মুখোশ আদনান || সৈয়দ নিউইয়র্ক
সরকারি খাতাপত্রের হিসেবে এখন বসন্ত কাল। কিন্তু বসন্তের কোনো নাম গন্ধ নেই। বাতাস কেমন জানি ভেজা সঁ্যাতসঁ্যাতে। গুমোট হাওয়া আর থেকে থেকে হালকা বৃষ্টি। ঠিক এমন বৈরি আবহাওয়াতেই ম্যানহাটনের কেন্দ্রবিন্দু টাইমস স্কয়ারে পয়লা বৈশাখের উপচে পড়া ভিড়। দূর থেকে ঢাকের শব্দ কানে আসছে। সেখানে একদল বাঙালি লাল, হলুদ আর সবুজ রঙের শাড়ি, পাঞ্জাবি পরে বাদ্যের তালে তালে ঘুরে ঘুরে নাচ করছে। ছোট ছোট শিশুদের গালে অনেক দরদ দিয়ে পয়লা বৈশাখের আলপনা এঁকে দিচ্ছেন কেউ কেউ। সেখানে এই শিশু—কিশোরদের আনন্দ যেন আর ধরে না। বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে নিউইয়র্কের মতো এমন একটি ফিরিঙি শহরে টাইমস স্কয়ারের লাল রঙের চত্বর যেন এক চিলতে বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে। বাঙালিদের ভিড় ঠেলে অনেক কষ্ট করে একটু পেছনের দিকে জায়গা করে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখেছে হালকা পাতলা গড়নের এক বাঙালি তরুণী। পরনে তার টাঙাইলের লাল—সাদা সুতির শাড়ি, কপালে লাল টিপ, গলায় এবং কানে বাংলাদেশ থেকে নিয়ে আসা দৃষ্টিনন্দন মাটির গয়না। হাতে সাদা শাঁখার চুড়ি। মুখটা হলুদ আর কালো রঙের বাঘের আদলে মুখোশে ঢাকা। মুখোশের কারণে মেয়েটাকে ঠিক চেনা যাচ্ছে না। তবে বয়সটা অনুমান করা যায়। চব্বিশ—পঁচিশ হবে।
মেয়েটির নাম মেহরিন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃতত্ত্ববিজ্ঞানে মাস্টার্স শেষ করে ঢাকার আইসিডিডিআরবির একটি রিসার্চ প্রজেক্টের সঙ্গে বেশ কিছুদিন যুক্ত ছিল। এখন নিউইয়র্কে এসে পুরোপুরি বেকার। নিউইয়র্কে বাবা—মা ভাইবোন সবাই অনেক আগেই ইমিগ্রান্ট হয়ে এসেছেন। অতএব, তারও একই পথ ধরে চলে আসা।
টাইমস স্কয়ারের রাস্তায় ঢাকের শব্দে বাঙালিদের কোমড় দুলিয়ে নাচ দেখতে অন্যদেশীরাও ঘাড় কাত করে উঁকি দিচ্ছে। ঢোল আর খোলের শব্দগুলো সেখানকার চকচকে ঝকঝকে বিলবোর্ডগুলোতে বাড়ি খেয়ে অদ্ভুত রকমের শব্দে বুমেরং হয়ে বাঙালি আত্মায় বাড়ি খাচ্ছে। সে এক অন্য রকম অনুভূতি। মেহরিন ঠিক করেছেÑসে—ও আজ অন্য কেউ হবে। এমন একজন মানুষ হবে যে মানুষটাকে সে নিজেই চেনে না। এর পেছনে একটা কারণও আছে। বাড়িতে বিয়ের কথাবার্তা চলছে। একটা পাত্রের খোঁজও পাওয়া গেছে। পাত্র তার মায়ের সঙ্গে ব্রংক্সে থাকেন। ব্যস! এতটুকুই সে জানে। বিস্তারিত জানার জন্য একটু অপেক্ষা করতে হবে। মেহরিনের মা অবশ্য আরও নানাভাবে পাত্রের খোঁজখবর নেয়ার চেষ্টা করছেন। এমনটা সব অভিভাবকরাই করে থাকেন। তবে, এসব বিয়ে—শাদির বিষয় নিয়ে মেহরিনের তেমন চিন্তা ভাবনা নেই। বিয়েটা না হলেই বরং ওর জন্য ভাল। