বই পড়ার অভ্যাস সমাজকে এগিয়ে নিতে বিশেষ সহায়ক! আবেদীন কাদের নিউইয়র্ক

আমাদের সমাজে বই পড়ার অভ্যাস খুব বেশি মানুষের নেই। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ একটা সময়ে অনেক বই পড়তেন, কিন্তু ধীরে ধীরে তা কমে আসতে শুরু করেছে। এর পেছনে নানা কারণ রয়েছে হয়ত, কিন্তু সবচেয়ে বড় কারণ সম্ভবত আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। বই পড়া এক ধরনের অভ্যাস, কিন্তু এছাড়া মানুষের মননজাত ক্ষুধার কারণে মানুষ বই পড়ে। এবং শেষ অবধি একজন ব্যক্তির বইপড়া এক ধরনের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায় যখন মানুষ বই না পড়ে থাকতে পারে না। এটা সৃষ্টি করে সাধারণত শিক্ষাব্যবস্থা, কিন্তু পারিবারিক আবহ বা শিশুবেলা থেকে একজন মানুষ যা দেখে তা তার মনোজগতে বড় প্রভাব ফেলে। অনেক পাঠক এবং বড় লেখকও জানিয়েছেন যে তিনি বাড়িতে মা বাবা বা বড় ভাইবোনদের কাছে বই পড়ার অভ্যাসটি দেখে বই পড়া রপ্ত করেছেন। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারে এখন থেকে পঞ্চাশ বা ষাট বছর আগেও লক্ষ্য করা যেতো যে মায়েরা বা বড় ভাইবোনরা দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর বিছানায় গা এলিয়ে দীর্ঘ উপন্যাস বা অন্য কোন পছন্দের বই পড়তেন। আজকাল শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে অভ্যাস কমে গেছে, কারণ হয়ত একাধিক, যেমন অধিকাংশ মধ্যবিত্ত নারীরা আজ কর্মজীবী এবং তারা কেউই প্রায় দুপুরে ঘরে থাকেন না, থাকেন কর্মক্ষেত্রে। এছাড়া সারাদিন কাজ করে বাড়ি ফিরে মেয়েরা বই পড়ার সুযোগ পান না বন্ধের দিন ছাড়া। 

দ্বিতীয়ত বইয়ের জায়গা কেড়ে নিয়েছে বিভিন্ন সায়েন্টিফিক গ্যাজেট, অর্থাৎ ইন্টারনেট বা সামাজিক মাধ্যম। 

একটি সমাজের মানুষ কোন বিষয়কে কীভাবে দেখবে বা কতটা মূল্য দেবে তা শেখানো হয় ছেলেবেলায় স্কুলে। ধরা যাক পশ্চিমা স্কুলগুলোতে প্রতি সপ্তাহে মাধ্যমিক স্কুলের ছেলেমেয়েদের বাধ্যতামূলকভাবে বই পড়তে হয়, তা নিয়ে ক্লাসে নির্দিষ্ট দিনে আলোচনায় অংশ নিতে হয়, দীর্ঘ ছুটির সময় কয়েকটি করে বই বাড়ি নিয়ে যেতে হয়, বন্ধের পর তা ফেরৎ দিতে হয় বা ক্লাসে আলোচনায় অংশ নিতে হয় বা লিখতে হয় বিষয়ে। এভাবেই ছাত্রদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে। কিন্তু আমাদের সমাজে অধিকাংশ ছাত্র ছাত্রী বই পড়ে নিজের ইচ্ছায় পছন্দে। তাই বই পড়াটা অভ্যাসে পরিণত হয় না। কোনটা ভালো বই বা অবশ্য পাঠ্য তাও অনেকেই বুঝতে পারে না। কিন্তু এই ভালো বা মন্দ বইয়ের শনাক্তকরণের কাজটি মূলত করে থাকে প্রতিষ্ঠান, বা শিক্ষাব্যবস্থা। তাই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সিলেবাস বা কারিকুলামের মধ্যে কী পড়ানো হবে বা কী পড়ানো বন্ধ হবে তা নির্ধারণ করে সরকার। আমাদের সরকার যেহেতু গত প্রায় সাত আট দশক ধরেই শুধু ভীষণরাজনৈতিকতাই নয়, বরং ধর্মীয় রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত। তাই আমাদের শিক্ষার সিলেবাস থেকে কখনও কখনও এমন লেখকের লেখাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বা বাদ দেয়া হয়েছে যা আসলে বইয়ের বা লেখার মূল্যমানের চেয়ে লেখকের ধর্ম বেশি গুরুত্ব পেয়ে এসেছে। এটা খুব বিপজ্জনক ফলাফল বয়ে আনতে পারে যদি জ্ঞানের রাজ্য ধর্ম রাজ্যের দখলে চলে যায়। ভারত বিভাগের আগে থেকে দেখা গেছে আমাদের সাহিত্যের বা বিজ্ঞানের অধিকাংশ ভালো লেখা লিখেছেন হিন্দু ধর্মালম্বী বড় লেখকগণ, এমনকি বিজ্ঞানের আবিষ্কার বা চর্চার ক্ষেত্রেও দেখা গেছে তাঁরাই ছিলেন সংখ্যায় বেশি। কিন্তু ধর্মের ভিত্তিতে যেহেতু পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছে তাই মুসলিম ছাড়া অন্য ধর্মের লেখকদের লেখা পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে রাজনীতি ব্যবহার করা হয়েছে, নির্বাচন করতে গিয়ে অহিন্দু সম্প্রদায়ের লেখকদের গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এতে আমাদের স্কুলের পাঠ্যতালিকা বিপর্যস্ত হয়েছে। এটা তো গেল বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে যে রাজনৈতিক বিবেচনা বা ধর্মীয় রাজনীতি কীভাবে প্রভাব বিস্তার করে সেদিকটা, কিন্তু আমাদের সমাজে গত কয়েক দশকে গ্রামের এবং শহরের শিক্ষালয়গুলোর নিদারুণ বৈষম্যের কারণে বই পড়ায় ছেলেমেয়েদের বিপুল ক্ষতি হয়েছে। যেমন আমাদের স্বাধীনতার আগে থেকেই শহর এবং গ্রামের পাবলিক স্কুলগুলোর শিক্ষকদের মানে ব্যাপক বৈষম্য ছিলো, সরকারি স্কুলগুলোর শিক্ষকরা চাইতেন শহরে থাকতে তাই গ্রামের স্কুলের শিক্ষকদের মান শহরের স্কুলের শিক্ষকদের মতো ছিলো না। ভালো বা উচ্চমানের শিক্ষকরা বিভিন্ন উপায়ে শহরের স্কুলেই পদায়িত হতেন। এর ফলে বই নির্বাচন বা পাঠাভ্যাস গড়তে শিক্ষকরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় একই রকম মনোযোগী ছিলেন না বা এখনও থাকেন না, বা সব শিক্ষকদের সে ক্ষমতাও থাকে না। তাই শিক্ষা ব্যবস্থার অধঃপতনের মতোই ছাত্র ছাত্রীদের পাঠাভ্যাসেও ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। 

