কাগজের ক্যানভাসে পৃথিবীর গল্প—চার ব্যাংকনোটে কালজয়ী লেখক আখতার আহমেদ রাশা নিউজার্সি
একটি দেশের ব্যাংকনোট বা কাগজের মুদ্রা কেবল অর্থনৈতিক লেনদেনের মাধ্যম নয়, এটি সেই জাতির শিল্প, সাহিত্য এবং ঐতিহ্যের এক চলমান চিত্রশালা। বিশ্বের অনেক দেশই তাদের জাতীয় সংস্কৃতিকে সম্মান জানাতে এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নিজেদের গৌরবময় ইতিহাস তুলে ধরতে মুদ্রায় কবি এবং সাহিত্যিকদের স্থান দিয়েছে। বিশেষ করে, যেসব লেখক তাদের লেখনীর মাধ্যমে সমাজের দর্পণ হিসেবে কাজ করেছেন এবং মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করেছেন, ব্যাংকনোটের ক্ষুদ্র পরিসরে তাদের প্রতিকৃতি অংকন করা এক অনন্য ও চিরস্থায়ী স্বীকৃতি। আমার সংগ্রহশালার অ্যালবামের পাতা উল্টালে দেখা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুদ্রায় অমর হয়ে আছেন বিশ্বখ্যাত সব সাহিত্যিক। আজ সেসব কালজয়ী কবি ও ঔপন্যাসিকদের জীবন এবং মুদ্রার পাতায় তাদের উপস্থিতির গল্পগুলো তুলে ধরব, যারা কলমের আঁচড়ে বিশ্বকে বদলে দিয়েছিলেন।
বিশ্বের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নাট্যকার ও কবি উইলিয়াম শেক্সপিয়রকে ১৯৭০ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ২০ পাউন্ডের নোটে সম্মান জানানো হয়েছিল। শত শত বছর পেরিয়ে গেলেও শেক্সপিয়র আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ তার সাহিত্যকর্ম প্রেম, ক্ষমতা, উচ্চাকাক্সক্ষা এবং নিয়তির মতো সর্বজনীন মানবিক বিষয়গুলোকে অন্বেষণ করেÑযা সময়ের গন্ডি পেরিয়ে মানবজীবন সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি দেয়। মানব প্রকৃতি এবং মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে তার এই গভীর উপলব্ধি তার সৃষ্ট চরিত্র এবং তাদের ভেতরের দ্বন্দ্বগুলোকে আধুনিক পাঠকের কাছে আজও অত্যন্ত জীবন্ত করে তোলে। এছাড়া, আধুনিক ভাষা, সাহিত্য এমনকি বর্তমান পপ সংস্কৃতিতেও তার প্রভাব অনস্বীকার্য; তার সৃষ্ট অসংখ্য শব্দ ও বাক্যাংশ আজও আমাদের দৈনন্দিন আলাপের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ব্যাংকনোটটির নকশায় শেক্সপিয়র—ভক্তদের কাছে পরিচিত অনেক খুঁটিনাটি বিষয় তুলে ধরা হয়েছিল। যেমন, ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে থাকা উইলিয়াম কেন্টের ভাস্কর্যের ওপর ভিত্তি করে তার প্রতিকৃতিটি তৈরি করা হয় এবং নোটের একপাশে ‘রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট’—এর বিখ্যাত ব্যালকনি দৃশ্যের চমৎকার চিত্রায়ন করা হয়।
অ্যাংলো—আইরিশ প্রাবন্ধিক এবং স্যাটায়ার লেখক জোনাথন সুইফট ১৭২৬ সালে প্রকাশিত তার কালজয়ী স্যাটায়ার উপন্যাস ‘গালিভারস ট্রাভেলস’—এর জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। ১৯৭৯ সালে আয়ারল্যান্ডের ১০ পাউন্ডের নোটে তার প্রতিকৃতি স্থান পায়। এই উপন্যাসটি তার ক্ষুরধার সমাজ সমালোচনার প্রতি এক বিনম্র শ্রদ্ধা।