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে মেহরিনের সঙ্গে একটি ছেলের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু পরে দেখা গেল ছেলেটি লুকিয়ে তারই এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর সঙ্গে চুটিয়ে প্রেম করছে। ধরা পড়ার পর স্বাভাবিকভাবেই ছেলেটির সঙ্গে ওর ব্রেকআপ হয়ে যায় আর গোটা পুরুষজাতির প্রতি এক দলা ঘৃণা আর বিদ্বেষ বুকে স্থায়ীভাবে জমা হয়। সেদিন থেকেই সে শপথ নিয়েছিল বিয়ে শাদির পথে এই জীবনে আর হাঁটবে না। কিন্তু নিউইয়র্কে আসার পর সিদ্ধান্ত পাল্টাতে হচ্ছে। শুধুমাত্র মা’র দিকে তাকিয়ে সে রাজি হয়েছে। যা খুশি ঘটুক, জীবনকে সে নিয়তির কাছে শপে দিয়েছে। মেহরিনের কথা হলো বিয়ে হলেই তো জীবনের রং বদলে যাবে। শুরু হবে এক মুখোশ পরা জীবন। অভিনয় করে চলতে হবে। অভিনয় করে কথা বলতে হবে। এরচেয়ে বরং আজ এই একদিনের জন্য মুখোশ পরে নিজের ইচ্ছেমত স্বাধীনভাবে পয়লা বৈশাখ উদযাপন করাটাই হবে বেশি আনন্দের। এসব ভাবতে ভাবতেই সে লক্ষ্য করে, ভিড়ে হঠাৎ কেউ তার পাশে এসে দাঁড়ায়। তারপর আড়চোখে মেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলে,
‘আপনিও কি মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছেন?’
মেহরিন একটু চমকে তাকায়। চেনা পরিচিত কেউ? কিন্তু সে সম্ভাবনা খুবই কম। দেখা গেল একটি ছেলে, তারই বয়সী হবে। সেও হলুদ রঙের বাঘের মুখোশ পরে আছে।
‘মানে? আমাকে বলছেন?’ মেহরিন ছেলেটির দিকে তাকিয়ে উত্তর দেয়। তবে মুখোশ পরার কারণে তার চোখমুখের কোন অভিব্যক্তি ঠিক বোঝা গেল না।
অবশ্যই। আপনাকেই তো বলছি। লক্ষ্য করে দেখেছেন, এখানে মুখোশ পরা মানুষ আপনি আর আমি! আরও অবাক বিষয় হলো আমরা দু’জনই ঠিক একই রকম মুখোশ পরে আছি!
ছেলেটির কথায় মেহরিন ঘাড় ঘুরিয়ে নৃত্যরত বাঙালিদের মুখগুলো এক পলকে দেখে নেয়। ছেলেটির কথা সত্য। কারও মুখে কোনো মুখোশ নেই। বিষয়টা খুবই কাকতালীয় বটে!
‘ঠিক বলেছেন! আমরা দু’জনই আজ মুখোশ পরেছি। আর মুখোশ পরলে কত ভালো লাগে! কেউ কাউকে চিনতে পারছে না। তাই না? এই যে আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না আর আমিও আপনাকে চিনতে পারছি না।’ মেহরিন কোমড় দোলাতে দোলাতে ছেলেটিকে বলে।
মেহরিনের কথা শুনে ছেলেটি এবার কথা বলার সুযোগ খুঁজে পায়।
’দেখুন, আমিও কিন্তু মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছি। আমার বিয়ের কথাবার্তা চলছে। মাকে কথা দিয়েছি তাঁর পছন্দের মেয়েটিকেই আমি বিয়ে করবো। তাই ভাবলাম, ফাঁসির দড়িতে ঝোলার আগে আজ নিজের মতো করেই সময় কাটাই। তাই, এই বৈশাখী উৎসবে চলে এলাম। একদিন অন্তত নিজের মতো থাকি। কী বলেন?’
ছেলেটির কথায় মেহরিন খুব অবাক হয়। মনে মনে ভাবে, ছেলেটির সঙ্গে দেখছি আমার অদ্ভুত মিল! কিন্তু মনের ভেতরে থাকা তোলপাড়কে স্বাভাবিক রেখে বলে,
‘সিরিয়াসলি?’
‘হ্যাঁ। আপনাকে মিথ্যা বলবো কেন? অআপনিও আমাকে চেনেন না আর আমিও না। আমাদের পরস্পর কোন স্বার্থও নেই এখানে। মিথ্যা কেন বলবো?’
