গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়— ছাব্বিশ পর্দা ও প্রভাতের সুরসাধক পঙ্কজ কুমার মল্লিক
ড. জীবন বিশ্বাসঃ শরতের প্রাক্কালে ভোরবেলা কুয়াশাচ্ছন্ন কলকাতার অলিগলিতে যখন প্রথম খড়খড়ি খোলার শব্দ হতো, ঠিক তখনই কাচের বাল্বওয়ালা কাঠের রেডিওর ভেতর থেকে ভেসে আসত এক সুরম্য ও গম্ভীর শঙ্খনাদ সদৃশ্য স্বর। সেই স্বর কেবল সাধারণ কোনো গান বা বাদ্যযন্ত্রের সুরধ্বনি ছিল না, তা ছিল বাঙালি মধ্যবিত্তের বৈঠকখানায় প্রাচ্যের প্রাচীন রাগসঙ্গীতের সঙ্গে পাশ্চাত্য সুসংগঠিত সিম্ফনির এক অভিনব রূপায়ন। বিশ শতকের প্রথমার্ধে যখন রাজদরবার ও ওস্তাদদের নিভৃত সাধনাশ্রমে ব্যাকরণভিত্তিক শাস্ত্রীয় সংগীত বন্দি ছিল, তখন সেই রূপান্তরকালে কাচ—প্লাস্টিকের সম্প্রচারযন্ত্রটিকে মাধ্যম করে সংগীতকে এক বিরাট সামাজিক ও নাগরিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিলেন পঙ্কজ কুমার মল্লিক। সুরকে কিভাবে প্রযুক্তির সঙ্গে মিলিয়ে, শৃঙ্খল ও নিয়মের খাঁচায় বেঁধে জনমানুষের প্রাত্যহিক আচারে পরিণত করা যায়, তিনি ছিলেন বাংলা সংস্কৃতিতে সেই ধারার প্রদীপ্ত স্থপতি।
জন্মপরিচয়, সাঙ্গীতিক শিক্ষা ও মহাপ্রয়াণ
১৯০৫ সালের ১০ মে কলকাতায় এক সাংস্কৃতিক পরিবারে জন্ম নেন এই পথপ্রদর্শক শিল্পী পঙ্কজ কুমার মল্লিক। পিতা মণিমোহন মল্লিক এবং মাতা মনোমোহিনী দেবী। পরিবারে সংগীতের অনুকূল পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও তাঁর শিল্পসাধনা কোনো আকস্মিক আবেগের বশবর্তী ছিল না, বরং তা গড়ে উঠেছিল কঠিন অনুশীলন ও বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষানুশীলনের ওপর ভিত্তি করে। তিনি ওস্তাদ দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে শাস্ত্রীয় ও লঘু—শাস্ত্রীয় সুরের বৈঠকি মার্গীয় তালিম আয়ত্ত করেন এবং পরবর্তীকালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য শিষ্য দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে রবীন্দ্রসংগীতের সঠিক বাচন ও সুররীতির নিবিড় পাঠ গ্রহণ করেন। দীর্ঘ সফল সাঙ্গীতিক জীবন অতিবাহিত করে ১৯৭৮ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় এই প্রখ্যাত সাধকের জীবনাবসান ঘটে। এই সুদীর্ঘ বাহাত্তর বছরের জীবনপরিধিতে তিনি বঙ্গীয় সংগীত, ব্রডকাস্টিং, রেকর্ড ইন্ডাস্ট্রি ও চলচ্চিত্রের ধারায় যে নতুন মোড় এনেছিলেন, তা তদানীন্তন সামাজিক জীবনে এক প্রগতিশীল বিপ্লব এনে দিয়েছিল যার ধারাবাহিকতা এখনও চলছে।
গ্রামোফোন প্রযুক্তি ও গণমুখী সঙ্গীত শিক্ষার আন্দোলন
১৯২৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড। সে আমলে একখণ্ড কালো মোমের ডিস্কে নিজস্ব কণ্ঠ বাদ্যযন্ত্র সহ বন্দি করা কিংবা বৈঠকখানায় তা বাজানো ছিল এক অভিজাত ও বিস্ময়কর নাগরিক অভিজ্ঞতা। অনেক প্রথাগত গুণীজন প্রযুক্তির এই নতুন জোয়ারকে সংশয়ের চোখে দেখলেও, তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে শিল্পকে জনমানুষের কাছে সর্বজনীন করতে হলে বিজ্ঞানের এই আধুনিক মাধ্যমকে আপন করে নিতে হবে। ১৯২৭ সালে কলকাতার ‘ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন’ অর্থাৎ উদীয়মান আকাশবাণীতে যোগ দিয়ে তিনি যে বেতার—যাত্রার