পয়লা বৈশাখ: এক উৎসব, এক বিতর্ক, নাকি আত্মপরিচয়ের সংকট? আহমাদ মাযহার নিউইয়র্ক

আধুনিক বাংলাদেশে বিস্তারশীল নাগরিক জীবনেমঙ্গল শোভাযাত্রা ধারণা ভুঁইফোড় কিছু নয়। এর উৎসে আছে বাংলার আবহমানের গ্রামীণ জীবন। লক্ষ্য করলে দেখব, বঙ্গীয় বদ্বীপে আধুনিক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দর্শন গড়ে উঠেছে শত শত বছর ধরে বসবাসরত গ্রামীণ জীবন যাপন ভিত্তিতেÑআরো জোর দিয়ে বলা যায়Ñএই ভূখন্ডের মানুষের সার্বিক সংস্কৃতির আকাক্সক্ষা থেকেই! সুতরাং আধুনিকতা অভিমুখী এই দেশের মানুষের চৈতন্যে এই সংস্কৃতি বহমান থাকবে নানা অনুষঙ্গের রূপান্তরের মাধ্যমে! অধুনা নাগরিক জীবনচৈতন্যেও এই ধারাই বহমান রয়েছে। তাই ১৩৯৬ সালেরবাংলা নববর্ষ বরণ উৎসবউদযাপনের সূচনাশোভাযাত্রাও সেই শত শত বছরের গ্রামীণ সাংস্কৃতিকতার বিচূর্ণিত রূপান্তরিত চৈতন্যপ্রবাহেরই আধার। ঢাকায়ও সূচনাকালে এর নাম ছিলআনন্দ শোভাযাত্রা’! মনে পড়ছে, সেই শোভাযাত্রার ওপর একটি প্রতিবেদন মুস্তাফা নূরউল ইসলামের আহ্বানে তাঁর সম্পাদিতসুন্দরমপত্রিকার জন্য লিখেছিলাম। আর সেই প্রতিবেদন রচনার অনুপ্রেরণা ছিল যশোর থেকে ঢাকার আর্ট কলেজে পড়তে আসা আমার বন্ধুদের কয়েক জনের কাছ থেকে পাওয়া এই সংক্রান্ত কর্মকান্ড সম্পর্কে সামান্য জানাশোনা। ১৩৯২ (১৯৮৫) সাল থেকে যশোর শহরে তাঁরাআনন্দ শোভাযাত্রানামে এই শোভাযাত্রা করে আসছিলেন।আনন্দ শোভাযাত্রানামটি ছিল ১৪০২ (১৯৯৫) সাল পর্যন্ত! ১৪০৩ (১৯৯৬) সাল থেকে উদ্যোক্তারাই এর নামকরণ করেনমঙ্গল শোভাযাত্রা নামের এই রূপান্তর ঘটেছিল এর আয়োজক বা সংগঠকদের নিয়মিত চর্চার ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই। নতুন বছরকে বরণ করার সঙ্গে সহজাতভাবেই যুক্ত থাকে মানুষের মঙ্গল কামনা। বাংলা সন মূলত ফসলি সন বলে এর এই রকম ভাবগত ধারণা গড়ে উঠেছে। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এর শুরু যাঁরা করোছিলেন তাঁদের মধ্যে ক্রিয়াশীল ছিল দেশাত্মের বোধ। অথচ এই উৎসব নিয়ে কথা বলতেও আজকাল একটি অস্বস্তি কাজ করে। সমাজের একটি অংশ আজকাল জোরেশোরে প্রশ্ন তুলে চলছেÑএই উৎসব কিআমাদের’? শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত বিচিত্র রঙ, গান উল্লাসএইসব কি আমাদের সামগ্রিক বিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ? পয়লা বৈশাখের সকাল তাই এখন আর নিছক ঋতুচক্রের আনন্দ নয়; এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে এক ধরনের মতাদর্শিক টানাপড়েনের বিষয়। 

মনে পড়ছে কিশোর বয়সে তখনকার ঢাকা জেলার কাপাসিয়া অঞ্চলে আমার নানাবাড়িতে উদযাপিত পয়লা বৈশাখেরবান্নি মেলার কথা! বাংলা বছরের প্রথম দিনের আনন্দ উদযাপনের সঙ্গে সে ছিল প্রথম পরিচয়। স্মৃতি হাতড়ে যা মনে পড়ে তাতে অনুভব করি এর সঙ্গে নাগরিক চৈতন্যের কোনো সম্পর্ক ছিল না। পয়লা বৈশাখ ছিল বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে বসবাসরত নানা শ্রেণি পেশার গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর স্বতঃস্ফূর্তপ্রয়োজন উদযাপন’, ‘যাপিত জীবনে মধ্য থেকে উদ্ভুত ললিতকলারপরিবেশনা উপভোগ’!

