পহেলা বৈশাখের বিষন্নতা: মঙ্গলবারের মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে বিতর্ক || আনিস আহমেদ
এবার সমাগত এই ১৪৩৩ সালের সূচনা হবে এক নান্দনিক আবহে সেই রকম এক প্রত্যাশা ছিল আমাদের সকলের মনে। গত বছরের মঙ্গল শোভাযাত্রায় যে অমঙ্গলের চিত্র আমরা দেখেছিলাম, রাজনৈতিক খেলায় মেতে ওঠা একদল অর্বাচীন তরুণ যেভাবে শেখ হাসিনার অবমাননা করেছিল, তাতে বিস্ময়ে হতবাক হয়েছিলাম এ কথা ভেবে যে বাংলা নববর্ষের উদযাপনকে এরা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অবমাননার জন্য ব্যবহার করছে। ড. ইউনুসের অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সময়ে এমনটি হওয়াও যে খুব একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার ছিল তা নয়। কারণ যে প্রশাসনের সময়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর চূড়ান্ত অবমাননা করা হয়, ৩২ নম্বর রোডে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি এবং জাদুঘরটি বার বার আক্রমণে বিধ্বস্ত করা হয়, সেই প্রশাসন এবং তাদের মদদপুষ্টদের কাছ থেকে আর কীই বা আশা করা যায়! কিন্তু এখন?
এক ধরনের নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সম্প্রতি ক্ষমতায় এসেছে। আরও দশজনের মতো আমারও একটা ক্ষীণ প্রত্যাশা ছিল যে তারেক তাঁর পূর্বসুরিদের সকল ভুল শুধরে নিয়ে বাঙালি জাতিকে সঠিক নেতৃত্ব দেবেন। কিন্তু না তারেক রহমান এবং তাঁর সরকারও পহেলা বৈশাখকে নিয়ে ভিন্ন রকমের খেলা খেলছেন বলে মনে হয়। তাঁরা নাকি মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পাল্টে বৈশাখি শোভাযাত্রা করতে চাইছেন। মঙ্গল শব্দের প্রতি তাঁদের এই ছুঁৎ মার্গের কারণটা কি? মঙ্গল মানে তো ভালো, কল্যাণ কিংবা শুভ; আরবীতে যাকে বলা হয় ‘খায়ের’। গোটা বাঙালি জাতিকে মূর্খতার যে স্তরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাতে মঙ্গল শব্দের অর্থ এরা বুঝবে কি করে? এ কথা সত্যি যে এই মঙ্গল শোভাযাত্রার এক সময়ে নাম ছিল আনন্দ শোভাযাত্রা। কিন্তু আনন্দের সঙ্গে সকল মানুষের কল্যাণ কামনা যেখানে অন্তর্ভুক্ত হয়, তখন তো সেটা মঙ্গল শোভাযাত্রা হতেই পারে। মানুষে মানুষে সম্প্রীতি, নতুন শুরু আর অশুভ শক্তির বিনাশে বাঙালির প্রতীকী আয়োজন মঙ্গল শোভাযাত্রা। যেখানে নানান মাসকট, সরাচিত্র, মুখোশ আর মোটিফে তুলে ধরা হয় আবহমান বাংলার লোকজ ঐতিহ্য, অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং সত্য—সুন্দর ও মঙ্গলের উদাত্ত আহ্বান। আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য থাকে, মানব জীবনের কল্যাণ ও সমৃদ্ধি। ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ জাতিসংঘের সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়। ইউনেস্কো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে তাদের ‘রিপ্রেজেনটেটিভ লিস্ট অব ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’র তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। সে সময় স্বীকৃতি দেওয়ার কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করে, এটা শুধু একটা সম্প্রদায় বিশেষের নয়, গোটা দেশের মানুষের, সারা পৃথিবীর মানুষের। অথচ এই শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনে সরকারের এই ব্যতিব্যস্ততা কেন? কেউ কেউ হয়ত বলবেন মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম বৈশাখী শোভাযাত্রা হলেই বা ক্ষতি কি? নাহ, নামে হয়ত কিছুই যায় আসেনা। কিন্তু নাম পরিবর্তনের পেছনে যে গূঢ় উদ্দেশ্য রয়েছে সেটিকে অনুধাবন করেই এই আপত্তি। বস্তুত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম তো অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকেই নিষিদ্ধ। কাজেই জামায়েতে ইসলামি দলের প্রাধান্য এখন সর্বত্র। আইন করে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হলে জামায়েতে ইসলামি দলের একচ্ছত্র আধিপত্য নিশ্চিত হবে। তাই এই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীকে খুশি করার জন্য চলছে বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধ্বংসের পাঁয়তারা, বাংলাদেশকে নব্য পাকিস্তান বানানোর ষড়যন্ত্র। মঙ্গলকে অমঙ্গলে পরিণত করার এটাই হচ্ছে কাহিনী।
