ভ্রমণ গদ্য—১ পাঠকের সাথে লেখকের সাক্ষাৎ || শাহাব আহমেদ
চারদিন লন্ডন, চারদিন প্যারিসÑসময়ের এই সংক্ষিপ্ত বাজেট নিয়েই বের হয়েছিলাম।
অরল্যান্ডো থেকে নিউইয়র্কের জেএফকে, সেখান থেকে হিথরো, তারপর ইউরোস্টারে প্যারিস। প্যারিসের চার্লস দ্য গল এয়ারপোর্ট থেকে আবার নিউইয়র্ক হয়ে অরল্যান্ডোÑএইভাবে টিকিট কাটা হয়েছিল।
সব—পেয়েছির দেশ আমেরিকায় এখন ফ্লাইটের সময়ের কোনো মা—বাপ নেই। লেট হয় প্রায়ই।
আমাদের রওনা হওয়ার আগের সপ্তাহে বন্ধুর মেয়ের বিয়ের দাওয়াত খেতে গিয়েছিলাম। আড়াই ঘণ্টার ফ্লাইট আঠারো ঘণ্টায় ঠেকেছিল। বিয়ের মূল অনুষ্ঠানই মিস করেছি।
এবারও তাই হলো।
অরল্যান্ডো থেকে প্লেন ছাড়ার কথা বেলা সোয়া তিনটায়। সন্ধ্যা সাতটার কিছু আগে জেএফকে পৌঁছে রাত নটার পর হিথরোর ফ্লাইট ধরার কথা। কিন্তু জেটব্লু এয়ারলাইন্সের লোকগুলো প্লেনের সময় নিয়ে রীতিমতো কুস্তি করতে শুরু করল। শেষ পর্যন্ত নিউইয়র্ক পৌঁছালাম রাত সাড়ে এগারোটায়।
ততক্ষণে হিথরোর প্লেন চলে গেছে।
কাউন্টারে দাঁড়িয়ে নতুন টিকিট পাওয়া গেল সকাল ৮টা ৪৫—এ।
হোটেল দেওয়ার কথা। কিন্তু বলল, অনেক রাত হয়ে গেছে, নিজে হোটেল রিজার্ভ করো, ২৫০ ডলার পর্যন্ত ফেরত পাবে।
সঙ্গে সঙ্গে অনলাইনে বুকিং দিলাম। খেয়াল করিনি, ততক্ষণে ঘড়ির কাঁটা রাত ১২টা ০১ মিনিটে পৌঁছে গেছে। অর্থাৎ এখন আগস্ট ১৮।
কীভাবে পৌঁছাব জানতে হোটেলে কল করলাম।
বলল, চেক—ইন টাইম দুপুর তিনটায়।
আমি থ!
বলি, বুকিং দিয়েছি এখন এসে একটু ঘুমানোর জন্য। ভোর ছয়টায় এয়ারপোর্টে ফিরব। তিনটায় চেক—ইন করার জন্য নিউইয়র্কেই থাকব না।
তা জানি না। আঠারো তারিখ। চেক—ইন টাইম দুপুর তিনটায়।
খালি রুম আছে?
আছে। তুমি চলে আসতে পারো। তবে নতুন করে বুকিং দিতে হবে।
আগের বুকিংয়ের কী হবে?
তা জানি না।
অনলাইন বুকিং কোম্পানি এক্সপিডিয়ায় কল করি।
জীবন্ত কোনো প্রাণী নেই।
কম্পিউটারের সুমিষ্ট কণ্ঠ তেতো লাগে।
বলে, তোমার বুকিং নন—রিফান্ডেবল। আর কোনো প্রশ্ন আছে?
বলি, কাস্টমার সার্ভিস।
মালিকের প্রতি কম্পিউটারগুলোর সার্ভিস আউটস্ট্যান্ডিং। একের পর এক অপশন দেবে, কিন্তু জীবিত কাউকে দেবে না।
মিনিট পঞ্চাশ লাইন ধরে থাকার পরে যাকে পাওয়া গেল তাকে কোকিলকণ্ঠী বলা যাবে না, তবে সে মন দিয়ে সব শুনল।
বলল, লাইনে থাকো, দেখি হোটেলে কল করে কিছু ব্যবস্থা করতে পারি কিনা।
ঝুলে আছি, বাদুড়ঝোলা।
কতক্ষণ গেল কেউ জানে না। পরে সেই কণ্ঠ—
সরি ফর দ্য ডিলে। কেউ ফোন ধরছে না।
যদিও তোমার বুকিং নন—রিফান্ডেবল, ঠিক আছে, আমি রিফান্ড করে দিচ্ছি।
ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসছিল।
তারপরেও মেয়েটাকে এবার কোকিলকণ্ঠী মনে হলো।
শাটল খুঁজে হোটেলে গিয়ে পৌঁছাতে রাত আড়াইটা। ২৫০ ডলারের বাজেট ট্যাক্সসহ ২৮০ অতিক্রম করল।
ঘুমালাম আড়াই ঘণ্টা। সকাল সাড়ে পাঁচটায় অ্যালার্ম। শাটল ছয়টায়।
নামার সময় লিফটে দেখা হলো মোটা—তাজা কাতলা মাছের মতো এক লোকের সঙ্গে।
গুড মর্নিং।
গুড মর্নিং।
তোমরা যাচ্ছ কোনদিকে?
হিথরো।
তাই নাকি? আমিও। কোন এয়ারলাইন?
জেটব্লু।
বাহ্! আমি তোমাদের ক্যাপ্টেন।
শাটলে উঠে ক্যাপ্টেনের সঙ্গে কথা জমে গেল।
ঘটনা কী, তোমাদের প্লেন এত ঘনঘন লেট হয় কেন?