ছেলেটার কথায় মেহরিন হিহি করে হেসে ওঠে।
ঢাকের তালে তালে শরীর দোলাতে দোলাতে টাইমস স্কয়ারে দু’জন মানব—মানবী ঘুরতে থাকে আর ফাঁকে ফাঁকে তাদের মধ্যে এভাবেই কথা চলতে থাকে।
হঠাৎ কিছুক্ষণ নিরবতা। তারপর নিরবতা ভেঙে ছেলেটিই বলে ওঠে, চলুন, পান্তা ইলিশ খাই। পয়লা বৈশাখ বলে কথা! খাবেন? টাইমস স্কয়ারের উল্টো দিকেই এক বাঙালি খাবারের স্টল দিয়েছে। আর শর্ত হলো আমি খাওয়াবো।
‘কেন? আপনি খাওয়াবেন কেন? ছেলে বলে?’
‘আরেহ নাহ! কি যে বলেন! লজ্জায় ফেলে দিলেন। ওসব কিছু না। গতকাল চাকরী থেকে প্রথম বেতন পেয়েছি। সেই বেতনের টাকা পকেটে পুরেই এখানে এসেছি। এই যে দেখেন, আমার পকেট বেশ স্ফিত হয়ে আছে!’ এই বলে ছেলেটা হাসতে হাসতে তার পকেটের দিকে আঙুল দিয়ে ইঙ্গিত করে।
ছেলেটির এমন সহজ সরল আচরণ মেহরিনের খুব ভালো লাগলো। সে মনে মনে ভাবে, এই যুগে মানুষ ভয়াবহ ক্রিটিক্যাল হয়ে গেছে। আর চিনি না জানি না এই লোকটা কিনা পকেট দেখিয়ে বলছে টাকা গিজগিজ করছে? আবার পান্তা ইলিশ খাওয়াবে? মুখটা কাছাকাছি নিয়ে মেহরিন ছেলেটাকে বলে, ঠিক আছে। তাই হোক। চলেন আপনার পান্তা ইলিশের দোকানে।
বৈশাখের হৈ—হুল্লোড় থেকে দল ছুট হয়ে তারা বর্ষবরণ উৎসবের পাশেই ছোট একটা টঙের মতো দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়টঙটার নামও বেশ খাসা! ‘রান্নাঘর’। দেখা গেল সেখানেও ছোটখাট বাঙালিদের জটলা। কেউ ফুচকা, কেউ চটপটিসহ নানা রকম বাঙালি খাবারের অর্ডার দিচ্ছে। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ চেয়ারে বসে খাচ্ছেন। ছেলেটা দোকানে খাবারের অর্ডার দিতে লম্বা লাইনে এসে দাঁড়ায় আর মেহরিন এই ফাঁকে দুটো খালি চেয়ার নিয়ে একটায় নিজে বসে আর অন্যটায় নিজের ব্যাগটা রেখে ছেলেটার অপেক্ষা করতে থাকে।
এদিকে টাইমস স্কয়ারের দেয়াল থেকে গানের শব্দগুলো গুমগুম করে ভেসে আসতে থাকে। সেখানে মোহিতোষ তালুকদার তাপস নামের এক গান পাগল বাঙালির কন্ঠ কানে আসছে। ’গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান, মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদী গাইতাম হায়রে..’ গানটি মেহরিনেরও খুব পছন্দের। আর এমন গান ভালোবাসবে না এমন বাঙালি কি দুটো আছে? এমন সময় ছেলেটি হাতে দুটো খাবারের প্লেট নিয়ে মেহরিনের সামনে এসে দাঁড়ায়।
ছেলেটি আসতেই মেহরিন মুখ খোলে। ’আচ্ছা, পাশেই কিন্তু ব্রায়ান্ট পার্ক। চলেন, সেখানে বরং আরাম করে বসি আর কথা বলতে বলতে খাই। সেই সাত সকালে এসেছি। এখন খুব ক্লান্ত লাগছে। নাকি আপনার যাওয়ার তাড়া আছে?’
