ধীরে পড়ার আনন্দ || রিটন খান

বাংলাদেশে বর্তমানে মানসম্মত পডক্যাস্টের সংখ্যা বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু নির্মাতাদের বড় অংশই এখন সৃজনশীলতার চেয়ে বাণিজ্যিক লাভালাভ বা মনিটাইজেশন নিয়ে বেশি মগ্ন। কন্টেন্টের গভীরতার বদলে বাজারের কাটতিই এখন মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেদিন এক পরিচিতের আক্ষেপে অন্যরকম এক অস্থিরতার সুর পেলাম; তিনি দাবি করলেন বাংলা বইয়ের ধীরগতি নাকি তার মস্তিকের ক্ষিপ্রতার সাথে মানানসই নয়, বরং তার প্রয়োজন প্রতিনিয়ত উত্তেজনাকর শব্দ আর দৃশ্যকল্পের ঝাঁকুনি। এই পরিস্থিতিকে তিনি নিজের সামর্থ্য হিসেবে দেখলেও, আমার মনে হয় ব্যস্ত রাস্তার কোলাহল আর স্মার্টফোনের নোটিফিকেশনের ভিড়ে শান্ত হয়ে একটি পাতায় চোখ রাখার ক্ষমতা হারানোটা আসলে এক অদৃশ্য অবক্ষয়। যে স্থিরতাকে তিনি একঘেয়েমি ভাবছেন, সেটিই হয়তো গভীর মনোযোগের আসল শক্তি ছিল যা এখন দ্রুততার মোহে হারিয়ে যাচ্ছে।

পড়ার ইতিহাসটা আসলে এইরকমই, জিনিসপত্রের বদল, হাতের ভেতর কী আছে, কাগজের গন্ধ, অক্ষরের ফাঁকফোকর; এসব বদলালেই মানুষ কেমন করে পড়ে, সেটাও বদলে যায়। হাজার বছর আগে, ধরা যাক ইউরোপের কোনো পাথরের গির্জার ভেতর, হাতে মোটা পান্ডুলিপি, তাতে অক্ষরগুলো গুঁজে গুঁজে লেখা, শব্দের মাঝে কোনো ফাঁক নেই, একটানা দাগের মতো; চোখ দিয়ে দেখে বোঝা যায় না কোথায় শব্দ শেষ, কোথায় শুরু, তখন পড়তে হয় মুখে উচ্চারণ করে, ধীরে ধীরে, যেন কানে শুনে আলাদা করা যায়, কী লেখা আছে। ওই সময়ের সন্ন্যাসীরা, নানরা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে পড়ছে, ঠোঁট নড়ছে, গলার ভেতর দিয়ে শব্দ বেরোচ্ছে, আবার ফিরে আসছে, একটা বাক্য বারবার পড়ছে, যেন মদের চুমুকের মতো, একটু করে, স্বাদ নিয়ে, শব্দের ভেতর ঢুকে পড়া; এইভাবে পড়ার নাম ছিল ষবপঃরড় ফরারহধ, পড়া মানে শুধু জানা নয়, ধীরে ধীরে এক ধরনের ডুবে যাওয়া, নিজের শরীর দিয়ে টের পাওয়া।

তারপর ধীরে ধীরে বদল এল। শব্দের মাঝে ফাঁক এল, অধ্যায়ের শিরোনাম এল, সূচিপত্র, ইনডেক্স; একটা বই খুলে সরাসরি দরকারি জায়গায় চলে যাওয়া সম্ভব হল। বিশ্ববিদ্যালয়, আদালত, দপ্তর; সবখানে দ্রুত তথ্য দরকার, পুরো বই পড়ে সময় নষ্ট করা যাবে না, চোখ বুলিয়ে নেওয়া শিখে গেল মানুষ। কিন্তু তখনও ধীরে পড়া হারিয়ে যায়নি, শুধু তার পাশে দাঁড়াল আরেকটা পদ্ধতি, দ্রুত দেখা, তুলে নেওয়া, কাজে লাগানো।

ছাপাখানা এলে বই ছড়িয়ে পড়ল, হঠাৎ করে অনেক মানুষের হাতে পৌঁছে গেল লেখা, তর্ক, ধর্ম, বিজ্ঞান; সবকিছু। তখন আর সময় নিয়ে প্রতিটা বই পড়া সম্ভব নয়, কে কী লিখছে, কোথায় কী হচ্ছে, সেটা ধরতে হলে দ্রুত পড়তেই হবে। ফ্রান্সিস বেকন বলছে, সব বই একইভাবে পড়ার দরকার নেই; কিছু শুধু চেখে দেখা, কিছু গিলে ফেলা, আর খুব কম বই আছে যেগুলো চিবিয়ে হজম করতে হয়। আবার রুশো বসে বসে আক্ষেপ করছে, মানুষ পড়ছে ঠিকই, কিন্তু যেন শুধু বলার জন্য যে পড়ছে, ভেতরে ঢোকার জন্য নয়। পত্রিকা, ম্যাগাজিন, খবরের কাগজ; সব মিলিয়ে গতি বাড়তেই থাকল।

