয়সী ভদ্রলোকের ছবি দেখিয়ে জানতে চেয়েছিল, ‘ইজ ইয়োর নেইম মোহাম্মদ তৈমুর?’ আলতাফ ঘুম জড়ানো ফোলা ফোলা রক্তিম চোখে বিস্ময়ে স্তম্ভিতের মতো তাকিয়ে ছিল। ঘটনার আকস্মিকতায় সে বাকশক্তি প্রায় হারিয়ে ফেলেছিল। তার ঘোর যেন কাটছিল না। কী অপরাধ তার? ইউনিফর্ম পরিহিত ফেডারেল এজেন্টের একজন দীর্ঘাকার যুবক গমগমে কণ্ঠে ধমকে ওঠেনশো মি ইয়োর আইডি এন্ড পাসপোর্টবলে। আলতাফ মানিব্যাগ থেকে আইডি বের করে। সেইফটি লকার থেকে পরিবারের সবার পাসপোর্ট বের করে কাচুমাচু হয়ে কম্পমান হাতে সামনে বাড়িয়ে দিয়েছিল। লোকটি বিড়বিড় করে দুইবার উচ্চারণ করেছিলআলতাফ মোহাম্মদ..ছবির দিকে আলতাফের দিকে তাকিয়েছিল বার দুয়েক। ছবির মানুষ আলতাফ, দুজনেরই চাপদাড়ি। দুজনেরই আনুমানিক চল্লিশের কোঠায় বয়স। 

হোয়ার ইজ হি? ইজ হি ইয়োর ব্রাদার? ইজ দ্যাট ট্রু?’ প্রশ্ন করে কালো মস্তকাবরণ পরা লোকটি। ভয়ে জড়সড় আলতাফ কাঁপা কণ্ঠে আওড়ায়, ‘নো, আই ডোন্ট নো হিম।একজন স্বাস্থ্যবান শ্বেতাঙ্গ অফিসার চৈতালিকে জেরা করে। অন্যজন ছয় বছর বয়সী কন্যা চিত্রার দিকে ঝুঁকে ছবি দেখিয়ে জানতে চেয়েছিল, ‘ইজ দিস ইয়োর আঙ্কেল, রাইট? হোয়ার ইজ হি? ’ সদ্য ঘুম থেকে জেগে ওঠা, কান্না জুড়ে দেয়া চিত্রা ব্যাপক ভীতিজড়ানো কণ্ঠে বলে ওঠে, ‘নো নো হি ইজ নট মাই আঙ্কেল। আই ডোন্ট নো হু দিস ইজ।তাদের সকলের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে আড় চোখে তাকিয়ে চোখের ইশারায় পরস্পরকে কিছু একটা ইঙ্গিত দিলো। তারপর লন্ডভন্ড বাড়িটি পেছনে ফেলে একে একে বেরিয়ে গিয়েছিল দীর্ঘকায় রুঢ় কণ্ঠস্বরের মানুষগুলো। মানুষ তো নয়, যেন সাক্ষাৎ আজরাইল। ছোটবেলায় বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সিনেমায় দেখা পাকবাহিনীর বুটের শব্দের মতো আওয়াজ তুলে এলিভেটরে ঢুকে পড়ে একে একে। সেই শব্দ মিলিয়ে যাওয়া অবধি আলতাফ স্তম্ভিতের ন্যায় দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল। বিপদবিপর্যয়ের সময়গুলো যেন সহজে লুপ্ত হতে চায় না। সে এক ভয়ংকর অপ্রত্যাশিত রাত ছিল। 

