সরকারের ভাষ্য ঃ প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে যাচ্ছেন
বিবিসি বাংলা প্রতিবেদনঃ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী সপ্তাহে দিল্লি সফরে যেতে পারেন বলে ঢাকায় সংশ্লিষ্ট একাধিক সরকারি সূত্র বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছে।
এটিকে দ্বিপাক্ষিক সফর বলা হচ্ছে, যার সম্ভাব্য তারিখ হতে পারে ২২ থেকে ২৩শে আগস্ট।
বাংলাদেশের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছেন, ভারতের দিক থেকে এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের দিক থেকেও বলা হয়েছে যে তারেক রহমান সফরে যাবেন।
ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফরের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে বাংলাদেশের কয়েকটি প্রত্যাশা রয়েছে।
তার মধ্যে একটি হলো, ২০২৪ সালের পাঁচই আগস্ট থেকে ভারতের আশ্রয়ে থাকা বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে বসে বিভিন্ন সময়ে যেসব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন বা বক্তব্য দিচ্ছেন, সেগুলো যেন তিনি আর করতে না পারেন।
কর্মকর্তাদের দাবি, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিতর্কের সৃষ্টি করছে এবং তার উদ্দেশ্য হলো, দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে তোলা।
তাই, শেখ হাসিনার এই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধের নিশ্চয়তা চায় বাংলাদেশ। নিশ্চয়তা পাওয়া গেলেই এই সফর নিশ্চিতভাবে হবে।
এ বিষয়ে ভারতের দিক থেকে এক ধরনের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তারা বলেন, তবে পুরোপুরি নিশ্চয়তা চায় বাংলাদেশ।
ভারতের একটি গণমাধ্যমও জানিয়েছে যে আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি দুই দিনের সফরে ভারত যেতে পারেন তারেক রহমান।
এছাড়া, ভারতের দিক থেকে আরও একটি আমন্ত্রণ রয়েছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লিতে ব্রিকসের সম্মেলন হবে। সেখানে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
তবে সেই সফরে তারেক রহমান যোগ দেবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি।
সফরটি কেন তাৎপর্যপূর্ণ
এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সফরটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে যখন উভয় পক্ষই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে আন্তরিকভাবে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। এই সফরের মাধ্যমেই সব অমীমাংসিত বিরোধের সমাধান হয়ে যাবে—এমনটা আশা করা হচ্ছে না। শেখ হাসিনা ইস্যু, পানি বণ্টন এবং কিছু বাণিজ্য ও সীমান্ত সমস্যা নিয়ে আরও আলোচনার প্রয়োজন হবে।
তবে নরেন্দ্র মোদি ও তারেক রহমানের মধ্যে সরাসরি বৈঠক এই মতপার্থক্যগুলো দূর করার জন্য একটি রাজনৈতিক পথ তৈরি করতে পারে। এই সফর তারেক রহমানকে তাঁর সরকারের অবস্থান সরাসরি ভারতীয় নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরতে সাহায্য করবে।
অন্যদিকে, নরেন্দ্র মোদির জন্য এটি হবে নতুন বাংলাদেশ সরকারের কাছে নয়াদিল্লির প্রত্যাশাগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরার একটি সুযোগ। সফরের চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ করা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সব ঠিক থাকলে, আগামী সপ্তাহে তারেক রহমানের দিল্লি সফর হতে যাচ্ছে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার নতুন রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রথম বড় পরীক্ষা।
এই মুহূর্তে মূল লক্ষ্য হলো— দুই পক্ষকে পুনরায় আলোচনায় ফিরিয়ে আনা। কঠিন সমস্যাগুলো যেন সামগ্রিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে গ্রাস করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা।
পানি, বাণিজ্য ও সীমান্ত সমস্যা
উভয় দেশের মধ্যে চলমান সমস্যার সমাধান করার মতো দীর্ঘ তালিকা রয়েছে। আসন্ন আলোচনা মূলত দুই দেশের বাণিজ্য ও ট্রানজিট, জ্বালানি সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সংযোগের (কানেকটিভিটি) মতো নানা বিষয়ের ওপর আলোকপাত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি দীর্ঘ স্থল সীমান্ত এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও পরিবহন যোগাযোগ রয়েছে। তাই রাজনৈতিক সম্পর্কের যেকোনো ইতিবাচক পরিবর্তন এই ক্ষেত্রগুলোতে খুব দ্রুতই দৃশ্যমান হবে।
