আইনি ভিত্তি না থাকায় ভেসে যাচ্ছে ১৭ মাসের সংস্কার

আল জাজিরা প্রতিবেদনঃ বাংলাদেশের নতুন সংসদ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর জবাবদিহিতা বাড়াতে প্রণীত বেশ কয়েকটি সংস্কার অধ্যাদেশ বাতিল করেছে। তাতে অনেক সংস্কার অকার্যকর হয়ে পড়ায় নিয়ে বিরোধী দলের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। উদ্বেগের কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর অর্জিত গণতান্ত্রিক অগ্রগতি থেকে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে।

১৩৩টির মধ্যে অধিকাংশ অধ্যাদেশ অনুমোদিত হলেও বিচারিক তদারকি, দুর্নীতি দমন এবং পুলিশি ব্যবস্থা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপসহ অন্তত ২৩টি অধ্যাদেশ সাংবিধানিক সময়সীমার মধ্যে সংসদীয় অনুমোদন পেতে ব্যর্থ হওয়ায় হয় বাতিল করা হয়েছে অথবা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। অধ্যাদেশগুলোকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, স্বচ্ছতার অভাব এবং দুর্বল জবাবদিহিতার জন্য দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ব্যাপকভাবে দেখা হয়। বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ গোষ্ঠী এবং বেশ কয়েকজন বিশ্লেষক এই পদক্ষেপকে অভ্যুত্থানের পর গৃহীত মূল সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর পশ্চাদপসরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং সতর্ক করেছেন যে এটি তদারকিকে দুর্বল করে স্বৈরাচারী কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতাকে পুনরায় কেন্দ্রীভূত করতে পারে। তবে, সরকার বলছে ত্রুটি সংশোধন এবং আলোচনার পর আরো শক্তিশালী আইন পুনরায় প্রবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত পর্যালোচনা চলছে। বোঝা যাচ্ছে ১৮ মাসের অন্তর্বতীর্ সরকারের তথাকথিত সংস্কার শেষ পর্যন্ত ভেসে যাচ্ছে।

এই বিবাদ দ্রুত সংসদের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিরোধী জোটগুলো বিক্ষোভ করেছে এবং দেশব্যাপী আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে, অন্য দিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বিতর্কটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তরের গতিপথ নিয়ে এক গভীরতর সংগ্রামের প্রতিফলনযা সংসদের ভেতরে এবং রাজপথে উভয় স্থানেই উন্মোচিত হচ্ছে।

মানবাধিকার কমিশন: কী পরিবর্তন হয়েছে এবং কেন তা গুরুত্বপূর্ণ

রাষ্ট্রীয় সংস্থা মানবাধিকার কমিশনকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত করার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল বলে একে আরো স্বাধীন কার্যকর করতে পুলিশ নিরাপত্তা বাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত, তদন্তের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা, ক্ষতিপূরণ জবাবদিহিতার জন্য সুস্পষ্ট বিধান এবং বৃহত্তর প্রশাসনিক আর্থিক স্বায়ত্তশাসনের ক্ষমতা দেয়া হয়। কিন্তু অধ্যাদেশটি বাতিল করে ২০০৯ সালের একটি আইন পুনর্বহাল করা হয়েছে, যেখানে কমিশন স্বাধীনভাবে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারে না। এর ফলে কমিশনের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তবে, সরকার যুক্তি দিয়েছে যে অধ্যাদেশটিতে আইনি অস্পষ্টতা রয়েছে এবং আরো পর্যালোচনার প্রয়োজন, বিশেষ করে তদন্তের ক্ষমতা, শাস্তি এবং পদ্ধতিগত স্বচ্ছতার মতো ক্ষেত্রগুলোতে। তারা আরো বলেছে যে আলোচনার পর তারা একটি সংশোধিত সংস্করণ আনার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু একটি খোলা চিঠিতে, পাঁচজন বিদায়ী কমিশনার এই ব্যাখ্যাকে চ্যালেঞ্জ করে যুক্তি দিয়েছেন যে, সরকারের উল্লিখিত আপত্তিগুলো আইনের প্রকৃত বিধানগুলোকে প্রতিফলিত করে না।

সাবেক কমিশনার নাবিলা ইদ্রিস আলজাজিরাকে বলেন, ‘সরকার অধ্যাদেশগুলো নিয়ে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলছে। আইনি সুরক্ষা দুর্বল করার ব্যাপকতর পরিণতি হতে পারে। বলা হচ্ছে আইনি সুরক্ষা দুর্বল হলেও শুধুমাত্র রাজনৈতিক সদিচ্ছাই যথেষ্ট। কিন্তু জবাবদিহিতা এভাবে কাজ করে না।

গুম তথা বলপূর্বক অন্তর্ধান: একটি গুরুতর আইনি শূন্যতা

বাতিলকৃত অধ্যাদেশটি গুম তথা বলপূর্বক অন্তর্ধানকে একটি নির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে, তদন্ত বিচারের জন্য পদ্ধতি স্থাপন করে এবং ভুক্তভোগীদের পরিবারকে ন্যায়বিচার চাওয়ার জন্য একটি আইনি ভিত্তি প্রদান করে এই বিষয়গুলোর সমাধান করতে চেয়েছিল। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (এনএইচআরসি) সাবেক কমিশনার ইদ্রিস বলেন, ‘যদি কোনো অপরাধের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা না থাকে, তবে তার শাস্তি দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে, বর্তমান আইনে বলপূর্বক অন্তর্ধানের কোনো সুস্পষ্ট আইনি সংজ্ঞা নেই। বিষয়টি অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে।

Related Posts