চলে গেলেন দেশবরেণ্য অভিনেতা আতাউর রহমান

দেশের বরেণ্য অভিনেতানাট্যকার আতাউর রহমান মারা গেছেন। টানা দশ দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর গত সোমবার মধ্যরাতে ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। তিনি এক ছেলে এক মেয়ে রেখে গেছেন। মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে একুশে স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য এই নাট্যজনকে। সেখানে মায়ের কবরেই সমাহিত করা হয় তাকে। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যেন আবারও মায়ের কোলেই ফিরে গেলেন তিনি।

এর আগে রাজধানীর মগবাজারে ইস্পাহানি সেঞ্চুরি আর্কেডে নিজ বাসভবনের সামনে বাদ জোহর তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ইমামতি করেন তার ছোট ভাই আবু নোমান মামুদুর। জানাজায় উপস্থিত ছিলেন মামুনুর রশীদ, নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, জাহিদ হাসান, গাজী রাকায়েতসহ অভিনয় জগৎ সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বহু মানুষ। এরপর সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য আতাউর রহমানের মরদেহ নেওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান সংগঠনের পক্ষ থেকে ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো হয়। শ্রদ্ধা জানান রামেন্দু মজুমদার, মফিদুল হক, তারিক আনাম খান, সারা যাকের, লাকী ইনাম, খায়রুল আনাম শাকিল, ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, শংকর সাঁওজাল, আজাদ আবুল কালাম, কামাল উদ্দিন কবির, রওনক হাসান, সামিনা লুৎফাসহ অনেকে।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার বাসায় হঠাৎ পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন আতাউর রহমান। তাকে প্রথমে গুলশানের একটি হাসপাতালে নেওয়া হলেও সেখানে আইসিইউ সুবিধা না থাকায় ধানমন্ডির আরেকটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সে সময় তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বহুমাত্রিক অবদান রেখেছেন আতাউর রহমান। তিনি ছিলেন নাট্যকার, অভিনেতা, মঞ্চনির্দেশক সংগঠক। পাকিস্তান আমলে গড়ে ওঠা দেশের প্রধানতম নাট্যসংগঠন নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। স্বাধীনতাপরবর্তীসময়ে বাংলাদেশে নবনাট্য আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত ছিলেন। ঢাকায় প্রথম দর্শনীর বিনিময়ে মঞ্চনাটক প্রদর্শনী শুরু করে তাদের দল নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়। ১৯৭২ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্তের নাটকবুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁনির্দেশনার মাধ্যমে মঞ্চনির্দেশক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের নাটকগডোর প্রতীক্ষায়’, ‘গ্যালিলিও’, ‘ঈর্ষা’, ‘রক্ত করবী’, ‘ক্রয়লাদ ক্রেসিদা’, ‘এখন দুঃসময়’, ‘অপেক্ষমাণ’—এর মতো নাটকগুলোও নির্দেশনা দিয়েছেন। নাগরিকের বাইরে আতাউর রহমানআগল ভাঙার পালা’, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘ম্যাকবেথ’, ‘গডোর প্রতীক্ষায়’, ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’, ‘নারীগণ’, ‘রুদ্র রবি জালিয়ানওয়ালাবাগনাটকগুলো নির্দেশনা দিয়েছেন।

শিক্ষকতা লেখালেখিতেও সক্রিয় ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে খন্ডকালীন শিক্ষকতা করেছেন। তার প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে রয়েছেপ্রজাপতি নিবন্ধ’, ‘মঞ্চসারথির কাব্যকথা’, ‘নাটক করতে হলেনাট্যপ্রবন্ধ বিচিত্রা অভিনয় করেছেন বেশ কিছু টিভি নাটক চলচ্চিত্রে।

সংগঠক হিসেবেও তার মিকা অনন্য। বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটবাংলাদেশ কেন্দ্রের সভাপতিসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন আতাউর রহমান। সংস্কৃতিতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০১ সালে একুশে পদক এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। ছাড়া বিভিন্ন সময়েমুনীর চৌধুরী সম্মাননাসহ একাধিক পুরস্কার সম্মাননা লাভ করেছেন। তার জন্ম ১৯৪১ সালের ১৮ জুন নোয়াখালীতে।

এদিকে, আতাউর রহমানের মৃত্যুতে তাঁর নাট্যজীবন, অবদান ব্যক্তিত্ব নিয়ে কথা বলেন মামুনুর রশীদ। তিনি বলেন, ‘দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে থেকেই আতাউর রহমানকে চিনতাম। পাকিস্তান আমলেই তিনি নাটকের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। স্বাধীনতার পর নতুন উদ্যমে নাট্যচর্চা শুরু করেন। পরে তিনি নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন।’ ‘৫০ বছরেরও বেশি সময় তিনি নাটকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিশেষ করে মঞ্চনাটকে তার বিশাল অবদান আছে। এই অবদান কখনো ভুলবার নয়,’ বলেন তিনি। তিনি আরও বলেন, ‘মঞ্চের জন্য আতাউর রহমান অসংখ্য কাজ করেছেন। নাটক লিখেছেন, নাট্যরূপ দিয়েছেন, নির্দেশনা দিয়েছেন, অভিনয়ও করেছেন। শুধু নিজের দলের জন্য নয়, অন্য নাট্যদলের জন্যও নির্দেশনা দিয়েছেন। তার কাজ দর্শকদের প্রশংসা ভালোবাসা পেয়েছে।