১৯৮৫ সালে যশোর শহরে যেআনন্দ শোভাযাত্রাশুরু হয়েছিল তা যে গ্রামীণ জীবনবোধের স্মৃতিময়তার রূপান্তর তা নাগরিক জনসমাজের উচ্ছ্বাস থেকেই বোঝা যায়! ‘মঙ্গল শোভাযাত্রানামে দীর্ঘ কাল ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে চলাআনন্দ শোভাযাত্রা ধারণা এর সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত এই টানাপড়েনের কেন্দ্রে যেভাবে ধর্ম বনাম সংস্কৃতির দ্বৈততা হাজির করা হচ্ছে আমাদের যাপিত জীবন কি তার দ্বারা বেশি প্রভাবিত? এই ধরনের শোভাযাত্রার অনেকগুলোতে বছরের পর বছর ধরে অংশ নিয়ে কখনো মনে হয়নি বিপুল জনতার এসবে অংশ নিতে স্বতঃস্ফূর্ততার কোনো ঘাটতি আছে। ধর্মের ন্যায্যতার সঙ্গে মানুষের অন্তরের বিরোধ বড় হয়ে দেখা দেয়নি। বিরোধের পরিস্থিতি তখনই এসেছে যখন রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য একে ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ স্বাভাবিক ভাবে আমাদের জনজীবনের দিকে তাকালে মনে হয় না যে, একটি সমাজে মানুষের জীবন এতটাই সরলরেখায় বিভক্ত নয় যে, তার উৎসবের আঙ্গিক উপকরণ মানেই তার নিজের ধর্মবিশ্বাসের বিরুদ্ধে অবস্থান। বরং ইতিহাস আমাদের অন্য কথা বলে। বাংলা সনের উৎপত্তি কোনো ধর্মীয় আচার থেকে নয়; বরং এর উদ্ভব প্রশাসনিক প্রয়োজন, কৃষিজীবনের ছন্দ, এবং ঋতুর আবর্তন থেকে। সেই ব্যবহারিক প্রয়োজনের সঙ্গে মানুষের হৃদয়াবেগের যোগ ক্রমে রূপ নিয়েছে সামাজিক উৎসবে, তারপর সাংস্কৃতিক চিহ্নে। এখানে ধর্মের সঙ্গে সংঘাতের প্রশ্নটি পরবর্তী সময়ের দুরভিসন্ধিমূলক আরোপ। শুধু তা নয়, তা একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিরই নির্মাণ।

এই দৃষ্টিভঙ্গির উৎস যতটা জনসাধারণের জীবনবোধের তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক মতলবের বলেইইসলামি সংস্কৃতিনামে ধারণাটিকে হাজির করা হয়। ইসলাম বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে সমন্বয় করেই বিকশিত হয়েছে। ফলে ইসলামি সংস্কৃতি নিজেই কতটা সুসংহত প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আরবের সংস্কৃতি, পারস্যের নন্দন, তুর্কি ঐতিহ্য, কিংবা উপমহাদেশের লোকায়ত জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ জীবন চর্যায় সবই মুসলিম সমাজের অংশ, কিন্তু একক কোনো রূপ নয়। তাহলে বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব সাংস্কৃতিক প্রকাশকেও কেন সন্দেহের মুখে ফেলা হবে? এখানে মনে হয়, সংস্কৃতির প্রশ্নটি যতটা ধর্মতাত্ত্বিক, তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক।

কারণ, সংস্কৃতি মানে কেবল গান বা মেলা নয়Ñএটি জনপরিসরের প্রতীক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। কে ঠিক করবে, কোন চিহ্নগ্রহণযোগ্য’? পয়লা বৈশাখের বিরুদ্ধে আপত্তি তাই অনেক সময় ধর্মীয় ভাষায় উচ্চারিত হলেও, তার অন্তর্গত সুরটি ক্ষমতার। এটি একটি প্রতীকী দখলদারির প্রয়াসÑজনজীবনের দৃশ্যপটকে একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শের অনুগত করে তোলার চেষ্টা।

এখানে আরেকটি সূক্ষ¥ স্তর রয়েছেÑলোকসংস্কৃতির প্রতি একধরনের অবজ্ঞা। পয়লা বৈশাখের উৎস মূলত গ্রামীণ, কৃষিজীবনের সঙ্গে যুক্ত। এই লোকায়ত রীতিকেঅশুদ্ধবাবেদআতবলা মানে কি কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণের আপত্তি, নাকি এটি এক ধরনের শ্রেণিগত দূরত্বেরও প্রকাশ? যেন ধর্মীয়ভাবে সংজ্ঞায়িত একটি শুদ্ধতার মানদন্ড থেকে গ্রামীণ জীবনের স্বতঃস্ফূর্ততাকে বিচার করা হচ্ছে।

