মঙ্গলালোকে আসুক নতুন বছর
পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম মঙ্গল শোভাযাত্রা রাখা নিয়ে বিগত ও বর্তমান সরকারের মাথা ব্যথার কারণ যে কী তা বুঝতে কারো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে কারণ যাই হোক এই সিদ্ধান্ত যে আত্মঘাতী এবং আমাদের সংস্কৃতির সাথে সাংঘর্ষিক তা নিশ্চয় বোঝার ক্ষমতা তাদের আছে। সকলেরই মনে থাকার কথা, ২০২৪এ যে অন্তর্বতীর্ সরকার ক্ষমতায় আরোহণ করে, একদিকে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দেয়ার চরম অপচেষ্টা চালিয়েই ক্ষান্তি দেয়নি, তারা এই যুদ্ধের নেতাসহ যারা জীবন হাতে রেখে যুদ্ধ করেছিলেন তাদের অবদানসহ যারা শহীদ হয়েছিলেন তাদের নাম মুছে ফেলে বাঙালি সংস্কৃতির শিকড় উপড়ে নেয়ার চেষ্টা করেছিল। তারা ২০২৫ সালের পহেলা বৈশাখে আয়োজিত মঙ্গল শোভাযাত্রা থেকে ‘মঙ্গল’ শব্দটি কেড়ে নিয়ে সেখানে ‘আনন্দ’ শব্দটি বসিয়েছিল। আনন্দ শব্দটির প্রতি হয়ত কোনো ক্ষোভ কারো থাকার কথা নয়। কারণ একদা এই নামেই শোভাযাত্রা হয়েছে। কিন্তু সরকার যে উদ্দেশ্যে মব বাহিনী দিয়ে ছায়ানট এবং উদীচী অফিসে অগ্নি সংযোগ করিয়েছিল, লুটপাট, ভাংচুর করিয়েছিল, মঙ্গল শোভাযাত্রা থেকে মঙ্গল শব্দটি কেড়ে নেয়ার উদ্দেশ্যও একই ছিল।
অন্তর্বতীর্ সরকারের প্রধান ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক, আমেরিকা থেকে উচ্চ শিক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তি। তিনি তার প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংকের সাথে একত্রে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারও পেয়েছিলেন। মানুষ যখন সম্মান বা বিশাল দুর্লভ সম্মান অর্জন করেন, তখন তার মাথা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তখন সেই শিরোধার্য সম্মানের মর্যাদা তাকেই রক্ষা করতে হয়। কিন্তু ওই সাময়িক সরকারে অনেক ডিগ্রিধারী শিক্ষিত মানুষ থাকলেও তাদের অনেকেই যে নিজের ঐতিহ্য অসচেতন, তা অন্য কেউ নয়, তারাই স্বেচ্ছায় প্রমাণ করে দিয়েছেন। যেমন তারা এতটাই নির্বোধ যে, যে—গাছের ডালে সকলে আরোহণ করেছে সে গাছই কেটে ফেলার মত আইন কানুনের তোয়াক্কা না করে সংবিধান ছুঁড়ে ফেলতে চেয়েছেন। তারা আইনের শাসন রদ করে মব বাহিনী দিয়ে চরম আতংকের সৃষ্টি করেছিলেন। বিচার ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্টি দেখিয়ে বিনা বিচারে বন্দি করে রেখেছেন যাকে ইচ্ছা তাকে। যে কোনো জাতির আত্মপরিচয়ের সোপান তার সংস্কৃতি। অথচ তারা সেই সংস্কৃতিরই গলা টিপে ধরতে চেয়েছেন। বিগত শাসক দলকে দেশ বিক্রির অভিযোগে অভিযুক্ত করে, নিজেরাই নৌবন্দরসহ বৃহৎ শক্তির সাথে গোপন চুক্তি করেছেন তড়িঘড়ি করে। যাকে বলা হচ্ছে গোলামির চুক্তি।
মানুষ যখন সুশিক্ষিত হয় তখন তার আত্মসম্মানবোধ থাকে, জাতি হিসাবে নিজ জাতির প্রতি শ্রদ্ধা থাকে, আর দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সমর্পিত হয়। সেই সাথে শিক্ষিত মানুষ বর্তমানকে সোপান তৈরি করে আগামীর জন্য। কিন্তু অন্তর্বতীর্ সরকারের কতিপয় মানুষ যেমন চিন্তাধারায় অসৎ, তেমনই ভবিষ্যত বিষয়ে হিসাব নিকাশহীন ছিলেন। ফলে নির্বাচনে যে দলই নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করবে, তারা