দেশের স্কুল কলেজের শিক্ষাব্যবস্থায় আমাদের কিশোর কিশোরী বা তরুণ তরুণীদের মাঝে বই পড়ার অভ্যাস সৃষ্টি ছাড়াও মনস্তাত্ত্বিক জগতে কেন বই বড় ক্ষুধার সৃষ্টি করে, যাকে আমরা জ্ঞান পিপাসা বলি, তা সহজে হয়তো চোখে পড়ে না, দৃশ্যমান নয়, কিন্তু সময়ের দীর্ঘ পরিসরে তা একটি জাতির কর্মকান্ডে বা কালেকটিভ সাইকিতে প্রকাশ পায়। ধরা যাক জাপান বা ইউরোপের ছেলেমেয়েদের মাঝে বই পড়ার পছন্দের তালিকা বিষয়ে গবেষণা করে দেখা গেছে জাপানের পাঠকদের মাঝে বিজ্ঞান বা গণিত বিষয়ক বই বা বিজ্ঞানসাহিত্য পড়তে বেশি উৎসাহী দেখা যায়, অন্যদিকে ইউরোপের উদার গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে ছাত্রদের পড়ার অভ্যাসের তালিকায় মানবিক বিদ্যার বইয়ের তালিকা বেশি। সুতরাং গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী বোঝা যায় একটি সমাজের শাসনব্যবস্থা সেই সমাজের মানুষদের পাঠের বিষয় মনোজগতের স্বরূপ কেমন করে নির্মাণ করতে চান তা নির্ভর করে সমাজ কারা চালায় বা কী তারা চায় তার ওপর। সাম্প্রতিক মার্কিন একটি গবেষণায় দেখা গেছে ১৫ বছরের বেশি বয়সী ছেলেমেয়রা পড়ার বই নির্বাচনে তারা স্মৃতিকে কিছুটা প্রাধান্য দেন। যেমন তার স্কুলে যাওয়ার বয়স হওয়ার আগে তার মায়ের হাতে যে বিষয়ের বই বেশি দেখেছে সে তার পাঠ্য তালিকায় সে বিষয়ের বইকে প্রাধান্য দেয়। ক্লেয়ার রেনলডস নামে একজন লেখক জানিয়েছেন তার শুধু পাঠাভ্যাস নয় এমনকি তিনি কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া পর্যন্ত মায়ের পাঠাভ্যাস দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। ছেলেবেলায় সারাক্ষণ তিনি মায়ের হাতে সাহিত্যের বই দেখতে পেতেন, তাই তিনি নিজে সাহিত্য নিয়েই পড়েছেন এবং মায়ের প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণেই হয়তো তিনি শেষ পর্যন্ত সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। আমাদের সমাজে যেহেতু মায়েরা খুব বেশি লেখাপড়া জানেন না, বিশেষ করে গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে, তাই স্কুল কলেজগুলোর দায়িত্ব বেশি শিশু বা কিশোর কিশোরীদের মাঝে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে, চেষ্টা করা উচিৎ ছাত্রদের মাঝে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা, এর প্রতি গুরুত্ব দেয়া। 