আমেরিকায় বসবাসরত বৈধঅবৈধ অভিবাসীদের অনেকের মতো সেদিন আলতাফ পরিবারের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইমিগ্রেশন ক্র্যাকডাউন। একই ঠিকানায় বহু বছর পূর্বে বসবাস করা মোহাম্মদ তৈমুর আলীকে পুলিশ খুঁজছে। মাঝেআজিজ আহমেদনামের আরও একজন বাসিন্দা ছিল এই বাড়িতে। যাদের মেইল এখনো আসে মাঝেমধ্যে। আলতাফ মোহাম্মদ স্ত্রী গর্ভবতী হওয়ার পর থেকে এই এপার্টমেন্টটিতে এসে উঠেছে। সে বছর সাতেক হয়। তাদের একমাত্র কন্যা চিত্রার বয়স এখন ছয়। আলতাফের আর বুঝতে বাকি রইল না, নামের মিলের কারণে আইসের এই অভিযান তাদের ঘর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। যদিও বৈধভাবে বসবাসরত আলতাফ পরিবারের ভয়ের কোনো কারণ ছিল না, তবুও তার বুকের ভেতরের তীব্র কামানদাগার শব্দ অনেকটা সময় অবধি অব্যাহত ছিল। অতঃপর বাতি নিভিয়ে কন্যাকে নিয়ে পুনরায় বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছিল আলতাফ মোহাম্মদ। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আন্দাজ করে নিয়েছিল সময়। ভেবেছিল আরও ঘন্টা দুয়েক ঘুমানো যাবে কর্মস্থলের উদ্দেশে রওয়ানা দেয়ার আগ অব্দি। কিন্তু কিছুতেই ক্ষণিক আগে ঘটে যাওয়া সুনামির কথা মাথা থেকে তাড়াতে পারেনি। বাকি রাতটুকু চৈতালিও চোখের পাতা এক করতে পারেনি। শুধুই চোখের সামনে পুনর্জীবিত হয়ে উঠেছিল নগরের কিছু বিচ্ছিন্ন দৃশ্য। 

জ্যাকসন হাইটসের ডাইভারসিটি প্লাজার রোজকার কোলাহল থেমে গেছে। ফুটপাতে স্ট্রিটভেন্ডাররা নেই। এখানেওখানে জটলা নেই। বাংলাদেশীদের রাজনৈতিক আলোচনা, হৈহট্টগোল নেই। সার্বক্ষণিক জমজমাট থাকা জায়গাটিতে ছুটির দিনগুলোতেও কেবলই খাঁখাঁ শূন্যতা। এইট্টিসেকেন্ড স্ট্রিট, জাংশন বুলোভার্ডে হিস্প্যানিকদের কোলাহল থেমে গেছে। ফ্লাশিংএর মেইন স্ট্রিট, ম্যানহাটনের ক্যানাল স্ট্রিটে চায়নিজদের ভিড়ভাট্টা নেই। প্রাণহীন শহর। রাস্তার ধারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কর্পুরের মতো উবে গেছে যেন। দীর্ঘদিনের দৃশ্যমান মানুষগুলো অদৃশ্য হয়ে গেছে আকস্মাৎ। সব যেন আনন্দহীন, ম্যাড়ম্যাড়ে। নির্দয় এক নৈঃশব্দ চারিদিকে। 

সেদিন ফেডারেল সরকারের এজেন্টদের অভিযানের মুহূর্তটি এমন এক বিভ্রান্তিকর সময়ে ঘটেছিল যে, যখন প্রতি মুহূর্তে টেলিভিশনে যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা স্টেটের মিনিয়াপলিসে অভিবাসন বিভাগের এজেন্টের গুলিতে দুই ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনা এবং এর জের ধরে ব্যাপক বিক্ষোভের প্রচার হচ্ছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতিকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কে উত্তাল নিউইয়র্ক সিটি। রাস্তায় নেমেছে সাধারণ মানুষ মানবাধিকার কর্মী। 

সেই অন্ধকার সময়ের কথা প্রাণপণে ভুলে যেতে চায় চৈতালি। নগরের বুক জুড়ে যখন রাত্রি গভীর হয়, তখন যে কোনো আওয়াজ তার জন্য পীড়াদায়ক, যন্ত্রণা হয়ে শরীরের সমস্ত রন্ধ্র দিয়ে আগুনে দগ্ধ হওয়ার মতো জ্বালা করে। সশব্দে দীর্ঘশ্বাস নেয় সে। তার ভেতরে ভিন্ন অচেনা এক অনুভূতিবোধের উদয় হয়। 

