কাজী নজরুল ইসলামের শেষজীবন || খায়রুল আনাম, শিকাগো
১৯৪২ সালের জুলাই মাসে চল্লিশ বছরে পড়ার অল্প পরেই সুঠামদেহী, সৌমকান্তি কাজী নজরুল ইসলাম হঠাৎই স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। সে সময় তিনি শেরে বাংলা ফজলুল হক প্রতিষ্ঠিত ‘নবযুগ’ পত্রিকা ও কলকাতা বেতার কেন্দ্রে কাজ করছিলেন। মাত্র দু’বছর আগে, ১৯৪০ সালে, কবির স্ত্রী প্রমীলা দেবী পক্ষাঘাত রোগে আক্রান্ত হন। ব্যাকুল কবি স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য তাঁর প্রায় সর্বস্ব ব্যয় করেন। কিস্তিতে কেনা মোটরগাড়ি, ভক্তের দান করা বালিগঞ্জের জমি, তাঁর লেখা বইগুলির কপিরাইট, তাঁর রেকর্ড করা গানের রয়্যালটিÑ সবই। দুর্ভাগ্য যে একা আসে না এবং সে কথাটা নজরুলের ভাগ্যেও যে অক্ষরে অক্ষরে পালিত হবে তা কে জানত?
ক’দিক আর সামলানো যায়? প্রথমত, স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ মেটাতে সর্বস্বান্ত হয়ে যাওয়া, দ্বিতীয়ত, নিজের স্নায়ুরোগের জন্য রোজগার করার ক্ষমতা হারানো। আর তৃতীয়ত বাড়িতে নিজেরা দু’জন ছাড়া আশ্রিত দু’তিন জন, শাশুড়ি গিরিবালা দেবী, ছোট ছোট দুই বাচ্চা, কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধ। সেজন্য চিকিৎসা তো দূর অস্ত, সংসারে এতগুলো মানুষের দু’বেলা খাওয়া দাওয়াটাই বা কি করে চলবে সেটাই প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়ালো। সেই টাকার জোগাড় করতে দ্বারে দ্বারে ঘুরে যে অপমান তিনি সহ্য করেছিলেন তা কল্পনারও অতীত। কালজয়ী ‘বিদ্রোহী’ কবিতা, শ্যামাসঙ্গীত ও ইসলামী গানের রচয়িতার প্রতি সম্মান দেখিয়ে কিছু টাকা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে তেমন কেউই এগিয়ে আসেনি।
তাই ১৯৪২ সালের ১৭ আগস্ট, কবি তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু ও অনুজপ্রতিম কবি, সুফি জুলফিকার হায়দারকে পত্রে লিখেছিলেনঃ
“প্রিয় হায়দার,
“...ইষড়ড়ফ ঢ়ৎবংংঁৎব—এ শয্যাগত। অতি কষ্টে চিঠি লিখছি। আমার বাড়িতে অসুখ, ঋণ, পাওনাদারের তাগাদা প্রভৃতি ড়িৎৎরবং, সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত খাটুনি। তারপর নবযুগের ড়িৎৎরবং ৩/৪ মাস পর্যন্ত। এই সব কারণে আমার হবৎাবং ংযধঃঃবৎবফ হয়ে গেছে। ৬ মাস ধরে (ফজলুল) হক সাহেবের কাছে গিয়ে ভিখারির মতো ৫/৬ ঘণ্টা বসে থেকে ফিরে এসেছি।...আমি ভালো চিকিৎসা করাতে পারছি না। ...আমার হয়তো এই শেষ পত্র তোমাকে। ...কথা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, অতি কষ্টে দু’একটা কথা বলতে পারি, বললে যন্ত্রণা সর্বশরীরে। হয়তো কবি ফেরদৌসীর মতো ওই টাকা আমার জানাজার নামাজের দিন পাব। কিন্তু ওই টাকা নিতে নিষেধ করেছি আমার আত্মীয়স্বজনকে। চিকিৎসার ব্যাপারে অবশ্য প্রথম দিকে বেশ কিছু ত্রুটি হয়েছে এবং বলা ঠিক হবে, অবহেলাই করা হয়েছিল। নতুবা কে জানে হয়তো—বা আজকের দিনের মতো এমনি এক ‘অসুখ সারাবার নয়’ বলবার মতো দিন না—ও আসতে পারত।”
চিঠি পেয়ে কবি জুলফিকার হায়দার একটুও দেরি না করে চলে আসেন নজরুলের ১৫/৪ শ্যামবাজার স্ট্রীটের দোতলার ছোট্ট বাসভবনে। কিছুক্ষণের মধ্যে হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার ডি, এল, সরকার হাজির হয়ে কি কষ্ট জিজ্ঞেস করলেন। কবি হাতটা বাড়িয়ে দিলেন, কিন্তু পরিষ্কার করে কিছু বোঝাতে পারলেন না। সপ্তাহ খানেক ধরে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা চলল। কিন্তু উন্নতির কোনো লক্ষণ দেখা গেল না।
