আল্লু অর্জুনের স্বপ্ন ছিল বিজ্ঞানী হওয়ার
ভারতীয় সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় নাম আল্লু অর্জুন। ২০২১ সালে ‘পুষ্পা’ ছবির মাধ্যমে প্যান ইন্ডিয়ান তারকা বনে যান। তবে ছোটবেলায় অভিনয় নয়, তার নাকি স্বপ্ন ছিল নাসার বিজ্ঞানী হওয়ার। এক সাক্ষাৎকারে এই তথ্য নিজেই জানিয়েছেন অভিনেতা। জানা যায়, কিশোর বয়সে অভিনয়ের চেয়ে বিজ্ঞানের প্রতিই তার আগ্রহ ছিল বেশি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবনের মোড় ঘুরে যায়। তিনি কিংবদন্তি অভিনেতা আল্লু রামালিঙ্গাইয়ার নাতি এবং প্রখ্যাত প্রযোজক আল্লু অরবিন্দর ছেলে হওয়ার সুবাদে সিনেমার রক্ত তার ধমনীতেই ছিল। ফলে ছোট থেকেই সিনেমার পরিবেশে বেড়ে ওঠা হলেও শুরুতে অভিনয়ের প্রতি তেমন ঝোঁক ছিল না। চেন্নাইয়ের সেন্ট প্যাট্রিক স্কুলে পড়াশোনা শেষে হায়দরাবাদের এমএসআর কলেজ থেকে ব্যবসা প্রশাসনে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি। পরবর্তীতে অ্যানিমেশন নিয়েও পড়াশোনা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত ক্যামেরার সামনের জগৎই তাকে টেনে আনে। ২০০৩ সালে ‘গঙ্গোত্রী’ ছবির মাধ্যমে বড়পর্দায় অভিষেক ঘটে আল্লু অর্জুনের। এরপর ‘বানি’, ‘হ্যাপি’, ‘পারাগু’সহ একাধিক ছবিতে অভিনয় করে ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। শুরুতে রোমান্টিক নায়ক হিসেবে পরিচিতি পেলেও ‘আরিয়া ২’ থেকে নিজের ভিন্ন রূপ দেখাতে শুরু করেন। পরবর্তীতে অ্যাকশন ঘরানায় সফল হয়ে ওঠেন তিনি। ‘নাপেরু সুরিয়া’ এবং ‘আলা বৈকুণ্ঠপুর’ ছবির মাধ্যমে জনপ্রিয়তা আরো বাড়ে। আর ‘পুষ্পা : দ্য রাইজ’ মুক্তির পর তিনি হয়ে ওঠেন প্যান—ইন্ডিয়া তারকা। বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন পূরণ না হলেও বর্তমানে অভিনয়জগতের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র আল্লু। ‘পুষ্পা’ ফ্র্যাঞ্চাইজির সাফল্যের পর এবার নতুন বড় বাজেটের ছবি ‘রাকা’ নিয়ে দর্শকদের সামনে আসতে যাচ্ছেন তিনি। ছবিটি পরিচালনা করছেন অ্যাটলি কুমার।
এদিকে, ৮ এপ্রিল ছিল এই তারকার জন্মদিন। এ উপলক্ষে জেনে নেওয়া যাক তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ারের কিছু জানা—অজানা তথ্য।
শুরুর গল্প: পরিবারেই সিনেমার শিকড়
১৯৮২ সালের ৮ এপ্রিল চেন্নাইয়ে জন্ম নেওয়া আল্লু অর্জনের বেড়ে ওঠা ছিল চলচ্চিত্র পরিমণ্ডলের ভেতরেই। তাঁর বাবা আল্লু অরবিন্দ দক্ষিণ ভারতের একজন প্রতিষ্ঠিত প্রযোজক। আর তিনি নিজে মেগাস্টার চিরঞ্জীবীর ভাতিজা। ফলে ছোটবেলা থেকেই ক্যামেরা, আলো আর অ্যাকশনের সঙ্গে পরিচয় ঘটে যায়। তবে এই পারিবারিক পরিচয়ই যে তাঁকে তারকা বানিয়েছে, এ কথা বলা ভুল হবে; বরং নিজের জায়গা তৈরি করতে তাঁকে লড়তে হয়েছে আলাদা করে।
অভিষেক ও সংগ্রামের দিন
শিশুশিল্পী হিসেবে প্রথম ক্যামেরার সামনে এলেও নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ২০০৩ সালে ‘গঙ্গোত্রী’ সিনেমার মাধ্যমে। ছবিটি মাঝারি সফল হলেও তাঁকে নিয়ে তখনো বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়নি। পরিস্থিতি বদলায় ২০০৪ সালে ‘আরিয়া’ মুক্তির পর। এ ছবিতে অভিনয়, সংলাপ এবং আলাদা ধরনের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ আল্লু অর্জুনকে রাতারাতি জনপ্রিয় করে তোলে। এখান থেকেই শুরু তাঁর আসল যাত্রা।
কেমন ছাত্র ছিলেন আল্লু