প্লেন চালানোর লোক নেই। আমরা সবাই ওভারটাইম করছি। হায়ার করার মতো পাইলট পাওয়া যায় না।
সে আরও বলল, কম্পিউটার গেম খেলায় এক্সপার্ট এমন কিছু লোককে ইন্টারভিউ করা হয়েছিল। ওদের হ্যান্ড—আই কোঅর্ডিনেশন ভালো, রেসপন্স টাইম শর্ট। ধারণা করা হয়েছিল, হয়তো পাইলট হিসেবেও ওরা ভালো করবে।
পরীক্ষায় দেখা গেল সবকটা ফেল করেছে।
তার মানে ব্রেইনের প্রয়োজন এখনও শেষ হয়ে যায়নি।
শ্বেতা আমার কানে ফিসফিস করে, লোকটা এত মোটা, ও না প্লেন চালাতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
আমি বলি, চুপ। ও বেঁকে বসলে আমাদের দেরি হবে আরও একদিন। চারদিনের লন্ডন তিন দিনে নেমেছে, পরে না দুইদিনে ঠেকে।
যা হোক, সুখবর হলো সাত ঘণ্টার ফ্লাইট মটু—মামা সাড়ে ছয় ঘণ্টায় নামিয়ে এনেছে।
লন্ডনের সময়টা খুব ব্যস্ত কেটেছে।
রকি—পার্লি আর ওদের দুই বাচ্চার সান্নিধ্যে দুই রাত। এক রাত জয়—লিমার বাসায়। জয় আমার প্রিয় বন্ধু কেশবের ছোটভাই। লেনিনগ্রাদে ছিল তিন বছর, কিন্তু ১৯৯৩ সালে ইউরোপে চলে যাওয়ার পরে এই প্রথম আবার দেখা।
মোশাররফ ভাই লেনিনগ্রাদ গিয়েছিলেন আমার এক বছর আগে। চলে যান ১৯৮৮ সালে। ১৯৮৯ সালে তাঁর সঙ্গে লন্ডন ঘুরেছি। ২০১১ সালে আমার ওকালার বাসায় এসেছিলেন এক বিকেলের জন্য। তারপর এই আবার মুখোমুখি দেখা।
পৃথিবীটা এখন আর অত দূরে নয়। অভাব শুধু সময়ের। তাই প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা হয় এত কম।
একদিন সারাদিন কাটল তাঁর সঙ্গে। আগেই অনুরোধ করেছিলাম শেক্সপিয়রের জন্মস্থানে নিয়ে যেতে।
স্ট্র্যাটফোর্ড—আপন—এভন শহরটি নিজেই একটি জীবন্ত জাদুঘর। এই এভন নদীর তীরের বাজার—শহরে ১৫৬৪ সালে জন্ম নিয়েছিলেন উইলিয়াম শেক্সপিয়র, আর সেই একই শহরে ১৬১৬ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।
বেশ কয়েক ঘণ্টা কাটল তাঁর পৈতৃক বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখতে। সেখানে দেখলাম কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের আবক্ষ মূর্তি।
যে দেশের জন্ম হয়েছিল ১৯৭১ সালে, যার নামটিও সম্ভবত তাঁর দেওয়া, জাতীয় সংগীতও তাঁর লেখাÑসেই দেশেই আজ তাঁকে তুচ্ছ করার কী অসম্ভব আগ্রহ!
অথচ সকল আর্য—অনার্যের অন্যতম মহান পুরুষ শেক্সপিয়রের আঙিনায় তিনি আছেন সসম্মানে।
স্ট্র্যাটফোর্ডের হেনলি স্ট্রিটের এই বাড়িতেই তাঁর বাবা জন শেক্সপিয়র প্রায় পঞ্চাশ বছর বাস করেছেন। বাড়ির একাংশে চলত তাঁর দস্তানা তৈরির ব্যবসা।
এই বাড়িতেই মেরি আর্ডেনের সঙ্গে সংসার।
এই বাড়িতেই তাঁদের আট সন্তানের জন্ম।
প্রথম দুই মেয়েকে শৈশবেই হারিয়েছিলেন। তৃতীয় সন্তান উইলিয়ামÑবেঁচে থাকা সন্তানদের মধ্যে সবচেয়ে বড়। তাঁর পরে আরও পাঁচ ভাইবোন; তাদের মধ্যেও ছোট বোন অ্যান বেশি দিন বাঁচেনি।
শেক্সপিয়রের মৃত্যুর পরে বাড়িটি তাঁর পরিবার ও বংশধরদের হাত ঘুরে একসময় সরাইখানা, তারপর কসাইয়ের দোকান, আবার মানুষের বাসাও হয়েছে।
১৮৪৭ সালে বাড়িটি নিলামে উঠলে গুজব ছড়ায়, আমেরিকান শোম্যান পি. টি. বার্নাম নাকি এটি কিনে ভেঙে ভেঙে আমেরিকায় নিয়ে যাবেন।
তখনই অনেকে এগিয়ে আসেন।
তাঁদের মধ্যে ছিলেন চার্লস ডিকেন্সও।
তহবিল সংগ্রহ করে শেক্সপিয়র বার্থপ্লেস কমিটি তিন হাজার পাউন্ডে বাড়িটি কিনে নেয়। পরে সেই কমিটিই শেক্সপিয়র বার্থপ্লেস ট্রাস্টে পরিণত হয়।
একজন লেখকের জন্মের ঘর শেষ পর্যন্ত আর ব্যক্তিগত বাড়ি থাকে না।
মানুষ সেটিকে স্মৃতির মন্দির বানিয়ে রাখে।
