চীন থেকে কী নিয়ে ফিরলেন প্রেসিডেন্ট
বাঙালী প্রতিবেদনঃ ইরানের সাথে যুদ্ধ নিয়ে পারস্পরিক হুমকি ধামকি চলছেই। হরমুজ প্রণালি দিয়ে নির্বিঘ্নে তেল ও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হয়নি, আমেরিকার অর্থনীতির বেহাল অবস্থা, গ্যাসের দাম সরাসরি সাধারণ মানুষের পকেটে আঘাত হানছেÑ এমন এক পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন সফর করলেন। যদিও তিনি এবং বিশ্ববাসী জানে ইরানের সাথে আমেরিকা ও ইসরাইলের যুদ্ধে নিরব, বড় ও চতুর প্লেয়ার চীন। চীন পর্দার আড়াল থেকে ইরানকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই হাই প্রোফাইল চীন সফর নিয়ে আমেরিকার জনগণের আশা যখন আকাশ ছোঁয়া তখন বিশ্ব অর্থনীতির ও প্রযুক্তির বিজনেস টাইকুনদের সফরসঙ্গী হিসাবে বেইজিং নিয়ে গিয়ে বলতে গেলে খালি হাতে ফিরলেন প্রেসিডেন্ট। এটা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের স্বভাববিরুদ্ধ। কারণ তার দীর্ঘদিনের খ্যাতি একজন সফল ‘ডিলমেকার’ হিসাবে। এই নিয়ে খবর ছেপে চলেছে পৃথিবীর সব গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী সংবাদপত্র। চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। মূল খবরটি এখানে মুদ্রিত হলোঃ ইরান যুদ্ধের মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন চীন সফরে যান, তখন ওয়াশিংটন ও বেইজিং—দুই রাজধানীতেই প্রত্যাশার পারদ ছিল আকাশচুম্বী।
প্রায় এক দশক পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের বেইজিং সফর, সঙ্গে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি, জ্বালানি, বিমান ও আর্থিক খাতের করপোরেট প্রধানদের বিশাল বহর—সব মিলিয়ে একে কেবল কূটনৈতিক সফর নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
অ্যাপল, এনভিডিয়া, বোয়িং, অ্যাক্সনমবিল, সিটিগ্রুপ, টেসলা, মেটা—এমন বহু প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীরা ট্রাম্পের সফরসঙ্গী ছিলেন। সফরের আগে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে, এটি ‘চীনকে আরও উন্মুক্ত করার’ একটি বড় সুযোগ হতে পারে।
কিন্তু সফর শেষে দেখা গেল, প্রত্যাশিত বড় কোনো বাণিজ্যচুক্তি হয়নি, নতুন শুল্ক সমঝোতা হয়নি, প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়নি, এমনকি দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কাঠামোগত বিরোধেরও দৃশ্যমান সমাধান আসেনি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
ফলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ এখন প্রশ্ন তুলছে—ট্রাম্পের এই সফর কি শেষ পর্যন্ত ‘যত গর্জে তত বর্ষে না’—এর উদাহরণ হয়ে গেল?
বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে স্বাগত জানানোর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সেক্রেটারি অব স্টেট পিট হেগসেথ, ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট, সেক্রেটারি অব স্টেট মার্কো রুবিও, এনভিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং, জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার, টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক এবং অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী টিম কুক।
তারকাখচিত সফর, কিন্তু ফল সীমিত
এই সফরের সবচেয়ে আলোচিত দিক ছিল মার্কিন করপোরেট জগতের মহারথীদের উপস্থিতি। ট্রাম্প প্রশাসন মূলত দেখাতে চেয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের বড় ব্যবসাগুলো এখনও চীনা বাজারে প্রবেশ ও সম্প্রসারণে আগ্রহী। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, জ্বালানি, বিমান ও ভোক্তা প্রযুক্তি খাতে নতুন সুযোগ তৈরির আশা ছিল।
বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, সফরে অন্তত কয়েকটি বড় বিনিয়োগ চুক্তি বা বাজার উন্মুক্তকরণের ঘোষণা আসবে। চীন হয়তো মার্কিন কৃষিপণ্য, জ্বালানি বা বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি দেবে। বাস্তবে সবচেয়ে বড় ঘোষণাটি ছিল চীনের সম্ভাব্য ২০০টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার আগ্রহ।
কিন্তু এটিও আনুষ্ঠানিক চূড়ান্ত চুক্তি হিসেবে উপস্থাপিত হয়নি। বরং বাজারে আগে যে ৫০০ বিমানের সম্ভাব্য অর্ডারের আলোচনা ছিল, তার তুলনায় এটি অনেক ছোট হয়ে গেছে। ফলে বোয়িং ও জিই অ্যারোস্পেসের শেয়ার দর পর্যন্ত পড়ে গেছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
অর্থাৎ, এই সফরের আগে যে ধরনের ‘মেগা ডিল’ নিয়ে আলোচনা চলছিল, বাস্তবে তার বড় অংশ অধরাই রয়ে গেল।
কেন বড় চুক্তি হলো না?
মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ বলছে, এজন্য কয়েকটি কারণকে সামনে এনেছেন বিশ্লেষকেরা।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পারস্পরিক অবিশ্বাস এখন অনেক গভীর
২০১৮ সালের বাণিজ্যযুদ্ধের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক কেবল শুল্কবিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ, সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, তাইওয়ান প্রশ্ন, দক্ষিণ চীন সাগর, সাইবার নিরাপত্তা এবং ভূরাজনৈতিক আধিপত্যের লড়াই।
চীন মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রযুক্তিগত উত্থান ঠেকাতে চায়। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের অভিযোগ, চীন রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি, প্রযুক্তি চুরি এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করছে।
এই প্রেক্ষাপটে একটি সফরে গিয়ে বড় অর্থনৈতিক সমঝোতা করা রাজনৈতিকভাবে দুই পক্ষের জন্যই কঠিন।
ট্রাম্পের দর—কষাকষির অবস্থান আগের মতো শক্তিশালী নয়
রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্প এবার চীনে গেছেন তুলনামূলক দুর্বল অবস্থানে থেকে। যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, উৎপাদক মূল্য সূচক দ্রুত বাড়ছে, সুদের হার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে এবং ইরান যুদ্ধ ঘিরে রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে।
এ ছাড়া, ট্রাম্পের আগের শুল্কনীতি উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে বিরল খনিজ বা ‘রেয়ার আর্থ’ সরবরাহে চীনের পাল্টা কড়াকড়ি ওয়াশিংটনের দুর্বলতাও প্রকাশ করেছে।
ফলে এবার বেইজিং সফরে ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য ছিল উত্তেজনা কমানো এবং অন্তত সীমিত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। বিশ্লেষকদের মতে, এই বাস্তবতা চীন ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে।
চীনের আগ্রহও ছিল সীমিত
অনেকে মনে করেছিলেন, অর্থনৈতিক ধীরগতির কারণে চীন এবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় চুক্তিতে আগ্রহী হবে। কিন্তু বাস্তবে বেইজিং অনেক বেশি সতর্ক অবস্থানে ছিল।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সফরের সময় ‘গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা’র কথা বললেও তাইওয়ান প্রশ্নে কড়া বার্তা দেন। তিনি ট্রাম্পকে সতর্ক করেন, তাইওয়ান ইস্যু ভুলভাবে সামলানো হলে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত বেঁধে যেতে পারে।
এতেই বোঝা যায়, চীন এখন অর্থনৈতিক আলোচনাকে নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক প্রশ্ন থেকে আলাদা করে দেখতে রাজি নয়।
চীন আরও বুঝতে পারছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থির। আগামী নির্বাচন, কংগ্রেসের চাপ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের অনিশ্চিত নীতির কারণে বেইজিংও দীর্ঘমেয়াদি বড় প্রতিশ্রুতি দিতে গিয়ে সতর্ক থেকেছে।
সফরের কেন্দ্রবিন্দুতে ইরান যুদ্ধ
ট্রাম্পের সফরের আরেকটি বড় প্রেক্ষাপট ছিল ইরান সংকট। যুক্তরাষ্ট্র চাইছিল, চীন যেন তেহরানের ওপর প্রভাব খাটিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করতে সাহায্য করে।
কিন্তু বিশ্লেষকেরা বলছেন, চীন এ ক্ষেত্রে খুব সীমিত সহযোগিতা করতে চায়। কারণ ইরান মধ্যপ্রাচ্যে বেইজিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। চীন একদিকে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা চায়, অন্যদিকে তারা ইরানের সঙ্গে সম্পর্কও নষ্ট করতে চায় না।
ফলে ইরান প্রশ্নেও এই সফর থেকে নাটকীয় কোনো অগ্রগতি আসেনি।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, ট্রাম্পের চীন সফর প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম ফল দিয়েছে। সফরের আগে যে ধরনের বড় অর্থনৈতিক সমঝোতা, বাজার উন্মুক্তকরণ বা কৌশলগত পুনর্মিলনের আলোচনা চলছিল, বাস্তবে তার খুব অল্পই দৃশ্যমান হয়েছে।
বরং এই সফর দেখিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে বড় করপোরেট প্রতিনিধিদল, জাঁকজমকপূর্ণ রাষ্ট্রীয় আয়োজন কিংবা ব্যক্তিগত কূটনৈতিক রসায়ন—কোনোটিই সহজে কাঠামোগত দ্বন্দ্ব দূর করতে পারছে না।
ফলে অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকের চোখে সফরটি শেষ পর্যন্ত আংশিক প্রতীকী সফলতা হলেও বাস্তব ফলাফলের বিচারে কিছুটা ‘যত গর্জে তত বর্ষে না’—এর মতোই হয়ে গেছে।
