তরুণদের মধ্যে উগ্রবাদের ঝোঁক বোঝা কেন জরুরি || বুলবুল সিদ্দিকী

ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে আমরা বেশ কিছু বোমা বা বোমাসদৃশ বস্তুর উপস্থিতির সংবাদ দেখতে পেয়েছি।

বিভিন্ন ইসলামি আন্দোলনের নৃবৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করা আমার বিদ্যায়তনিক গবেষণার অন্যতম বিষয়। এমন এক গবেষণাকালীন একজন তথ্যদাতা আমাকে বলেছিলেন, কীভাবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া একজনউগ্রবাদীবড় ভাইয়ের খপ্পরে পড়েছিলেন। ইসলামের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের ইতিহাসসংবলিত বই পড়ার কথা বলে ধীরে ধীরে তাঁদের সংগঠনে ভেড়ানোর পাঁয়তারার পরিকল্পনা যখন তিনি বুঝতে পারেন, তখন তিনি সেই ফাঁদ থেকে বের হয়ে আসেন। তবে সবার ক্ষেত্রে এমন ঘটে না। 

এই ঘটনা যখন ঘটে, তিনি তখন স্কুলের গণ্ডির শেষ দিকে। তাঁর বাবা বিষয়টি আঁচ করতে পেরে সেই বড় ভাইকে বলে দেন যেন তিনি আর তাঁর ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ না রাখেন। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ডিজিটাল ডিভাইসের সহজলভ্যতার কারণে ধরনের চেষ্টা আরও সূক্ষ¥ভাবে পরিচালিত হয়। 

ফলে উগ্রবাদ নিয়ন্ত্রণের উপায় খুঁজতে হলে এর সামাজিক প্রেক্ষাপটকে আমাদের বুঝতে হবে। উগ্রবাদের চর্চা প্রকাশ আমাদের জনপরিসরের নানা ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এটি ব্যক্তির আচরণগত পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে। তাই এর সূক্ষ¥ উপস্থিতি বোঝা জরুরি।

উগ্রবাদকে বুঝতে তার নানামুখী বিস্তারের ধরন নিয়ে নানা আলোচনা বিতর্ক রয়েছে। সংজ্ঞাগত জটিলতার পাশাপাশি এর প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য এই পুরো আলাপকে কঠিন করে তোলে। তদুপরি, উগ্রবাদের ধারণাকে প্রধানত সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা বিশ্লেষণ করার প্রবণতা উগ্রবাদ ধারণাটিকে আরও সমস্যাসংকুল করে তোলে।

আবার উগ্রবাদের প্রচলিত সংজ্ঞায় একে অস্পষ্টভাবে মতাদর্শের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখা হয়। কিন্তু কেবল মতাদর্শই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পূর্বশর্ত নয়; বরং যারা ধর্মের মাধ্যমে উগ্রবাদী চিন্তার যৌক্তিকতা খুঁজে ফেরে, তার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করা উগ্রবাদের একটি রাজনৈতিক প্রকাশভঙ্গি। 

আবার উগ্রবাদের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি উগ্র চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনতে পারে; কিন্তু সেটি যে অবশ্যম্ভাবীভাবে তাকে সন্ত্রাসবাদের দিকে নিয়ে যাবেবিষয়টি এমনও নয়। কেননা মানুষের মনোজগতে উগ্রপন্থার প্রভাব থাকলেই যে একজন তা বাস্তবায়ন করবে, সেটা না হতে পারে। 

আবার কেউ কেউ যে তার মনোজগতে বিকশিত উগ্রবাদী চিন্তার বাস্তবায়নও করতে চাইবে না, সেটাও ভাবার কোনো কারণ নেই। তাই সামাজিক পরিসরে যখন আমরা উগ্রবাদী চিন্তা আচরণের দৈনন্দিন প্রকাশ দেখি, তাকে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। কারণে উগ্রবাদকে একটি জটিল সামাজিক রাজনৈতিক প্রপঞ্চ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। 

বাংলাদেশে বিগত কয়েক দশকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিক বোমা হামলা এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকার অভিজাত এলাকায় অবস্থিত হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলাকে কেন্দ্র করে বিষয়ে উদ্বেগ আলোচনা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, উগ্রপন্থায় জড়িয়ে পড়া অনেক তরুণই বিভিন্ন উচ্চ সামাজিকঅর্থনৈতিক শ্রেণি থেকে এসেছিল এবং তাদের কেউ কেউ ইংলিশ ধারার স্কুলে বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছিল। এটা বিগত সময়ের মাদ্রাসাকেন্দ্রিক উগ্রবাদের যে একপেশে ধারণা ছিল, তার চেয়ে ভিন্নতর অবস্থানের ইঙ্গিত প্রদান করে। 