‘না না। তাড়া থাকবে কেন? বললাম না? আজকের দিনটা শুধুই আমার। হয়তো এই সুযোগ আর জীবনে পাবো না।’
ব্রায়ান্ট পার্ক টাইমস স্কয়ারের কাছেই। তাই সেখানে যেতে তাদের খুব সময় লাগেনি। তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। সুনসান নিরবতা। পার্কে একজনকে দেখা গেল আপন খেয়ালে ছবি আঁকছেন। ছিপছিপে গড়নের পাতাবিহীন বড় রেইনট্রির আড়ালে এক জোড়া প্রেমিক প্রেমিকা অলস দুপুরে বসে আড্ডা দিচ্ছে। কখনো কখনো একে অপরকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাচ্ছে। মেহরিন সেদিকে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ ছেলেটির সম্বোধনে হুশ আসে।
‘এই যে এখানে বসেন। সুন্দর খালি দুটো বেঞ্চ পাওয়া গেল। কপাল ভালো বলা যায়। সন্ধ্যার সময়তো এখানে বসার সুযোগ পাবেন না।’
মেহরিন বেঞ্চে বসতে বসতে মুখোশটা খোলে। সেই সাত সকালে মুখোশ পরেছিল। মুখোশ খোলায় মেহরিনকে আরও সুন্দর লাগছিল। ওর কপালটা এক ঝাঁক এলোমেলো চুল দখল করে নেয়। গোলাপি গাল দুটো মুখোশের আড়ালে থেকে একেবারে লাল হয়ে উঠেছে। ছেলেটিও তার মুখোশ খুলে ফেলে।
আচ্ছা, মুখোশ যেহেতু খুলেই ফেলেছি তাহলে নাম জানতে অসুবিধা কি? ছেলেটির চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে মেহরিন।
মুখোশ খোলার পর ছেলেটার মায়াবি মুখটা যেন আরও জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে। ওর চুলগুলো ঈষৎ কোঁকড়ানো। বাদামি বর্ণ। নাকের নিচে ঘাম জমে উঠেছে। সেই ঘাম মুছতে মুছতে ছেলেটি বললো,
আমার নাম রাকিব। রাকিব হাসান।
বাহ! নামটাতে কেমন যেন গোয়েন্দা গোয়েন্দা ঘ্রাণ আছে।
তাই? আমাকে দেখলে গোয়েন্দা গোয়েন্দা মনে হয় বুঝি?
একদম না। বরং ঠিক উল্টো। আপনাকে বরং মুখোশ পরা অবস্থায় কেমন যেন ভয়াবহ কেউ মনে হচ্ছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে খুব সাদাসিধে মানুষ।
আরে বাপরে! আপনিতো দেখছি গোয়েন্দাদের বাপ! মানুষের চোখ মুখে দেখেই সব বলে দিতে পারেন!
তা পারি বটে! মানুষের চেহারা দেখে সেই মানুষটার ব্যক্তিত্ব, স্বভাব—চরিত্র সব কিন্তু বলে দেয়া যায়। অন্তত কাছাকাছি পর্যন্ত অনুমান করা যায়। শুধুমাত্র মানুষটাকে গভীরভাবে আপনাকে একটু গবেষণা করতে হবে। এই যা!
বাহ! এটা কিন্তু একজন মানুষের বিশেষ গুণ। যেমনটা আপনার আছে। আচ্ছা, আপনি যে এতক্ষণ কথা বলছেন অথচ আপনার নামটা কিন্তু বললেন না।
বলি নাই ইচ্ছে করে। কারণ আমি জানতাম আপনি আমার নাম জিজ্ঞেস করবেন। এই যে এখন জিজ্ঞেস করলেন। এখন নামটা বলবো।
মাই গড! আপনিতো দেখি রীতিমত ভবিষ্যত দ্রষ্টা!
না না। আমি কোন দ্রষ্টা ফস্টা নই। যদি তাই হতাম তাহলে নিশ্চয়ই নিজের ভবিষ্যৎটা জানাতে পারতাম, তাই না? যাইহোক, আমার নাম মেহরিন। মেহরিন চৌধুরী।
আচ্ছা, সত্যি করে বলেন তো আপনি আজ কেন এই মুখোশ পরে পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে এলেন?
ওমা! কারণ আবার কী! এই যে পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠান হচ্ছে, বাঙালির ঐতিহ্যের একটি উৎসব হচ্ছে, এসবে যোগ দিতে মুখোশ তো পরাই যায়? তাই না?
তা ঠিক।
তাহলে, আপনার কেন মনে হল আমার মুখোশ পরার পেছনে কোনো কারণ আছে?
কারণ আপনি ছাড়া আর কাউকে এখানে মুখোশ পরতে দেখলাম না?
