যা দেখেছি যা বুঝেছি—১১ || মনিরুল ইসলাম সাবেক রাষ্ট্রদূত
সবাই সমান?
The worst form of inequality is to try to make unequal things equal: Aristotle
An earthly kingdom cannot exist without inequality of persons: Martin Luther
All animals are equal, but some animals are more equal than others: George Orwell
অন্য অনেকের মতো আমারও ভাবতে খুব ইচ্ছা করে যে, আমরা সবাই সমানÑপৃথিবীর সকল মানুষ সমান, সকল প্রাণ সমান, সবার অধিকার কর্তব্য দায়িত্ব মর্যাদা অনুভূতি সমান। কিন্তু হায়, কল্পনায় বাসনায় প্রার্থনায় সমান হলেও বাস্তবে প্রয়োগে বিশ্বে বা মহাবিশ্বে কেউ কারো সমান নয়। যদি সমান না হই, একে অন্যের তুলনায় ‘অসমান’ হওয়াই কি স্বাভাবিক? আমি কোনদিক থেকে আপনার সমান? বস্তুগত (ওজন) ও অবস্তুগত (মেধা) সবদিক থেকে আমি কারো চেয়ে বড়, কারো ছোট এবং কেউ আমার কাছাকাছিÑকিছুতেই গাণিতিকভাবে একজন মানুষ আরেকজনের সমান নয়, অবিকল (আইডেন্টিকেল) তো নয়ই।
অনেকে জোর করে সব মানুষকে সমান বানাতে চেষ্টা করেÑহয়ত নিজেকে অন্যের চোখে মহৎ মহান উদার হিসাবে জাহির করার জন্য, নয়তো কোনো গোপন উদ্দেশে। লিঙ্গসমতা, নারীস্বাধীনতা, সমানাধিকার ও অর্থনৈতিক সমতা নিয়ে কথা না বললে ‘মহাপুরুষ/মহীয়সী নারী’ হওয়া যায় না। সবাই সমান, শুনতে কি সুমিষ্ট কথা, ভাবতে কি প্রাণজুড়ানো আশ্বাস কিন্তু কত যে অবাস্তব অসত্য প্রতারণামূলক উক্তি এটি, বিশ্লেষণ করলে মন খারাপ হয়ে যায়। এই ‘ক্যাচ—ওয়ার্ড’ বা জাদুকরী শব্দ শোভা পায় রাজনৈতিক নেতা, সমাজপতি ও ধর্মগুরু থেকে শুরু করে ‘মহৎ’ পন্ডিতদের বচনামৃতে।
তাহলে কী সমান? কিছুই নয়Ñমহাবিশ্বের সবই অসমানÑএই অসাম্যতা নিজেদের মধ্যে এবং অন্যদের সাথে। এমন কি মানুষের মৌলিক অনুভূতিগুলোর বোধ—উপলব্ধিও সমান নয়। আমি আমার সন্তানকে হারিয়ে যেরকম শোকাভিভূত, এমন অনেক সন্তানহারা পিতা তারচেয়ে কম বা বেশি আচ্ছন্ন হতে পারে। তাহলে সমান বলে কিচ্ছু নেই? শুধুমাত্র প্রকৃতির আলো—বাতাস—পানি সমভাবে বন্টিত হতে পারে কিন্তু তা—ও কি হয়? কারো বাসস্থান উন্মুক্ত আলো বাতাস সবুজের সমারোহে, কেউ বা অন্ধবদ্ধ ঘুপচির অলিগলিতে কাটায় জীবন। পৃথিবী সৃষ্টির পর মানব সভ্যতার গত দশ হাজার বছরের ইতিহাসে এ পর্যন্ত কোনো জনসমাজে কখনো সকল মানুষ সমভাবে বাস করেছে? ভবিষ্যতে করবে বলে কি এখনো কেউ বিশ্বাস করেন? সব যুগে রাজা—রানি ধনী—গরিব ছিল, বর্তমানে এবং ভবিষ্যতেও তাই হবে। তেমনি পৃথিবীর সুখ—দুঃখ ভোগ—বঞ্চনা সবার জন্য সমান নয়। সবকিছু সবার জন্য সমভাবে নয়-Everything not for everybody equally.
