৫০ রাজ্যের ৫০ ভালোবাসার গল্প ঃ মিশিগান দি ভারজিন সুইসাইডঃ জেফ্রি ইউজেনিডিস || আবদুল্লাহ জাহিদ নিউইয়র্ক

আমেরিকার মিশিগান স্টেটের ডেট্রয়েটের উপকণ্ঠে গড়ে ওঠা শান্ত, সবুজ, পরিচ্ছন্ন এক উপশহর। চারদিকে সারি সারি ম্যাপল গাছ, বিস্তীর্ণ লন, স্কুল, গির্জা আর মধ্যবিত্ত পরিবারের নিরীহ জীবন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, এখানে কোনো দুঃখ নেই, প্রতিটি ঘর যেন সুখের নিখুঁত প্রতিকৃতি। কিন্তু এই শান্ত সৌন্দর্যের নিচে কখনো কখনো জমে থাকে এমন এক অন্ধকার, যার কোনো শব্দ নেই। সেই অন্ধকারেরই নাম ঞযব ঠরৎমরহ ঝঁরপরফবং।

জেফ্রি ইউজেনিডিস তাঁর প্রথম উপন্যাসেই এমন এক গল্প লিখেছিলেন, যা শুধু পাঁচ বোনের করুণ পরিণতির কাহিনী নয়; বরং কৈশোর, নিঃসঙ্গতা, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের অজানা অন্তর্জগতের এক অনন্য দলিল।

লিসবন পরিবার এই উপশহরের অন্য সব পরিবারের মতোই দেখতে। বাবা রোনাল্ড লিসবন একজন গণিত শিক্ষক; নীরব, ভদ্র, সংঘাত এড়িয়ে চলা মানুষ। মা এক গভীর ধর্মবিশ্বাসী, কঠোর নিয়মনিষ্ঠ নারী। তাঁর কাছে পৃথিবী বিপজ্জনক; সন্তানদের রক্ষা করতে হলে তাদের পৃথিবী থেকেই দূরে রাখতে হবে। সেই নিস্তব্ধ শহরতলির বুকে লিসবন পরিবারটি ছিল যেন এক রহস্যময় দ্বীপ।

স্কুলের ছেলেদের চোখ আটকে থাকত লিসবনদের সেই সাদা বাড়িটার দিকে। কারণ, সেই বাড়িতে বাস করত পাঁচটি বোনÑ সেসিলে (১৩), লাক্স (১৪), বনি (১৫), মেরি (১৬), এবং থেরেসা (১৭) ওদের সোনালি চুল, হালকা হাসি আর চোখের নীরব ভাষা গোটা পাড়ার ছেলেদের স্বপ্নে এক অদৃশ্য ঝড় তুলত। পাড়ার একদল ছেলে দূর থেকে ওদের দেখতো। ওদের প্রতিটি পা ফেলা, বারান্দায় এসে দাঁড়ানো, কিংবা জানালার পর্দা সামান্য সরে যাওয়াÑসবকিছুই তাদের কাছে ছিল এক অজানা জগতের ইশারা।

কিন্তু সেই বাড়ির সুন্দর ছাদের নিচে যে কঠোরতার শাসন চলছিল, তা বাইরের কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি। ধর্মপ্রাণ কঠোর মা মিসেস লিসবন আর স্কুলের গণিত শিক্ষক কিছুটা ভীতিু প্রকৃতির বাবা মি. লিসবন মেয়েদের মুড়ে রেখেছিলেন এক অদৃশ্য খাঁচায়। পোশাক, চলাফেরা, বাইরের দুনিয়াÑসবকিছুতেই ছিল নিষেধের পাহাড়।

এই বাড়ির সবচেয়ে ছোট মেয়ে সিসিলিয়ার বয়স মাত্র তেরো। একদিন এক গ্রীষ্মের দুপুরে সিসিলিয়া প্রথম নিজের হাত কেটে আত্মহত্যার চেষ্টা করল। পরিবার, প্রতিবেশী, চিকিৎসকÑকেউ বুঝতে পারে না, এত অল্প বয়সী একটি মেয়ের জীবনে এমন কী ঘটেছিল?

চিকিৎসক তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমার তো এখনো জীবন শুরুই হয়নি।

সিসিলিয়া শান্ত গলায় উত্তর দেয়, ‘স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, আপনি তেরো বছরের মেয়ে ছিলেন না।

এই একটি বাক্য পুরো উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।

সবাই ভাবে, মেয়েটিকে একটু আনন্দে রাখলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। তাই বাড়িতে একটি ছোট পার্টির আয়োজন হয়। প্রতিবেশী ছেলেমেয়েরা আসে। হাসিআড্ডা শুরু হয়।

কিন্তু সেই আনন্দের মাঝেই সিসিলিয়া নিঃশব্দে জানালা দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে বাগানের লোহার বেড়ার ধারালো মাথায় ঝাঁপ দেয়। লোহার গ্রিলের ওপর তার নিথর শরীরটা দেখে থমকে গেল গোটা শহরতলি। তার মৃত্যু যেন পুরো উপশহরের ওপর অদৃশ্য ছায়া ফেলে।

