হত্যা, হামলা, ক্ষমতাচ্যুতি এ মাসেই || আওয়ামী লীগের আগস্ট ফ্যাক্টর
বিবিসি বাংলা প্রতিবেদনঃ বাংলাদেশের রাজনীতিতে আগস্ট মাসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক মূলত শোক, সহিংসতা ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ের স্মৃতিতে জড়িয়ে আছে। কারণ বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ এই দলটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে এই মাসেই।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যা করা হয় বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে, যিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন নেতাও।
শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার ঘটনা দলটির রাজনৈতিক ইতিহাসে এতটাই গভীর প্রভাব ফেলে যে, আগস্টকে তারা ‘শোকের মাস’ হিসেবে পালন করে এসেছে।
এর প্রায় তিন দশক পর, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা হয় এবং অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান দলটির তৎকালীন সভাপতি শেখ হাসিনা।
আর চব্বিশের পাঁচই আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে পতন হয় আওয়ামী লীগের টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের। পরবর্তীতে গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে ভারতে আশ্রয় নেয়া শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। পুরো ঘটনাটিকে আওয়ামী লীগের জন্য বড় বিপর্যয় বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক।
আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৯ সালে। ৭৭ বছরের পুরোনো এই দলটির ইতিহাসে এই তিন ঘটনার প্রেক্ষাপট, কারণ ও পরিণতি এক নয়। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন বাস্তবতায় ঘটেছে সেগুলো।
তারপরও একটি জায়গায় এসে ঘটনাগুলোকে মেলানো যায়, আর তা হলোÑ আগস্ট।
১৫ আগস্ট: শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ড এবং ঘুরে দাঁড়ানো
৫১ বছর আগে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যসহ বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকায় তার ধানমন্ডির বাড়িতে হত্যা করা হয়।
তার দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা — তখন বিদেশে, ফলে এই দু’জনই কেবল প্রাণে বাঁচেন।
এ সবের মধ্যেই পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ভোর পাঁচটার দিকে একদল সেনা কর্মকর্তা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে সপরিবারে হত্যা করে এবং ক্ষমতার পালাবদল ঘটায়।
শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার সময় খন্দকার মোশতাক আহমদ ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের পর ওই দিনই তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা তখন খন্দকার মোশতাকের সরকার এবং পরবর্তী সরকারগুলোতে যোগ দেন।
এদিকে, এর আড়াই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে, ৩ নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে কারাগারে হত্যা করা হয়।
ফলে স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছরের মাথায় আওয়ামী লীগ একদিকে শীর্ষ নেতৃত্বের বড় একটি অংশ হারায়, অন্যদিকে দলটির ভেতরেও দেখা দেয় বিভক্তি ও নেতৃত্বের সংকট।
তবে সাংগঠনিক সংকটে পড়লেও আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। তারা ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছিল, তবে প্রক্রিয়াটি ছিল বেশ দীর্ঘ।
দলটির ভেতরে নেতৃত্বের কোন্দল থাকলেও শেখ মুজিবকে হত্যার পর অন্যান্য নেতারা দলকে সংগঠিত করার চেষ্টা করেছেন।
পরে ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই তাকে সর্বসম্মতিক্রমে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয় এবং পঁচাত্তরের পর ওই বছরের ১৭ মে প্রবাস থেকে সর্বপ্রথম দেশে ফেরেন তিনি। এরপর ৪৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে দলটির সভপতি পদেই রয়েছেন শেখ হাসিনা।
২১ আগস্ট: ‘রাজনীতিতে চিরস্থায়ী দাগ কেটেছে’
শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের প্রায় তিন দশক পর, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আবারও বড় ধরনের আঘাতের মুখে পড়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব।
ওইদিন ঢাকায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আয়োজিত আওয়ামী লীগের সমাবেশে হামলা হয় যেখানে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা।
একটি ট্রাকের ওপর তৈরি অস্থায়ী মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখছিলেন তিনি। ওই সময় গ্রেনেড বিস্ফোরণে ২৪ জন নিহত হন, আহত হন কয়েকশ মানুষ।
নিহতদের মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমান। হামলা থেকে প্রাণে বেঁচে গেলেও শেখ হাসিনা আহত হন এবং তার শ্রবণশক্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
হামলার পরপরই বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা ওই হামলার জন্য তখনকার বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলেছিলেন এবং হামলার দায় মাথায় নিয়ে সরকারকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
