গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়— একত্রিশ দূরত্ব যখন বাঁধা পড়ে সুরে শিল্পী জগন্ময় মিত্র
ড. জীবন বিশ্বাসঃ কিছু শিল্পী দূরত্ব জয় করেন কণ্ঠকে বহুদূর ছড়িয়ে দিয়ে, জগন্ময় মিত্র যেন তার বিপরীত পথের মানুষ। তিনি দূরত্বকে টেনে আনেন মনের ভেতরেÑএমনভাবে, যেন বিচ্ছেদ, অপেক্ষা, স্মৃতি আর হারানোর বেদনা গায়ক ও শ্রোতার মধ্যকার একান্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় বাঁধা পড়ে। বাংলায় তিনি জগন্ময় মিত্র, বৃহত্তর হিন্দিভাষী সংগীতভুবনে জগমোহন। কিন্তু নাম বদলালেও কণ্ঠের গভীর স্বভাব বদলায়নিÑকোমলতা ছিল, দুর্বলতা নয়; বিষাদ ছিল, আতিশয্য নয়; আবেগ ছিল প্রবল, অথচ সংগীতের শৃঙ্খলা কখনো ভাঙেননি। এই দুর্লভ ভারসাম্যই তাঁকে বাংলা আধুনিক গান ও ভারতীয় লঘু—সংগীতের ইতিহাসে অন্যতম বিশিষ্ট ও প্রভাবশালী কণ্ঠে পরিণত করেছে।
১৯১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর কলকাতার চেতলায় মাতুলালয়ে জন্ম জগন্ময় মিত্রের। জন্মের অল্প আগে তাঁর বাবা যতীন্দ্রনাথ মিত্র প্রয়াত হয়েছিলেন, ফলে পিতৃস্নেহ ছাড়াই বৃহত্তর পরিবারের স্নেহ—আশ্রয়েই তাঁর বেড়ে ওঠা। ২০০৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর, পঁচাশিতম জন্মদিনের মাত্র দুই দিন আগে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। তাঁর জীবনকাল যেন উপমহাদেশীয় সংগীতের প্রযুক্তিগত ইতিহাসেরই এক দীর্ঘ সেতুÑপ্রথম যুগের গ্রামোফোন থেকে বেতার, চলচ্চিত্র, এলপি রেকর্ড, ক্যাসেট হয়ে টেলিভিশন পর্যন্ত বিস্তৃত।
বহুমাত্রিক শিল্পীসত্তা
‘আধুনিক গানের শিল্পী’Ñএই একটি পরিচয়ে তাঁর সংগীতশিক্ষার গভীরতা ধরা পড়ে না। ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুংরি ও টপ্পার নিয়মিত তালিম ছিল তাঁর। কেশব মুখোপাধ্যায়, দিলীপকুমার রায়, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় এবং উত্তর ভারতে অবস্থানকালে শম্ভু মহারাজের মতো গুরুজনের সঙ্গে তাঁর শিক্ষাসূত্রের কথা গবেষণামূলক জীবনীতে পাওয়া যায়। ১৯৩৮ সালের অল বেঙ্গল মিউজিক কম্পিটিশনে ধ্রুপদ, টপ্পা, ঠুংরি, বাউল, কীর্তন ও রাগপ্রধানসহ একাধিক বিভাগে তিনি প্রথম হন। পরে এলাহাবাদের সর্বভারতীয় সংগীত প্রতিযোগিতায় খেয়ালেও প্রথম স্থান অর্জন করেন। সে সময় বিচারকদের মধ্যে ছিলেন ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ। উত্তর ভারতের এই পর্বেই ‘জগন্ময়’ নামটি উচ্চারণ—বিভ্রাটে ‘জগমোহন’ হয়ে ছাপা হতে শুরু কেও, পরবর্তী সময়ে বাংলার বাইরে সেই নামই তাঁর পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়।