তৎকালীন বাংলার প্রধানমন্ত্রী, ফজলুল হক সাহেবকে কবির অবস্থা জানানো হলো। তিনি তেমন পাত্তা না দিয়ে ব্যাপারটার দেখভালের জন্য অর্থমন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে দায়িত্ব দিলেন। তিনি সেই দিনই কবিকে দেখতে আসেন এবং কবির ইচ্ছানুসারে তাঁকে মধুপুরে হাওয়া বদল করতে পাঠান। মধুপুরে কবি দু’মাস ছিলেন। ডাঃ ডি, এল, সরকারের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাও চলছিল। কিন্তু কোনোভাবেই রোগ থেকে আরোগ্যের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না।
এমতাবস্থায় তাঁর অবস্থার কথা আবার পত্রপত্রিকায় ছাপা হলো। কিন্তু কেউ কোনো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এলো না। ঠিক হলো এ সবে হবে না। তাঁর অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা করাতে হবে। কিন্তু সে তো আরো ব্যয়বহুল ব্যাপার। সে সময় সাহায্যের জন্য প্রার্থনা করে যেসব জবাব তিনি পেয়েছিলেন, তা শুনলে চোখে পানি চলে আসবে, লজ্জায় মাথা কাটা যাবে। যেমন, আবার ফজলুল হক সাহেবের কাছে অর্থ সাহায্যের জন্য প্রার্থনা করা হলো। কিন্তু তিনি অর্থ না দিয়ে উপদেশ দিলেন। খাজা নাজিমুদ্দিনের কাছে যাওয়া হলো। তিনি বললেন, “অসুখ হয়েছে, ডাক্তার দেখান, আল্লা ভালো করে দেবেন”। শহীদ সোহরাওয়াদীর্ সাহেব বললেন, “নবযুগ—এর সম্পাদক কাজী নজরুল ইসলামের অসুখ বা আর্থিক দুরাবস্থার জন্য আমার কাছে কেন? তোমাদের ফজলুল হক সাহেবের কাছে যাও”। কলকাতার কিছু মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের সাধারণ মতামত ছিল যে, যেহেতু “নবযুগ” পত্রিকা মুসলিম সমাজের স্বার্থের বিরুদ্ধে লেখে, অতএব মুসলমানরা কেন তাকে সাহায্য করতে যাবে?
এত সবের পরেও তৃতীয়বার ফজলুল হক সাহেবের কাছে সাহায্যের আবেদন করা হয়। তখন তিনি কবিকে রাঁচিতে নিয়ে যাবার কথা বলেন। কিন্তু এতে প্রমীলা দেবী ও গিরিবালা দেবী কেউই রাজী ছিলেন না। এই সময় বিমলানন্দ তর্কতীর্থ নামে বিখ্যাত এক কবিরাজ কবিকে বিনা পয়সায় চিকিৎসা শুরু করে দেন। প্রথম দিকে কিছুটা কাজ হলেও শেষ পর্যন্ত তাতেও কোনো সুবিধা হয়নি। দিনে দিনে আরও নতুন নতুন উপসর্গ দেখা দিতে থাকে। থাকবে তো অবশ্যই, কারণ তাঁর প্রকৃত চিকিৎসা তো আদৌ শুরু হয়নি।
১৯৪২ সালের ২৫ অক্টোবর কবিকে কলকাতার তিলজলায় অবস্থিত লুম্বিনী মানসিক হাসপাতালে ডাঃ গিরীন্দ্রশেখর বসুর তত্ত্বাবধানে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাঁকে শিকল পরিয়ে বেঁধে রাখা হয়। কবির অমানুষিক চিৎকার, যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ ও সর্বোপরি ব্যয়বাহুল্যতায় অপারগ হয়ে বাধ্য হয়ে কবিকে আবার ঘরে ফেরত আনা হয়। বাড়িতে ফেরার পর তিনি কেমন নির্বাক, শান্ত, ভাবলেশহীন একজন মানুষ হয়ে যান। কবির ভেতরটা যখন এভাবে শান্ত হয়ে আসছে, তখন বাইরে গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন, নেতাজীর আজাদ হিন্দ ফৌজের লড়াই, হিন্দু—মুসলমান দাঙ্গা ইত্যাদি মিলে চতুর্দিকে তখন দারুণ দুর্যোগ। এরই মধ্যে এতদিন ধরে যিনি কবি নজরুলের সংসার দুহাতে আগলে রেখেছিলেন, সেই গিরিবালা দেবী একদিন নিরুদ্দেশ হয়ে কোথায় যে হারিয়ে গেলেন, কেউ তা জানলো না।