চৈতালি জানালার ধারে দাঁড়িয়ে রইল তখনও, যেখান থেকে সিটিস্কেপ দেখা যায়। পূর্বাকাশের বিচ্ছিন্ন লালিমা পশ্চিমদিকের উঁচুউঁচু দালানের গায়ে ছড়িয়ে পড়েছে। শীতের হাওয়ায় পত্রপল্লবহীন বৃক্ষের দোলায়মান ডালপালা যেন সেই লালিমার সঙ্গে মিলেমিশে অ্যাপার্টমেন্টের ইটের দেয়ালের ওপর আঁকিবুঁকি ছায়া ফেলেছে। ঊষার আকাশে ভোরের স্নিগ্ধ আলো। অসময়ে বেজে ওঠা একটি কর্কশ ফোনরিঙ তার ঘুমের বারোটা বাজিয়েছে আজও। শেষ রাতের ফোন সাধারণত বিশেষ কোনো খবরের ইঙ্গিত দেয়।

ফোন বেজে ওঠে আবারও। সেই একই অচেনা নম্বর। দ্বিধাদ্বন্দ্বের দোলাচলে দোলার তোয়াক্কা না করে ছুটে যায় চৈতালি। ছোঁ মেরে তুলে নেয় ফোন। হ্যালো বলতেই অন্যপ্রান্ত থেকে করুণ মিনতির স্বর ভেসে আসে। 

হ্যালো, ভাবী, ভাইকে বলো আমাকে যেকোনো ভাবেই হোক যেন বের করে আনে। আমি আনোয়ারা।

আনু আপা! কোথা থেকে বের করতে হবে? ’ অস্ফুটে বলে ওঠে চৈতালি। 

ভাবী, গতকাল ভোরে ফেডারেল প্লাজায় আমার এপয়েন্টমেন্ট ছিল, গ্রীনকার্ড পিকআপ করার। আমি সকল কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়ে হাজির হয়েছিলাম। কিন্তু ওরা আমায় আটক করে নিউজার্সি ডিটেনশন সেন্টারে নিয়ে এসেছে। দ্রুত বের হতে না পারলে আমাকে দেশে পাঠিয়ে দেবে। একজন লয়ার ধরেন, প্লিজ.. প্লিজ..ভাবী। ‘ 

কাঁপা কণ্ঠে হড়হড় করে বলা করুণ আকুতি থেমে গেল। ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। 

চৈতালি অবর্ণনীয় এক বেদনায় আচ্ছন্ন হয়ে রইল কিছুক্ষণ। দুঃখ, ক্রোধ, হতাশার অনুভূতিতে বেদনার্ত এক দৃষ্টিতে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। অনেক আশা নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিল সেমেইক আমেরিকা গ্রেটশ্লোগানে প্রলুব্ধ হয়ে। এই তার প্রতিদান

পশ্চাতের জীবনের স্মৃতি জেঁকে ধরেছে, ঝাপসা চোখে দূরের ইমারতের দিকে তাকিয়ে থাকা চৈতালিকে। 

আমেরিকায় আগমনের শুরুর দিকে, অর্থাৎ প্রায় এক যুগ আগে ২০১৫ সালে আলতাফচৈতালি দম্পতি একটি প্রাইভেট হাউজে ভাড়া থাকত। সেখানেই একটি রুমে সাবলেট হিসেবে একাকী থাকতেন চল্লিশোর্ধ আনোয়ারা বেগম। তার গল্পটি মোটামুটি এরকম, ‘বাংলাদেশে নার্সিং চাকুরি, স্বামী একমাত্র পুত্র সন্তান নিয়ে বেশ ছিলেন তিনি। নিউইয়র্কে বেড়াতে এসেছিলেন টুরিস্ট ভিসায়। কিন্তু মনের গহীন কোণে স্বপ্ন ছিল আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের। বিশ্বের রাজধানী নামে খ্যাত নিউইয়র্কে জীবনযাত্রার ব্যয় অত্যাধিক হওয়ায় মাস দুয়েক বাদে স্বামী, সন্তানকে দেশে পাঠিয়ে একলাই রয়ে গেলেন। বৈধ কাগজপত্রের কূলকিনারা করতে পারলে পরে তাদের আবার এদেশে নিয়ে আসবেন, এমন পরিকল্পনা ছিল।

