বইপাঠ: কোন বই এবং কেন? আনিসুজ জামান ক্যালিফোর্নিয়া

জীবনে অনেক বই পড়ার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। কিন্তু যে কটি বই পড়ি, সেটা ভালো করে পড়তে হবে। অর্থাৎ বইয়ের কোয়ানটিটি না, পাঠের কোয়ালিটিটা মূল বিষয়। দশটা বই ভাসা ভাসা করে পড়ার চেয়ে একই সময়ে একটা বই গভীরভাবে পড়া অনুধাবন করা বেশি জরুরি। 

বই তখনই পাঠকের সঙ্গে কথা বলে, তর্কবিতর্ক করে যখন সেটা সাধারণ পাঠকে অতিক্রম করে যায়। আমরা বলি কোনো কোনো বই পাঠকের জীবন বদলে দিতে পারে। কথাটা সত্য বটে, কিন্তু বিষয়টা একতরফা বইয়ের উপর নির্ভর করে না। পাঠকের উপরও নির্ভর করে। এই কারণে একই বই দশজন পাঠক পড়লে দশজনের জীবনই বদলে যায় না।

আমি সাহিত্যকে তিন ভাগে ভাগ করতে চাই। 

প্রথমটি হলো বিনোদনমূলক সাহিত্য। মানুষের জীবনে বিনোদনের প্রয়োজন আছে। তাই আমি বিনোদনমূলক বই লেখা এবং সে ধরনের বই পাঠ করাÑ দুটোই গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। ধরনের সাহিত্য ভ্রমণে, অলস সময়ে সুন্দরভাবে সঙ্গ দেয়। আমি কখনো কখনো বিমান, বাস বা ট্রেনে ভ্রমণের সময় ধরনের কোনো একটি বই নিয়ে উঠি। পড়া শেষ হলে বইটি সব সময় আর বাসায় নিয়ে আসি না। 

দ্বিতীয়টি হলো সেই ধরনের সাহিত্য, যা আপাতভাবে মনে হয় গভীরবোধসম্পন্ন। জটিলতা ভাষাভঙ্গী দিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতার আবরণ তৈরি করে, অথচ পাঠ শেষে পাঠকের ভেতরে তেমন কোনো অনুভূতি তৈরি হয় না। কেবল অস্পষ্টতা, জটিলতা বা অতিরিক্ত রেফারেন্সের কারণে গভীর বলে মনে হয়, হতেও পারে গভীর, কিন্তু সেটা মানুষের হৃদয়কে জাগাতে পারে না, পাঠকের সঙ্গে কথা বলতে পারে না।

আর তৃতীয় ভাগে রাখি আমি সেই সাহিত্যকে যা পাঠককে বদলে দেয়। এক মানুষ থেকে অন্য মানুষে রূপান্তরিত করে। 

আমি নিজে পাঠক হিসেবে এই সাহিত্যটাকেই অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। 

সমস্যা হলো, তৃতীয়ধারার সাহিত্যকে অধিকাংশ পাঠক প্রথম ধারার সাহিত্যের মতো পাঠ করতে পছন্দ করে না। সাহিত্য বলতে তারা প্রধানত বিনোদনমূলক সাহিত্যকে বোঝে। 

তারা কেবল উপরের গল্পটি খোঁজে। তাদের জানার বিষয় হলো ঘটনা। কিন্তু Pedro Páramo, Ficciones, The Pit,  বা The Sound and the Fury-এর মতো বই কেবল গল্প বলার জন্য রচিত হয়নি। ধরনের সাহিত্য লেখা হয় মানুষের ভেতরে প্রতিধ্বনি, প্রতিস্বর প্রতিকণ্ঠ সৃষ্টি করার জন্য। মানুষকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। 

আমি এটাও বিশ্বাস করি না যে বোর্হেসকে পড়তে হলে আগে বোর্হেস নিজে যে দর্শন, ইতিহাস, গণিত বা পুরাণ পড়েছেন, সেগুলো সব পড়ে নিতে হবে। তা অসম্ভব। একই কথা রুলফো, ফকনার, বা মার্কেসের মতো মহান লেখকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কেউই পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে কোনো লেখকের জগতে প্রবেশ করতে পারে না।