সিসিলিয়ার মৃত্যুর পর মিসেস লিসবন আরও ভয় পেয়ে যান। সেই ঘটনার পর লিসবন পরিবারে নেমে এল এক স্থায়ী অন্ধকার। বাবামা মেয়েদের ওপর শাসনের বাঁধন আরও শক্ত করে দিলেন।

তারা বিশ্বাস করেন, বাইরের পৃথিবীই তাঁর মেয়েদের ধ্বংস করছে।

ফলে চার বোনের স্কুলে যাওয়া সীমিত। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা নিষিদ্ধ।

টেলিফোনে কথা বলা বন্ধ। বাইরে বের হওয়া বন্ধ।

ধীরে ধীরে বিশাল বাড়িটি এক অদৃশ্য কারাগারে পরিণত হয়।

জানালার আড়াল থেকে মাঝে মাঝে মেয়েদের মুখ দেখা যায়। তারা যেন পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু পৃথিবী আর তাদের কাছে পৌঁছাতে পারছে না।

চার বোনের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী প্রাণবন্ত লাক্স। তার মধ্যে এখনও জীবনের প্রতি আকর্ষণ রয়ে গেছে।

স্কুলে তার পরিচয় হয় ট্রিপ ফন্টেইন নামের এক ছেলের সঙ্গে। ডেট্রয়েটের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং দুর্দান্ত ছেলে। ট্রিপ অনেক কষ্ট করে মি. লিসবনকে রাজি করালো স্কুলেরহোমকামিং ড্যান্সপার্টিতে মেয়েদের নিয়ে যাওয়ার জন্য। শর্ত একটাইÑচার বোনের জন্য চারজন সঙ্গী থাকবে এবং সবাই একসঙ্গে ফিরবে।

সেই রাতটি যেন বহুদিন পর চার বোনের মুক্তির রাত। কিন্তু স্বপ্নের পরদিনই নামল ঘোর অমাবস্যা।

হাসি, গান, নাচসবকিছু নতুন মনে হয়।

পার্টি শেষে বাকিরা ফিরলেও, ট্রিপ আর লাক্স রাত কাটাল স্কুলের ফুটবল মাঠে। সকালে যখন লাক্স একা একা বাড়ি ফিরল, তখন মিসেস লিসবনের ধৈর্য শাসনের বাঁধ একেবারে ভেঙে গেল। শাস্তিস্বরূপ মেয়েদের স্কুল ছাড়িয়ে দেওয়া হলো। বাইরের পৃথিবী থেকে তাদের সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হলো। লিসবনদের ঘরের জানালাগুলোর পর্দা সারা দিনের জন্য টেনে দেওয়া হলো।

এই অপমানের পর তার জীবন আর আগের মতো থাকে না।

মা এরপর মেয়েদের সম্পূর্ণ গৃহবন্দি করে ফেলেন। স্কুল বন্ধ। বন্ধু বন্ধ।

বাইরের পৃথিবী নিষিদ্ধ। বাড়ির ভেতরে দিনগুলো ধীরে ধীরে থমকে যায়।

লাক্স মাঝরাতে ছাদে উঠে আসে। পাড়ার ছেলেরা দূর থেকে তাকে দেখে।

কখনো তারা দূরবীনে তাকায়। কখনো আলো জ্বালিয়ে সংকেত দেয়।

কখনো টেলিফোনে একই গান চালিয়ে শোনায়। এই অদ্ভুত যোগাযোগে প্রেমের চেয়ে বেশি থাকে এক ধরনের অসহায়তা। কেউ কাউকে স্পর্শ করতে পারে না।

সময়ের সঙ্গে বাড়িটিও যেন জীবন্ত মানুষের মতো অসুস্থ হয়ে পড়ে।

ঘাস কাটা হয় না। জানালার কাচে ধুলো জমে।

বাগান আগাছায় ভরে যায়। ঘরের ভেতরে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।

বাবা চাকরি হারানোর উপক্রম হন। মা বাস্তবতা থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।

এই বাড়িটি যেন পুরো আমেরিকান মধ্যবিত্ত সমাজের এক প্রতীকÑবাইরে সাজানো, ভেতরে ভাঙা।

পাড়ার ছেলেরা সিদ্ধান্ত নেয়, এই মেয়েদের বাঁচাতে হবে।

তারা গোপনে যোগাযোগ করে।

রাতের অন্ধকারে পালানোর পরিকল্পনা হয়।

একদিন নির্ধারিত সময়ে ছেলেরা বাড়িতে পৌঁছায়।

তারা ভাবে, আজ চার বোনকে মুক্ত করবে।

কিন্তু বাড়ির ভেতরে ঢুকেই তারা বুঝতে পারেÑসব শেষ।

বনি গলায় দড়ি দিয়েছিল, মেরি গ্যাসে মুখ গুঁজে নিঃশ্বাস বন্ধ করেছিল, থেরেসা খেয়েছিল অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ, আর লাক্স আগেই গ্যারেজে গাড়ির ধোঁয়ায় নিঃশ্বাস আটকে বিদায় নিয়েছিল। একে একে চার বোন একই রাতে নিজেদের শেষ করে দিল, ঠিক যেভাবে বছরখানেক আগে সেসিলে চলে গিয়েছিল।

