যা দেখেছি যা বুঝেছি—২৬ || মনিরুল ইসলাম
প্লেজারিজম
পশ্চিমা দেশে প্লেজারিম একটা বড় অপবাদসূচক অপমানজনক কাজ। একজন মানুষের প্রকাশিত কথন, লিখন বা ভাবনাকে যদি অন্য কেউ হুবহু নকল করে, অনুসরণকারীর লজ্জা ও লাঞ্ছনার শেষ নেই। এটাকে এক ধরনের প্রতারণামূলক চৌর্যবৃত্তির পর্যায়ে ফেলে দন্ডও দাবি করা হয়। সবকিছুকেই বাণিজ্যিকীকরণ করে ফেলার কারণে তাদের প্রত্যেকটি বক্তৃতা ও লেখা হয়ে যায় ‘পণ্য’, তাই ‘কপিরাইট’ করে বিক্রি/লাভের চিন্তা করে। প্রকাশনাকে পারা যায়, মানুষের চিন্তা—ভাবনা—কথাকে তো রুদ্ধ করা যায় না। আচ্ছা, আইন মেনে অন্যের প্রকাশিত কথায় তার স্বত্ব স্বীকার করে নিলাম কিন্তু তার চিন্তা—ধারণায়ও কি আমি সহমত পোষণ করতে পারব না? ‘জ্ঞান’—এর মালিকানা দাবি করা আর বাতাসের মালিকানা দাবি করা যেন একই ধাঁচের হাস্যকর মনে হয়। তাও অবাক হই না, কারণ আজকাল নাকি মহাসাগর—মহাকাশের মালিকানাও ভাগ হয়ে যাচ্ছে। ভাল। এর নাম উন্নতি, সভ্যতা। তো প্লেজারিজম কতবড় অন্যায়?
আমি এর মধ্যে এতবড় অন্যায় অবিচার দেখি না। একটা পূর্ণবিকশিত মানুষ অন্য আরেকটা পূর্ণবিকশিত মানুষের মতোই অভিন্নভাবে ভাববে, এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। সেজন্যই তো একজনের লেখা আরেকজনের মনে ধরে, মিল পায় নিজের মধ্যে। একজন মানুষের ভাবনা—কামনা—কল্পনা আংশিকভাবে হলেও আরেকজনের মতো হতে পারে। প্রকাশে তার শক্তি নেই বলে অন্যেরটা পড়ে নিজেরটাও ওভাবে প্রকাশ করতে পারে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধুলার তলে’। প্রত্যেক ধার্মিক যখন সাষ্টাঙ্গ প্রণাম/সিজদা করে বা বিজয়ী মানুষ যখন ভূমিতে পড়ে কপাল ঠেকায় মাঠে বা মঞ্চে, তখন তো সে এই কথাই বলে। সবার ভাষাজ্ঞান পর্যাপ্ত নয়, তাই বলে তার ভাবনা নেই একথা বলা যায় না। আসলে প্রত্যেক মানুষের ভাবনা অফুরান, জীবনভাবনা কমবেশি এক অভিন্ন সমান্তরাল।
পৃথিবীর সকল আত্মার মতো সমস্ত জ্ঞানও এক অভিন্ন অখন্ড, বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন পরিমাণে তার খন্ডাংশের সন্ধান পায়। একই ভাবনা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানুষের মধ্যে কমবেশি জাগ্রত ও প্রকাশিত হতে পারে, প্লেজারিমকে তাই বড়জোর পুনরাবৃত্তি বলা যায়। ভাবনার এই পুনরাবৃত্তি নিজ মনে বা অন্যের মনোভুবনে আসতে পারে। একই লেখকের, এমন কি ধর্মগ্রন্থেও, একই ভাবনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে বিভিন্ন লেখায়, কারণ একই ভাবনা একই মানুষের মধ্যে অনেকবার উদিত হতে পারে। আবার অন্যের মধ্যেও তার সেই ভাবনার সাদৃশ্য দেখা যেতে পারে। এতে আশ্চর্য হয়ে হইচই করার কিছু পাই না, বরং স্বস্তি পাই এই ভেবে যে, সব মানুষ মূলত একইভাবে ভাবে। মানুষ তো প্রতিদিন এক একভাবে ভিন্ন জিনিস ভাবতে পারে না, প্রতিটি মানুষও সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস ভাবে না। আমরা যদি কোনোকিছু একইভাবে, প্রকাশের সময় সেটা একই রকম হলে এত জোর আপত্তি কেন?