গ্রামোফোনের আগেই তাঁর জীবনে এসেছিল বেতার। কৈশোর পেরিয়েই কলকাতা বেতারকেন্দ্রে গান গাওয়ার সুযোগ পান তিনি। বেতারের প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল আজীবন। ১৯৩৮—এর শেষদিকে কলকাতায় ফিরে হেমচন্দ্র সোমের মাধ্যমে এইচএমভির সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে; সেই সূত্রেই তাঁর সাক্ষাৎ কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে। তখন গ্রামোফোন কোম্পানির সংগীতজগতে নজরুলের প্রভাব গভীর। এই সংযোগ শুধু কয়েকটি গানের জন্ম দেয়নিÑজগন্ময়ের গায়কীকে শিখিয়েছে কীভাবে শাস্ত্রীয় সংগীতের দীর্ঘ সাধনাকে তিন মিনিটের একটি রেকর্ডের মধ্যে সংহত করতে হয়।
সুর ও স্বরের শিল্পভূমি
এই সংক্ষিপ্ত রেকর্ড—পরিসরই ক্রমে তাঁর স্বাভাবিক শিল্পভূমি হয়ে ওঠে। তাঁর কণ্ঠের সৌন্দর্য উচ্চস্বরের প্রদর্শনে নয় বরং কোমল, পূর্ণ স্বরের ভেতরে আবেগ ধরে রাখার ক্ষমতায়। বাক্যের শেষ প্রান্তে প্রায় কথোপকথনের মতো মৃদু অবতরণ, শব্দের স্পষ্ট উচ্চারণ, সুরের অলংকারে সংযম এবং বিষাদের সূক্ষ¥ বর্ণবদলÑএসব তাঁর গায়নের স্বাক্ষর। শাস্ত্রীয় ব্যাকরণ জানতেন বলেই রাগের আভাস দিতে পারতেন, অথচ আধুনিক গানকে কখনো খেয়ালের আসরে পরিণত করতেন না। শিল্পী জগন্ময় মিত্র কবিতার প্রতি সংবেদনশীল ছিলেন বলেই শব্দকে শ্বাস নেওয়ার অবকাশ দিতেন।
তাঁর শ্রেষ্ঠ আধুনিক বাংলা গানগুলোতে এই শিল্পবোধ সবচেয়ে স্পষ্ট। ‘তুমি কি এখন দেখিছ স্বপন’, ‘ভুলি নাই ভুলি নাই’, ‘ভালোবাসা মোরে ভিখারী করেছে’, ‘আমি ভুলে গেছি তব পরিচয়’, ‘আমি স্বপন দেখেছি’Ñসব কটিই প্রেম ও স্মৃতির কাছাকাছি ভূগোলে জন্ম নেওয়া গান; অথচ তাঁর কণ্ঠে কোনো দুটি গানের বিষাদ একই রঙের নয়। কোথাও হারানোর ব্যথা, কোথাও প্রত্যাবর্তনের আকাক্সক্ষা, কোথাও আত্মসমর্পণ, কোথাও স্মৃতির গোপন দীপ্তি। কমল দাশগুপ্ত তাঁর অন্যতম প্রধান সুরসঙ্গী; প্রণব রায়, মোহিনী চৌধুরী, সুবোধ পুরকায়স্থ, শৈলেন রায়ের মতো গীতিকারের ভাষা তাঁর কণ্ঠে পেয়েছে মৃদু অথচ গভীর নাটকীয়তা।
চিঠির ইতিহাস
বাংলা কাব্যগানের ইতিহাসে ‘চিঠিÑতুমি আজ কত দূরে’ এক বিশেষ ঘটনা। সেখানে রেকর্ড যেন আর কেবল গান বহন করে না, বহন করে দূরের মানুষের উদ্দেশে লেখা এক দীর্ঘ আবেগপত্র। ‘সাতটি বছর আগে’ এবং ‘সাতটি বছর পরে’—র মতো কাহিনীগীতিও সেই স্মৃতি—নির্ভর সংগীতভাষাকে আরও বিস্তৃত করেছে। জগন্ময় মিত্র এই গানগুলো শুধু যে তিনি গাইতেন তা নয়, তিনি যেন স্মৃতির গতি নির্ধারণ করতেন। কোথায় থামতে হবে, কোথায় একটি শব্দ একটু দীর্ঘ হবে, কোথায় স্বরের ভেতর নিঃশব্দ আকুতি রেখে দিতে হবেÑএই সূক্ষ¥ পরিমিতিই গানগুলোকে ব্যক্তিগত জীবনের অংশ করে তুলেছে।