যে অন্তর্বতীর্ সরকারের অপ্রয়োজনীয় বা অধিকাংশ অধ্যাদেশ, সনদ বা সংস্কার বাতিল করবে সে বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল। ফলে দিনের পর দিন মনের মাধুরী মিশিয়ে ১৭ মাসে অনেক কিছু ‘রচনা’ করলেও তার অধিকাংশ বিএনপি সরকার নাকচ করে দিচ্ছে। কারণ, বিএনপি প্রায় ১৬ বছর দেশ চালিয়েছে। তাদের অভিজ্ঞতা আছে। তারা কেন সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ অরাজনৈতিক এবং জনগণের ম্যান্ডেটহীন ব্যক্তিদের তৈরি ‘দেশ পরিবর্তনের’ প্রস্তাব মেনে নেবে? যে কারণে বিএনপি সরকার মঙ্গল শোভাযাত্রাকে মঙ্গল শোভাযাত্রা হিসাবে উদযাপনের কথা ঘোষণা করেছে। তবে শেষ মুহূর্তে কেন তা বৈশাখী শোভাযাত্রা করল তা বোঝা কঠিন নয়।
গত শতাব্দীর শেষ দিক থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হওয়ার পর থেকে এই শোভাযাত্রা ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এমন বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রাও আগে দেখা যায়নি। যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা এর উদ্যোক্তা ও আয়োজক, তাই বিদায়ী বছরের অশুভকে দূর করে দিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর শুভ বোধকে জাগিয়ে তোলার জন্য উজ্জ্বল রঙের ফেস্টুনসহ প্রতীকী শিল্পকর্ম শোভাযাত্রার ‘মঙ্গল’ শব্দটি গভীর ব্যঞ্জনা ও তাৎপর্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই মঙ্গল শোভাযাত্রার জনপ্রিয়তার প্রভাব এতটাই ব্যাপক হয়ে ওঠে যে নতুন শতাব্দীতে এসে তা ছড়িয়ে যায় দেশব্যাপী প্রায় প্রত্যেকটি ছোট বড় শহরে। এইভাবেই বাঙালি সংস্কৃতির হৃদয় উৎসারিত ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়ে। একদা যা ছিল চৈত্র সংক্রান্তি বা বৈশাখী মেলায় সীমাবদ্ধ গ্রামে গ্রামে, তা নাগরিক জীবনকে সংস্কৃতির চেতনায় উজ্জীবিত করে তোলে।
আপামর বাঙালির এই প্রাণের স্ফূরণ লক্ষ্য করেই ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর কনভেশনে একাদশ আন্তঃরাষ্ট্রীয় পর্ষদের বৈঠকে পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ‘অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসাবে অন্তভুর্ক্ত করা হয়। অর্থাৎ এই মঙ্গল শোভাযাত্রা আন্তর্জাতিক বলয়ের নথিতে জায়গা করে নেয়। এ যে—কোনো বাঙালিরই গৌরবের বিষয়। অথচ কতিপয় ব্যক্তি গত বছর এই শোভাযাত্রা থেকে শুধু ‘মঙ্গল’ শব্দটি ছেঁটে দিয়েই থেমে থাকেনি, বাঙালিত্বকে কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্রেও নিয়োজিত হয়। তারা এতটাই অদূরদশীর্ যে তারা জানেও না, কোনো জাতির প্রাণ ভোমরাকে উপড়ে নেয়া যায় না। যেমন কেড়ে নেয়া যায় না যে জাতি কোনো ষড়যন্ত্র করে নয়, প্রতারণা করে নয়, মুখোশ পরে নয়, সরাসরি ঘোষণা করে, অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে প্রাণ বলিদান করে নিজ দেশের স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে আনে, তাদের সেই স্বাধীনতাকেও কেড়ে নেয়া যায় না।
সকল মানুষের শুভ বোধের উদয় হোক।
সকল বাঙালিকে আসন্ন নতুন বছরের শুভেচ্ছা। নতুন বছর নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠুক, সকলের জীবন সুন্দর, সফল ও সার্থক হোক।
শুভ নববর্ষ ১৪৩৩।