চেন্নাইয়ের সেন্ট প্যাট্রিক স্কুল থেকে পড়াশোনা করেছেন অর্জুন। কিন্তু বয়স ২০ পেরোতেই পরিবারের সঙ্গে হায়দরাবাদে চলে আসেন অভিনেতা। সেখানে এমএসআর কলেজ থেকে বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন নিয়ে স্নাতক হন তিনি। এরপর বিবিএ পাস করলেও গৎবাঁধা নয়টা—ছয়টার চাকরি করতে চাননি আল্লু। ২০০৩ সালে ‘গঙ্গোত্রী’ ছবি দিয়ে আত্মপ্রকাশ করেন নায়ক হিসেবে। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাননি অভিনেতা। একের পর এক সফল ছবি দিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের জায়গা পাকা করে নিয়েছেন। তাঁর ‘পুষ্পা: দ্য রাইজ’—এর রেশ এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি সিনেমাপ্রেমীরা।
ব্যর্থতা পেরিয়ে সাফল্যের শিখরে
ক্যারিয়ারের শুরুতে একাধিক ব্যর্থ ছবিও ছিল আল্লুর ঝুলিতে। কিন্তু তিনি বারবার নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়েছেন। ‘পারুগু’, ‘জুলায়ি’, ‘সারাইনোডু’—প্রতিটি ছবিতেই দেখা গেছে তাঁর ভিন্ন রূপ। তবে আল্লুর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয় ‘পুষ্পা’র দুই কিস্তি। এ ছবিতে ‘পুষ্পা রাজ’ চরিত্রে অভিনয় করে তিনি শুধু দক্ষিণ ভারত নয়, গোটা ভারত ও আন্তর্জাতিক দর্শকদের মন জয় করেন। ‘ঝুঁকেগা নেহি’—এ সংলাপ হয়ে ওঠে এক সাংস্কৃতিক ট্রেন্ড। পর্দায় লাল চন্দনকাঠের চোরাকারবারি হয়ে ছক্কা হাঁকিয়েছেন। হয়ে উঠেছেন সুপারস্টার।
স্টাইল আইকন থেকে প্যান ইন্ডিয়া সুপারস্টার
আল্লু অর্জন শুধু অভিনেতা নন, তিনি একজন ট্রেন্ডসেটার। তাঁর ফ্যাশন, হেয়ারস্টাইল, নাচ—সবকিছুই ভক্তদের কাছে অনুকরণীয়। এ জন্যই তাঁকে বলা হয় ‘স্টাইলিশ স্টার’। তাঁর নাচের দক্ষতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। বিশেষ করে তাঁর গানের স্টেপগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায় নিয়মিত।
ব্যক্তিগত জীবন: পর্দার বাইরে এক শান্ত মানুষ
পর্দার ঝলকানি থেকে দূরে, ব্যক্তিগত জীবনে আল্লু অর্জন বেশ সংযত। ২০১১ সালে তিনি বিয়ে করেন স্নেহা রেড্ডিকে। তাঁদের দুই সন্তান—এক ছেলে ও এক মেয়ে। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, ভক্তদের সঙ্গে সংযোগ রাখা—এসব বিষয়কে আল্লু জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করেন। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, পরিবারই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।
সম্পদের পরিমাণ ও জীবনযাপন
বর্তমানে আল্লু অর্জন দক্ষিণ ভারতের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেতাদের একজন। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি ভারতীয় রুপি। হায়দরাবাদে আল্লুর বিলাসবহুল বাড়ি, দামি গাড়ির সংগ্রহ এবং ব্র্যান্ড এনডোর্সমেন্ট—সব মিলিয়ে তিনি এক আধুনিক তারকাজীবনের প্রতীক। তবে এই বিলাসিতার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ পরিশ্রম ও ধারাবাহিক সাফল্য। এই অভিনেতা এমন একটি বাংলোতে থাকেন, যার মূল্য ১০০ কোটি। হায়দরাবাদের সেই বাংলোর তিনি নাম দিয়েছেন ‘ব্লেসিং’, অর্থাৎ আশীর্বাদ। দুই সন্তান ও স্ত্রীর সঙ্গে সেখানেই সংসার পেতেছেন তিনি।
সাত কোটি টাকার একটি ভ্যানিটি ভ্যান রয়েছে আল্লুর, যার কিছু ছবি নিজের ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইলে দিয়েছিলেন তিনি। ভ্যানিটির ভেতরের ঝলক দেখে চমকে উঠেছিলেন অনুরাগীরা।
