চক্রবর্তীদের জীবন গেল কুচক্রীদের বেড়াজালে আনিস আহমেদ
আজকাল প্রায়শই অনাকাঙ্খিত বিষন্নতায় মনটা বিষিয়ে ওঠে। প্রতিদিন শুনতে পাই, জানতে পাই বাংলাদেশে সন্ত্রাসীদেও দোর্দন্ড দাপটের কথা। এখন চুরি—ছিনতাই একদম সাধারণ বিষয়, এগুলো এখন আর অপরাধ বলে গণ্যই করা হয় না। আর তারই সমান্তরালে হত্যা ধর্ষণও প্রায় প্রাত্যহিক ব্যাপার হয়ে উঠছে। অতি সম্প্রতি রংপুরে একই সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা, কন্যা আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী এবং পুত্র আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রহস্য—জাল ক্রমশই গভীর হচ্ছে। মাদকাসক্ত দুই ব্যক্তি, সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ এই চারজনকে হত্যা করেছে বলে পুলিশের প্রাথমিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে এ নিয়ে নানান বিতর্ক রয়েছে। এই মামলার বাদী ও নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী দাবি করেছেন যে এই হত্যাকান্ডের পেছনে বড় কোনো শক্তি কাজ করছে। তাঁদের শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে গোপীনাথ চক্রবর্তী স্পষ্ট করে বলেন, ‘এখানে একটা বড় চক্র রয়েছে। দুজনের পক্ষে চারজনকে হত্যা করা সম্ভব নয়। একটা মানুষ খুন করা চাট্টিখানি কথা নয়। পেছনে কোনো বড় শক্তি আছে, অলক্ষে, আড়ালে।’ হত্যার আলামত সম্পর্কেও ভিন্ন ভিন্ন মত পাওয়া যাচ্ছে। পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে নিহত দুই নারীর শরীরে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে কী না, তা নিয়ে পুলিশের বক্তব্যের সঙ্গে রংপুর মেডিকেল কলেজের মর্গের ডোমের দেওয়া তথ্যের ভিন্নতা দেখা দিয়েছে। মর্গের ডোমের দাবি, নিহত গণপতি চক্রবর্তীর মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর শরীরে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে। তার মায়ের শরীরেও ধর্ষণের চিহ্ন রয়েছে। মর্গের ডোম বলেন, ‘আমি অনেকদিন ধরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লাশ কাটি। ময়নাতদন্তের জন্য এখানে চারটি লাশ আনা হলে আমি লাশগুলো কাটি। ডাক্তার আমাকে বলে, দেখো তো কিছু আছে কিনা। আমি দেখি মেয়ের ভ্যাজাইনা থেকে বীর্য বেরোচ্ছে। তখন ডাক্তার বলছে রাখি দেও। আমি রাখি দিলাম। এর মধ্যে দুইটা ভ্যাজাইনা সোয়াব সিআইডি পুলিশ নিয়ে গেছে, দুইটা মেডিকেলে পরীক্ষা করার জন্য দিছে... গোপন কথা বাহিরে বলা যাবে না। তখন ডাক্তার রিপোর্ট লিখবে একটা, আমি বলবো একটা। ডাক্তার বলতে মানা করছে বলে বলতে পারলাম।’ তবে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবুলকুমার বিশ্বাস জানিয়েছেন, ধর্ষণের চেষ্টার কোনো লক্ষণ তারা পাননি। এদিকে তদন্ত সম্পন্ন হবার আগেই রংপুরের পুলিশ প্রশাসনে পরিবর্তনও আনা হয়েছে। সবটাই যেন আজব এক রহস্যের চাদরে মোড়া।
ইয়াবা সেবনকারী বলে অভিযুক্ত, সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ এবং ফরেনসিকের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবুলকুমার বিশ্বাস, সকলেই সনাতন ধর্মাবলম্বী বলে জানা গেছে। অভিযুক্ত সিদ্ধার্থের বাবাও দাবি করেছেন যে সেই রাতে সে কোথাও যায়নি। সেই স্কুলের বর্তমান প্রধান শিক্ষকও পুলিশের প্রাথমিক প্রতিবেদন খন্ডন করেছেন। প্রশ্ন উঠেছে তাহলে কি কেউ কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার চেষ্টা করছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ৫ আগস্টের পর বিশেষত, ভারত বিরোধিতা এবং হিন্দু বিরোধিতাকে সমান্তরালভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে সেই কথিত দ্বিজাতিতত্ত্বের ভ্রান্ত নীতির কারণে। মনে রাখা দরকার ভারত একটি রাষ্ট্র আর হিন্দুত্ব একটি ধর্ম। বাংলাদেশের হিন্দুরা বাংলাদেশের নাগরিক। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদান কিছু কম নয়। সেই অবদানকে অস্বীকার করার ব্যর্থ চেষ্টা হিসেবে ৫ আগস্ট থেকে যে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে সেটি কোনো ক্রমেই মেনে নেয়া যায় না। হিন্দু ও মুসলমানকে জাতি হিসেবে আখ্যায়িত করে যে বিভেদ ও বিভাজন সৃষ্টি করা হয়েছিল সেই ১৯৪৬—৪৭ সালে এবং যে বিভাজনকে বাংলাদেশের মানুষ অবজ্ঞা করেছিল ’৪৭ পরবর্তী সময়ে; এমনকী বাংলাদেশের মানুষকে বিভক্ত করতে পারেনি ১৯৬৫ সালেও ভারত—পাকিস্তান যুদ্ধের সময়ে, বিভাজনের যে তত্ত্বকে আমরা সম্পুর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলাম ১৯৭১, সেই বিভ্রান্তিতে আবার যেন জাতি নিমজ্জিত হচ্ছে।