এক বৃষ্টিভেজা বুধবার বিকেলে চৈতালি বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল কোনো এক অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং এর লবির সামনে। সামান্য দূরত্বে দাঁড়িয়ে ছিল মাথার মধ্যখানে লম্বা সিঁথি করা, খোঁপা বাঁধা এক নারী। গায়ের বাদামি রঙ, দাঁড়ানোর ধরন আর পরিধানের সাথে ওড়না দেখে চৈতালি অনুমান করে নিয়েছিল বাংলাদেশী ভেবে। চোখাচোখি হতেই তার বিবর্ণ বেমানান হাসির প্রতিউত্তরে আগ বাড়িয়ে পরিচিত হয়েছিল চৈতালি। আলাপচারিতায় জানা গেল, তিনি এসেছিলেন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে। রুম ভাড়ার বিজ্ঞাপন। ব্যাটেবলে মেলেনি, তাই বিফল মনোরথে ফিরে যাচ্ছিলেন। চৈতালি যে বাসায় থাকত, সেখানে ছোট রুমটির জন্য একজন ভাড়াটিয়া খুঁজছিল। দুটো মোহনা এক হলো। সেই থেকে আনোয়ারা বেগম চৈতালির সখ্য। সেসময় একই রান্নাঘর, বাথরুম ব্যবহার করলেও তিনি কোনো শর্ত মানতেন না, যা বাড়ি ভাড়া দেয়ার সময় বলা হয়েছিল। রান্না শেষে ময়লা নিচে ফেলে দিয়ে আসতেন না। চুলা পরিষ্কার করতেন না কিংবা বাথরুম ব্যবহারের সময় এগজস্টফ্যান চালু করতেন না। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার অন্যান্য গুণাগুণ শর্ত নামানার বিষয়টিকে ম্রিয়মান করে দিয়েছিল। চৈতালি উপলব্ধি করেছিল, কিংবা তিনিই প্রমাণ করেছিলেন যে, তিনি সত্যিই চৈতালির শুভানুধ্যায়ী। 

এভাবেই শুরু হয়েছিল আনু আপার সাবলেট জীবন। তিনি বিছানায় উপুড় হয়ে সাপ্তাহিক বাংলা সংবাদপত্রগুলো পড়তেন। সেখানেই বিজ্ঞাপন দেখে কাজ নিয়েছিলেন ব্রুকলীনে, এক অবস্থাপন্ন ভারতীয় পরিবারে। ঘরের পরিচ্ছন্নতার কাজ আর ছোট একটি বাচ্চা দেখাশোনা করতেন। সপ্তাহ শেষে ভালোই বেতন পেতেন। নিজের খরচ বাদে বাকি অর্থ আইনজীবীকে দিতেন। বৈধ কাগজ পেতে মরিয়া আনু আপা মানুষকে বিশ্বাস করতেন অবলীলায়। বিশেষ করে বৈধ কাগজ পেতে নানাজন নানান পরামর্শ দিতেন। যাচাইবাছাই, বিচারবিবেচনা ছাড়াই তিনি তাদের বিশ্বাস করেছিলেন। কষ্টার্জিত অর্থের অধিকাংশই ব্যয় করতেন সোনার হরিণগ্রীনকার্ডপাওয়ার আশায় বাংলাদেশী আইনজীবীর পেছনে। চেষ্টার কমতি ছিল না কোনো। মানুষ যখন মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, কবিরাজ, ঝাড়ফুঁক, হোমিওপ্যাথি একই সঙ্গে সবকিছুই বিশ্বাস করতে শুরু করে। প্রাণপণে আঁকড়ে বাঁচার চেষ্টা করে। আনু আপার বিষয়টি ছিল অনেকটা তেমন। 

হেমন্তের এক পড়ন্ত বিকেলে রান্নাঘরে চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিয়েছিল চৈতালির দিকে। নিজে অন্য কাপটিতে চুমুক দিয়ে চোখেমুখে উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে বহু আকাঙ্খিত সুখবরটি জানিয়েছিলআমার সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড হাতে এসেছে আজ ডাকেএভাবেই। কথাটি বলার আগে আনু আপা চৈতালিকে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিলেন, কথা বাইরের কারো কাছে প্রকাশ করা যাবে না। চৈতালি খুশি হয়েছিল খুব। আনু আপার জন্যে তার বড় মায়া। সেই রাতে আনন্দে আত্মহারা আনু আপা ডিনারের নিমন্ত্রণ জানিয়েছিল চৈতালিকে। বেশ আয়োজন করে বিফ বিরিয়ানি রান্না করেছিল। আলতাফ কাজ থেকে ফিরলে তাকে বহু প্রতীক্ষিত কার্ডটি দেখিয়েছিল আনু আপা। কীভাবে, কোন ক্যাটাগরিতে কার্ডটি পেয়েছে, তীক্ষè দৃষ্টিতে তাকিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চাইল আলতাফ। সে কার্ডটি এপিঠওপিঠ দেখল। যেন আনন্দিত হওয়ার পরিবর্তে উৎকণ্ঠিত হলো। আনু আপা অপ্রতিভ হয়ে কথার মোড় ঘোরালেন। ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ঝুলিয়ে শুধু বলেছিলেন, ‘বিষয়টি সিক্রেট 