ব্যক্তিগত বিমানের মালিক আল্লু। খুব কম তেলেগু অভিনেতার ব্যক্তিগত বিমান রয়েছে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম আল্লু। ইনস্টাগ্রামে সেসব ছবিও পোস্ট করেন তিনি। পরিবারের সঙ্গে সেই বিমানে করে দেশ—বিদেশে ভ্রমণ করেন নায়ক।
‘পুষ্পা’ দিয়েই বিতর্কে
‘পুষ্পা ২’ ছবির প্রিমিয়ারে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু হয় ৩৯ বছর বয়সী এক নারীর। এ ঘটনায় হওয়া মামলায় গ্রেপ্তার হন আল্লু অর্জুন। তাঁকে রাখা হয় হায়দরাবাদের চঞ্চলগুড়া জেলে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ব্যক্তিগত বন্ডে জামিন পেয়ে যান তিনি। তবে রিলিজ অর্ডার সময়মতো জেলে না পৌঁছানোয় রাতটা হাজতখানায় কাটাতে হয় আল্লু অর্জুনকে। এটা তাঁর ক্যারিয়ারেরই অন্যতম বিতর্কিত ঘটনা।
অন্যদিকে, ভারতের সান পিকচারস তাদের বড় বাজেটের ফ্যান্টাসি—অ্যাকশন প্রজেক্টের নাম ঘোষণা করেছে। এটি পরিচালনা করবেন অ্যাটলি এবং এতে অভিনয় করছেন অল্লু অর্জুন ও দীপিকা পাডুকোন। সিনেমাটির নাম রাকা। বুধবার আল্লু অর্জুনের জন্মদিনে সিনেমার পোস্টার প্রকাশ করা হয়। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হয়।
রাকা নিয়ে যা জানা গেল
পিঙ্কভিলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাকা হলো বড় আকারের প্যান—ইন্ডিয়ান মেগা প্রজেক্ট। সান পিকচারসের প্রযোজনায় নির্মিত এই সিনেমাতে থাকবে অত্যাধুনিক ভিএফএক্স, হাই—অ্যাকশন রিয়েল—টাইম সিকোয়েন্স, ফ্যান্টাসি উপাদান, একাধিক চরিত্রের রূপান্তর এবং আরও অনেক কিছু। গত বছর সিনেমার শুটিং শুরু হয়। পরে সান পিকচারস একটি ভিডিও শেয়ার করে। যেখানে দেখা যায়, দীপিকা পাডুকোন পরিচালক অ্যাটলির সঙ্গে বসে স্ক্রিপ্ট পড়ছেন। তখন সবাই নিশ্চিত হয়, এই বড় প্রজেক্টে দীপিকা প্রধান চরিত্রে অভিনয় করছেন। এটি অল্লু অর্জুন ও পরিচালক অ্যাটলির একসঙ্গে প্রথম কাজ।
সিনেমার বাজেট
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিনেমাটির বাজেট প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০ কোটি রুপি। এশিয়ানেট নিউজের প্রতিবেদনের অনুযায়ী, রাকাতে অল্লু অর্জুনের পারিশ্রমিক ধরা হয়েছে প্রায় ১৭৫ কোটি রুপি। এছাড়াও, তিনি সিনেমার লাভের ১৫ শতাংশ নেবেন। সবমিলিয়ে এই সিনেমা থেকে তার মোট আয় ৩০০ কোটি টাকার ওপরে যেতে পারে। অ্যাটলি জওয়ান সিনেমার সাফল্যের পর, তার পারিশ্রমিক বাড়িয়েছেন। এই সিনেমার জন্য তিনি ১০০ কোটি রুপি নিচ্ছেন। এর আগে তিনি শাহরুখ খানের সিনেমা পরিচালনার জন্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা পেয়েছিলেন। দীপিকা পাডুকোন প্রায় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা পারিশ্রমিক পাচ্ছেন। তবে এই বাজেটের পরিমাণ আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাতাদের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়নি।
অ্যাটলি শাহরুখ খানের ব্লকবাস্টার জওয়ান এবং তামিল ভাষার হিট সিনেমা ‘মার্সাল’ ও ‘বিগিল’ পরিচালনা করেছেন। তিনি বলেছেন, রাকা তার দীর্ঘদিনের স্বপ্নের প্রজেক্ট। তার ভাষ্য, রাকা কেবল একটি সিনেমা নয়। বছরের পর বছর ধরে এই সিনেমাটির স্বপ্ন লালন করেছি। চেন্নাইভিত্তিক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সান পিকচারস জানিয়েছে, সিনেমাটি ভারতীয় সিনেমার আন্তর্জাতিক পরিসরে বাড়াতে সহায়তা করবে।