ফরাসি রোমান্টিসিজমের অন্যতম পুরোধা এবং ‘লা মিজারেবল’—এর অমর স্রষ্টা ভিক্টর হুগোকে ১৯৬৫ সালের ফরাসি ব্যাংকনোটে দেখা যায়। তিনি কেবল একজন লেখকই ছিলেন না, বরং মানবাধিকার রক্ষায় এক সোচ্চার কণ্ঠস্বর ছিলেন।
বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী লেখক জেমস জয়েস তাঁর ‘ইউলিসিস’ উপন্যাসের জন্য বিশ্বখ্যাত। ১৯৯৯ সালের আয়ারল্যান্ডের ১০ পাউন্ডের নোটে তাঁর প্রতিকৃতি স্থান পেয়েছিল, যা জেমস জয়েসের জটিল, মনস্তাত্ত্বিক ও প্রতীকী লিখনশৈলীর প্রতি জাতির কৃতজ্ঞতার প্রকাশ।
স্কটল্যান্ডের জাতীয় কবি রবার্ট বার্নসকে ১৯৯৬ সালে তার ২০০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ৫ পাউন্ডের নোটে স্থান দেওয়া হয়। নোটের উল্টো পিঠে তার বিখ্যাত কবিতা দঞড় ধ গড়ঁংব’ এবং দগু ষাঁ রং ষরশব ধ ৎবফ, ৎবফ ৎড়ংব’—এর চিত্রায়ন করা হয়েছে। অন্যদিকে, ঐতিহাসিক ঔপন্যাসিক ওয়াল্টার স্কটকে বিভিন্ন স্কটিশ নোটে আজীবন সম্মান জানানো হয়েছে, বিশেষ করে ১৮২০—এর দশকে স্কটিশ ব্যাংকনোট ব্যবস্থা রক্ষায় তার সাহসী ভূমিকার জন্য।
রূপকথার জাদুকর হান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসন তার ‘দ্য লিটল মারমেইড’ এবং ‘দ্য আগলি ডাকলিং’—এর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। ডেনমার্কের ১০ ক্রোনের নোটে এই স্বপ্নস্রষ্টাকে স্থান দেওয়া হয়েছে। ‘ম্যাজিক রিয়েলিজম’ বা জাদু বাস্তবতার জনক, নোবেলজয়ী সাহিত্যিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজকে কলাম্বিয়ার ৫০,০০০ পেসোর নোটে সম্মান জানানো হয়েছে। নোটটিতে তাঁর প্রতিকৃতির পাশাপাশি রূপক হিসেবে প্রজাপতির ঝাঁক তুলে ধরা হয়েছে, যা তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অব সলিচ্যুড’—এর কথা মনে করিয়ে দেয়। আধুনিক জাপানি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক নাতসুমে সোসেকিকে ১৯৮৪ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত জাপানের ১,০০০ ইয়েন নোটে দেখা যেত। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে ৫,০০০ ইয়েন নোটে স্থান পান মেইজি যুগের অন্যতম প্রখ্যাত নারী সাহিত্যিক ইচিও হিগাচি।
প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের ভিত্তি স্থাপনকারী মহাকাব্য ‘ইলিয়াড’ ও ‘ওডিসি’—র রচয়িতা হিসেবে হোমারের নাম চিরস্মরণীয়। যদিও তিনি একক কোনো ব্যক্তি ছিলেন কি না, তা নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীর দিকে প্রাচীন আয়োনিয়ায় বসবাসকারী এই প্রবাদপ্রতিম অন্ধ চারণকবির মুখে মুখে প্রচলিত মহাকাব্যগুলোই পরবর্তীতে লিপিবদ্ধ হয়। পশ্চিমা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও চিন্তাধারায় হোমারের সৃষ্টির প্রভাব অপরিসীম। এই কিংবদন্তি কবিকে সম্মান জানিয়ে ইউরো চালুর আগে গ্রিসের ৫০ ড্রাকমা নোটে তাঁর প্রতিকৃতি স্থান পেয়েছিল।