সবশেষে বলবো আমাদের সমাজ যে বইবিমুখ তা হয়তো নয়, কিন্তু সমাজের অধিকাংশ মানুষের জীবিকার জন্য এতো সময় চলে যায়, তাতে সন্তানদের পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা বা তাদের দিকে যত্ন নিয়ে বইয়ের দিকে আকৃষ্ট করার সময় তাদের হাতে নেই। তাই এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি সম্পূর্ণই পড়ে গিয়ে শিক্ষকদের ওপর। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ভয়ঙ্কর রকম দুরবস্থার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে, এই সমাজ গত পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে একাধিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং শ্রেণীগত বৈষম্যের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে যার অবসান হওয়া জরুরি। কোনো সভ্য আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজে এক সঙ্গে একাধিক শিক্ষা ব্যবস্থা থাকতে পারে না। আমাদের সমাজে মাদ্রাসা শিক্ষা, সাধারণ শিক্ষা এবং ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা প্রায় একই সঙ্গে রাষ্ট্র কর্তৃক অনুমোদিত এবং চলছে। সাধারণ মানুষের দেয়া কর্মের টাকায় মাদ্রাসা শিক্ষা চলছে যার তদারকি করার জন্য সরকারের খুব সুব্যবস্থা নেই। কী সেখানে সিলেবাস, কী ধরনের প্রায়োগিক শিক্ষা বা বিজ্ঞান শিক্ষা তারা সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করে তা সম্ভবত সরকারের অডিটের আওতায় নেই, বা থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়। এর বিপরীতে সাধারণ শিক্ষার মাধ্যমে ছাত্ররা বেরিয়ে চাকুরীর ক্ষেত্রে বা উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে যাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হাজির হয় তারা একই মানের নয়। অন্যদিকে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা সমাজে কোথায় কাজ করে বা কী কাজ করে, বা তাদের পাঠাভ্যাস কেমন তা সমাজের শাসক শ্রেণী ছাড়া কেউ হয়তো জানে না। শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আমাদের শাসক শ্রেণীর মতো এতোটা দায়িত্বহীনতার পরিচয় সম্ভবত আর কোনো সমাজের শাসকদের মাঝে নেই। আমরা প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গেই উপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন হয়েছিলাম, কিন্তু জাতীয় শিক্ষায়, শিক্ষার মানে পদ্ধতিগত ধরনের দিক থেকে আমরা তাদের থেকে আজ যোজন যোজন দূরে। এর জন্য দায়ী আমাদের শাসনব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রপরিচালকরা। আমাদের সমাজে এমন কোনো শাসক গত পঞ্চাশ বছরে আসেনি যার মস্তিষ্কে শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে কোনো মৌলিক চিন্তা ছিলো, তাই আমরা শিক্ষার দিক থেকে দিনে দিনে পিছিয়েই পড়েছি। 

বই পড়া বা পড়ার বিষয় নির্বাচন ছেলেবেলা থেকে আমরা শিখি পরিবার স্কুল কলেজ থেকে। বিশেষ করে পরিবারের পাঠাভ্যাস থাকলে আমরা সেটাকে গ্রহণ করি। এছাড়া স্কুল বা কলেজে বই পড়ার অভ্যাস বাধ্যতামূলক করলে সহজে সমাজে এটা গড়ে ওঠে। আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমরা শুধু আর্থিকভাবেই দরিদ্র নই, আমাদের সমাজ মননশীলতার দিক থেকেও খুব দরিদ্র, তাই আমাদের সমাজে বই পড়ার অভ্যাস খুব বেশি ভালোভাবে গড়ে ওঠেনি। ব্যাপারে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রয়েছে রাষ্ট্র পরিচালকদের, দ্বিতীয়ত শিক্ষকদের। সবশেষে পরিবারের সদস্যদের। কিন্তু আমাদের লেখক শিল্পীরাও বইয়ের প্রকাশনা, বইয়ের বিস্তার পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারেন। আমাদের সুশীল সমাজের সবাই অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ হবেন না, যিনি তাঁর সারাটা জীবনই ব্যয় করেছেন তরুণ তরুণীদের মাঝে পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য। কিন্তু তবুও সাংবাদিক লেখক বা শিল্পীরা পারেন প্রত্যেকের অবস্থান থেকে বইয়ের প্রতি শিশুকাল থেকে সবাইকে আকৃষ্ট করাতে। 

Related Posts