অন্যরূপে জগন্ময়
জগন্ময় মিত্র শুধু বিরহের শিল্পী নন। ‘আমি দুরন্ত বৈশাখী ঝড়’—এ পাওয়া যায় অন্য এক জগন্ময়কেÑউদ্দীপ্ত, সম্মুখমুখী, প্রায় বিদ্রোহের তাপময়। মোহিনী চৌধুরীর কথায় এবং কমল দাশগুপ্তের সুরে গানটির ঝড়, বহ্নিশিখা ও মুক্তির প্রতীক ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ যুগের রাজনৈতিক আবহকে ধারণ করে। যে কণ্ঠ প্রেমিকের নিঃসঙ্গতা বলতে পারত, সেই কণ্ঠই আবার ইতিহাসের উত্তাল সময়কে সমবেত শক্তির ভাষায় রূপ দিতে পেরেছে।
তাঁর সংগীতজগৎ আরও বিস্তৃতÑনজরুলগীতি, রবীন্দ্রসংগীত, রাগপ্রধান, টপ্পা, ভক্তিগীতি, বাংলা আধুনিক এবং হিন্দি গীত। ‘শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে’, ‘গভীর নিশীথে ঘুম ভেঙে যায়’—এর মতো গান তাঁর নজরুলসংগীতের স্বতন্ত্র ব্যাখ্যা স্মরণ করিয়ে দেয়। পরবতীর্তে তিনি রবীন্দ্রসংগীতও গেয়েছেন অনেক। তাঁর আধুনিকতা তাই ঐতিহ্য ভেঙে তৈরি হয়নি বরং ঐতিহ্যের সংগীতবোধকে শহুরে গ্রামোফোন—গানের সংক্ষিপ্ত ও সংহত রূপে রূপান্তরের মধ্যেই তার জন্ম।
বাংলার বাইরের জগমোহন
তাঁর জীবনের দ্বিতীয় বৃহৎ সংগীতভূগোল বোম্বে। হিন্দি ও উর্দু রেকর্ডের মাধ্যমে বাংলার বাইরেও তিনি আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন। পঞ্চাশের দশকের গোড়া থেকে বোম্বের সঙ্গে তাঁর কাজের যোগ বাড়ে, দশকের শেষভাগে সেখানেই স্থায়ী হন। ‘জগমোহন’ হয়ে ওঠে তাঁর বহির্বঙ্গীয় পরিচয়ের প্রধান নাম। ‘সুরসাগর’ উপাধিটিও চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি থেকে তাঁর নামের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়। বিভিন্ন জীবনীতে বলা হয়েছে, কলকাতার একদল শাস্ত্রীয় সংগীতজ্ঞ তাঁকে এই সম্মানসূচক উপাধি দিয়েছিলেন। তবে এর প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস সরকারি পুরস্কারের মতো স্পষ্ট নয়। তাই একে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার নয়, তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিল্পী—উপাধি হিসেবেই দেখা অধিক যথার্থ।
শুধু বাংলাই নয়, হিন্দি সংগীতেও কমল দাশগুপ্তের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৫ সালের মেঘদূত ছবির ‘ও বর্ষা কে পেহেল বাদল’ তাঁর হিন্দি পরিচয়ের অন্যতম স্মরণীয় গান। আবার বোম্বে গিয়ে তিনি শুধু গায়ক হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেননিÑসংগীত পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন। জ্ঞান মুখার্জির ‘সর্দার’ (১৯৫৫) ছবিতে তাঁর সুরে লতা মঙ্গেশকর গেয়েছিলেন ‘পেয়ার কি ইয়ে তক্ষিয়াম’। এই অধ্যায় প্রমাণ করে, তিনি শুধু বাংলা থেকে বোম্বেতে যাওয়া একজন শিল্পী নন, ভারতীয় লঘু—সংগীতের বৃহত্তর বিবর্তনেও তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল।