রাকিবের কথা শেষ হতে না হতেই মেহরিন হেসে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ঘাড়টা রাকিবের দিকে কাত করে হাসতে হাসতে মেহরিন বলে, বলেছিলাম না আপনার নামের সঙ্গে একটা গোয়েন্দা গোয়েন্দা ঘ্রাণ আছে। এখন দেখছি আমার অনুমান মিথ্যে না। তাহলে আপনি যেহেতু সব কিছুই জানেন তাই এর উত্তরটা আপনিই না হয় বলে দিন।
না, আপনারটা আগে বলেন। পরে আমি আমারটা বলছি।
ঠিক আছে। এমন বিশেষ সিরিয়াস কিছু না। আমরা তো আমাদের গোটা জীবন অদৃশ্য এক মুখোশ পরে বসে আছি। কোথায় মুখোশ নেই? চলনে বলনে, শয়নে স্বপনে এমনকি আমরা যখন ফেসবুকে নিজেদের ছবি দেই সেটাও রংচং মেখে নতুন আরেক মানুষ বানিয়ে ফেলি। তাই না? এই সমাজ, রাষ্ট্র, ঘরে, বাইরে, পরিচিত, অপরিচিত সর্বত্র আমরা সারাক্ষণ অভিনয় করে যাচ্ছি। যে যত বেশি ভালো অভিনয় করছে সে তত বেশি উন্নতি করছে। সত্যি কথাটি আপনি কি বলতে পারছেন? সাহস আছে? বছরের ৩৬৫ দিন আমরা এই অদৃশ্য মুখোশে নানা ভাবে নানান নামে আটকে আছি। এই মুখোশ পরেই কিন্তু স্বামী তার স্ত্রীকে ঠকাচ্ছে, স্ত্রী তার স্বামীকে ঠকাচ্ছে। মুখোশ পরে বন্ধু তার বন্ধুকে হত্যা করছে, ভাই তার ভাইকে অধিকার বঞ্চিত করছে। আগে মানুষের ছিল ডবল স্ট্যান্ডার্ড চরিত্র। বুঝলেন, এখন ট্রিপল স্ট্যান্ডার্ড! মানুষ দিনে দিনে শুধুমাত্র এই মুখোশের কারণে ভয়ানক হয়ে উঠেছে। তাদের বিশ্বাস করা কঠিন। তাই, ভাবলাম, আজ এই একটা দিন সত্যিকারের মুখোশ পরেই সময় কাটাবো। আজ এমন একজন মানুষ হবো যে মানুষটাকে কেউ চিনবে না, আর আমি নিজেও চিনবো না। বিশ্বাস করেন আজ আমি যেন আমাকে চিনতে পারছি না। কারণ আজ আমি নিজের সঙ্গে কোনো অভিনয় করছি না। শুধু একটা কাগজের মুখোশের আশ্রয় নিয়েছি মাত্র।
কিন্তু এই যে আমি আপনাকে চিনে ফেললাম! আপনার নাম জানতে পারলাম, মেহরিন!
শুধু নামটাই জানতে পারলেন। নাম জানলেই কি একটা মানুষকে চেনা যায়?
মোটেই না। আপনি খুব সুন্দর করে আমাদের মুখোশ জীবনের চিত্রটি তুলে ধরলেন। অসাধারণ! সত্যি, আমরা সবাই এক অদৃশ্য মুখোশে বন্দী। মুখোশ পরে সুখের পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে আমরা নিজেরাই জানি না সুখটা আসলে কেমন। তবে, আমি মুখোশটা পরেছি অন্য একটা কারণে।
আচ্ছা?
হ্যাঁ, আমাকে এখানে কেউ একজন খুঁজছেন। তাকে ফাঁকি দেয়ার জন্যই এই মুখোশের আশ্রয় নিয়েছি।
এইতো জনাব রাকিব হাসান! রহস্যের জাল ফেলতে শুরু করলেন? বললাম না আপনার কথায় কোথায় যেন একটা রহস্য লুকিয়ে থাকে?
না, সাত্যি বলছি। একটা মেয়ে মানে ভবিষ্যৎ পাত্রী আজ পয়লা বৈশাখের এই অনুষ্ঠানে এসেছেন। এবং আমি জানি তিনি আমাকে খুঁজছেন?
আপনি কীভাবে জানলেন?
