মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পাল্টে হল বৈশাখী শোভাযাত্রা

বিবিসি বাংলা প্রতিবেদনঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বাংলা নববর্ষের দিনে প্রতিবছর যে শোভাযাত্রা হয়, ফের সেটির নতুন নাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এতদিন এটিআনন্দ শোভাযাত্রাবামঙ্গল শোভাযাত্রানামে পরিচিত থাকলেও এবার থেকে এর নামবৈশাখী শোভাযাত্রাকরার কথা জানিয়েছে সরকার।

সরকার বলছে, নাম নিয়ে দীর্ঘদিনের বিভাজন দূর করার জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আয়োজকরা বলছেন, সময়ের প্রেক্ষাপট সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নাম পরিবর্তন করা হয়েছে, যাতে আয়োজনটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক গ্রহণযোগ্য হয়।

তাদের মতে, নামের পরিবর্তন মূল আয়োজনের উদ্দেশ্য বা তাৎপর্যকে বদলে দেয় না, বরং নতুন প্রজন্মের কাছে বিষয়টিকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তোলে।

যদিও সমালোচক বিশ্লেষকরা বলছেন উল্টো কথা। তাদের বক্তব্য হলো, একই আয়োজনের নাম বারবার পরিবর্তন করলে এর ঐতিহ্য ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

নাম পরিবর্তন রাষ্ট্রীয় ব্যাপার, চাইলে করতেই পারে

বাংলাদেশে প্রতিবছর বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে পালন করা হয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হচ্ছে এই পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত শোভাযাত্রা।

এটি মূলত একটি বর্ণাঢ্য মিছিল, যার শুরুটা হয়েছে চারুকলা ইন্সটিটিউটের হাত ধরে।

১৯৮৯ সাল থেকে প্রতিবছর এই চারুকলা অনুষদ থেকে পহেলা বৈশাখের সকালে বাদ্যযন্ত্রের তালে বাঁশকাগজসহ নানা উপকরণে তৈরি নানা ধরনের ভাস্কর্য, মুখোশ হাতে বর্ণাঢ্য মিছিল বের হয়, যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রশিক্ষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ অনেকেই শামিল হন।

এটিমঙ্গল শোভাযাত্রানামে খ্যাতি পেয়েছে, কিন্তু সাড়ে তিন দশক আগে যাত্রা শুরুর সময় ওই আয়োজনটির নাম ছিলআনন্দ শোভাযাত্রা

পরবর্তীতে সেটির নাম পরিবর্তন করেমঙ্গল শোভাযাত্রাকরা হয়। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গত বছর এর নামআনন্দ শোভাযাত্রাকরেছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

এর ঠিক এক বছরের মাথায় ফের এর নাম পরিবর্তিত হয়েবৈশাখী শোভাযাত্রাকরা হলো।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, নাম নিয়ে যা হচ্ছে তাস্রেফ রাজনীতি

কিন্তু মুশকিল হলো, এটার উদ্যোক্তা চারুকলা। তারা যদি এই নাম পরিবর্তনকে মেনে নেয়, তাহলে কিছু বলার থাকে না। তারা নাম দিয়েছিলো, তারাই এখন অন্য নাম গ্রহণ করছে। এখানে কিছু করার নাই,’ যোগ করেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সঙ্গে কথা বলেও দেখা গেছে, শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন নিয়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই।

অনুষদের ডিন নববর্ষ উদযাপন কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম শেখ বিবিসি বাংলাকে বলেন, নাম পরিবর্তন করা হলেওশোভাযাত্রার মূল আয়োজন কর্মকান্ডে নীতিগত কোনো বাধা নেই। আর নাম পরিবর্তন রাষ্ট্রীয় ব্যাপার, চাইলে তো করতেই পারে।

চারুকলা অনুষদ তাদের সাধ্যমতো উৎসবটিকে সুন্দরভাবে করার চেষ্টা করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এটি কতটুকু অন্তর্ভুক্তিমূলক করা হলো, এতে কতটুকু বৈচিত্র্য এলো, দলমত নির্বিশেষে সেক্যুলার প্রেজেন্টেশন; বর্ষবরণ উদযাপনে এগুলোই চেতনার মূল জায়গা।

এইমূলজায়গাগুলোতেকোনো সমস্যা নেইবলে জানিয়েছেন অধ্যাপক মি. ইসলাম।

বারবার শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনের বিষয়টিকে চারুকলা কীভাবে দেখছে জানতে চাইলে আজহারুল ইসলাম শেখ বলেন, ‘এটা আমাদের (চারুকলা) কাছে ঠিকঠাক লাগার প্রসঙ্গ না শুধু, এটি বৃহত্তর একটি রাষ্ট্রীয় প্রোগ্রাম। আমরা আয়োজক। সবই ঠিক আছে।

