গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়— দশ সুরের ঐন্দ্রজালিক স্থপতি সতীনাথ মুখোপাধ্যায়

রাত যখন বাড়ে, যখন রাতের তারাগুলো ক্লান্তিতে নিভে আসে, আর জানলার ওপাশে কোনো এক নাম না জানা গাছের পাতা কাঁপিয়ে শীতল বাতাস ঘরের কোণে ঢুকে পড়েÑঠিক সেই মুহূর্তের জন্য যেন তৈরি হয়েছিল সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ। বাঙালির রোমান্টিকতার ইতিহাসে তিনি এমন এক বিরহের শিল্পী, যাঁর স্বরে একই সাথে মিশে ছিল আভিজাত্যের তেজ আর এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা। ১৯২৩ সালের জুন যাঁর সুরযাত্রা শুরু হয়েছিল এবং ১৯৯২ সালের ১৩ ডিসেম্বর যিনি অনন্তের পথে পাড়ি জমালেন, সেই দীর্ঘ কয়েক দশকের ইতিহাস আসলে বাংলা আধুনিক গানের এক সোনালি অধ্যায়। এই নিভৃতচারী সুরস্থপতি বাংলা গানে বিরহের সুরস্রোতে যত জঞ্জাল মখমলি সুরের অতলে ভাসিয়ে নিয়ে গেছেন, তেমনভাবে আর কোনো শিল্পী করতে পেরেছেন কিনা সন্দেহ।

সুরের বুননে এক অনন্য কারিগর

সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের গায়কির দিকে তাকালে অবাক হতে হয় তাঁর কণ্ঠের পরিশীলিত ভঙ্গি দেখে। তিনি যখন গেয়ে চলেনমরমিয়া তুমি চলে গেলে’, মনে হয় সুরগুলো যেন তাঁর গলায় এক সুনিপুণ রেশমি বুননের মতো খেলে যাচ্ছে, কিন্তু এক অনির্বচনীয় বিষণ্ণতার বাষ্পে ছেয়ে যায় আকাশ। তাঁর গলার সেইটিম্বারবা স্বরমাধুর্য ছিল একেবারেই আলাদাÑএকদিকে তা যেমন ছিল পৌরুষদীপ্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ, অন্যদিকে তেমনি ছিল কোমল এবং দরদী। তিনি নজরুলসংগীত থেকে শুরু করে আধুনিক গানÑসবখানেই এক ধরনের ধ্রুপদী আভিজাত্য বজায় রাখতেন। সতীনাথের গায়নশৈলীর বিশেষত্ব ছিল তাঁর উচ্চারণের স্পষ্টতা এবং সুরের ওপর নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ। তিনি কেবল গান গাইতেন না, গানের কথাগুলোকে বেদনার এক একটি জীবন্ত ছবিতে রূপান্তর করতেন।

নতুন যুগের স্পন্দনে সুরকার সতীনাথ

সতীনাথ মুখোপাধ্যায় কেবল গায়ক হিসেবেই অনন্য ছিলেন তা নয়, সুরকার হিসেবেও তাঁর মেধা ছিল সমসাময়িকদের কাছে এক বিস্ময়। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখায় সতীনাথের বিখ্যাত গানজীবনে যদি দীপ জ্বালাতে নাহি পারো’—এর সুরও সৃষ্টি করেছেন সতীনাথ নিজেই; এতেই বোঝা যায় কত বড় সুরকার ছিলেন সতীনাথ। এছাড়া সহধর্মিনী উৎপলা সেনের সাথে তাঁর যে সাঙ্গীতিক ব্যক্তিগত রসায়ন, তা বাংলা গানের ভান্ডারকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। তিনি জানতেন কণ্ঠের সীমা কোথায় এবং সুরকে ঠিক কোন পর্দায় নিয়ে গেলে তা অমরত্ব পায়। তাঁর সুরারোপিত গানে এক ধরনের নাগরিক আভিজাত্য ছিল, যা একই সঙ্গে শিক্ষিত রুচি এবং সাধারণ মানুষের আবেগÑদুইকেই গভীরভাবে স্পর্শ করত। তাঁর সুরের মধ্যে যে আধুনিকতা তা সময়ের চেয়েও ছিল অনেকখানি এগিয়ে।