সংগীতে তাঁর দীর্ঘ অবদানের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আসে ১৯৯৯ সালে। ভারত সরকারের পদ্মশ্রী পুরস্কারের সরকারি গেজেটে তাঁর নাম লেখা হয়েছিল—‘ঝযৎর ঔধমধহসড়ু গরঃৎধ ধষরধং ঔধমসড়যধহ ঝঁৎংধমধৎ’—এবং শিল্প—সংগীতে অবদানের জন্য তিনি পদ্মশ্রী লাভ করেন। যেন একটি সরকারি পঙ্ক্তিতেই তাঁর তিনটি পরিচয় এসে পাশাপাশি দাঁড়ায় — জগন্ময়, জগমোহন, সুরসাগর।
জগন্ময় মিত্রের গাওয়া ২৫টি স্মরণীয় বাংলা গান
১। চিঠি—তুমি আজ কত দূরে, ২। তুমি কি এখন দেখিছ স্বপন, ৩। ভালোবাসা মোরে ভিখারী করেছে, ৪। আমি দুরন্ত বৈশাখী ঝড়, ৫। ভুলি নাই ভুলি নাই, ৬। সাতটি বছর আগে, ৭। সাতটি বছর পরে, ৮। আমি ভুলে গেছি তব পরিচয়, ৯। জানি জানি গো, ১০। আমি স্বপন দেখেছি, ১১। প্রেমের তাজমহল, ১২। গভীর নিশীথে ঘুম ভেঙে যায়, ১৩। শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে, ১৪। তব গানের পাখিরা যত, ১৫। প্রেমের না হবে ক্ষয়, ১৬। অশ্রুমুক্তা কেন তোমার চোখে, ১৭। প্রিয় যদি নাহি আসে, ১৮। যে ফুল আমারে দাও, ১৯। মন বিহঙ্গরে প্রাণ বিহঙ্গরে, ২০। আমার দেশে ফুরিয়ে গেছে ফাগুন, ২১। কেন আগের মতো, ২২। সেদিন তোমায় আমি, ২৩। বাঁশরী কি বাজিবে না, ২৪। কোন দূর প্রণয়ীর পথে, ২৫। আমি ভোরের স্বপ্নে দেখেছি তোমারে।
পরিশেষ
জগন্ময় মিত্রের শিল্পের একটি বড় তাৎপর্য এখানেইÑতাঁকে কখনো ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মধ্যে, বাংলা আর বোম্বের মধ্যে, কাব্যগান আর জনপ্রিয় গানের মধ্যে একটি মাত্র দিক বেছে নিতে হয়নি। তিনি এক ভাষা ও এক স্মৃতিকে অন্য ভাষা, অন্য ভূগোলের মধ্যে বহন করেছেন, অথচ নিজের কণ্ঠের অন্তরঙ্গতা হারাননি। শাস্ত্রীয় শিক্ষা তাঁকে দিয়েছিল সংযমের কাঠামো, গ্রামোফোন শিখিয়েছিল স্বল্প পরিসরে গভীরতার শিল্প, কবিতা শিখিয়েছিল শব্দের মধ্যবর্তী নীরবতার মূল্য আর দেশান্তর তাঁর সুরের মানচিত্রকে করেছিল প্রসারিত। জগন্ময় মিত্র যেন একটি দূরগামী কন্ঠের পরিচয়ে অন্তরের গভীর সরোবরে সন্তরণরত সুর। পুরনো রেকর্ড ঘুরছে, কেউ অনেক দূরে; একটি দরদী চিঠির উত্তর আসেনি, ঋতু বদলে গেছে। তারপর খুব মৃদু স্বরে গান শুরু হয়, আর সেই মুহূর্তে দূরত্ব আর দূরত্ব থাকে না, দূরত্বই হয়ে ওঠে সুর।