তবে ২১ আগস্টের প্রভাব শুধু আওয়ামী লীগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত ভয়াবহ সহিংসতার যেসব ঘটনা ঘটেছে, ওই হামলার ঘটনা তার একটি এবং ওই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর প্রভাবও ফেলেছে। বিশেষ করে, ঘটনাটি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সম্পর্কেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখেছে।
আশির দশকের আন্দোলনগুলোতে কিংবা নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পাশাপাশি আন্দোলন করেছে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও দুই দলের মধ্যে তখন যোগাযোগের জায়গা ছিল। কিন্তু ২১শে আগস্টের পর সেই সম্পর্ক আরও বৈরী হয়ে ওঠে।
৫ আগস্ট: জনরোষ ও ক্ষমতাচ্যুতি
পঁচাত্তরের বিপর্যয় কাটিয়ে আওয়ামী লীগ শেষ পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ৫ আগস্টের পর দলটি যে পরিস্থিতিতে পড়েছে, সেটিকে আরও জটিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের অনেকে।
২০০৯ সালে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে যে দলটি সরকার গঠন করে, তারা টানা সাড়ে ১৫ বছরের বেশি ক্ষমতায় থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র—জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়। সেদিনই সামরিক বাহিনীর সহায়তায় দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। তার সাথে তার বোন শেখ রেহানাসহ পরিবারের সদস্যরাও ছিলেন।
চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা নিয়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিলো, তা পরে এক দফা অর্থাৎ শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে রূপ নিয়েছিলো। একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন, মানবাধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার অভিযোগ, দুর্নীতিসহ নানা ইস্যুতে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বাড়ে তখন।
ওই আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ এবং ব্যাপক প্রাণহানির অভিযোগও রয়েছে শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে।
জাতিসংঘের রিপোর্টে বলা হয়েছে, জুলাই—আগস্ট গণ—অভ্যুত্থানের সময় নিহতের সংখ্যা ১৪শ’ জনের মতো হতে পারে। অন্যদিকে, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে ‘জুলাই শহীদের’ সর্বশেষ যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, সেখানে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৪৩ জনে।
এদিকে, ৫ আগস্ট শুধু শেখ হাসিনা ও তার পরিবার নন, আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা দেশ ছেড়েছেন, আত্মগোপনে গেছেন কিংবা পরে মামলার মুখে পড়েছেন। ফলে পঁচাত্তরের মতো এবারও দলটির সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক পুনর্গঠন।
বারবার আগস্ট: নিছক ঘটনাচক্র নাকি যোগসূত্র আছে?
তাহলে আওয়ামী লীগের ইতিহাসের বড় এই তিনটি ঘটনা আগস্টেই ঘটার পেছনে কি কোনো যোগসূত্র রয়েছে, নাকি এটি শুধুই ঘটনাচক্র?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, ১৫ আগস্ট ও ২১ আগস্টের মধ্যে একটি যোগসূত্র খোঁজার সুযোগ থাকলেও পাঁচই আগস্টের ঘটনাকে একইভাবে দেখা কঠিন।
তার মতে, ‘১৫ আগস্ট ও ২১ আগস্ট— পরিকল্পিত ছকে বাঁধা। আগস্টকে কেন্দ্র করেই ২১ আগস্ট হয়েছে বলে মনে করি। ১৫ আগস্টে একটি পরিবার শেষ হয়েছে। ২১ আগস্ট একটি বড় ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। কিন্তু গণঅভ্যুত্থান, প্ল্যান করে হয়েছে বলে আমি মনে করি না।’
অধ্যাপক শামীম রেজা অবশ্য তিনটি ঘটনার মধ্যে সরাসরি কোনো যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া কঠিন বলেই মনে করেন। কারণ ঘটনাগুলোর সময় ও প্রেক্ষাপট আলাদা এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে এক কোনো রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নেই।
‘খুব নির্মোহভাবে, যুক্তি দিয়ে দেখলে এখানে কোনো যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া কঠিন, কাকতালীয় বলেই মনে হয়’ বলছিলেন তিনি।
‘তিনটি ঘটনার মধ্যে একটি সাধারণ মিল হলো, প্রতিটি ঘটনাই অত্যন্ত সহিংস। ঘটনাগুলোতে হত্যাকাণ্ডের মতো বিষয় যুক্ত। তখনকার সময় যারা এই পরিকল্পনা করেছেন, তাদের প্রতীকী কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, এটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণেও স্পষ্টভাবে উঠে আসেনি।’
‘আর, সেদিক থেকে চিন্তা করলে...১৫ আগস্ট একটি দেশের জাতীয় দিবসের সাথে মিলে যায়। অন্য দু’টোকে মেলানো যায় না,’ আরও বলেন অধ্যাপক শামীম রেজা।
তিনি জানান, ২১ আগস্টের হামলার ক্ষেত্রে আগস্ট মাসকে প্রতীকীভাবে বেছে নেওয়া হয়েছিল কি না, তার স্পষ্ট কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
‘আর চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান যেভাবে সংঘটিত হয়েছে এবং যেভাবে আন্দোলনটা এক দফা দাবিতে পরিণত হয়েছে...সেটিকে ওইভাবে পরিকল্পনা করে, নির্দিষ্ট দিনক্ষণ হিসেব করে, একদম আগস্ট মাসেই ফেলা হয়েছে, এই ধরনের তথ্য প্রমাণ হাজির করা কঠিন।’
ফলে, কোনো তত্ত্বেই এগুলোর মাঝে যোগসূত্র তৈরি করা না গেলেও ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতায় ঘটে যাওয়া এই তিনটি ঘটনা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাসকে পাল্টে দিয়েছে।