সূচনা করেন, তা স্থায়ী হয় প্রায় চার দশক ধরে। বেতারকে তিনি কেবল সম্প্রচারের যন্ত্র ভাবেননি, ভেবেছিলেন এক মুক্ত বিদ্যাপীঠ। সেই চিন্তা থেকেই জন্ম নেয় তাঁর অবিস্মরণীয় সৃষ্টি ‘সঙ্গীত শিক্ষার আসর’। মাইকের সামনে বসে স্বরলিপি, তালের গাণিতিক বিশ্লেষণ, সঠিক উচ্চারণ ও গানের অন্তর্নিহিত ভাব সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দিয়ে তিনি লাখ লাখ পরিবারে গান শেখার যে আন্দোলন তৈরি করেন, তা ছিল বাঙালি সমাজে সংগীতশিক্ষার প্রথম ঐতিহাসিক গণতন্ত্রীকরণ।
নিউ থিয়েটার্স, প্লেব্যাক উদ্ভাবন ও চলচ্চিত্রের সুর—স্থাপত্য
চলচ্চিত্রমাধ্যমে পঙ্কজ মল্লিকের ভূমিকা বাংলা ও হিন্দি সুরের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মোড় হিসেবে চিহ্নিত। বিখ্যাত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘নিউ থিয়েটার্স’—এর সঙ্গে তাঁর গভীর ও দীর্ঘকালের সম্পর্কের ফলে ভারতীয় চলচ্চিত্রের আবহসঙ্গীত পায় এক নতুন মাত্রা। থিয়েটারের উঁচু গলার নাটুকে সুর থেকে চলচ্চিত্রকে টেনে এনে তিনি দিলেন সেলুলয়েডের নিজস্ব রূপকথা। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার নীতিন বসুর সঙ্গে যৌথ দূরদর্শিতায় তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্রথম প্রবর্তন করেন ‘প্লেব্যাক’ বা নেপথ্য সংগীতের বৈপ্লবিক প্রযুক্তি, যা সিনেমার সুরচিন্তায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। ‘মুক্তি’, ‘ডাক্তার’, ‘নর্তকী’, ‘দেশের মাটি’, ‘আলোর ছায়া’, ‘রাইকমল’ কিংবা ‘আহ্বান’—প্রতিটি ছবিতে তাঁর সুরারোপিত গান ও আবহ দৃশ্যপটকে অনন্য আবেগে ভরিয়ে তোলে। গানের মাঝে অণুসুর, যন্ত্রসঙ্গীতের সংযমী ভূমিকা, ইন্টারলিউড এবং দৃশ্যের মেজাজ অনুযায়ী আবহ তৈরির মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, সিনেমায় সুর কেবল পৃথক কোনো আনন্দের উপাদান নয়, তা চিত্রনাট্যেরই এক অবিচ্ছেদ্য কাব্যিক সংলাপ।
গায়কি প্রজ্ঞা ও বিচিত্র সাঙ্গীতিক বিস্তৃতি
তাঁর কন্ঠস্বর ছিল অত্যন্ত ভরাট, সুসংগঠিত ও প্রশান্ত আভিজাত্যে পূর্ণ। সেখানে না ছিল অপ্রয়োজনীয় চপলতা, না ছিল স্বরের কৃত্রিম কসরত। রবীন্দ্রনাথের গানকে সাধারণ শ্রোতার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর বলিষ্ঠ ও সুস্পষ্ট উচ্চারণ এক যুগান্তকারী ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে। তবে কেবল রবীন্দ্রসংগীতেই তাঁর কাজের পরিধি আটকে ছিল না। কীর্তন, ভজন, লোকসংগীত, শ্যামাসংগীত, দেশাত্মবোধক এবং আধুনিক গান রচনার ক্ষেত্রেও তিনি সমান পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রতিটি সুরের বাণীর প্রতি তাঁর যে গভীর শ্রদ্ধা ছিল, তা তাঁর গাওয়া প্রতিটি গানে স্পষ্ট ধরা পড়ে, প্রতিটি শব্দে তিনি সুরে বসাতেন এক সুবিন্যস্ত প্রসন্নতায়।
মহিষাসুরমর্দিনী ও সামাজিক আচারের নান্দনিকতা