১৯৪৭ সালে স্বাধীন দেশের পশ্চিমবঙ্গ সরকার কবির চিকিৎসার জন্য অর্থ সাহায্য বরাদ্দ করেন। কবির অসুস্থতার শুরু, নিদারুণ আর্থিক সংকট ও দ্বিতীয় বিশ্বমহাযুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে দশ বছর কেটে গেছে। ১৯৫২ সালে মূখ্যমন্ত্রী ডা: বিধানচন্দ রায়ের পরামর্শে কবিকে সরকারীভাবে চিকিৎসার জন্য রাঁচি পাঠানো হয়। ইতিমধ্যে ১৯৫২ সালের জুন মাসে কবির বিশিষ্ট কিছু দরদী মিলে “নজরুল চিকিৎসা কমিটি” নামে একটি কমিটি গঠন করেন (অন্যত্র একে “নজরুল নিরাময় সমিতি” নামেও উল্লেখ করা হয়েছে)। এই সমিতিতে ছিলেন অতুল গুপ্ত, কাজী আব্দুল ওদুদ, সজনীকান্ত দাস, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়দের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। সমিতির উদ্যোগে পরের মাসের ২৫ জুলাই সস্ত্রীক কবিকে চিকিৎসার জন্য রাঁচির ‘হসপিটাল ফর মেন্টাল ডিজিজেস’—এ (এইচএমডি) পাঠানো হয়। সেখানে ডা: মেজর ডেভিসের তত্ত্বাবধানে চার মাস চিকিৎসা করেও কোনো ফল না পেলে তাঁকে আবার কলকাতায় ফিরিয়ে আনা হয়।
১৯৫৩ সালের ১৪ মে, কবিকে চিকিৎসার জন্য সরকারীভাবে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয় (মতান্তরে, ১৯৫৩ সালের ১০ মে, নিরাময় সমিতির উদ্যোগে সহ—সম্পাদক, হুগলী জেলার নতিপূর অধিবাসী, রবিউদ্দীন আহমদ ‘জল আজাদ’ জাহাজে চেপে কবিকে নিয়ে পাড়ি দেন লন্ডনে)। লন্ডনে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের দুটো গ্রুপ তাঁকে পরীক্ষা করেন। প্রথম গ্রুপ, যেটিকে প্রধান গ্রুপ মনে করা হয়, তাতে ছিলেন ডাঃ রাসেল ব্রেন, ডাঃ উইলিয়াম সেজিয়েন্ট ও ডাঃ মাককিস্ক। চার মাস ধরে চিকিৎসা করার পর ডাঃ ব্রেন ঘোষণা দেন যে, রোগটি দুরারোগ্য। কিন্তু অন্য বা দ্বিতীয় গ্রুপটি, প্রথম গ্রুপের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত ছিলেন না। তাঁদের মত অনুযায়ী কবি “ইনভোলিউশানাল সাইকোসিস (ওহাড়ষঁঃরড়হধষ চংুপযড়ংরং)” রোগে ভুগছেন। এটি একটি ’ডিপ্রেশান’ বা হতাশাজনিত রোগ, যেটি ৪০—৫৫ বছরের মেয়েদের ও ৫০—৬৫ বছরের পুরুষদের মধ্যে দেখা দিতে পারে। উদ্বেগ, অস্থিরতা, বিভ্রান্তি, অনিদ্রা, অ্যানোরেক্সিয়া, ওজন অনেক কমে যাওয়া, ইত্যাদি থেকে এটি উদ্ভুত হতে পারে। এর মধ্যে সোম্যাটিক বা নিহিলিস্টিক বিভ্রান্তি, হাইপোকন্ড্রিয়াসিস টাইপের বড় বড় কথাও চলে আসে। সেগুলোর মধ্যে আর নাই গেলাম।
কাজের কথা হলো, লন্ডনের এক ক্লিনিকে, এয়ার এনসোফালোগ্রাফি নামে এক ধরনের এক্সরে করে দেখা গেল কবির মাথার সামনের দিকটা (ফ্রন্টাল লোব) অনেকটা সংকুচিত হয়ে গেছে। সেজন্য ‘ম্যাককিস্ক অপারেশন’ নামে প্রসিদ্ধ অপারেশনটি করার আয়োজনের কথা উঠেছিল। কিন্তু ডাঃ ব্রেন, রোগীর এ অবস্থায় কোন ধরনের অপারেশনের পুরোপুরি বিরোধিতা করেন। এরপর কবির মেডিকেল রিপোর্ট ভিয়েনা ও ইউরোপের অন্যান্য বিখ্যাত চিকিৎসকদের কাছে পাঠানো হয়। জার্মানি ও ভিয়েনার চিকিৎসকরাও কোনো প্রকার অপারেশনের বিরোধিতা করেন। তাঁরা ‘সেলিব্র্যাল অ্যাঞ্জিওগ্রাফি’র কথা বলেন, যাতে মাথার রক্তপ্রণালীর মধ্যে রঙ ঢেলে এক্সরে করলে সবকিছু ঠিকমতো দেখা যায়। ব্যাপারটা অনেকটা এখনকার হার্টের রোগীদের জন্য নিউক্লিয়ার ফ্লুইড দিয়ে স্ট্রেস টেস্ট করার মতো।
