যা দেখেছি যা বুঝেছি—২৪ মনিরুল ইসলাম সাবেক রাষ্ট্রদূত
হত্যালীলা
২. আত্মহত্যা
আশ্চর্যের ব্যাপার হল এই মানুষ নিজেকেও নিজে হত্যা করে! মানুষ এমনই দুর্বোধ্য প্রাণীÑকেউ বেঁচে থাকার প্রাণান্ত চেষ্টা করে, কেউ স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে সুস্বাস্থ্যে আত্মহনন করে। বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষের মরবার সাধও হয় এবং সেই সাধ অন্য সাধের চেয়ে কম তীব্র নয়! কিভাবে করে স্বহনন? অস্ত্র ওষুধ ফাঁস অগ্নিসংযোগ নিম্নপতন জলমগ্ন বিষক্রিয়া ভুঁড়িকর্তন।
কারণে অকারণে কোনোকিছু বিনষ্ট করার প্রবণতা বা জিঘাংসা প্রবৃত্তি মানুষের জন্মগত। আত্মহত্যা প্রাণীর সহজাত প্রবণতা, প্রত্যেকের মধ্যেই কমবেশি থাকে। দারিদ্র্য ব্যাধি ও বঞ্চনার কারণে নয়, অনেক বিত্তবান সুস্থ মানুষও আত্মহত্যা করে বসে। অনেকেই দু—একবার মরে যাবার চেষ্টাও করে, অন্তত ভাবে অথবা বলে, ধ্যাৎ, মরে যেতে চাই, মরে গেলেই ভাল ছিল, এরচেয়ে মরণই ভাল, আমার কেন মরণ হয় না, পার কর প্রভু, ধরণী দ্বিধা হও (মাটির নীচে চলে যাই) ইত্যাদি। বিশেষ করে নবযৌবন চায় সৃষ্টি অথবা ধ্বংস করতে। তাই সৃষ্টির জন্য ধরে নৃত্য বাদ্য সঙ্গীত সাহিত্য চিত্র, এমনকি প্রেম ও সেবা। অথবা ধ্বংসের জন্য ধরে ধূম মদ মাদক বিষ অস্ত্র অপরাধ। সৃষ্টি করার মতো কিছু না পেলে ধ্বংসের সহজ পথে চলে যায়, এমন কি নিজেকেও। যৌবনে মানুষ কিছু একটার জন্য মরতে চায়, কেন চায় সে এক অজানা রহস্য।
১৬—১৭ বছরের কিশোরী, ১৮—১৯ বছরের কিশোর যখন প্রথম ক্রাশ করে, তখন তার সাপোর্ট দরকার, অতি সূক্ষ্মভাবে অলক্ষ্যে আলতো করে। এ বয়সে কেউ অস্বাভাবিক ‘ভাল’ হলে সন্দেহ করবেন, মানুষ সাধারণত বেশি ভাল হয় না। এটা ঘরে বসে থাকার বয়স নয়। বাহির তাকে তীব্র আকর্ষণে টেনে নিয়ে যায় অজানায়। যে কেউ সহজেই তাকে কনভিন্স করে ফেলবে জীবনে মরণে ও প্রেমে। সে কখনো পরগাছা, কখনো ফার্মের মুরগি। সংগ্রামী ক’জন?
সব হত্যার চেয়ে আত্মহত্যা আমাকে বেশি পীড়া দেয়। মরার আগে আমি মরতে চাই না, কারণ জীবনের সর্বশেষ প্রান্ত পর্যন্ত কী আছে, তাও দেখে যেতে চাই। অনিন্দ্যের অকাল প্রয়াণের পর মনে হল, ‘হয়ত এগিয়ে যাব কিন্তু সেই জীবন আর ফিরে পাব না। কোনোরকম টেনে নিয়ে পথ শেষ করা। তবু পথ শর্টকাট করব না, দেখতে চাই জীবনের সারাপথে নিয়তি কী বিছিয়ে রেখেছে আমার জন্য।’ কতজন কতবার বলে ‘মরে যাব’। নিজেও বলি নিজেকে, অন্যকে। কেউ মরেনি, আমিও না। অনি মরণের কথা কখনো মুখে আনেনি অথচ সে—ই মরে গেল। অনির কথা, আম্মার কথা মনে হলে মরে যেতে ইচ্ছা করে। নানা হতাশায় বাঁচতে ইচ্ছা করে না কিন্তু তাও মরব না, মরব কেন? মরণ তো আসবেই একদিন, আমি চাইলেও তো সেদিন বেঁচে থাকতে পারব না। আর কয়দিনই বা বাঁচব, একটু ধৈর্য ধরে শেষ পর্যন্ত দেখে যাই পৃথিবীর সবরূপ। সুখ—দুঃখ আধাআধিÑসুখ না পাই, দুঃখ তো পাব? সুখী মানুষের দিকে তাকিয়ে দুঃখকেই মনভরে খেয়ে যেতে চাই। মরে নিঃশেষে বিনাশ হয়ে গেলে তো দুকূলই গেল।
বাঁচতে না চাইলেও বেঁচে থাকতে হয়, অনিচ্ছায় কাজ করতে হয়। নানা কারণে আমরা বলি, আর বাঁচতে ইচ্ছা করে না, মরে যেতে ইচ্ছে করে। আসলেও করে কিন্তু আমরা মরি না, চাইলেই নিজেকে মারা যায় না, সংসারের নানা শৃঙ্খল আমাদেরকে বেঁধে রাখে, বাঁচিয়ে রাখে নানাছলে। বেঁচে থাকতে হবে বলে বেঁচে থাকে। দীর্ঘ জীবনটায় সে কী করবে বুঝে পায় না, সময় শেষ হতে চায় না। নানা কারণে সকল মানুষের মন অস্থির থাকে। জীবনের বিভিন্ন বাঁকে তাই সে বলে, আর কত। তবু সে বেঁচে যায়।