তিনি পাথরের আংটি পরতেন। নিয়মিত হস্তরেখা বিশারদের চেম্বারে যেতেন বাবাজি পরামর্শ মেনে চলতেন। আনু আপা যে সহসাই একটি সুসংবাদ পাবেন, এবং তার হাতে ভাগ্য রবিরেখা স্পষ্ট এটি তাকে সাক্ষাতে আগেই জানিয়েছিলেন জ্যোতিষী, এমন আলোচনা চলছিল ডিনারের টেবিলে। 

কিন্তু এই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। রাত বাড়লে আলতাফচৈতালি দম্পতি ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। অতর্কিতভাবে পাশের রুমে উচ্চস্বরে বাগবিতন্ডা শোনা যাচ্ছিল ফোনের স্পীকারে। আনু আপা আর পুরুষকণ্ঠ। রাত যত বাড়ে, কণ্ঠস্বর তত ছোট হয়ে আসে। ম্রিয়মান এক কান্নার সুর ভেসে আসে মধ্যরাত অব্দি। চৈতালি স্বভাবতই অত্যুৎসাহী হয়ে কিছু জানতে চায়নি। পরদিন ভোরে ঘুম ভাঙলে জানতে পারে আনু আপার জীবনে ঘটে যাওয়া শতাব্দীর এক নিষ্ঠুরতম ঘটনা। সুদূর বাংলাদেশে আনু আপার স্বামী নতুন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন অনেক কম বয়সী এক মেয়ের সঙ্গে। দেশে থাকতে প্রতিবেশি মেয়েটিকে আনু আপা নিজের মেয়ের মতো স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন। অথচ সে কিনা.. বেশ কিছুদিন আগেই আনু আপার পুত্র, বাবার সন্দেহজনক আচরণের বিষয়টি ফোনে মাকে অবহিত করেছিল। ছোট্ট কিশোর ছেলেটির কথা বিশ্বাস করেননি তিনি। স্বামীর প্রতি ছিল অগাধ বিশ্বাস ভালোবাসা। শেষ অবধি পুত্রের কথাই অবধারিতভাবে সত্য প্রমাণ হলো। আকস্মাৎ দেশে রেখে আসা নিজের স্বামী, সংসার দখল হয়ে গেল চর দখলের মতো। ঘটনায় খুব ভেঙে পড়েছিলেন আনু আপা। দিনভর মুখখানি মেঘাচ্ছন্ন থাকল। একবুক হতাশার স্বরে বলেছিলেন, ‘বুঝলে ভাবী, প্রতিটি পাওয়ার পেছনে একটি হারানোর গল্প থাকে।’ 

সব শোক এক সময় সয়ে আসে। আনু আপাও ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন। তবে দেশে ফিরতে তীব্র অনীহা জেঁকে বসেছিল। বড় বেদনার স্বরে, নিস্পৃহভাবে বলতেন, ‘কোথায় ফিরবো? কার কাছে ফিরবো? আমার যা কিছু ছিল, সবই তো আজ অন্যের

এভাবে কারো ঘরসংসার, স্বামীসন্তান অন্য কারও হয়ে যায়? চৈতালি নির্জন রান্নাঘরে সকালের নাশতা তৈরির সময়ে ভেবে ভেবে বিষণ্ণ হতো। বিস্মিত হতো। গরম ফ্রাইপ্যানের তেলে ডিম ছেড়ে দিয়ে মনে মনে আনু আপার স্বামীকে তীব্র ভর্ৎসনা করত। 