বিরহ নির্জনতার সুরভাস্কর

বাঙালির বিরহ যদি কোনো একজন শিল্পীর কণ্ঠে সবচেয়ে বেশি হাহাকার হয়ে ফুটে উঠে থাকে, তবে তা প্রধানত সতীনাথের কন্ঠে বললে অত্যুক্তি হবে না। তিনি যখন গাইতেনÑ ‘পাষাণের বুকে লিখো না আমার নাম’Ñতখন সেই সুরের মায়ায় প্রতিটি শ্রোতা নিজের ভেতরে এক কাল্পনিক বিষণ্ণ সাম্রাজ্য তৈরি করে ফেলে। তাঁর সুর ছিল অত্যন্ত মার্জিত, সেখানে কোনো উচ্চকিত আর্তনাদ ছিল না, ছিল এক ধরনের সুনিপুণ মায়াবী কারুকাজ। তাঁর কণ্ঠের সেই মখমলি স্পর্শে সাধারণ গানও হয়ে উঠত অসামান্য কোনো মহাকাব্য। জীবনকে তিনি দেখেছিলেন এক শিল্পীর চোখ দিয়ে, যেখানে প্রেম আর বিরহ একই মুদ্রার এপিঠওপিঠ। সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের গান প্রকৃত অর্থে বাঙালির জন্য এক টুকরো স্বদেশের ভেজা মাটির ঘ্রাণ, পুরনো বিকেলের স্মৃতির আয়না। তাঁর গান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সত্যিকারের শিল্প চিরকাল সতেজ থাকে। সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ বাঙালির একাকিত্বের বিশ্বস্ত সঙ্গী, প্রথম যৌবনের অব্যক্ত আবেগের এক অনন্য প্রতিধ্বনি।

সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের বিখ্যাত কয়েকটি গান

১। জীবনে যদি দীপ জ্বালাতে নাহি পারো, ২। মরমিয়া তুমি চলে গেলে, ৩। আকাশ এত মেঘলা যেও নাকো একলা, ৪। এমন অনেক কথাই বল তুমি, ৫। কত না হাজার ফুল ফোটে ভূবনেতে, ৬। তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়, ৭। এখনো আকাশে চাঁদ ওই জেগে আছে, ৮। জানি একদিন আমার জীবনী লেখা হবে, ৯। হায় বরষা এমন ফাগুন কেড়ে নিওনা, ১০। বন্ধু হয় অনেকে, ১১। যেদিন তোমায় প্রথম দেখি, ১২। আমি চলে গেলে, ১৩। আকাশ প্রদীপ জ্বলে, ১৪। এল বরষা যে সহসা মনে তাই, ১৫। জীবনে আমি যারে চেয়েছি, ১৬। আজ মনে হয় এই নিরালায়, ১৭। যদি তুমি না গান কোনোদিন শোনো, ১৮। ওই আকাশ প্রদীপ তারা জ্বেলো না, ১৯। তুমি যে আমার বিফল রাতের চেয়ে থাকার স্মৃতি, ২০। তবু ঘুম ভাঙে কই, ২১। যদি আমাদের ছেড়ে চলে যাও, ২২। ভোগবিলাসে মত্ত থেকে, ২৩। রাধিকা বিহনে রাধিকা রমণ, ২৪। যে পথে নিলে বিদায়, ২৫। বনের পাখী গায় বোলো না বোলো না

পরিশেষ

সতীনাথ মুখোপাধ্যায় ছিলেন বাংলা সংগীতের সেই নিভৃতচারী নক্ষত্র, যিনি ভিড়ের মাঝে হারিয়ে না গিয়ে বরং দূরত্ব বজায় রেখে নিজের এক অনন্য আলোকবৃত্ত তৈরি করেছিলেন। তাঁর কণ্ঠের মখমলি পরশ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সংগীত কেবল শ্রবণের বিষয় নয়, তা আসলে অনুভবের এক গূঢ় শিল্প। তিনি কোনো বিশেষ দশকের ছকে বন্দি নন, বরং তিনি সময়ের সেই নীরব সাক্ষী, যাঁর গান আজও শ্রোতার একাকীত্বের শ্রেষ্ঠ সঙ্গী। সতীনাথ মুখোপাধ্যায় মানেই সুরের এক বিরহী নিঃসঙ্গতা, যা ব্যস্ত কোলাহলের ভেতরেও এক মায়াবী শান্তির প্রলেপ বুলিয়ে দেয়। তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর গানের সেই আশ্চর্য বিষণ্ণতার মাঝে, যা ফুরিয়ে যাওয়ার ভয়ে নয়, বরং অক্ষয় হওয়ার নেশায় বারবার ফিরে আসে বাঙালির নিঃশ্বাসে।

Related Posts