যাই হোক, এর পর কবির শুভাকাঙ্খীদের পক্ষ থেকে তাঁকে সস্ত্রীক ভিয়েনায় পাঠানো হয়। সেখানে এক নোবেল বিজয়ী চিকিৎসকের যোগ্য ছাত্র, প্রখ্যাত চিকিৎসক ডাঃ হ্যান্স হফের অধীনে তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৫৩ সালের ৯ ডিসেম্বর তিনি পরীক্ষা করে বলেন, তিনি একেবারে নিশ্চিত যে কবি “পিক্স ডিজিজ” নামে এক রোগে ভুগছেন। এ রোগে রোগীর ফ্রন্টাল ও পাশের লোব সংকুচিত হয়ে যায়। তিনি আরো বলেন, রোগটি এখন এমন পর্যায়ে চলে এসেছে যে, চিকিৎসা করে এখান থেকে ওঁকে আগের স্বাভাবিক অবস্থায় আর ফেরানো অসম্ভব।
অতএব নজরুলের দল ১৯৫৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর, সোমবার রোম থেকে দেশের উদ্দেশে যাত্রা করেন। এর পর পশ্চিমবঙ্গের তখনকার মূখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় ভিয়েনা যান ও ডাঃ হ্যান্স হফের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে সবকিছু অবগত হন। কবির আর কোনো চিকিৎসা হয় না। তবে পরে তাঁর জীবনে আর এক অপ্রত্যাশিত পর্ব শুরু হয়। তার মধ্যে ১৯৬২ সালের ৩০ জুন, প্রমীলা দেবী মাত্র ৫৪ বছর বয়সে মারা যান। কবির গ্রাম, বর্ধমানের চুরুলিয়াতে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। ফলে কবি সত্যিকার অর্থে একেবার নিঃসঙ্গ হয়ে গেলেন। এরপর ১৯৭২ সাল পর্যন্ত কবির জীবন কাটে অবজ্ঞায়, অবহেলায়, রাষ্ট্রীয় অনুগ্রহের আশায়, বার বার বাসস্থান বদল ও প্রায় বিনা চিকিৎসায়।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর, ১৯৭২ সালে তখনকার রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নিমন্ত্রণে ভারতে যান। তিনি প্রস্তাব দেন যে, কবির ১৯৭২ সালের জন্মদিনটি তাঁরা বাংলাদেশে কবিকে সামনে রেখে পালন করতে চান। পরের বছর, ১৯৭৩ সালে কবির জন্মজয়ন্তী পশিচমবঙ্গে পালিত হোক। এই প্রস্তাবে রাজী হয়ে ভারত সরকার কাজী নজরুলকে বাংলাদেশে নিয়ে যাবার অনুমতি দেন।
১৯৭২ সালের ২৪ মে বাংলাদেশ বিমানে নজরুল ইসলামকে সপরিবারে বাংলাদেশে আনা হয়। উচ্ছ্বসিত হাজার হাজার বাংলাদেশী ঢাকা বিমান বন্দরে এসে তাঁকে অভ্যর্থনা জানায়, যদিও কবি নিজে তার কিছুই বুঝলেন না। পুর্বপ্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ সরকার কিন্তু আর কবিকে ভারতে ফেরত দিলেন না। কবির প্রতি প্রাণঢালা ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, যত্ন, চিকিৎসা ও পরিষেবা লক্ষ্য করে ভারত সরকারও আর তা নিয়ে জেদাজেদি করেনি। এই অভুতপূর্ব আদর, যত্ন ও আগ্রহ দেখে কবির নিকট আত্মীয়রাও তেমন উচ্চবাচ্য করেননি। ধানমন্ডির এক সরকারী বাসভবনে কবির বোধহীন, নিঃশব্দ জীবন ধীরে ধীরে অতিবাহিত হতে থাকল। সঙ্গে তাঁর বড় পুত্রবধু উমা কাজী ও নাতনি খিলখিল কাজীও থেকে গেলেন।