উপন্যাসের সবচেয়ে অভিনব দিক হলোÑএই গল্প কোনো একক ব্যক্তি বলছে না। গল্পটি বলছে সেই পাড়ার ছেলেরা, যারা এখন মধ্যবয়স্ক মানুষ।

তারা এখনও বুঝতে পারেনি, কেন এমন হলো। তারা পুরনো ছবি, ডায়েরি, সংবাদপত্র, স্মৃতিÑসব সংগ্রহ করেছে। কিন্তু রহস্যের সমাধান হয়নি।

তারা শুধু জানে, তারা পাঁচ বোনকে ভালোবাসত। কিন্তু কখনো সত্যিকার অর্থে তাদের বুঝতে পারেনি।

উপন্যাসের মিশিগান কেবল একটি স্থান নয়; এটি গল্পের একটি নীরব চরিত্র।

সত্তরের দশকের ডেট্রয়েট তখন শিল্পের পতন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাইরের পৃথিবীতে এক যুগ শেষ হচ্ছে; আর লিসবন পরিবারের বাড়ির ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছে পাঁচটি তরুণ জীবন।

মিশিগানের দীর্ঘ শীত, ধূসর আকাশ, নিস্তব্ধ উপশহর এবং গাছঘেরা রাস্তাÑসব মিলিয়ে গল্পটির বিষণ্ণ আবহকে আরও গভীর করে তোলে।

ঞযব ঠরৎমরহ ঝঁরপরফবং কোনো রহস্যোপন্যাস নয়, যদিও শুরু থেকেই পাঠক জানে শেষ পর্যন্ত কী ঘটবে। এর শক্তি লুকিয়ে আছে মানুষের মনের অদৃশ্য অঞ্চলকে স্পর্শ করার ক্ষমতায়।

জেফ্রি ইউজেনিডিস দেখিয়েছেন, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ যেমন একটি তরুণ মনকে শ্বাসরুদ্ধ করতে পারে, তেমনি দূর থেকে কাউকে ভালোবাসা মানেই তাকে বোঝা নয়। পাঁচ বোনকে সবাই দেখেছিল, কিন্তু কেউ তাদের অন্তর্গত নিঃসঙ্গতা বুঝতে পারেনি।

উপন্যাসটি কৈশোরের ভঙ্গুরতা, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, ধর্মীয় কঠোরতা, মানসিক যন্ত্রণা এবং স্মৃতির অনিশ্চয়তাকে এমন কাব্যিক ভাষায় তুলে ধরে যে এটি সমকালীন আমেরিকান সাহিত্যের অন্যতম স্মরণীয় প্রথম উপন্যাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত পাঠকের মনে একটি প্রশ্নই থেকে যায়Ñযদি কেউ সত্যিই তাদের কথা শুনত, যদি কেউ তাদের নিঃসঙ্গতার ভাষা বুঝতে পারত, তবে কি এই পাঁচটি জীবন অন্যরকম হতে পারত? জেফ্রি ইউজেনিডিস সেই প্রশ্নের উত্তর দেন না। বরং মিশিগানের নিস্তব্ধ উপশহরের ওপর ঝরে পড়া শরতের পাতার মতো সেই প্রশ্নটিকে বাতাসে ভাসিয়ে রাখেনÑযেখানে শোকেরও একটি দীর্ঘ, নীরব প্রতিধ্বনি আছে।

লেখক পরিচিতি

জেফ্রি ইউজেনিডিস (ঔবভভৎবু ঊঁমবহরফবং) (জন্ম: মার্চ ১৯৬০, ডেট্রয়েট, মিশিগান) সমকালীন মার্কিন সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কথাসাহিত্যিক। তাঁর পিতৃসূত্রে গ্রিক বংশোদ্ভূত পরিবার এবং ডেট্রয়েট শহরে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তিনি ব্রাউন ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক এবং পরবর্তীতে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ক্রিয়েটিভ রাইটিং কর্মসূচিতে অধ্যয়ন করেন।

১৯৯৩ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম উপন্যাস ঞযব ঠরৎমরহ ঝঁরপরফবং তাঁকে আন্তর্জাতিক সাহিত্যাঙ্গনে পরিচিতি এনে দেয়। উপন্যাসটি পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে ঝড়ভরধ ঈড়ঢ়ঢ়ড়ষধএর পরিচালনায় একই নামে চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয় এবং ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে।

Related Posts