খঁুতখঁুতে সমালোচকগণ বলেন, এ লেখায় নতুন কি, মৌলিকত্ব কি? একজন নিজেকে যতই স্বতন্ত্র ভাবুক, মৌলিক দাবি করুক, মানুষ মূলত একই জিনিস একইভাবে চিন্তা করে। ব্যক্তিমানুষের মৌলিক জ্ঞান বলে কিছু নেই, জ্ঞান ইতোমধ্যে ছড়িয়ে আছে প্রকৃতিতে, জাস্ট আহরণ—অর্জন করতে হবে। প্রকৃৃতি থেকে যে যতটুকু সংগ্রহ করে বচনে বা বর্ণনে প্রকাশ করতে পারে, তার তত বাহাদুরি। এতে গর্ব করা গেলেও মালিকানা দাবি করা অযৌক্তিক। কথনে লেখনে নিজের কাছে ‘সত্য’ হও, সেই সত্য অন্যের সত্যের সাথে মিলে গেলে বিব্রত শঙ্কিত হয়ো না। তোমার চিন্তা ও বক্তব্য মৌলিক নয় বলে কেউ দোষারোপ করলে অপ্রস্তুত হয়ো না, কারণ কিছুই মৌলিক নয়Ñসবই ছিল অনন্তকাল ধরে। পুরনো কথাই নতুন মানুষ নতুন আঙ্গিকে নতুন ভঙ্গিমায় উপস্থাপন করে। আপনি আমি যেসব কথা এখন বলছি, সেকথা আগেও অনেকে বলেছে, পরেও বলবে। পার্থক্য শুধু অভিব্যক্তির ধরনে, প্রকাশের তারতম্যে। ‘রক—পেইন্টিং’ দেখে মনে হয় গুহামানুষের অনুভব—ভাবনা যেন চিরকালীন শিল্পীদের মতো, মিশরীয় ফারাও নারীদের সৌন্দর্যচেতনাও যেন আজকের নারীদেরই মতো তীব্র। অর্থাৎ ভঙ্গিমার পরিবর্তন হয়, চেতনার নয়।
অন্যদিকে আজকের জ্ঞান অভিজ্ঞতা তো হাজার বছর ধরে মানুষের পুঞ্জিভূত আহরিত জ্ঞানের সামষ্টিক ফসল। আমার জ্ঞান—অভিজ্ঞতা তাই পূর্বসূরিদের জ্ঞানেরই ধারাবাহিকতা। ‘অষষ ঃযব ড়িৎষফ'ং ধ ংঃধমব, ধহফ ধষষ ঃযব সবহ ধহফ ড়িসবহ সবৎবষু ঢ়ষধুবৎং’ কিংবা ‘ঊাবৎু সড়সবহঃ রং ধ ভৎবংয নবমরহহরহম’Ñএসব তো মানবেতিহাসের প্রথম কথা কিন্তু সেক্সপিয়ার/টি.এস. এলিয়ট তা নিজের মতো করে বললেন। নিউটনের সূত্রগুলো আগেও ছিল কিন্তু তিনি আমাদেরকে বুঝিয়ে দিলেন সহজ করেÑসেজন্য কৃতিত্ব নিতে পারেন, মালিকানা নয়। আর কোনো কথাই তো সবার কাছে চূড়ান্তভাবে সামগ্রিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই ভলতেয়ার বলেছেন, সকল সত্য তথ্য তত্ত্বকেই চ্যালেঞ্জ করা যায়, নিশ্চিত বলে কিছু নেই। মানুষ তাই পুরনো জ্ঞান—বিজ্ঞানকে অথবা বিদ্যমান সত্যকে নতুন করে আবিষ্কার করে। আসলে সে সত্য খঁুজে বের করে, জ্ঞানের সন্ধান পায়। সেজন্য আমি বলি পৃথিবী তথা মহাবিশ্বে কোনো উদ্ভাবন (রহাবহঃরড়হ) নেই, সবই আবিষ্কার (ফরংপড়াবৎু)।