১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি, কবির ছোট ছেলে কাজী অনিরুদ্ধ কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৭৪ সালেরই ৯ ডিসেম্বর কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে ডি লিট উপাধি দেওয়া হয়। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে কবি নজরুলকে বাংলাদেশের নাগরিত্ব দেওয়া হয় এবং ২১ ফেব্রুয়ারিতে তাঁকে একুশে পদক দিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত করা হয়। এদিকে কবির স্বাস্থ্য ক্রমশ অবনতির দিকে যাচ্ছিল। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকার পি জি হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর স্ত্রী প্রমীলা দেবীর শেষ ইচ্ছা ছিল কবির নিজ পৈতৃকভূমি চুরুলিয়াতে তাঁর নিজের কবরের পাশে যেন তাঁর স্বামী, কবি নজরুল ইসলামকে কবর দেওয়া হয়। তখন সম্ভবত তিনটি কারণে সেটি হয়ে ওঠেনি।
প্রথমত, বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দিয়ে তখন কবিকে বাংলাদেশী হিসেবে ধরা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, নজরুল তাঁর বিখ্যাত এক গানের মাঝে বলে গিয়েছেন, “মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই/ যেন কবর থেকে মোয়াজ্জিনের আযান শুনতে পাই”। সেই অনুযায়ী, একুশবার তোপধ্বনির মাধ্যমে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সামরিক মর্য্যাদায় কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে কবরস্থ করার ব্যবস্থা হয়। তৃতীয়ত, খবর পেয়ে কবির বড়ছেলে কাজী সব্যসাচী যখন কলকাতা থেকে ঢাকা আসছিলেন, তখন কলকাতা এয়ারপোর্ট থেকে বিমান ছাড়তে লেট হয়েছিল। তিনি ঢাকায় ঐ কবরস্থানে যখন পৌঁছান, ততক্ষণে কবি কবরে শায়িত হয়েছেন।
কবির জানাজার নামাজে কয়েক হাজার মানুষ জমায়েত হয়েছিল। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকামন্ডিত কাজী নজরুলের মরদেহ সোহরাওয়ার্দী ময়দান থেকে ঐ মসজিদের পাশে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর মৃত্যু উপলক্ষে বাংলাদেশে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হয়। তবে পরবতীর্তে ঢাকার ঐ কবর থেকে কিছু মাটি নিয়ে চুরুলিয়ায় কবিপত্নীর পাশে তাঁকে আবার কবর দেওয়া হয়। অপরদিকে ভারতের আইনসভায় প্রয়াত কবির সম্মানে এক মিনিটের জন্য নীরবতা পালন করা হয়।
ইদানিং নজরুল চর্চা বেশ ব্যাপক উদ্যমে শুরু হয়েছে। তার লেখা গদ্য, পদ্য ও গান নিয়ে নানা গবেষণা ও পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে। দুই বাংলাতেই নজরুল মঞ্চ, পাঠাগার, অ্যাকাডেমি ও বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। আজ কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাভাষার কবি হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত, আদৃত ও প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে যে সম্মান তিনি সেদিন পেয়েছেন ও এখনও পেয়ে চলেছেন, তাঁকে নিয়ে যতটা ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও উৎসাহ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হচ্ছে, সেটি লক্ষ্য করলে মনে হয় তাঁর কষ্টে ভরা জীবন—মরুতে যেন মরূদ্যান তৈরি হয়ে চলেছে।
(তথ্যসূত্রঃ বিভিন্ন গ্রন্থ, পত্র—পত্রিকা, টিভি সাক্ষাৎকার, ইউ টিউব, নানা অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা, উইকিপিডিয়া) ।