চেক জাতীয় জাগরণ আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী এবং বিখ্যাত ঔপন্যাসিক নেমকোভাকে চেক প্রজাতন্ত্রের ৫০০ কোরোনা ব্যাংকনোটে সম্মান জানানো হয়েছে। তিনি নারীদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়েও একজন পথিকৃৎ ছিলেন। ১৯৫৬ সালে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী স্পেনের কবি হুয়ান র্যামন হিমেনেজ তার ‘চষধঃবৎড় ধহফ ও’ বইটির জন্য চিরস্মরণীয়। স্পেনের ২০০০ পেসেটা নোটে তাঁর প্রতিকৃতি তাঁর ‘বিশুদ্ধ’ লিখনশৈলীর স্বীকৃতিস্বরূপ স্থান পেয়েছে। আধুনিক হিব্রু কবিতার অন্যতম পথপ্রদর্শক রাচেল ব্লুস্টেইন ইসরায়েলের ২০ শেকেল নোটে এবং বিখ্যাত কবি শাউল চেরনিখোভস্কিকে ৫০ শেকেল নোটে স্থান দেওয়া হয়েছে, যার দেশপ্রেমমূলক কবিতা নোটের ডিজাইনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তোগোলক মোলদো ছিলেন একাধারে একজন কিংবদন্তি কিরগিজ কবি, গীতিকার এবং সুদক্ষ গল্পকার। কিরগিজ লোকগাথা এবং মহাকাব্য ‘মানাস’—এর ধারক এই মহান কবিকে কিরগিজস্তানের ২০ সোম (ঝড়স) নোটে দেখা যায়। কিরগিজস্তানের মুখে মুখে প্রচলিত মৌখিক লোকজ ঐতিহ্যকে লিপিবদ্ধ করে চিরস্থায়ী রূপ দেওয়ার জন্য তাকে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। তাঁর রচিত চমৎকার ও হৃদয়স্পর্শী কবিতাগুলোতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও সংগ্রামের নিখুঁত চিত্র ফুটে উঠেছে।
ইউক্রেনের অন্যতম প্রধান কবি, নাট্যকার এবং সাহসী নারী বুদ্ধিজীবী লেসিয়া ইউক্রেনকাকে ২০০ রিভনিয়া নোটে সম্মান জানানো হয়েছে। তিনি আধুনিক ইউক্রেনীয় আত্মপরিচয়ের অন্যতম কণ্ঠস্বর। তাঁর লেখনী মানুষের মর্যাদা এবং স্বাধীনতার কথা বলে যা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটেও অত্যন্ত জরুরি।
সার্বীয় ভাষার সংস্কারক এবং মহান এক পন্ডিত ভুক স্তেফানোভিচ কারাদজিচ। ২০১৩ সালের সার্বিয়ার ১০ দীনারা মুদ্রায় স্থান দিয়ে জাতি তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছে।
অধ্যাপক, লেখক এবং অকুতোভয় বিপ্লবী নেতা কার্লোস ফনসেকা আমাদোর ছিলেন নিকারাগুয়ার স্বৈরাচারী সোমোজা শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক অবিসংবাদিত নাম। ‘সন্দিনিস্তা’ বিপ্লবের এই প্রধান রূপকার ১৯৭৬ সালের ৮ নভেম্বর সোমোজার ন্যাশনাল গার্ডের সাথে এক সশস্ত্র সংঘর্ষে নির্মমভাবে নিহত হন। যদিও তিনি বিপ্লবের চূড়ান্ত বিজয় দেখে যেতে পারেননি, তাঁর এই আত্মত্যাগ তাঁকে জাতির কাছে চিরস্থায়ী শহীদের মর্যাদা এনে দেয়। নিকারাগুয়ার বিভিন্ন ব্যাংকনোটে এই মহান ‘জাতীয় বীর’—কে সম্মান জানানো হয়েছে, যা কেবল একজন নেতার প্রতি শ্রদ্ধাই নয়, বরং তাঁর অদম্য সাহস ও আত্মদানের এক ঐতিহাসিক দলিল।
মুদ্রার এই ক্ষুদ্র ক্যানভাসে কালজয়ী কলমযোদ্ধাদের উপস্থিতি আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, একটি জাতির প্রকৃত সম্পদ কেবল তার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে নয়, বরং তার শিল্প, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের অক্ষয় ভান্ডারে নিহিত। আমার সংগৃহীত এই ব্যাংকনোটগুলো কেবল কাগজের টুকরো নয়; এগুলো বিশ্ব সাহিত্যের এক একটি অমূল্য ঐতিহাসিক দলিল, যা শত শত বছর পরেও এই মহান স্রষ্টাদের বাঁচিয়ে রেখেছে সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয়।