গণপতি চক্রবর্তী পরিবারের এই নির্মম হত্যাকান্ড যে কোনো সাধারণ হত্যাকান্ড নয়, এর পেছনে যে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে সেটা বলাই বাহুল্য। এই ঘটনার আসামি করা হয়েছে যে দু’জন তরুণকে তারাও কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক। তাই হয়ত কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে এটা বলা সহজ হচ্ছে যে ঘটনাটি সাম্প্রদায়িক নয়, মাদকাসক্ত দুই তরুণের অপকর্ম। তবে নানান তথ্য প্রমাণে উঠে আসছে ভিন্ন রকমের চালচিত্র। চূড়ান্ত তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এটাও হয়ত কারও পক্ষে বলা সম্ভব নয় যে প্রকৃত ঘটনা কি ছিল। তবে অনেকেই এমন আঁচ অনুমান করছেন যে তরুণদের বোঝা—পড়ার মাধ্যমে এই ঘটনার আসামী করা হয়েছে; হয়তো পরবর্তীতে তথ্য প্রমাণের অভাবে তারা মুক্তিও পেতে পারে। কিংবা এক ঢিলে একাধিক পাখি মারার চক্রান্ত হিসেবেই চক্রবর্তী পরিবারের এই সর্বনাশ করা হলো। এমনটি মনে করার যৌক্তিক কারণ হচ্ছে এই হত্যাকান্ডের বিবরণ ও তদন্ত নিয়ে যে পরস্পর বিরোধী সংবাদ আমরা পাচ্ছি তাতে অন্তত মনে হচ্ছে না যে ইয়াবা সেবনকারী দুজন তরুণ চারজনকে নির্বিশেষে হত্যা করবে, নিহতদের বাড়িতে প্রবেশ করবে, স্নান করবে, চুরি করবে এবং আবার ইয়াবা সেবন করবে। সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার হচ্ছে গণপতি চক্রবর্তীর তরুণী কন্যা আগমনী চক্রবর্তী প্রার্থীর যখন বিয়ের পিঁড়িতে বসার কথা, তার অল্পদিন আগেই তাকে হত্যা করা হলো। তার ভালোবাসার পাত্র এই বেদনাবিধুর সময়ে যে কষ্টের সম্মুখীন হয়েছে তা বর্ণনাতীত। তেমনি কষ্ট ভোগ করছেন গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তীও। তাঁদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যও এতটাই সন্ত্রস্ত যে তাঁরা এ ব্যাপারে মুখ খুলতে রাজি নন, বোধগম্য কারণেই।
অসাম্প্রদায়িক আদর্শকে অবলম্বন করে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে যে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে, নয় মাসের যে যুদ্ধে বহু হিন্দু নারীর সিঁথির সিঁদুর মুছে যায়, যে দেশ আজন্ম লালিত তাঁদেরই দেশ সেই দেশে যখন তাঁরা নিরাপদ বোধ করেন না, হয়ত প্রাণভয়ে বাধ্য হয়ে ভারতে চলে যাবার কথা ভাবেন তখন এ লজ্জা আমাদের সকলের। সত্য বটে কেবল হিন্দু কিংবা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা নন, উদারপন্থি মুসলমানরাও, কট্টরবাদী জঙ্গিদের রোষানলে পড়ে থাকেন। মুক্তিযুদ্ধ যে উদারতা নিয়ে এসেছিল আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশে যেখানে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষ সকলের সহ—অবস্থান থাকার কথা, সেই বাংলাদেশ এখন কোথায়। স্বৈরাচার, স্বৈরাচার বলে যারা চিৎকার করেছিল ২০২৪ সালের জুলাই আগস্টে তাদের দৃষ্টিতে স্বৈরাচারের পতন ঘটানোর জন্য, তারা যে এখন প্রকৃত অর্থেই স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছে তা দিব্যদৃষ্টিতেই দেখা যাচ্ছে। আর এই স্বৈরাচারের শিকার হচ্ছেন নিরীহ মানুষ। কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করাটা যেমন স্বৈরাচারেরই একটি রূপ, তেমনি কোনো রাজনৈতিক দলের অনুসারীদের নির্বিচারে হত্যা করাটা তেমনই স্বৈরাচারী আচরণ। আর রাজনৈতিক দলের সমর্থক না হয়েও, বিশেষ ধর্মের অনুসারীদের ওপরও যে নিপীড়ন চলছে তা কোনো যুক্তিতেই সমর্থনযোগ্য নয়।
চক্রবর্তীরা কেবল নয়, সকলেই কিছু কুচক্রীদের চক্রান্তের শিকার হচ্ছেন। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানোর ভাষাও খুঁজে পাইনা আজকাল।