চৈতালির বুকের ভেতরটা ধ্বক্ করে ওঠে। জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে একাকি বিড়বিড় করে ওঠে, ‘আনু আপা ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন। এখানেই স্থায়ী হতে চেয়েছিলেন।’ 

যে আইনজীবীর মাধ্যমে সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড পেয়েছিলেন, তার মাধ্যমেই মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে গ্রীনকার্ড পেতে যাচ্ছেন, শুনেছিল চৈতালি। সেই লোকই গ্রীনকার্ড পিকআপের অ্যাপয়েসবচমেন্ট করে দিয়েছিলেন। 

এভাবেই ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহটি চৈতালিকে নিয়ে গেল সেই জগতে, যেখানে আনু আপার সঙ্গে অনেক আনন্দের স্মৃতি জড়িয়ে ছিল। 

নিউইয়র্কে সবে স্মরণকালের অন্যতম শক্তিশালী তুষারঝড় আঘাত হেনেছে তিনদিন আগে, পঁচিশে জানুয়ারি। স্নো পড়েছে বিরামহীন। স্নো স্ট্রমের জন্যে নিউইয়র্ক সিটিতে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। ফ্লাইট বাতিল হয়েছে অগণন। রাস্তাঘাট বিপদজ্জনক হয়ে পড়েছে। তবুও আনু আপা বড় ঝরঝরে আনন্দ মিশ্রিত কণ্ঠে চৈতালিকে আহবান জানিয়েছিলেন, ‘ভাবী, চলো না আমার সঙ্গে।

কোথায়?’ সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল চৈতালি।

জ্যোতিষীর চেম্বারে।’ 

কী কাজ সেখানে?’ 

আগামীকাল আমি সত্যিই গ্রীনকার্ড পেতে যাচ্ছি অবশেষে। নির্ধারিত দিনটি আমার জন্য কতটা সহায়ক, এইসব নিশ্চিত হতে।’ 

চৈতালি জীবনে কোনোদিন হস্তরেখা বিশারদকে হাত দেখায়নি। তারা কেমন করে মানুষের ভবিষ্যৎ বলে দেয় অবলীলায়, সে কৌতূহল ছিল বটে। ফলে সে সাগ্রহে গিয়েছিল আনু আপার সঙ্গে, শহর জুড়ে স্তূপীকৃত বরফের পাহাড় ডিঙিয়ে। 

অফিসের বাইরে বড় বড় হরফেওয়ার্ল্ড ফেমাস এস্ট্রোলজারসাইনবোর্ড। ভেতরে বেশ স্বাস্থ্যবান ভুঁড়িওয়ালা ছোটখাটো এক বয়োবৃদ্ধ মানুষ। আনু আপার হাত দেখলেন গভীর মনোযোগে। পর্যবেক্ষণ শেষে কপালে চিন্তার ভাঁজ। পর মুহূর্তেই ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা। বললেন, ‘সুখবর সন্নিকটে চৈতালি পূর্ণ মনোযোগে তাকিয়ে ছিল লোকটির দিকে। তিনি আরও যোগ করলেন, ‘ভাগ্য রেখা জানান দিচ্ছে, ভাগ্য আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে। রবি সূর্য রেখা স্পষ্ট। সাফল্য সমৃদ্ধি আসন্ন। অষ্টধাতুর আংটি পরুন। ভাগ্যটাকে বদলে ফেলুন।জ্যোতিষী ব্যাখ্যা করলেন, পাথরের অলৌকিক ক্ষমতার কথা। বোঝালেন, মনুষ্য জীবনে গ্রহনক্ষত্রের ভালোখারাপ প্রভাবের কথা। প্রবাল, পান্না, হীরা, নীলা, রুবি, পোখরাজ.. ইত্যাদি পাথরের ভালোমন্দ। প্রবাল কীভাবে মানুষকে বিপদাপদ থেকে রক্ষা করে। তিনি পাথরের মাহাত্ম্য ব্যাখ্যা করলেন। আনু আপা তার কাছ থেকে খুশি মনে চড়া দামেসবুজ জেডনামের রত্নপাথর ক্রয় করেন। সেদিন থেকেই তার হাতে শোভা পেতে থাকে সবুজ রঙের এক পাথর। এই পাথর নাকি সৌভাগ্য প্রাচুর্য ফেরাবে।