এখানে আসার আগে আমার মা আমাকে বলে দিয়েছেন। যদি কথা বলতে চায় যেন কথা বলি। আর কোনো ভালো রেস্তোরাঁয় নিয়ে আপ্যায়ন করি। আমার মার খুব ইচ্ছে এই মেয়েটার সঙ্গে আমার বিয়ে হোক। মেয়েটির পকেটে নাকি আমার একটা ছবিও আছে।
মাই গড! এতো দেখি সিরিয়াস ডিটেকটিভ সিনেমা! যে মেয়েকে আপনি এখনো দেখলেন না, জানলেন না এমনকি নামটাও জানেন না তেমন একজন মেয়েকে বিয়ে করবেন?
না, এই যে বললাম। এই মুখোশ জীবনে একজন মানুষকে চেনা অত সহজ না। হয়ত আমরা চেনার একটা ভান করি। তারপরও হয়তো চেষ্টা করি যতটুকু চেনা যায়। কথা হলো শুধু আমার পছন্দই তো যথেষ্ট না। মেয়েটাও আমাকে পছন্দ করতে হবে। তাই না? আর আমার মা সম্ভবত মেয়েটির মার সঙ্গেও কিছু আলাপ করে রেখেছেন। আমি মেয়েটিকে এখনো দেখিনি। আজ নিশ্চয়ই আমাকে না দেখতে পেয়ে মেয়েটি হতাশ হয়ে বাড়িতে রিপোর্ট করবে।
আচ্ছা, মেয়েটা যদি আপনাকে পছন্দ না করে?
হতেই পারে। তাহলে মা নিশ্চয়ই অন্যত্র কাউকে দেখবেন।
আর যদি এমন হয় আপনি আজ কাউকে পছন্দ করে ফেললেন?
রাকিব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, সেই একই কথা। শুধু আমি পছন্দ করলেই কি সব ঠিক হয়ে যাবে?
রাকিবের কথা শুনে মেহরিনের বুকটা হালকা কেঁপে ওঠে।
সূর্য ডুবে যায়। চোখের সামনে ম্যানহাটনের দালানগুলো আলোয় ঝলমল করে হেসে ওঠে। এবার ওঠার পালা। দু’জন দুদিকের দুই সাবওয়ে ট্রেন ধরবে। একজন যাবে ই ট্রেনে জ্যামাইকা, কুইন্স, আরেকজন ট্রেনে ব্রংক্স। বিদায়ের সময় রাকিব বলে—‘আশা করি আবার কখনো কোথাও দেখা হবে। আপনার জন্য অনেক শুভকামনা রইল।’
‘আপনার জন্যও।’ মেহরিনের সংক্ষিপ্ত উত্তর।
তারপর, দু’জনেই হেসে, বিপরীত দিকে হাঁটা শুরু করে। রাকিব তাঁর ব্রংক্সমুখি সাবওয়ের দিকে হাঁটতে হাঁটতে নাম না জানা শত মানুষের স্রোতে মিলিয়ে যায়। মেহরিন সেদিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। মনে মনে ভাবে, কত মানুষ অল্প সময়েই কত আপন হয়ে যায় আর কত মানুষ হাজার বছরেও অচেনা হয়ে থাকে!
মেহরিন ধরবে ই ট্রেন। জ্যামাইকা, কুইন্স। স্টেশনের প্লাটফর্মের সামনে এসে সদ্য কেনা নীল রঙের ব্যাগটায় ওর মেট্রোকার্ড। চেইন খুলে ভেতর থেকে মেট্রো কার্ডটা বের করতে গিয়েই সে আঁৎকে উঠে। একি! মেট্রোকার্ডের পাশে একটা পাসপোর্ট সাইজের ছবি। এখানে আবার কে ছবি রাখলো! কার ছবি? ছবির পাশে মায়ের হাতের লেখা একটা ছোট্ট নোট। সেখানে লেখা ‘ছবিটা ব্যাগে দিয়ে রাখলাম। ছেলেটা টাইমস স্কয়ারে বৈশাখের অনুষ্ঠানে যাবে। সুযোগ পেলে পরিচিত হবি। ফোনে বিস্তারিত কথা হবে।’
মেহরিন দ্রুত ছবিটা তার মুখের সামনে তুলে ধরে। কত মায়াবি একটা মুখ! সেই চোখ, সেই হাসি! মুহূর্তেই মেহরিনের ফর্সা গালে আনন্দের ঢেউ ফুটে ওঠে। সাবওয়ের প্লাটফর্মে রাখা ঘড়িটা জানিয়ে দিল ই ট্রেন আসতে আরও পাঁচ মিনিট বাকি।