প্রত্যেক মানুষের মাথায়ই কথার রাশি কিলবিল করে, বের হয়ে আসার জন্য উন্মুখ থাকে। প্রত্যেকেই নিজেকে কোনো না কোনোভাবে প্রকাশ করতে চায়। কিন্তু সকল নদীর স্রোত যেমন সমান নয়, সকল মানবমনের প্রকাশক্ষমতাও সমান নয়। প্রত্যেকের বিশ^ভাবনা তার চিন্তাশক্তির সীমায় বাঁধা। তবে প্রকাশ করতে না পারলেও কমবেশি সবাই জ্ঞানী। প্রত্যেক মানব—মন একই রকম, সেজন্যই বোঝালে একজনের কথা আরেকজন বুঝতে পারে। মেধা মনন বোধের মাত্রাগত পার্থক্য আছে, একচ্ছত্রতা নেই। রবীন্দ্রনাথকে পড়ে কেন মুগ্ধ হই, কারণ তাকে বুঝি, যদিও তার সমান প্রকাশ করতে পারি না। আমার মনে হয় এৎবধঃ সরহফং ঃযরহশ ধষরশব একথা অর্ধসত্য, পুরোসত্য হল সব মানুষই ঃযরহশ ধষরশব, পার্থক্য শুধু প্রকাশের ধরনেÑমাত্রায় তীব্রতায়। জ্ঞানের রাজ্য সীমান্তবিহীন কিন্তু মানুষের জ্ঞান—পরিধি, ধারণ—ক্ষমতা চিন্তাশক্তি সীমিত। সেজন্যই একই মানুষ একই চিন্তা বার বার করে, আবার ভিন্ন ভিন্ন মানুষ একই চিন্তা করে। যেমন একই ভাবনা রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন রচনায় ফিরে এসেছে এবং বড় বড় লেখকদের অনেক ‘উপলব্ধি’ অভিন্ন হয়ে প্রকাশিত হয়েছে।
আর মনোযোগ দিয়ে শুনলে দেখবেন প্রত্যেক মানুষই মাঝেমধ্যে গুরুগম্ভীর কথা বলে, কিন্তু আমরা পাত্তা দিই না। একই কথা রাজা বললে এক, প্রজা বললে আরেক। গুরু বললে ‘শিরোধার্য’, বস্ বললে ‘অলঙ্ঘ্য’ আর যদুমধু বললে ‘পাকামি’, দীনহীন বললে ‘বেশি বুঝিস না’। আসলে সবার ‘কথা বুঝ বোধ’ মোটামুটি একই। কেন একজনের লেখা অন্যজনে পছন্দ করে পড়ে? কারণ, এটা তারও মনের কথা। সে প্রকাশ করতে পারেনি কিন্তু তার কথাই অন্য একজন প্রকাশ করেছে। সকল মানুষের চিন্তা চেতনা আকাঙ্খা ভীতিÑসবই মূলত অভিন্ন। সেজন্য একজনের সাথে অন্যজনের লেখালেখি মিলে গেলে আমি তাতে দোষ দেখি না, সহমর্মিতা দেখি। এটাকে নকল বা ঢ়ষধমধৎরংস না বলে আমি ঢ়ষবধংঁৎব রহ ধমৎববসবহঃ বলি।
তবে অন্যের কথা ও ভাবভঙ্গি হুবহু কপি করে নিজের নামে প্রচার করা নিছক বোকামি, আলসেমি। যেমনই হোক, তোমার কথা তোমার মতো করেই লেখো না কেন? তোমারটা তোমার, তারটা তার। অন্যের সন্তানে যেমন নিজের আত্মতৃপ্তি হয় না, অন্যের লেখা নকল করলেও তাতে নিজের মনে তৃপ্তি আসবে নাÑমনে হবে পালক সন্তান!
পৃথিবীতে তাই কারো লেখাই মৌলিক নয়। যে দাবি করে ‘আমি মৌলিক’, সে কি একক অনন্য ভিন্ন কোনো প্রাণী? আমাদের দৈহিক পার্থক্য যেমন সমান্য, মানসিক পার্থক্যও ক্ষুদ্র্র। তাই যে লেখক অন্যের ‘মনের কথা’ বুঝতে পেরে ভাষায় প্রকাশ করতে পারে, পাঠক যখন নিজেকে লেখকের মধ্যে খঁুজে পায়, তার কৃতিত্ব দু’জনেরই প্রাপ্য।
ধর্ম—দর্শন পড়তে গিয়ে দেখি পৃথিবীতে এত বিদ্যা, এত জ্ঞান, এত মত, এত পথÑএক জীবনে আমি আর কতটুকু শিখতে পারব। মানবজন্মের শুরুতেই ঈশ্বর কি তাকে জ্ঞানের সবটুকু ভান্ডার দিয়ে সৃষ্টি করেন, নইলে একজন মানুষের চিন্তা চেতনা জ্ঞান অন্তর্দৃষ্টি কেন অন্যজনের সাথে মিলে যায়?
পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষ ‘হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল’ কিন্তু সে কী বলতে চায় তা সে জানে না, বলে শেষ করতে পারে না, প্রকাশের তাড়না পেলেও ভাষা পায় না। আমার সব লেখা আমার নিজস্ব ভাবনা কিন্তু এইসব ভাবনা শুধু আমার একার নয়, অনেকের। তাই যদি কারো সাথে মিলে যায়, তার কারণ, আমরা সম—প্রজাতির সম—ভাবনার মানুষ। ভাবনা অভিন্ন বলেই তো একজনের কথা অন্যজন মন দিয়ে পড়ে। সেজন্যই মনে হয় মানবজ্ঞান এক অভিন্ন অবিভাজ্য। শুধু প্রকাশে ভিন্নতা, অর্জনে কম—বেশি, ধারণ ক্ষমতার তারতম্য, উপলব্ধিতে হেরফের, বিকাশের প্রয়োগের সুযোগে কম—বেশি। একটি পূর্ণবিকশিত সুস্থ মস্তিষ্ক মোটামুটি একই জ্ঞান ধারণ করতে পারেÑকারো বিকাশ ঘটে, কারো অস্ফুট থেকে যায়। সেজন্যই সকল মানবমনের চাহিদা কল্পনা আকাঙ্খা অনুভব সমান না হলেও ধরন একই।
নিজেকে প্রকাশ করার জন্য পৃথিবীর প্রত্যেক প্রাণী, পাখি, মৎস্য এমনকি উদ্ভিদ পর্যন্ত প্রাণান্তকর চেষ্টা করে। যতটুকু পারে নিজে করে, তারপর নিজ দেহ থেকে জীন রেখে যায় বাকিটুকু কন্টিনিউ করতে। এমন যে মরুর ক্যাকটাস গাছ, সেও তার কন্টকিত পাতায় ফুল ফোটায়, ফল ধরায়। আপনি কেন নিজেকে গুটিয়ে আড়ালে ঢেকে রাখবেন? প্রকাশিত উদ্ভাসিত বিকশিত হনÑশুধু বাহ্যিকভাবে নয়, ভিতরটাকে প্রকাশ করুনÑকথায় ভঙ্গিমায় রচনায়। নিজেকে প্রকাশের জন্য সবাই গাইতে চায়, নাচতে চায়, অঁাকতে চায়Ñযতটুকুই সে পারুক, তাকে দমিয়ে না রেখে উৎসাহ দিন।
মানুষের অজান্তেই কর্ম তার স্বীকৃতি চায়। লেখা চায় মুগ্ধ পাঠক, নৃত্য চায় মুহূর্মুহূ তালি, সঙ্গীত চায় তন্ময় শ্রোতা, গৌরব চায় প্রচার প্রসার, সৌরভ চায় মত্ত গন্ধক। জমি চায় কৃষক, নারী চায় পুরুষ, পুরুষ চায় নারী। কারণ, পৃথিবীর প্রায় সবই পরিপূরক ও সম্পূরক।
সমরেশ মজুমদারের ‘বাঙালির নষ্টামি’ পড়লাম। মানুষের প্রকাশ ক্ষমতার অক্ষমতা নিয়ে ব্যঙ্গ করা উচিত নয়। প্রকাশ করতে পারে না বলেই অন্যকে ছোট ভাবা অন্যায়। প্রকাশ ক্ষমতার তারতম্য থাকতে পারে, বোধের নয়, অনুভবের নয়। সেই প্রকাশ নিয়ে ব্যঙ্গ করো না, তাকে মুক্তভাবে ব্যক্ত হতে দাও। জন্মদাত্রী মাত্রই প্রসবের পরই তীব্র যন্ত্রণা ভুলে তার সৃষ্টিকে পরম মমতায় কোলে নেয়, তেমনি লেখক তার রচনাকে আগলে ধরে সযত্নে। জননীর কাছে সন্তান যেমন অতুলনীয়ভাবে আদৃত, লেখকের কাছে তার লেখা অতীব আপন। কারো সন্তানকে যেমন ‘খারাপ’ বললে তার কষ্ট হয়, লেখকের লেখাকেও অবহেলা করলে বেদনাবোধ হয়।
সুতরাং প্লেজারিজম নিয়ে রং—তামাসা করা যায়, ঝগড়াঝাঁটি নয়। তবে একাডেমিক কারণে স্বার্থোদ্ধারে কৃতিত্ব জাহির করতে কেউ যদি সজ্ঞানে অন্যেরটা অবিকল নিজের বলে চালিয়ে দিতে চায়, সেটা গর্হিত। মূলকথা, অন্যের লেখা বা ভাবনার সাথে আপনারটা মিলে যাচ্ছে, এই আশঙ্কায় লেখা বন্ধ করবেন না। নিজে যা ভাবেন, নিজের মতো করে প্রকাশ করুন, মিল—অমিল সমালোচকরা খঁুজে বের করুক।