এসব তো কেবল দিন আগের কথা। অথচ এরই মধ্যে অন্ধকার একটু একটু করে সরে গিয়ে চারপাশ ফর্সা হয়ে উঠেছে। ইস্ট রিভারের ওপাশে উঁচু উঁচু দালানের গায়ে সকালের কোমল সূর্যকিরণ। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই আনু আপার আটক হওয়ার বিষয়টি চৈতালিকে মর্মাহত করল প্রবলভাবে। সে অস্থির হয়ে উঠল। আনোয়ারা আপা তার আত্মীয় নন, স্বজন নন, রক্ত সম্পর্কীয় কেউ নন। তবুও এই দূরদেশে একদা এক সঙ্গে এক বাসায় বসবাসের সুবাদে তার জন্যে একরকম আত্মিক টান তৈরি হয়েছে। যা নিজের বড়বোনের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এমন আত্মার আত্মীয়ের জন্যে তার প্রাণ কেঁদে ওঠে। কিছু একটা করতে হবে। সে অপেক্ষায় থাকে স্বামী ঘুম থেকে জেগে ওঠার। 

এলার্মের শব্দে ঘুম ভাঙে আলতাফের। চৈতালি জানালা ছেড়ে ছুটে যায় বিছানার পাশে। হড়বড় কণ্ঠে বিষয়টি জানায় স্বামীকে। আলতাফ অস্ফুটেওহ্ মাই গড, বলো কী!’ বলে চেঁচিয়ে ওঠে। এক মুহূর্ত দেরি না করে উঠে বসে। মৌন থাকে। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে কী যেন ভাবে। তারপর কর্মস্থলে ফোন করেসিককলকরে। কয়েক জায়গায় ফোন করে। তৈরি হয়ে পরিচিত ফার্মের উদ্দেশে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ে। নির্দ্বিধায় পাঁচ হাজার ডলার পেমেন্ট করে যত দ্রুত সম্ভব কাজ শুরু করার তাগিদ দেয়। আইনজীবী দ্রুততম সময়ে সব ঠিকঠাক ভাবে সম্পন্ন করার আশ্বাস দেয়। আনু আপাকে ছাড়িয়ে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টার প্রতিশ্রুতি দেয়। চৈতালি সব জেনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। যাক্ আনু আপার জন্যে অন্তত কিছু করা গেল। এবার অন্তত নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। 

ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত নিউইয়র্ক সিটিতে তীব্র শীত চলমান রইল। জমে থাকা তুষার গলার নাম নেই। বরং পাথরের মতো শক্ত হয়ে রইল। সকালের দিকে চৈতালির ঘুম ভাঙতেই ফোন বেজে ওঠে। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে বাংলাদেশের নম্বর। বুকের ভেতরে অজানা আশঙ্কা। এতো ভোরে ফোন বেজে ওঠা তাকে আতঙ্কিত করে তোলে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশের সময় ঠাহর করার চেষ্টা করে। সেখানে তখন সন্ধ্যা। ফোন রিসিভ করে হ্যালো বলতেই প্রান্তে আনু আপার ক্লান্তিকর কান্না জড়িত কণ্ঠস্বরভাবী, আমায় এক কাপড়ে দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে।ডুকরে ডুকরে কান্নার আওয়াজের সঙ্গে ভেসে আসে দূরের কোনো মসজিদ থেকে মাগরিবের আজানের সুমধুর সুর, ‘হায়্যা আলাস্সালাহ.. হায়্যা আলাল ফালাহ.. (নামাজের দিকে আসো, কল্যানের দিকে আসো) ভেসে আসে আনু আপার মিনতি, ‘ক্লোজেটে রেখে আসা আমার সোনার জুয়েলারিগুলো অন্তত পাঠানোর ব্যবস্থা করো, ভাবী।’ 

চৈতালির হাতপা অসাড় হয়ে আসে। কী কথা! এত দ্রুততম সময়ে! আইনজীবী কিছুই করতে পারল না! তবে যে এতগুলো ডলার নিলো