বাঙালি সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হচ্ছে পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষ হচ্ছে বাঙালিদের সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব। ঈদ কিংবা পূজা এই উৎসবগুলিতে ধর্মীয় আমেজ থাকে সব সময়ে। কিন্তু ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালির উৎসব হচ্ছে পহেলা বৈশাখ। এই অনুষ্ঠানকে বাংলাদেশে কেবল মাত্র হাল খাতা উৎসব থেকে জাতীয় উৎসবে রূপান্তরিত করতে বাঙালিকে সংগ্রাম করতে হয়েছে। সেই ষাটের দশকে নব বর্ষ ও রবীন্দ্র জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপনে বাংলাদেশের মানুষ যে প্রচন্ড বাধার সম্মুখীন হয়েছিল, সেই বাধাকে অতিক্রম করেই বাঙালি কেবল রবীন্দ্র শতবার্ষিকীই পালন করেনি, বাংলা নববর্ষকে বার্ষিক উদযাপনে পরিণত করেছে। সেই যে পুরনো ঢাকায় বলধা গার্ডেনে পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়, তারই ধারাবাহিকতায় এই অনুষ্ঠানের আয়োজন চলে রমনার বটমূলে। হাজার হাজার লোকের উপস্থিতিতে প্রতিবছর ছায়ানট এই অনুষ্ঠানটি আয়োজন করেছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং পরবর্তীতে করোনার সময় ছাড়া ছায়ানট প্রতিবছর তাদের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছে। কিন্তু ছায়ানটের এই আয়োজনও উগ্রবাদীদের আক্রমণের সম্মুখীন হয়েছিল। বস্তুত বিষয়টা হচ্ছে এই যে একদল উগ্রবাদী বাঙালি সংস্কৃতিকে হিন্দুয়ানি বলে বাঙালি মুসলমানদের বিভ্রান্ত করেছে বার বার। এখনও সেই উদ্যোগে বাধা প্রয়োগ করা হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখন বিভ্রান্ত সেখানে ইসলামি ছাত্র শিবিরের দাপটে, অনুমান করি চারুকলা ইনস্টিটিউটও, এই প্রতিবন্ধকতার শিকার। তবে আমার বিশ্বাস, বাঙালিকে তার শেকড় থেকে উপড়ে ফেলার যে ষড়যন্ত্র চলছে তা কখনই সফল হবে না। জানি সম্প্রতি মঙ্গল শোভাযাত্রার বিরুদ্ধে জনৈক আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান রিট আবেদন করেছেন। বলা হচ্ছে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ইমান, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাংবিধানিক অধিকার এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় তিনি এ রিট করেন। এই রিট আবেদনকারী জানেনই না যে মঙ্গল শোভাযাত্রায় মুসলমানদের ইমান ও ধর্মীয় স্বাধীনতার উপর কোনো ক্রমেই হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে না আর এর ফলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ক্ষুন্ন হবার কোন আশংকাই নেই যদি না কতিপয় স্বার্থান্বেষী ধর্মব্যবসায়ী ধর্মীয় অনুভূতিতে উস্কানি প্রদানের জন্য এটিকে ব্যবহার করেন। যে কথাটি কট্টরবাদীরা কোনো ক্রমেই বুঝতে পারেন না যে সংস্কৃতি ও ধর্ম সম্পূর্ণ পৃথক ব্যাপার। পাখি, মাছ ও পশুর বিশালাকৃতির প্রতিকৃতি বহন করার অর্থ এই নয় যে তাদেরকে পূজো করা হচ্ছে। এই প্রতিকৃতিগুলি বাংলাদেশের প্রকৃতির সঙ্গে মিশে আছে; এগুলোর মঙ্গলকামনায় ভুলতো কোথাও নেই।
পরিহাসের বিষয় হচ্ছে এবার পয়লা বৈশাখ হচ্ছে মঙ্গলবার। মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনে কি মঙ্গলবারের নামও বদলাতে হবে! আর মঙ্গল গ্রহের নাম! সবই কি তাহলে শেষ অবধি অমঙ্গলে পরিণত হবে? মঙ্গল নিয়ে যাদের ভয়, তারা তো তাহলে অমঙ্গলকেই চাইছে। কিন্তু বাংলাদেশে কেবল মাত্র শোভাযাত্রার মাধ্যমে নয়, সামগ্রিক অর্থে অমঙ্গল নয়, মঙ্গলেরই জয় অবধারিত।
