লেখক যখন আঁকেন || দীপেন ভট্টাচার্য ক্যালিফোর্নিয়া

পৃথিবীর বুকে আমাদের সময় কম। সেই কম সময়ে আমাদের অনেক কিছু করতে হয়। তার মধ্যে বর্ণমালা চিনে, অক্ষরকে মস্তিষ্কে স্থান দিয়ে, শব্দ সাজিয়ে ভাষাকে কব্জা করতে হয়। সেই ভাষা দিয়ে আমরা সৃষ্টি করি খাদ্য, চিকিৎসা, গবেষণা, বিনোদন, সাহিত্য।

অন্য অনেক কিছুর মতই সাহিত্য আমাদের বিবর্তনের ফল। ত্রিশ হাজার বছর আগে, প্যালিওলিথিক গুহায় যে মানুষ পশু শিকারের চিত্রকর্ম এঁকেছিল নিজের অজান্তেই সে প্রথম সাহিত্য সৃষ্টি করেছিল। তার গোষ্ঠীর মানুষেরা নিশ্চয় সেই শিল্পকর্ম দেখে লিটিল ম্যাগাজিনে লেখেনি যে, আমাদের চিত্রকর হরিণের শিংটা বড় বাঁকা করে এঁকেছে, কিন্তু তারা বুঝে নিয়েছে তাদের মধ্যে কোন শিল্পীর মান কত উন্নত।

এই যে সহজাত বোধ তা শিল্পকলার প্রথম পরীক্ষা। এর মধ্যে শ্রেণীসংগ্রাম নেই, ভাষার বিনির্মাণ নেই। এই কলা হচ্ছে ব্যক্তিমানুষের সঙ্গে প্রকৃতির বোঝাপড়ার ফসল। সেই প্রাচীন চিত্রকলাকে সেজন্য মহৎ বলা চলে। সেজন্য হয়তো আধুনিক সময়ের লেখকেরা তাদের রচনার পাশে, হাতের লেখার পাশে, তাদের চরিত্রদের রূপ দেবার জন্য তাদের চিত্র আঁকতেন। এডগার অ্যালেন পো তো ভাল আঁকিয়েই ছিলেন, সেরকমই প্রতিভা ছিল কিপলিং, বদলেয়ার, নাবোকভের। নাবোকভ কাফকার গ্রেগর সামসার কীটে পরিণত হবার ঘটনা তেলাপোকা বা গুবড়ে পোকার মত কিছু একটা এঁকে বুঝতে চেয়েছিলেন। দস্তয়েভস্কিঅপরাধ শাস্তিতে রাসকোলনিকভকে এঁকেছেন, জেমস জয়েস এঁকেছেন ইউলিসিসের লিওপল্ড ব্লুমের কার্টুন, রবীন্দ্রনাথ এঁকেছেন আত্মপ্রতিকৃতি মহাবিশ্বের মধ্যে জীবনদেবতার স্থান খুঁজতে, ফকনারের ঘটনাও তাই।

কাফকা তাঁর অংকন সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমার আঁকা মানুষের গঠনগুলোতে স্থানের অনুপাত নেই, তাদের নিজস্ব কোনো দিগন্ত নেই। যে প্রেক্ষাপট থেকে তাদের আমি আঁকতে চাইছি, ধরতে চাইছি, সেটা কাগজের বাইরে পেন্সিলের অধারালো অংশে আমার মধ্যে বিরাজমান।

হয়তো কাফকা লেখকের মস্তিষ্কে বিরাজমান চিন্তাকে ছাপার মাধ্যমে বিশ্বস্তভাবে প্রকাশ করার বিফলতার কথা বলতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে পাঠক যখন লেখাটি পড়েন তখন তিনি কি তাঁর মনে চরিত্রটিকে যথার্থভাবে কল্পনা করতে পারেন? পাঠকও কি গল্পটিকে আঁকতে পারেন না? সেই আঁকায় কি পাঠকের পাঠআনন্দের মাত্রা বাড়তে পারে? ধরুন হাসান আজিজুল হকেরআত্মজা একটি করবী গাছেরপ্রথম প্যারার একটি লাইনÑ ‘ওদিকে বড় গঞ্জের রাস্তার মোড়ে রাহাত খানের কড়ির টিনের চাল হিম ঝকঝক করে।হিম অর্থে শীতকাল, আর টিনের চালের রাতে ঝকঝক করার একটাই উপায়Ñ চাঁদের আলো তার ওপর পড়ছে। তখন আমি ফিরে যাই প্রথম লাইনেÑ ‘এখন নির্দয় শীতকাল, ঠান্ডা নামছে হিম, চাঁদ ফুটে আছে নারকেল গাছের মাথায়।