অনেকদিন ভেবেছি কেন মানুষ আত্মহত্যা করে? যত দুঃখ—যন্ত্রণা—অপমান আসুক, জীবনটাকে শেষ করে দিলে তো জীবনে আর ফিরে আসা যাবে নাÑঅন্ধকার ওয়ানওয়ে পথে কেন হাঁটব? শেষ করার আগে এই বিশাল পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কত অপশন/উপায় আছে, কেন সেগুলোর সুযোগ গ্রহণ করব না। আসলে বেঁচে থাকার এতসব কারণ/অপশন বা উপায় মূল্যহীন হয়ে যাবার জন্য শুধু একটি আঘাতই যথেষ্ট। যেমন ছেলেটা চলে যাবার সাথে সাথে আমার বেঁচে থাকার সমস্ত কারণ উধাও হয়ে গেছে। সবকিছুর মৃত্যু ঘটে একটি মৃত্যুতে, তাই মানুষ বেঁচে থাকার কারণ হারিয়ে ফেলে। প্রতিক্ষণে মনে হয়, আর ভাল লাগছে না পৃথিবীর কিছুই, ছেলেটার কাছে চলে গেলে মন্দ হয় না, মৃত্যুকে ডেম—কেয়ার ভাব দেখিয়ে চলি অর্থাৎ জীবনের মায়া শেষ! বাবা যদি চলে যেতে পারে এমন অবলীলায়, তাহলে আমি কেন বসে আছি এখানে? এটাও হয়ত একধরনের আত্মহত্যা অর্থাৎ আমার আত্মার মৃত্যু হয়েই আছে, প্রাণটা শুধু বেঁচে আছে।
যে মানুষ যতটুকু সহ্য করতে পারবে ঈশ^র তাকে ততটুকু দুঃখশোকই দিয়ে থাকেন, একথা আমি আর মানি না। মানুষ কখন আত্মহনন করে? যখন দুঃখের ভার সহ্যের অতিরিক্ত হয়ে যায় হৃদয়ে, পৃথিবীর আলো নিভে অন্ধকার নেমে আসে চোখে, সব কামনা সাধ শেষ হয়ে যায় মনে, অজানা উৎসে চলে যেতে চায় বিধ্বস্ত অন্তর। তারা কি উবধফ বহফ—এ এসে পেঁৗছে যায়? নিরুপায় অসহায় নিঃসঙ্গ হয়ে যায়? যখন মনে হয় সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে তখন লুকানো পালনোর জন্য মৃত্যুর পথটাকে পায় খোলাÑসোজা, সহজ, সস্তা, সদর। মনে করে আমাকে ছাড়াও সবাই ভাল থাকবে। এরা কাউকে কিছু বলে না, সমস্যা শেয়ার করে না। আত্মহত্যার ভাবনা, সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন ব্যক্তির একান্ত একক নিজস্ব ও গোপন অভিপ্রায়। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, বুদ্ধিদীপ্ত দার্শনিক ও কৃতি মানুষেরই মনোবিকার ঘটে বেশি। ধনী—গরিবও মূলপ্রশ্ন নয়, ‘সব পেয়েছির দেশ’—এ যদি শান্তি থাকত নিরন্তর, তাহলে ইউরোপ—আমেরিকায় এত বড়লোক আত্মহত্যা করত না।
আত্মহত্যাকারী কি সাহসী বীরপুরুষ, নাকি ভীরু পলায়নপর কাপুরুষ। এটা কি স্বার্থপরতা, আলস্যতা, পরাজয়বরণ, স্বজনহত্যা ? এসব প্রশ্ন আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তির নিকট অবান্তর, কারণ তার চিন্তা একমুখী, অন্যেরা কে কী বলে সে তার ধার ধারে না। আমার মনে হয় যারা ভীতু পলায়নপর বেয়াড়া বা আপোষহীন, তারাই জীবনের পথটাকে শর্ট—কাট করতে আত্মসংহার করে। কিছু একটা ‘ভুল’ করে, শুধরানোর পথ পায় না, বিদ্রোহ করার সাহসও হয় না।
দ্বিতীয়ত, অধিকাংশ ধর্মে আত্মহনন মহাপাপ, সামাজিক দৃষ্টিতে ও রাষ্ট্রীয় আইনে অপরাধ। এসবই আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তির নিকট অর্থহীন, কারণ তার একদেশদর্শী চিন্তা অস্বচ্ছ বিক্ষত বলে স্বজন সমাজ আইন ধর্ম ইত্যাদি নিয়ে ভাবে না। তবে আত্মহত্যা অমার্জনীয় মহাপাপ, আমি এটা মানতে পারি না। কখন মানুষ আত্মহননে যায়? ‘আমি কষ্ট দিয়ে যাই, তুই সহ্য করে যাও’Ñএরকম সম্ভব? এটাকে মানসিক রোগ বলাও যথার্থ নয়, বলা যায় মেন্টাল ব্রেকডাউন।
তৃতীয় প্রশ্ন, পশু—পাখি—মাছ—পতঙ্গ—বৃক্ষ তথা অন্যান্য প্রাণীও কি আত্মহনন করতে চায় বা পারে? তাদের কী দুঃখ? দুঃখ ছাড়া আর কী থেকে মরণেচ্ছা জাগে? আটলান্টিক স্যামন মাছ ডিম ছেড়ে দিয়ে মৃত্যুর জন্য ডাঙ্গায় উঠতে চায়, হয়ত সে তার জীবনের প্রয়োজন আর বোধ করে না।