উচ্চাসনে বসে সাধুজনেরা শিষ্যদের বলেন, সব মানুষের সম্মান—মর্যাদা সমান। বাস্তবে কি তা—ই? মনে মনে সবাই জানে সমতা বলে কিছু নেইÑসে কারো চেয়ে বড়, কারো চেয়ে ছোট। এমন যে কঠোর ধর্মীয় অনুশাসনে চলে অর্থোডক্স খ্রিস্টান, ইথিওপিয়ার মতো গরিব দেশে তাদের ধর্মীয় নেতাদের বাড়ি—গাড়ি—সেবায়েত ও পোশাকের জৌলুশ দেখে আমি অবাক। ধর্মে যতই সমতার কথা বলা হোক, সমাজ কোনোদিন নারী—পুরুষ, ধনী—গরিব, দুর্বল—সবল ব্যক্তির সমতা নিশ্চিত করে না। ব্যাখ্যাতীত কারণে ঈশ্বর কাউকে সুখী করেন জীবনভর, কাউকে সাময়িক। কেউ আবার দুঃখী হয় আজন্ম আজীবন, কখনো লাঘব হয়, সাময়িক। তিনি কেন সবকিছুকে এমন বৈচিত্র্যপূর্ণ করেন, তার কারণ আমি জানি না কিন্তু দৃঢ়বিশ্বাসে জানি যে বিশ্বব্রহ্মান্ড, পৃথিবী এবং তাবৎ সৃষ্টজীব বৈচিত্র্যপূর্ণ হয় এবং একে মেনে নিতে পারাই জ্ঞানের লক্ষণÑযদিও কখনো কঠিন, নিষ্ঠুর মনে হয়।
পৃথিবী জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী সমাজতান্ত্রিক মতবাদের কী হল যে আস্তেধীরে বিস্তার লাভের পরিবর্তে বরং নিস্তেজ হয়ে মরে গেল? আমার মতে সমাজতন্ত্র সাম্যবাদ মানুষের প্রকৃতির সম্পূর্ণ বিরোধী। মহাবিশে^র কিছুই সমান নয়, সবই অসমান অনন্যÑবস্তু বুদ্ধি কল্পনা বিবেচনা চাহিদা শক্তি আকার আকৃতি। অথচ সাম্যবাদ জোর করে সবাইকে সমান বানাতে চায়, সবকিছু সমান করতে চায়। সকল মানুষের চাহিদা দক্ষতা আকাঙ্খা কি করে সমান হয়! এমন কি সবার প্রয়োজনও সমান নয় অথচ সাম্যবাদ বলে সবারই সবকিছু অভিন্ন। মানুষকে তার মেধা দক্ষতা আন্তরিকতা ও কর্মানুযায়ী ফলাফল দিতেই হবে, নইলে উদ্ভাবন অগ্রগতি থমকে থাকবে। কর্মফল দেখে মানুষের কর্মস্পৃহা বাড়ে—কমে। আমার কর্মের ফল যদি আমার হাতে না আসে, আমার মেধা ও শ্রমের ফসল অন্যে ভোগ করে, আমি কতদিন তা চালিয়ে যাব? মানুষকে মানবিক বানানো যায়, ঈশ্বরিক নয়।
মানুষ চায় আমি বড় হব, শক্তিশালী হব, আশেপাশে ছোট দুর্বল আমাকে সমীহ করে চলবে। মুখে যতই মধুর মনোহর কথা বলুক, মাথায় তার একটাই চিন্তাÑ অন্যকে পেছনে ফেলে কিভাবে আরো উপরে ওঠা যায়। মাও—লেনিন—কিম প্রমুখের আচরণ কি বিলাসী জমিদারসুলভ নয়? তাহলে ধনবান কি বংশানুক্রমে চিরকালই তাদের ধনবল ধরে রাখতে পারবে, দীনহীন অব্যাহতভাবে অসহায় বুভুক্ষু রয়ে যাবে? না। এক ব্যক্তি ধনী সবল হলেও তার পরবর্তী প্রজন্ম ক্রমান্বয়ে সেরকম হবে না বলে স্বাভাবিকভাবেই তার বংশের পতন ঘটবে, নতুনভাবে অন্য ঘরে ধনীর সৃষ্টি হবে। এজন্য জোর করে লুন্ঠন হত্যাযজ্ঞ ধ্বংসযজ্ঞ করারও দরকার নেই। প্রাকৃতিক নিয়মেই উত্থান—পতনের খেলা চলতে থাকবে।
কিছু লোক তবু সাম্যবাদ পছন্দ করবে, কারণ সমাজের অসাম্য তাকে পীড়া দেয়। কিন্তু সে যে আরামে সুখে থাকতে চায় না, তা নয়। ইতোমধ্যে যারা ধনশালী হয়ে উঠেছে তারা চায় না সমতা, বড়জোর তারা চায় খয়রাতি দিয়ে সুখ্যাতি অর্জন করবে। কখনো বা নিজেদের নামে তারা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে স্মরণীয় হয়ে থাকার জন্য, অমরত্ব অর্জনের আশায়।