প্রকৃত প্রবেশপথ অনেক সহজ।

পাঠককে থামতে শিখতে হবে। থামতে জানতে হয়। 

কারণ এই লেখাগুলোর মধ্যে অদ্ভুত কিছু থাকে। একটি অপ্রত্যাশিত শব্দ। অস্বাভাবিক যতিচিহ্ন। অস্বাভাবিক দীর্ঘ একটি বাক্য। এক বিরল নীরবতা। এক সন্দেহজনক পুনরাবৃত্তি। সেখানেই ধরনের সাহিত্য নিজেকে খুলতে শুরু করে। অধিকাংশ পাঠক গল্প ধরে নিতে গিয়ে সেই ফাটলগুলোর ওপর দিয়ে দ্রুত চলে যায়। প্রয়োজনে লাফিয়ে যায় স্বচ্ছন্দে হাঁটার জন্য। অথচ প্রকৃত পাঠ ওই ফাটলটুকুই। 

আমিনা বোঝা কথা বলছি না। আমি সেই মুহূর্তের কথা বলছি, যখন পাঠক অনুভব করে যে লেখাটি আর স্বাভাবিকভাবে এগোচ্ছে না। মনে হচ্ছে একই জায়গাতে ঘুরপাক খাচ্ছে। বা কি ঘটছে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।

সাহিত্যকে আরো দুটো অ্যাঙ্গেল থেকে পাঠ করা যায়। এক. লেখক সম্পর্কে জেনে। দুই. লেখক সম্পর্কে কোনোকিছু না জেনে। 

তৃতীয় ধারার বইয়ের ক্ষেত্রে লেখকের ভূগোল, তাঁর বায়োগ্রাফি, অভিরুচি ইত্যাদি জানা থাকলে টেক্সটের গভীরে যাওয়া সম্ভব হয়। তখন ছোটো ছোটো ফাটলগুলো চোখের সামনে উন্মোচিত হয়ে পড়ে। এটা জরুরি পাঠকে একাডেমিক অনুশীলনে পরিণত করার জন্য নয়, বরং বুঝতেÑলেখক কোথা থেকে চিন্তা করেন, কীভাবে পৃথিবীকে দেখেন, ভাষাকে কীভাবে শোনেন। বোর্হেসের জগতে যেভাবে প্রবেশ করতে হয়, রুলফোর জগতে তেমনভাবে প্রবেশ করা যায় না। ওনেত্তিকে যেমন পড়তে হয় মার্কেসকে তেমনভাবে পড়া যায় না।

এবং এই বইগুলো অনেক সময় সামষ্টিক পাঠে বা গ্রুপ স্টাডিতে আরো ভালো করে বোঝা যায়। অন্যদের সঙ্গে একত্রে পড়ার কারণে অপ্রত্যাশিত পথগুলো খুলে যায়। এজন্য সাহিত্যের খুব সমঝদার পাঠক হতে হবে তাও না। অনেক সময় নতুন পাঠক এমন কিছু আবিষ্কার করে, যা অভিজ্ঞ পাঠকের চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ আমরা সাহিত্য পড়ি না বিখ্যাত হওয়ার জন্য, বুদ্ধিমান দেখানোর জন্য, কিংবা কোনো তত্ত্ব প্রমাণ করার জন্য। আমরা পড়ি, কারণ নিজেদের মতো কিছু না কিছু আবিষ্কারের আনন্দ পাই। আমরা পড়ি, পাঠ একটা সৃজনশীল প্রক্রিয়া, আমরা সৃষ্টি করি আমাদের পাঠে। এই সৃষ্টিশীল পাঠের ভেতর দিয়ে মানবিক অভিজ্ঞতাকে আরও গভীরভাবে বোঝার আনন্দ খুঁজে পাই। 

তবে এই সৃষ্টিশীলতার কারণে একটা অসুবিধাও আছে। একই বই বিভিন্ন বিভিন্ন পাঠে তার আবেদন বদলে যায়। নির্ভর করে কোন বই আমরা কোন পরিবেশ মানসিক অবস্থার ভেতর পাঠ করছি। ক্লান্তি, শব্দ বা বিষণ্ণতার মধ্যে পড়া কোনো কবিতা অন্ধকার হয়ে উঠতে পারে। সেই একই কবিতা যদি নদীর পাশে, ভিন্ন আলোয়, শান্ত মনের মধ্যে পড়া হয়, তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু উন্মোচন করতে পারে।

এই কারণেই আমি বলি, কেউ যদি অল্প কিছুরূপান্তরমূলকবই পড়ে, এবং তা সত্যিকার অর্থে পড়ে, তবে তার আর বেশি বই পড়ার প্রয়োজন নেই।


Related Posts