জল, নীরবতা ও আত্মার অবয়বঃ জার্সি সিটির 'ডধঃবৎ'ং ঝড়ঁষ' || আখতার আহমেদ রাশা

নগর জীবনের অবিরাম কোলাহল, যান্ত্রিক ব্যস্ততা আর নদীর জলের কলধ্বনির মাঝখানে হঠাৎ যদি আশি ফুট উঁচু এক বিশাল শুভ্র মুখাবয়ব দেখে আপনার দৃষ্টি থমকে যায়Ñতবে বুঝতে হবে, আপনি জার্সি সিটির নিউপোর্ট ওয়াটারফ্রন্টে দাঁড়িয়ে আছেন। স্প্যানিশ শিল্পী জউমে প্লেনসা (ঔধঁসব চষবহংধ)— সৃষ্টি করা এই বিখ্যাত ভাস্কর্যটির নাম 'ডধঃবৎ' ঝড়ঁষ' (জলের আত্মা) জার্সি সিটির হাডসন রিভারওয়াক ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভাস্কর্যটি ম্যানহ্যাটানের সুবিশাল স্কাইলাইনের দিকে মুখ করে রয়েছে। এর ডান হাতের তর্জনীটি নিজের ঠোঁটের ওপর স্পর্শ করে আছেÑ যেন পুরো নিউইয়র্ক নিউজার্সির যান্ত্রিক নগরজীবনকে নীরবতার এক চিরন্তন বার্তা দিচ্ছেÑ‘একটু শান্ত হও, চুপ করো, শোনো 

১৯৫৫ সালে স্পেনের বার্সেলোনায় জন্মগ্রহণ করা জউমে প্লেনসা বর্তমান বিশ্বের অন্যতম খ্যাতিমান ভাস্কর পাবলিক আর্ট নির্মাতা। প্লেনসার শিল্পকর্মের মূল বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের মুখ, অক্ষর, আলো এবং নীরবতার মেলবন্ধন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রধান শহরগুলোতে তাঁর তৈরি বিশালাকার মাথা বা মুখাবয়বের ভাস্কর্য দেখা যায়। ২০০৪ সালে শিকাগোর মিলেনিয়াম পার্কে উন্মোচিত তাঁর তৈরি বিখ্যাতক্রাউন ফাউন্টেনযা ভিডিও ভাস্কর্য ফাউন্টেনের এক চমৎকার মেলবন্ধন। এটি তাঁর অন্যতম সেরা বিশ্বখ্যাত উন্মুক্ত শিল্প। প্লেনসার মতে, মানুষের মুখমন্ডল হলো আত্মার সবচেয়ে বড় প্রবেশদ্বার। তিনি বিশ্বাস করেন, ভাস্কর্য কেবল কোনো নির্দিষ্ট স্থানকে সুন্দর করার জন্য নয়; বরং তা সাধারণ মানুষের সাথে একটি আত্মিক কথোপকথন তৈরি করে। 'ডধঃবৎ' ঝড়ঁষ'—এর ক্ষেত্রেও তাঁর ভাবনা একই। এই ভাস্কর্যের মধ্য দিয়ে তিনি জল এবং জলবায়ুর গুরুত্বকে যেমন স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, তেমনই মানুষের ভেতরের নীরবতাকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন।

'ডধঃবৎ' ঝড়ঁষ' ভাস্কর্যটি দেখলে মনে হয় এক তরুণীর মুখ, যার চোখ দুটি বন্ধ এবং ঠোঁটে আঙুল দিয়ে নীরব থাকার ইশারা। এর পেছনে কাজ করেছে কয়েকটি গভীর রূপক: প্রথমটি জলের প্রতি শ্রদ্ধা। হাডসন নদী এবং দুই তীরের নগরজীবনের সংযোগস্থলে এর অবস্থান। প্লেনসা নিজেই বলেছেন, জল পৃথিবীর মূল জীবনসত্তা। জল যেমন নিঃশব্দে বয়ে চলে এবং সবকিছু ধারণ করে, তেমনই জলের সেই আত্মাকেই এই ভাস্কর্য রূপ দিয়েছে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে নীরবতার শক্তি। আজকের পৃথিবী অতিরিক্ত কথায় মুখরিত। আমরা সারাক্ষণ কথা বলছি, কিন্তু শুনছি কম। 'ডধঃবৎ' ঝড়ঁষ' আমাদের ইশারায় মনে করিয়ে দেয়Ñকখনও কখনও নীরবতাই হলো সবচেয়ে গভীর বার্তা। নীরব না হলে পরিবেশের কথা, নদীর কথা বা নিজের ভেতরের আত্মার কথা শোনা যায় না। তৃতীয়ত প্রকৃতির সাথে কৃত্রিমতার সংঘাতÑ ম্যানহ্যাটানের ধাতব কাচের বিশাল আকাশছোঁয়া অট্টালিকার সামনে দাঁড়িয়ে পলিয়েস্টার রজন, মার্বেল ধুলো আর ফাইবারে তৈরি এই শান্ত, শুভ্র ভাস্কর্যটি যেন এক অনন্য বার্তা দেয়। কংক্রিটের এই যান্ত্রিক পৃথিবীকে এক মুহূর্তের জন্য হলেও একটু বিনয়ী শান্ত হতে শেখায়।

জার্সি সিটিতে এই ভাস্কর্যটির উপস্থিতি শহরের সৌন্দর্যকে এক অন্য মাত্রা দিয়েছে। দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলে যখন ওপার থেকে নিউইয়র্কের আলো ঝলমল করে ওঠে, তখন হাডসন নদীর জলের ওপর 'ডধঃবৎ' ঝড়ঁষ'—এর প্রতিচ্ছবি এক অদ্ভুত মায়াবী শান্ত পরিবেশ তৈরি করে।

প্রাকৃতিক উপাদান বা জলের স্রোতে ভেসে আসা ড্রিফ্টউড নিয়ে কাজ করার সময় যেমন দেখি কীভাবে সমুদ্রের জল আর বাতাস কাঠের গায়ে নিজস্ব ইতিহাস লিখে দিয়ে যায়, ঠিক তেমনই এই জলের আত্মাও হাডসনের বাতাসে নীরবতার কাব্য বুনে চলেছে। এটি কেবল জার্সি সিটির ল্যান্ডমার্ক নয়; এখানে মানুষ ব্যস্ত জীবনের ভিড়ে থমকে দাঁড়িয়ে ভেতরের নীরব প্রশান্তিটুকু অনুভব করতে পারে। দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে এই জার্সি সিটিকে নিজের চোখের সামনে বদলে যেতে দেখেছি। এক সময়ের শান্ত শহরটি আজ দিনে দিনে উঁচু উঁচু অট্টালিকায় ভরে গেছে, আকাশ ঢেকে গেছে কংক্রিটের জ্যামিতিতে। যান্ত্রিক এই নগরায়নের ভিড়ে যখন মন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন এই 'ডধঃবৎ' ঝড়ঁষ'—এর নির্জন উপস্থিতি মনটাকে এক মুহূর্তে শান্ত করে দেয়। নদীর হাওয়া আর শান্ত শুভ্র এই বিশাল ভাস্কর্যটির সামনে গিয়ে যখন কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকি, মনে হয় শহরটা যেন সত্যিই এক মুহূর্তের জন্য থেমে গিয়ে আমাকে স্বস্তি দিচ্ছে। একজন ভাস্কর হিসেবে প্রকৃতির নীরবতা আর শিল্পের এমন আত্মিক মিলন আমাকে প্রতিদিন নতুন করে ভাবতে শেখায়, বাঁচতে শেখায়।

Related Posts