কিছুক্ষেত্রে কৃত্রিমভাবে সমতা প্রতিষ্ঠার প্রয়াস দেখা যায়। যেমন, যেসব জিনিস ওজন উচ্চতা আয়তন সময় ইত্যাদি দিয়ে মাপা যায়, তা সমভাবে বণ্টন করা যায়। তাও সাময়িকভাবে, প্রকৃতির কাছে ছেড়ে দিলে আবার অসমতায় ফিরে আসে। সুতরাং অসমতাই স্বাভাবিক, সমতা অস্বাভাবিক অবস্থা। আমরা নৈতিক ও আইনগত সমতার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারি কিন্তু এটা ধরে রাখা বা এর সুযোগ গ্রহণ করার সক্ষমতা সবার সমান নয় বলে নৈতিক সমতাও প্রতিষ্ঠিত হবে না। আইনের চোখে সবাই সমান কিন্তু আইনের মনে সবাই অসমান, কারণ সবাই তো সমভাবে আইনের সেই রক্ষাকবচ ব্যবহার করতে পারে না। গরিব কি ধনীর সমপর্যায়ের আইনজীবীর সহায়তা পাবে? আইন করে অধিকারের সমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারি কিন্তু অধিকার ভোগের সক্ষমতার সমতা প্রতিষ্ঠা করবে কেÑপ্রকৃতি নিজেই তো সেই সক্ষমতায় বৈষম্য সৃষ্টি করে রেখেছে।
তবে রাষ্ট্রীয় অধিকার সমান হতে পারে, আইনের প্রয়োগ সমান হতে পারে কিন্তু দুঃখজনক হল, এসব রাষ্ট্রীয় সুযোগ—সুবিধা ও আইনের আশ্রয় সবাই সমভাবে নিতে পারে না সেই একই কারণেÑমানুষ সমান নয় বুদ্ধিতে ধনে জ্ঞানে ও কৌশলে। বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পদে আসীন একজন আইন প্রয়োগকারী ব্যক্তি আমাকে বলেছিলেন, ‘আইনের প্রয়োগ ও আশ্রয় সবার জন্য নয়, নিয়ম সবাইকে মানতে হয় না, বিচার সবাই পায় না। নিয়ম আইন বিচার দন্ড ও দন্ডভোগ কিছুলোকের জন্য।’ তাই Balzac—এর উপলব্ধি ছিল, Equality may perhaps be a right, but no power on earth can ever turn it into a fact.
কে বলে পৃথিবীর সব মানুষ সমান? আফ্রিকার অনেক দেশে প্রতিদিন জাতিগত দাঙ্গায় কতলোক মরে, অথচ বিশ্বমিডিয়া তা ব্রেকিং নিউজ করে না। ভাষণে ও আইনে যে যা—ই বলুক, বাস্তবে একজন আফ্রিকান—ল্যাটিন—এশিয়ান—ইউরোপিয়ান কখনো সমান নয়। একই মহাদেশে একদেশের মানুষ আরেক দেশের মানুষের সমান নয়, একই দেশে সকল গোষ্ঠীর মানুষ সমান নয়, একই গোষ্ঠীর মধ্যেও সব পরিবার সমান নয়, পরিবারেও সবাই সমভাবে আদৃত নয়। সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলির মধ্যেও কি সমমর্যাদা রক্ষিত হয়? বড়—ধনী রাষ্ট্রগুলি এখনো ছোট—দরিদ্র দেশগুলিকে অঙ্গরাজ্য মনে করে। রাবাতে ফ্রান্স বা স্পেনের রাষ্ট্রদূতদ্বয়ের এমন ভাব যে এখনো তারা প্রভু, বাকি সব প্রজা। এরা কারো রিসেপশনে যায় না, অথচ তাদের রিসেপশনে সবাই আসে। আর আধুনিক দাসত্বের অবিশ্বাস্য কাহিনী শুনলে গা শিউরে ওঠে।
নিশ্চয়ই মানুষের ¯্রষ্টা তার কোনো নিগূঢ় রহস্যাবৃত কারণে প্রতিটি মানুষকে এমনই পৃথকভাবে সৃষ্টি করেছেন। তার সৃষ্টি যদি সঠিক হয়, আমার অসম আচরণ কেন বেঠিক হবে? সেজন্য আমি সমাজের সবাইকে সমভাবে দেখি নাÑকাউকে শ্রদ্ধা সমীহ, কাউকে তোয়াজ বা তাচ্ছিল্য করি, কাউকে ঘৃণায় হীনতায় দেখি। আর সমাজের গণবিচারও সর্বদা সমান নয়। কেউ সহানুভূতি পায়, কেউ পায় বিদ্রুপ। এটা হয় হিংসা পরশ্রীকাতরতা পক্ষপাতিত্ব থেকে।
