বুদ্ধি || মনজুর কাদের

এক চতুর লোক পত্রিকায় একটা বিজ্ঞাপন দিলো, যারা একমাসের মধ্যে কোটিপতি হওয়ার বুদ্ধি শিখতে চান তারা দশ টাকার পে অর্ডার সহ লিখুন।

মানুষ এমন চটকদার বিজ্ঞাপন লুফে নিলো। লক্ষ লক্ষ মানুষ দশ টাকার পে অর্ডার সহ চিঠি লিখে বুদ্ধি জানতে চাইলো। এক মাস পর চতুর লোকটি পত্রিকায় ফিরতি বিজ্ঞাপন দিলো, ‘আমার কোটি টাকা ইনকাম হয়েছে, আপনারাও এই বুদ্ধি প্রয়োগ করে কোটিপতি হতে পারেন

এরকম বুদ্ধিবাজী চতুর সারা পৃথিবীতে গিজ গিজ করছে। বাংলাদেশেও আছে। সারা পৃথিবীতে এরকম বুদ্ধির ফাঁক ফোঁকর খুঁজে বের করার একটা আন্তর্জাতিক চক্র আছে। এরা আবার দুই কক্ষ বিশিষ্ট। এক কক্ষের টাউটরা বিভিন্ন ফাঁক ফোঁকর খুঁজে বের করে কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে অপর কক্ষের কাছে বিক্রি করে দেয়। অপর পক্ষটি এসব কুবুদ্ধি প্রয়োগ করে কোটি কোটি মানুষকে সর্বস্বান্ত করে।

পৃথিবীর আদিমতম এসব কুবুদ্ধির অন্যতম হলো জুয়া বাজী ধরা যেগুলো এখনো চটকদার মোড়কে সভ্যসমাজে প্রচলিত আছে। বিজ্ঞান প্রযুক্তির উন্নতির পরম্পরায় এসব প্রতারণাও চলে উন্নত প্রযুক্তিতে।

এখানে আর একটা গল্প বলা প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে।

দুই প্রতারক সদ্য মাতৃহারা এক সহজ সরল ধনী লোককে টার্গেট করলো। একজন সাজলো বিরাট মাওলানা। অন্যজন মায়ের কবরের পাশে গর্ত করে সেখানে লুকিয়ে থাকলো। মাওলানা গিয়ে মাতৃহীন ভদ্রলোককে বললো, আপনার মা সামান্য কিছু একটা ঘাটতির জন্য জান্নাতে ঢুকতে পারছেন না। আপনি রাজি থাকলে আপনাকে অমাবস্যার মধ্যরাতে মায়ের কবরের কাছে নিয়ে যেতে পারি। তখন আপনিই মায়ের কাছ থেকে ঘাটতিটা জেনে নিতে পারবেন।

যেই কথা সেই কাজ। মধ্য রাতে কবরের কাছে গিয়ে হাত জোড় করে ভদ্রলোক ডাকলোঃ মা।

আগেই গর্তে লুকিয়ে থাকা প্রতারক বিকৃত কণ্ঠে জবাব দিলোঃ কী বাবা?

মায়ের কণ্ঠ (!) শুনে হাউমাউ করে ভদ্রলোক কেঁদে ফেললেন।

মা জানালেন, মাওলানার হাতে এক কোটি টাকা দিয়ে দোয়া করালেই তিনি জান্নাতে চলে যেতে পারবেন। তাই হলো।

এসব প্রতারণার বিভিন্ন কৌশল। আমরা কেবল দুটি প্রতারণার গল্প বললাম। পাঠক নিশ্চয়ই এরকম সহস্র গল্প জানেন।

বাংলাদেশের মানুষ বার বার এসব প্রতারণার চক্করে পড়েছে। পড়ে শিক্ষা পেয়েছে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার একই রকম প্রতারণার ফাঁদে পা গলিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে। এই পরম্পরা কবে গিয়ে থামবে, কে জানে!