এরপরে লেখক একটা শেয়ালের মুরগী চুরি করে পালানোর কাহিনী বর্ণনা করেন। তারপর আরো হিম নামে, তখনো ইনাম, ফেকু, সুহাসের আবির্ভাব হয়নি, কিন্তু প্রথম প্যারার চিত্রকল্প আমার মনে শঙ্কা জাগায়, মনে পড়ে ১৯৭১ সনে, এক প্রত্যন্ত গ্রামে, রাতের আঁধারে একটি পাকা দালানের ওপর উঠে আমাদের ডাকাতের আক্রমণের জন্য অপেক্ষা করা। ডাকাত আসতো প্রতি রাতে, টর্চের আলো ফেলত দেয়ালের বাইরের বনে, ঝকঝক করত গাছের পাতা সেই আলোয়, শেষ পর্যন্ত তাদের হাত থেকে আমরা রক্ষা পাইনি। আজিজুল হকের গল্পশেষে আমি নিজেকে সেই বয়স্ক লোকটিই ভাবি যে কিনা বসে আছে ভাঙা চেয়ারেÑ অপেক্ষা করছে তিন ডাকাতের, ইনাম, সুহাস, ফেকুর। এই গল্পটিতে লেখক রাতের গায়ের পথকে যেভাবে মূর্ত করেছেন এই তিনটি ছিঁচকে পকেটমারের চেহারার সেরকম বর্ণনা দেননি, শুধু বলেছেন ফেকুর বাঘের মত চেহারা।

বাঘের মত চেহারাটা যে কী সেটা আমাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সৃজনশীলতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে নিতে হবে। টিনের চালে চাঁদের ঝলক, প্রতিফলন আপনি আমি ভিন্ন মানুষ হলেও মোটা দাগে একইভাবে কল্পনা করা যায়, কিন্তু বাঘের মত চেহারা আপনি আমি যে খুবই পৃথকভাবে মানসপটে মূর্ত করব তা বলার অপেক্ষা রাখে না, আর এই বিমূর্ততাই গল্পকে করে তোলে পাঠযোগ্য।

আর্ট সমালোচক Peter Mendelsund তার What We See When We Read বইয়ে লিখছেন, “আমি যদি আপনাকে বলি আনা কারেনিনাকে বর্ণনা করুন, আপনি হয়তো তাঁর সৌন্দর্যের কথা বলবেন। আপনি যদি খুব মনোযোগের সঙ্গে পড়েন তো হয়তো তাঁর ঘনআঁখিপল্লবেরকথা বলবেন, তাঁর ওজন, অথবা হয়তো তাঁর হাল্কা নরম গোঁফের (হ্যাঁএটি আছে সেখানে) কথা।আনার কাঁধ, জমাট চুল আর আধোনিমীলিত চোখ’—এর ওপর ম্যাথিউ আরনল্ড মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু আনা কারেনিনা কীরকম দেখতে ছিলেন? আপনি হয়তো অনুভব করছেন আপনি চরিত্রটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত (চমৎকার ভাবে বর্ণিত চরিত্র পড়ে মানুষ বলতে পছন্দ করেÑ এমন যেন আমি তাঁকে চিনি), কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আপনি সেই ব্যক্তিটিকে চিত্রিত করতে পারছেন। কিছুই নির্দিষ্ট নয়, কিছুই নিখুঁত নয়।

ফেকুর বাঘের মত চেহারা আমাদের হাতের বাইরেই থেকে যাবে।

Related Posts