কিন্তু বিষয়টি এখানেই শেষ নয়। পয়লা বৈশাখের বাস্তবতা থেকে উদ্ভুত সৌন্দর্যের বোধÑতার রং, তার উল্লাস, তার অবয়বিক উপস্থিতিÑএসবের প্রতিও একটি অস্বস্তি কাজ করে। আনন্দের উন্মুক্ততা, দেহের দৃশ্যমানতা, সংগীতের উচ্ছ্বাসÑএসব যেন একটি নিয়ন্ত্রিত নৈতিকতার সঙ্গে খাপ খায় না। ফলে আপত্তি কেবল বিশ্বাসের নয়; এটি এক ধরনের নান্দনিক সংশয়েরও যেন, একধবংঃযবঃরপ ধহীরবঃু’Ñযেখানে আনন্দকেও শঙ্কার চোখে দেখা হয়।

এই সমস্ত প্রশ্নের ভেতর দিয়ে আরেকটি বড় প্রশ্ন সামনে আসেÑজাতীয় পরিচয় বনাম উম্মাহচেতনা। একটি রাষ্ট্র তার ভাষা, ইতিহাস, ভূখন্ড সংস্কৃতির মাধ্যমে নিজেকে নির্মাণ করে। সেখানে যদি স্থানীয় সংস্কৃতিকে অস্বীকার করা হয়, তবে নাগরিকতার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশ্বজনীন ধর্মীয় পরিচয় নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা কি স্থানীয় অভিজ্ঞতাকে পুরোপুরি মুছে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে?

অবশ্যই, এই বিষয়ের আলোচনায় একপাক্ষিকতা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। একটি বহুত্ববাদী সমাজে ধর্মীয় সংবেদনশীলতার প্রশ্নকে নিশ্চয়ই অস্বীকারও করা যায় না। কিন্তু সেই সংবেদনশীলতা যদি অন্যের সাংস্কৃতিক চর্চাকে সীমাবদ্ধ করে দিতে চায়, তবে তা সহাবস্থানের পরিসরকে অনেকটা সংকুচিত করে ফেলে না কি? আসলে এখানে প্রয়োজন সংঘাত নয়, সংলাপ। দরকার একটি এমন পরিসর, যেখানে ব্যক্তি তার বিশ্বাস পালন করতে পারে, আবার সমাজ তার সামগ্রিকতায় সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকেও লালন করতে পারে।

অভিবাসী জনসমাজে পয়লা বৈশাখ উপলক্ষেবৈশাখী মেলাকিংবামঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজনের দিকে তাকালেও এই প্রশ্নগুলোর একটি ভিন্ন মাত্রা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভৌগোলিক দূরত্বে বিচ্ছিন্ন মানুষ যখন নতুন পরিবেশে নিজেদের পুনর্গঠনের চেষ্টা করে, তখন সংস্কৃতি হয়ে ওঠে স্মৃতি পরিচয়ের এক ধরনের আশ্রয়। নিউইয়র্ক, লন্ডন কিংবা টরন্টোর মতো মহানগরীতে আয়োজিত বৈশাখী মেলা বা শোভাযাত্রাগুলো তাই নিছক উৎসব নয়; এগুলো এক ধরনের আত্মপরিচয় পুনর্নির্মাণেরই প্রয়াস। সেখানে গ্রামীণ জীবনের সরল অনুষঙ্গ, নাগরিক রূপান্তরের প্রতীক, এবং ব্যক্তিগত স্মৃতির আবেগÑসব মিলেমিশে একটি নতুন সাংস্কৃতিক রূপ নেয়। লক্ষণীয় যে, এই প্রবাসী আয়োজনগুলোতে অংশগ্রহণকারীদের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে কোনো দৃশ্যমান দ্বন্দ্ব তৈরি হয় না; বরং উৎসবটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক পরিসর হিসেবে কাজ করে। ফলে প্রশ্নটি আরও তীব্র হয়ে ফিরে আসে। যে সংস্কৃতি ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরি করতে পারে, সেটি নিজ ভূখন্ডেই কেন বিতর্কের মুখে পড়ে?

শেষ পর্যন্ত, পয়লা বৈশাখের বিতর্কটি হয়তো একটি উৎসবের প্রশ্ন নয়। এটি আমাদের নিজেদের দিকে তাকানোর একটি আয়না। আমরা কি আমাদের ইতিহাসকে গ্রহণ করতে দ্বিধায় পড়ছি? নাকি আমরা ভয় পাচ্ছি আমাদের আনন্দকে স্বীকার করতে? নাকি আমরা এমন একটি পরিচয়ের খোঁজে আছি, যা আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়?

পয়লা বৈশাখ তাই এখন কেবল একটি দিন নয়; এখন এটি একটি প্রশ্ন, যা প্রতি বছর ফিরে আসে। এবং প্রতিবারই আমাদেরকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেÑআমরা আসলে কারা?

Related Posts