তবে এমন উগ্রবাদী ধারণার ব্যাপক বিকাশ বিস্তার ঘটে বিশেষ করে বিগত আওয়ামী লীগের শাসনামলে। কারণ হিসেবে অনেকেই সেই সময়ের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে একধরনের প্রতিরোধ বা রেজিস্ট্যান্স হিসেবেও দেখে থাকেন।

সে সময়ের উগ্রপন্থাকে রাষ্ট্রীয় পরিসরে যেভাবে নিয়ন্ত্রণের দৃশ্যমান প্রচেষ্টা ছিল, তাতে অনেকাংশেই বৈশ্বিকসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি ব্যবস্থা ছিল। তবে সেই উগ্রবাদের যুগ পেরিয়ে আমরা যখন গণঅভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে পদার্পণ করলাম, তখন থেকে আমরা আবারও সমাজের নানা পরিসরে উগ্রপন্থী চিন্তার ধারাবাহিক প্রকাশ দেখতে পাই। এখানে দুই ধরনের ধারা আমরা দেখতে পাই।

প্রথমত, নানাভাবে জনপরিসরে উগ্রবাদী চিন্তা আচরণের দৈনন্দিন প্রকাশ পাচ্ছে। যেমন ধর্মের পিতৃতান্ত্রিক বিরূপ ব্যাখ্যার মাধ্যমে নারীর প্রতি ক্রমাগত অবমাননা এবং যৌক্তিকতা দেওয়ার অব্যাহত চেষ্টা। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমাজের ভিন্নচিন্তা দর্শনের মানুষের প্রতি হামলা সহিংসতা। বাউল, মাজার মাজারপন্থীদের ওপর হামলা হয়েছে; প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানটের মতো প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা হয়েছে।  

এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কোন কোন সাংস্কৃতিক চর্চাকেও ইসলামবিরোধী বলে প্রচার করে সামাজিক রাজনৈতিক পরিসরে একটি ঘৃণার বয়ান তৈরির চেষ্টা দেখা যায়। এসবের পেছনে সমাজের গভীরে প্রোথিত উগ্রবাদী চিন্তা একটি বড় ভূমিকা পালন করে আসছে। এর সঙ্গে রয়েছে উগ্রবাদী চিন্তা আচরণকে উৎসাহিত করে এমন বিভিন্ন ধরনের বই প্রকাশের হিড়িক। 

এখানে শঙ্কার বিষয় হলো, আলকায়েদা আইএসের মতো নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে জড়িত লেখকদের বইও এসব তালিকায় রয়েছে। ধরনের বই তরুণদের মনোজগতে উগ্রবাদী মানসিকতা তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এটা অবশেষে সন্ত্রাসবাদী চিন্তারও প্রকাশ ঘটাতে পারে কারও কারও ক্ষেত্রে।

দ্বিতীয়ত, ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে আমরা বেশ কিছু বোমা বা বোমাসদৃশ বস্তুর উপস্থিতির সংবাদ দেখতে পেয়েছি। সম্প্রতি সাভারের একটি বাসায় কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের তত্ত্বাবধানে বোমাসহ গ্রেপ্তারের খবর জনমনে আরও উদ্বেগ তৈরি করছে। এমনকি বিষয়ে জাতিসংঘের উদ্বেগও আমাদের জন্য একটি আশঙ্কার বিষয়।

ফলে আমরা যখন একটি নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পার করেছি, ঠিক সেই সময়ে ধরনের ঘটনাগুলো সরকারের জন্য আরও চ্যালেঞ্জ দেশের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে। হোলি আর্টিজানে হামলা পরবর্তী সন্ত্রাসবাদ দমন নিয়ে আমাদের স্মৃতি এখনো তাজা। তাই বিষয়ে সরকারের উচিত হবে অস্বীকারের রাজনীতির মধ্য দিয়ে না গিয়ে এর যথাযথ ব্যবস্থাপনা অর্থাৎ এর নিয়ন্ত্রণ নির্মূলের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হাতে নেওয়া। 

বুলবুল সিদ্দিকী নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং আহ্বায়ক, অ্যালায়েন্স ফর মাল্টিডিসিপ্লিনারি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস

Related Posts