মামুনুর রশীদ বিশেষভাবে উল্লেখ করেনরক্তকরবীনাটকের কথা। তিনি বলেন, ‘রক্তকরবী ছিল অত্যন্ত সাড়া জাগানো প্রশংসিত একটি নাটক। এটি তার নির্দেশিত অসাধারণ একটি মঞ্চনাটক। এছাড়া তিনি গ্যালিলিওসহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। এসব কাজই তাকে মানুষের মনে বাঁচিয়ে রাখবে।আতাউর রহমানের সাহিত্য সংস্কৃতিচর্চার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির প্রতি তার গভীর ভালোবাসা ছিল। তিনি প্রচুর পড়তেন, জানতেন অনেক কিছু। সেই জ্ঞান অভিজ্ঞতা তিনি নাট্যদলের জন্য উজাড় করে দিয়েছেন।

তার ভাষ্য, ‘একসময় তিনি বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের প্রধান ছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, তিনি সারাজীবন নাটক নিয়েই থেকেছেন। এর বাইরে আর কিছু ভাবেননি। শিল্পের প্রতি তার গভীর ভালোবাসা দায়বদ্ধতা ছিল।

মামুনুর রশীদ বলেন, ‘মঞ্চে তার অনেক কাজ দেখেছি, প্রশংসাও করেছি। এত বছরের পথচলায় কত স্মৃতি, কত কথা মনে পড়ছে। সবকিছু ছেড়ে তিনি চলে গেলেন। তার প্রতি আমার গভীর ভালোবাসা শ্রদ্ধা রইল।

তারিক আনাম খান বলেন, ‘একজন কমিটেড মানুষ ছিলেন আতাউর রহমান। সারাজীবন কমিটমেন্ট ধরে কাজ করে গেছেন। আমাদের পথিকৃৎ তিনি। গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনে বড় দায়িত্ব পালন করেছেন। আধুনিক নাট্যচর্চা করেছেন।

তিনি জানান, ১৯৬৮ সালে আতাউর রহমান জিয়া হায়দার মিলে নাগরিক নাট্যসম্প্রদায় গঠন করেন। স্বাধীনতার পর আরও অনেকে এই দলে যুক্ত হন। বাংলাদেশের নাট্যচর্চার শুরুর দিকেই আতাউর রহমান নাটক নির্দেশনা দিয়েছেন, অভিনয়ও করেছেন। তারিক আনাম খান বলেন, ‘সম্ভবত ১৯৭৩৭৪ সালের দিকে তার সঙ্গে আমার সখ্যতা গড়ে ওঠে। সেটা আজীবন ছিল।

আতাউর রহমানের ব্যক্তিগত স্বভাবের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আতাউর রহমানের সঙ্গে হাসিঠাট্টার সম্পর্ক ছিল। মজা করতেন। আড্ডা পছন্দ করতেন। আড্ডাপ্রিয় মানুষ ছিলেন। আমার বাসায়, কখনো আতা ভাইয়ের বাসায় আড্ডা দিয়েছি। কখনো কখনো আলী যাকেরের বাসায়ও আড্ডা দিয়েছি।

আতাউর রহমানের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে তারিক আনাম খান বলেন, ‘তার চলে যাওয়ায় দুঃখ পেয়েছি। আসলে এভাবেই চলে যেতে হয়, জীবন এমনই। তবে তার উৎসাহ আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে, তা মনে থাকবে সবসময়।

নাট্যকার মাসুম রেজা,বলেন, ‘আতাউর রহমান থিয়েটারের মানুষ। সত্যি কথা বলতে, থিয়েটারের পরিপূর্ণ মানুষ আতাউর রহমান। সংস্কৃতিমনা মানুষ। আধুনিক মনের মানুষ। এত সিনিয়র হওয়ার পরও অনেক আধুনিক একজন মানুষ ছিলেন আমার প্রিয় আতা ভাই।

থিয়েটারে আতাউর রহমানের অবদানের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘বাংলা নাটকে তার ব্যাপক অবদান। বাংলা নাটককে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন। সৃষ্টিশীল মানুষ ছিলেন। সবসময় সৃষ্টির নেশায় থাকতেন।

আতাউর রহমানের সাহিত্যচর্চা বিশ্বনাট্যের প্রতি আগ্রহের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। মাসুম রেজা বলেন, ‘যেকোনো কাজে রবীন্দ্রনাথের লেখা থেকে আতা ভাই উদ্ধৃতি দিতেন। রবীন্দ্রনাথের ভক্ত ছিলেন এবং প্রচুর পড়াশোনা করা একজন মানুষ ছিলেন। শেকসপিয়ার নিয়ে কাজ করেছেন। বিশ্বখ্যাত নাট্যকারদের প্রতি তার প্রবল শ্রদ্ধাবোধ ছিল। সেইসব কাজ মঞ্চে নিয়ে এসেছেন। কাজ করে তৃপ্তি পেয়েছেন।

শেষে মাসুম রেজা বলেন, ‘তার কথায় আনন্দ পেতাম। অনেক কিছু জানতাম। তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

Related Posts