এখন এসে আমরা যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, এখানে গতি যেন থামার কোনো জায়গাই রাখেনি। ফোনটা হাতে নিলেই একটার পর একটা লেখা, ছবি, ভিডিও, লিঙ্ক; একটা পড়তে পড়তেই আরেকটা টেনে নিয়ে যায়। মাঝ বাক্যে থেমে যাওয়া এখন স্বাভাবিক, একটা লিঙ্কে চাপ দিলেই অন্য জায়গা, সেখান থেকে আরেকটা; মাথার ভেতর যেন ছোট ছোট টুকরো, কোথাও পুরোটা জোড়া লাগছে না। তথ্য বাড়ছে, কিন্তু মনোযোগ কমছে; এই কথাটা এখন প্রায় সবারই জানা, কিন্তু তাও থামা যাচ্ছে না।

ডিজিটাল স্ক্রিনে পড়া মানে শুধু লেখা পড়া নয়, তার চারপাশে আরও অনেক কিছু থাকে; বিজ্ঞাপন ঝলকাচ্ছে, পাশে ভিডিও, নিচে কমেন্ট, আর ভেতরে ভেতরে একটা টান, এখান থেকে বেরিয়ে অন্য কোথাও যাওয়ার। এমনকি না গেলেও একটা চাপ কাজ করে, যেন কিছু মিস হয়ে যাচ্ছে। এই টানটা অদ্ভুত, চোখের সামনে লেখা থাকলেও মন সরে যায়। পরে মনে করতে গেলে বোঝা যায়, ঠিক কোথায় কী পড়েছিলাম, সেটা মনে পড়ছে না।

কাগজের বইয়ের একটা আলাদা শরীর আছে; পাতা উল্টানো, আঙুলের স্পর্শ, ডান পাশে ছিল না বাঁ পাশে, ওপরের দিকে না নিচে; এইসব ছোট ছোট চিহ্ন মনে রাখতে সাহায্য করে। বুক রিডার কিছুটা শান্ত, কিন্তু তাতেও ওই ত্রিমাত্রিক অনুভূতিটা পুরো আসে না। ফলে পড়া হয়, কিন্তু কোথায় কী ছিল, সেটা মনের ভেতর বসে না আগের মতো।

এইসব মিলিয়ে এখন এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে, অনেকেই বলে, মন দিয়ে পড়তে পারি না, বসে থাকলেও মাথা অন্যদিকে চলে যায়। যেন পড়া একটা কাজ হয়ে গেছে, শেষ করতে হবে, টিক দিতে হবে, এগিয়ে যেতে হবে। আমাকে অনেকে বলছে কোরান শরীফ পড়তে গিয়েও মনে হয় যেন ইমেইল স্কিম করছি, দ্রুত দেখে শেষ করে ফেলছি, ভেতরে ঢুকছি না।

তবু একটা জিনিস রয়ে গেছে, যেটা নিয়ে খুব কম কথা হয়; ধীরে পড়ার আনন্দ। যখন একটা বইয়ে ডুবে যাওয়া যায়, বাইরে কী হচ্ছে ভুলে যাওয়া যায়, সময়ের হিসেব থাকে না; এই যে ডুবে থাকা, এটা অন্যরকম। কোনো উপদেশের মতো নয়, কাজের তালিকার মতো নয়, বরং একটা অভিজ্ঞতা, যেখানে মাথা আর শরীর একসঙ্গে জড়িয়ে থাকে। কাগজের বই হাতে নিয়ে বসে থাকলে এই ডুবে যাওয়াটা সহজ হয়, স্ক্রিনে সেটা বারবার ভেঙে যায়।

অনেক সময় টেবিলের ওপর বইয়ের স্তূপ পড়ে থাকে, চোখ যায়, মনে হয় এতগুলো পড়া বাকি, সময় কোথায়, তারপর ফোন তুলে ইমেইল করে ফেলা, ছোট কাজগুলো সেরে ফেলা; মনে হয় এগুলোই জরুরি। কিন্তু সেই মুহূর্তে যেটা চোখ এড়িয়ে যায়, সেটা হল, একটা বই খুলে কয়েক মিনিট পড়ার ভেতর যে স্বাদ, সেটা অন্য কোথাও নেই। এটা কোনো কাজ শেষ করার তাড়া নয়, বরং একটু থেমে থাকা, একটু ধীরে যাওয়া।

পড়াকে যদি কাজের তালিকা থেকে সরিয়ে আনা যায়, যদি এটাকে একটু অন্যভাবে দেখা যায়; যেমন কেউ ধীরে ধীরে চুমুকে চুমুকে এক কাপ চা খাচ্ছে, তাড়াহুড়ো নেই, শেষ করার চাপ নেই, শুধু স্বাদটা নেওয়া; তাহলে হয়তো বোঝা যাবে, ধীরতা আসলে কোনো দুর্বলতা নয়। বরং এই ধীরতার ভেতরেই একটা গভীরতা আছে, যা দ্রুততার ভেতর হারিয়ে যায়।

পডক্যাস্টের আলোচক যেটাকে অস্বীকার করে, সেই ধীরতার ভেতরেই হয়তো অন্যরকম এক তৃপ্তি আছে, যেটা শব্দে বোঝানো যায় না, শুধু বসে থেকে, পাতা উল্টে, একটু একটু করে পড়তে পড়তেই টের পাওয়া যায়।

হ্যাপি রিডিং।


Related Posts