আরেকটি অন্যতম প্রধান সমস্যা হতে পারে পানি বণ্টন। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে চলেছে। এই সময়সীমা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে চুক্তিটির নবায়নের বিষয়টি আলোচনায় প্রাধান্য পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ঢাকা বেশ কিছু অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ইস্যুতে ভারতের কাছ থেকে আরও বড় ধরনের সহযোগিতাও কামনা করেছে। নয়াদিল্লির জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেবল অভিন্ন সীমান্তের কারণেই নয়, বরং বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান এবং ভারতের উত্তর—পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে এর সংযোগের কারণেও।
শেখ হাসিনার পাঁচই আগস্টের সংবাদ সম্মেলন
দুই বছর আগে ৫ই আগস্টে গণ—অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন।
পরে বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে।
ক্ষমতা হারানোর ঠিক দুই বছর পর গত ৫ই আগস্ট ভারতের রাজধানী দিল্লিতে একটি সংবাদ সম্মেলন করে আওয়ামী লীগ, যেখানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে অডিও বক্তব্য রাখেন শেখ হাসিনা এবং সরাসরি সাংবাদিকদের কয়েকটি প্রশ্নের উত্তরও দেন।
তবে আদালতের নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ সরকার গণমাধ্যমকে সতর্ক করে যাতে কেউ তার বক্তব্য নিয়ে খবর প্রচার না করে।
পরে ঢাকা অভিযোগ তোলে যে বাংলাদেশের আপত্তি সত্ত্বেও ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নয়া দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কড়া ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়ে রাতেই বিবৃতিও দেয় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দক্ষিণ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) ওই সংবাদ সম্মেলনটি আয়োজন করেছিল।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই বিবৃতিতে বলা হয়, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জুলাই গণ—অভ্যুত্থানের বার্ষিকীর দিনে দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ সরকার।
দুই দেশের সম্পর্কউন্নয়নের চেষ্টার প্রসঙ্গ টেনে ওই বিবৃতিতে বলা হয়, অনুষ্ঠানটি আয়োজনের ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন যাত্রার প্রচেষ্টায় সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে উদ্বেগ ভারত সরকারকে আগেই জানানো হয়েছিল। এর পরেও ভারতের মাটিতে এ আয়োজনের অনুমতি দেওয়ায় ঢাকা গভীর হতাশা প্রকাশ করছে।
বাংলাদেশ সরকার যেমন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দিয়েছে, একইসঙ্গে সরকারে থাকা বিএনপি নেতাদেরও অনেকে তখন ভারত সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়েছেন।
বিএনপির নেতারা বলেছেন, তাদের সরকার আসলে ভারতে অবস্থান করা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য—বিবৃতি ও কর্মকাণ্ড বন্ধ চায়।
এদিকে, শেখ হাসিনা ইস্যুকে সানে এনে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের বিরোধিতা করছে জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের একাংশের নেতৃত্বে গঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি।
‘শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ কীভাবে হবে, ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কীভাবে নতুন করে নিরূপণ হবে, এই প্রশ্নের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তারেক রহমান ভারতে যেতে পারবেন না,’ বলে সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদের বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘...দিল্লিতে যে প্রেস কনফারেন্স হয়েছে, সেটি ভারত সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থনে হয়েছে...। দিল্লি থেকে শেখ হাসিনা যা কিছু বলছে, সেগুলোকে শেখ হাসিনার ভাষ্য হিসেবে না নিয়ে দিল্লির ভাষ্য হিসেবে নিতে হবে। ভারত এই বার্তা বাংলাদেশকে দিয়ে যাচ্ছে।”
“বিচারে একটা রায় হয়েছে, সেই আসামিকে যখন প্রেস কনফারেন্স করতে দিয়েছে একটি সরকার; তার মানে এ দেশের গণতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা, সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ভারত সরকার অবস্থান নিয়েছে। এটি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধ ঘোষণা করার মতো।’