এখন বৃহত্তর কমিটি, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য অংশীদার যারা আছে, সবার মতামতের আলোকে বৃহত্তর সিদ্ধান্ত এটি। কারও একক সিদ্ধান্ত বা মতামতের ব্যাপার নেই এখানে। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে যেভাবে সুবিধা হয় আর কি,’ তিনি যোগ করেন।

তার মতে, শোভাযাত্রার মূল বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ আছে কি না, এখানে সেটিই দেখার বিষয় শুধু।

নাম পরিবর্তনের পেছনে সরকারের যুক্তি

মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে আগেও বিভিন্ন সময় বিতর্ক হতে দেখা গেছে। ধর্মভিত্তিক একাধিক গোষ্ঠী দলের সদস্যদের এই আয়োজনের বিরোধিতা করতেও দেখা গেছে।

চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে ১৯৮৯ সালেআনন্দ শোভাযাত্রানামে এই শোভাযাত্রা শুরু হলেও পরবর্তীতে নব্বইয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পটভূমিতেঅমঙ্গলকে দূর করে মঙ্গলের আহ্বানজানিয়েই শোভাযাত্রার নামকরণ হয় তখনমঙ্গল শোভাযাত্রা

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই শোভাযাত্রাটি পরবর্তীতে বাংলাদেশের পহেলা বৈশাখ উদযাপনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জাতিসংঘের শিক্ষা, সংস্কৃতি বিজ্ঞানবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর মঙ্গল শোভাযাত্রাকেঅপরিমেয় বিশ্ব সংস্কৃতিহিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

মঙ্গল শোভাযাত্রা অন পহেলা বৈশাখ’— বাংলা বর্ষবরণের আয়োজনটিকে ইউনেস্কোর অপরিমেয় বিশ্ব সংস্কৃতি হিসেবে স্বীকৃতির সনদে এভাবেই উল্লেখ করা হয়েছে।

তাহলে কেন হঠাৎ করে ফের এই আয়োজনের নাম পরিবর্তন করার প্রয়োজন পড়লো এবং সরকার কেন চারুকলা আয়োজিত অনুষ্ঠানে জড়াতে গেল, এসব নিয়ে জানতে চাইলে সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘এই শোভাযাত্রা এককভাবে চারুকলার না। চারুকলা এটি প্রতিবছর আয়োজন করে। এটি সামগ্রিকভাবে একটি বৈশাখী উৎসব।

তিনিও উল্লেখ করেন যে ১৯৮৯ সালে চারুকলা এর নাম দেয়আনন্দ শোভাযাত্রা পরে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার এসে এর নামকরণ করেমঙ্গল শোভাযাত্রা এরপর গতবছর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসে এর নাম পাল্টে করে দেয়আনন্দ শোভাযাত্রা

এখন এই আনন্দ আর মঙ্গল...সবকিছুই আনন্দ, সবকিছুই মঙ্গল...বৈশাখ একটি আনন্দঘন পরিবেশ। অথচ এই নামটা নিয়ে দুটো পক্ষ হয়ে মারাত্মকভাবে একটি বিভাজন তৈরি হয়েছে। আমরা বিভাজন চাই না, অনৈক্য চাই না। আমরা ঐক্য বৈচিত্র্য চাই। বিভিন্ন জাতিসত্তা সংস্কৃতি তুলে ধরতে চাই। তাই, এটি অবসান করে আমরা নাম দিলাম বৈশাখী শোভাযাত্রা।

মন্ত্রী বলেন, ‘দেশের অধিকাংশ মানুষ সরকারের এই সিদ্ধান্তে খুশি হয়েছে।

এদিকে, নাম বদলের ফলে জাতিসংঘের স্বীকৃতিতে কোনো প্রভাব পড়বে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সেইসাথে, বাংলাদেশ সরকার এখন বিষয়ে কী করবে, জানতে চাইলে মন্ত্রী আরও বলেন যে জাতিসংঘকে বিষয়ে জানাতেই হবে, এমন কোনো বিষয় নেই; ‘তবে আমরা তাদেরকে জানিয়ে দিবো যে এখন শোভাযাত্রার নাম এটা। এটা এমন কিছু না।

ইউনেস্কোর স্বীকৃতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তারা নবর্ষের উৎসবকে দিয়েছে। এর মাঝে অনেক কিছুই আছে। ওইদিন ঢাকায় রমনা বটমূলের অনুষ্ঠান হয়, চারুকলা থেকে শোভাযাত্রা বের হয়। উদীচী অনুষ্ঠান করে, নজরুল ইনস্টিটিউট তাদের মতো অনুষ্ঠান করে।

Related Posts