চৈতালি জানে, এই ভিনদেশের একলা যাপিত জীবনে সে আনু আপার কতটা ভরসার জায়গা ছিল। সে ছাড়া তার যে আর কেউ নেই। একজন কর্মজীবী নারীর সঙ্গে সাবলেট থাকতেন আনোয়ারা আপা। চৈতালি দেরি না করে তৈরি হয়ে নেয়। কন্যাকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে সেই বেসমেন্টে যায়, যেখানে আগেও দুএকবার গিয়েছিল। যেখান থেকে এক ভোরে আনু আপা বেরিয়েছিল গ্রীনকার্ড নিয়ে ফিরবে বলে। আনু আপার রুমমেট চৈতালির সেখানে যাওয়াটা সহজভাবে নেয়নি। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়নি। চৈতালির উপস্থিতির কারণ জানতে পেরে বরং দুই ভ্রম্নর মাঝে ভাঁজ ফেলে বিরক্তির স্বরে বলে ওঠে, ‘এখানে কোনো সোনার জুয়েলারির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।’ 

বড় বিষণ্ণ মনে বেরিয়ে আসে চৈতালি। বিচ্ছিন্নভাবে উদ্দেশ্যহীন হেঁটে চলে হিমাংকের নিচে তাপমাত্রার শহরে, ফুটপাত ধরে, যেখানে তুষার সরিয়ে হাঁটার সরু রাস্তা বানানো হয়েছে। তার যেন ঠান্ডা লাগছে না। বাড়ি ফিরতে মন চাইছে না। তার মন চাইছে এই দেশের অভিবাসন আইনের উপর একদলা থুথু নিক্ষেপ করতে, যেমনটি পথের ধারের শাদা বরফের ওপর হলদে দাগ হয়ে আছে কুকুরের পেচ্ছাব। এইদেশে কি কোনো প্রতিবাদ প্রতিরোধের আইন নেই? মানবিকতা নেই?

নিকটস্থ কফিশপে ঢুকে কোণের দিকের টেবিলে বসে চৈতালি। হ্যাসব্রাউনে কামড় বসিয়ে ধোঁয়াওঠা কফির কাপে চুমুক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে আনমনা। তার মন বড় বেশি বিক্ষিপ্ত। বড় বেশি অশান্ত। শৈশবকৈশোরের ফেলে আসা শহরের পাশ দিয়ে বহমান উত্তাল মেঘনার মতো। অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়। ফোনের স্ক্রিনে সময় দেখে সে। চিত্রার ছুটি হতে আরও কিছুটা সময় বাকি। 

চৈতালি যেন কোথাও স্থির হতে পারে না। মানসিক অস্থিরতা তাকে রেস্তোরাঁর বাইরে নিয়ে আসে। সে জ্যাকসন হাইটসের বাংলাদেশী গ্রোসারির পাশ দিয়ে উদ্দেশ্যহীন হাঁটতে থাকে। থমকে দাঁড়ায়। আলগোছে সেলফে রাখা বাংলা সংবাদপত্র তুলে নেয় হাতে। প্রথম পৃষ্ঠায় বড় বড় হরফে লেখা  জ্যোতিষবিদ সোলায়মান সিকদার আটক 

ততক্ষণে মসজিদ থেকে জুম্মার নামাজ শেষে মাথায় গোল টুপি পরা মুসল্লিরা বেরিয়ে আসে দলে দলে। সকলেই একটি করে পত্রিকা হাতে তুলে নেয়। কেউ পত্রিকা বগলদাবা করে হেঁটে চলল বাড়ির পথে। কেউবা দাঁড়িয়ে উল্টেপাল্টে দেখল। ইতিমধ্যে তারা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করল, অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের দায়ে জ্যোতিষবিদ সোলায়মান সিকদার আটকের খবরটি। ধীরে ধীরে গ্রোসারি স্টোরের সামনে প্রৌঢ়প্রবীণের ভিড় বাড়ে। শীতের দুপুরে ঝলমলে সূর্যকিরণে দাঁড়িয়ে পরস্পরকে পত্রিকার শিরোনামটি অবহিত করেন। একজন জ্যোতিষবিদ হয়েও কীভাবে নিজের ভাগ্য বিষয়ে নিজেই সচেতনতা অবলম্বনে গাফলতি করেছেন, হাস্যরসের অবতারণা করে তারা সেইসব আলোচনা চলমান রাখেন।

Related Posts