বাঙালির বার্ষিক ঋতুপরিবর্তনের সঙ্গে মিশে থাকা সবচেয়ে বড় সাঙ্গীতিক মহাকাব্য ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। বাণীকুমারের সমৃদ্ধ রচনা, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের হৃদয়স্পর্শী চণ্ডীপাঠ এবং পঙ্কজ কুমার মল্লিকের সুচিন্তিত সাঙ্গীতিক পরিচালনায় গঠিত এই বেতার—আলেখ্য বাংলার এক অনন্য সাংস্কৃতিক মাইলফলক। শরতের প্রত্যুষে দেবীর আবাহনে রাগসঙ্গীতের আভিজাত্য, সমবেত কণ্ঠের গাম্ভীর্য এবং বাদ্যযন্ত্রের অর্কেস্ট্রেশনকে তিনি এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম পার হয়েও একই উদ্দীপনায় ফিরে আসে। সময় গড়িয়েছে, বিনোদনের মাধ্যম বদলে আধুনিক রূপ নিয়েছে, কিন্তু আশ্বিনের সেই ভোরের বেতারে তাঁর সুরময় বিন্যাস আজও প্রতিটি গৃহকোণে এক পবিত্র আনন্দের অনুভূতি সঞ্চার করে।
রাষ্ট্রীয় সম্মান ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি
পঙ্কজ কুমার মল্লিক তাঁর বহুমুখী সৃজনশীল কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৩১ সালে ‘সুরসাগর’ এবং ১৯৬২ সালে ‘সঙ্গীতরত্নাকর’ উপাধিতে ভূষিত হন। পরবতীর্তে ভারত সরকার ১৯৭০ সালে তাঁকে প্রদান করে ‘পদ্মশ্রী’ এবং ১৯৭৩ সালে ভারতীয় চলচ্চিত্রে সর্বোচ্চ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ভূষিত করে মর্যাদাপূর্ণ ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কারে। এসব সম্মাননা কেবল একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত অর্জন ছিল না, তা ছিল সংগীতকে আধুনিক প্রযুক্তি, গণমুখী সংগীত শিক্ষা ও সামাজিক সম্মানের আসনে বসানোর জন্য এক দূরদর্শী সংগঠকের ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃতি লাভ।
পঙ্কজ কুমার মল্লিকের গাওয়া (রবীন্দ্রসংগীতের বাইরে) কয়েকটি বিখ্যাত বাংলা গান
১। আমারে ভালোবেসে, ২। ও কেন গেল চলে, ৩। জীবনে জেগেছিল মধুমাস, ৪। এই চাঁদিনী যামিনী, ৫। আমি আজ নিয়ে যাই পরাজয়, ৬। নাও মালা নাও গলে, ৭। আবার যে রে রং ফিরেছে (ইলা ঘোষের সংগে), ৮। আজি বসন্ত জাগিল (ইলা ঘোষের সংগে), ৯। মরণ রে, তোরে লও পাশে (কথা, সুর ও কন্ঠ শিল্পীর নিজের), ১০। যেদিনে তোমার গাইল বীণা, ১১। জনম—মরণ জীবনের দুটি দ্বারে, ১২। কার চারু চরণের মঞ্জীর, ১৩। গানখানি মোরা রেখে যাব (উৎপলা সেনের সংগে), ১৪। যৌবনেরই বীণার তারে (উৎপলা সেনের সংগে), ১৫। আমি কোথায় পাব তারে (রাইকমল চলচ্চিত্রে), ১৬। সবার মাঝে জাগে যে মহাপ্রাণ (উৎপলা সেনের সংগে), ১৭। শান্তি দাও, শান্তি দাও (উৎপলা সেনের সংগে), ১৮। আজি অন্ধার হইল আলো, ১৯। কোন লগনে জনম নিলাম, ২০। তুমি ভুল করো না পথিক, ২১। দুঃখে যাদের জীবন গড়া, ২২। শেষ হলো তোর অভিযান, ২৩. এই তো মিলন শুরু, ২৪। চৈত্রদিনের ঝরা পাতার পথে, ২৫। তোরা যে জাত—বিচারী।
পরিশেষ
পঙ্কজ কুমার মল্লিক বাংলা সংগীতের ইতিহাসে কেবল একজন প্রথাসিদ্ধ কণ্ঠশিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক নতুন যুগের প্রাতিষ্ঠানিক রূপকার। এলোমেলো সুরভাবনাকে তিনি শৃঙ্খলার ফ্রেমে বেঁধেছিলেন, প্রযুক্তিকে করেছিলেন সাধনার হাতিয়ার, আর গানকে নামিয়ে এনেছিলেন কোটি মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের আনন্দ—বেদনায়। পুরনো রেডিওর আলো জ্বললে কিংবা মহালয়ার ভোরে ভারী তানপুরার সঙ্গে অর্কেস্ট্রেশনের সেই প্রথম সুর বেজে উঠলেই অনুধাবন করা যায়Ñবাঙালি তার আধুনিক সাঙ্গীতিক ঐতিহ্যের যে বিশাল প্রাসাদে বসবাস করছে, তার মূল ভিতটি এই দ্রষ্টা সাধকের নিখুঁত সাঙ্গীতিক নকশাতেই নির্মিত হয়েছিল।