বাংলাদেশ সম্প্রতি একটি প্রতারণামূলক সাময়িক সরকারের খপ্পরে পড়েছিলো।

তারা এতোই চতুর ধাপ্পাবাজ ছিলো যে জনগণ বুঝে ওঠার আগেই তাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে।

তাদের প্রথম প্রতারণা ছিলো এটা প্রচার করা যে, বাংলাদেশের ধন সম্পদ, ব্যবসা বাণিজ্য, উৎপাদন বিনিয়োগ পরিশ্রমÑ এসব কিসসু দরকার নেই। শুধু দরকার বুদ্ধি। তাদের প্রখর বুদ্ধির জন্য নাকি সারা বিশ্ব বাংলাদেশের লোকদের চাকরি দেয়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। এই দেশ বলছে যে আমাদের এতোজন পাঠাও তো ওই দেশ বলছে, আমাদের এতোজন পাঠাও।

শুধু তাই নয়, তিন শূন্যের ধাপ্পায় ফেলে বাংলাদেশকে এমন গভীর খাদে ফেলে দেয়া হবে, মানুষ তা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি। বিদেশ থেকে কিছু টাউট টাইপের লোকজন ধরে তাদের দিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের নসিহত লিপিবদ্ধ করা হলো। এদের প্রত্যেকেই বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করার স্বপ্ন দেখিয়ে নিজেরা দুই হাতে কামাই করে আখের গুছিয়ে চম্পট দিয়েছে।

লজিং মাস্টার যখন গৃহস্বামীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তখন ঘরের যে অবস্থা হয়, বাংলাদেশের অবস্থা সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের এতোই বুদ্ধি প্রয়োগ হয়েছে যে, উৎপাদন বিনিয়োগ, রপ্তানি টার্নওভার শূন্যে নেমে এসেছে। মূল্যস্ফীতি বেকারত্ব আকাশচুম্বী হয়েছে এবং দেশ বন্ধুহীন এক বিচলিত জাতিতে পরিণত হয়েছে।

তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা, পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত সংবিধানে হাত দিয়ে মূলত বাংলাদেশের হৃদপিন্ডে হাত দিয়ে বসেছে। এমনও শোনা গেছে তারা কয়েকটি আসনে যোগসাজস করে শক্তিশালী প্রার্থীদের বঞ্চিত করে পছন্দমতো অযোগ্য প্রার্থীকে জোর করে জিতিয়েছে।

কেউ কেউ আবার নির্বাচিত হলে নির্মোহ থেকে সরকারি কোন সুযোগ সুবিধা না নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সংসদে ঢুকেই গাড়ি বাড়ির বায়না করা শুরু করেছে।

ফলতঃ, বাংলাদেশ যে একটিযেই লাউ সেই কদু ব্যবস্থা পেয়েছে সেটা বুঝতে আমাদের সম্ভবত খুবই কম সময় অপেক্ষা করতে হবে।

বুদ্ধির বুলি ফেরি করে দেশের সহজ সরল মানুষকে স্বপ্নাতুর করে তারা যে আসলে নিজেরা ফুলে ফেঁপে ওঠার সকল আয়োজন সম্পন্ন করেছিলোÑ সেকথা তখনই কেউ কেউ ঠিক ধরে ফেলেছিলো। যদিও দেশের মানুষকে তখন সেকথা গেলানো যায়নি।

বাংলাদেশের মানুষের জন্মই হয়েছে বারবার প্রতারিত হওয়ার জন্য। অত্যন্ত কম দূরদৃষ্টি সম্পন্ন অপরকে অল্পেই বিশ্বাস করে বসা সহজ সরল মানুষ আলোকের আশায় যে পথেই যায় সে পথেই কেবল আলেয়ারই দেখা পেয়ে পেয়ে হতাশ হয়।

Related Posts