এই সন্ত্রাস থেকে মুক্তি আসবেই || তাজুল ইমাম নিউইয়র্ক
৭১—এর মাঝামাঝি পার্বত্য ত্রিপুরার হরিনা ক্যাম্পের আর্মি ক্যাম্পে আমাদের প্লাটুন নির্বাচিত করা হল। একুশ জনের একটি ছোট্ট গেরিলা প্লাটুন। হালকা ধরনের অস্ত্র বরাদ্দ করা হল আমাদের জন্য। চট্টগ্রাম শহরে আমাদের গন্তব্য। মনু থেকে বৈষ্ণবপুর পর্যন্ত গিয়ে সেখানে বর্ডারে অপেক্ষা করতে হবে এবং সময় ও সুযোগ বুঝে বর্ডার ক্রস করে পাহাড়ি পথে আমাদের যাত্রা শুরু হবে। মনু থেকে বৈষ্ণবপুর পর্যন্ত পথের দু’ধারে স্থানে স্থানে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী শরণার্থী শিবির। শরণার্থীদের মানসিক ও আর্থিক অবস্থা তখন অবর্ণনীয়। তার মধ্যে তারা রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে নেড়ে আমাদের অস্ত্রধারী সুশৃংখল মুক্তিযোদ্ধা প্লাটুনকে অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন। এই সামান্য উৎসাহেই আমাদের আত্মবিশ্বাস আর বিক্রম বেড়ে যাচ্ছিল। এরইমধ্যে একজন বৃদ্ধ ষাট—পঁয়ষট্টির মত বয়স হবে, হাতের ইশারায় দাঁড়াতে বললেন এবং কাছে এগিয়ে এসে দু’হাতে আমাকে জড়িয়ে ধরে প্রবল উচ্ছ্বাসে কেঁদে ফেললেন। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি একটু বিব্রত হয়ে পড়েছিলাম। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় তাঁর কান্নাজড়িত কথাগুলো হলÑ‘বাপুরে দেশতো তোরা স্বাধীন করবি। আমাদের মুজিবকে কি ফিরে পাবো? মুজিব কি এখনো বেঁচে আছে? আহারে বঙ্গবন্ধুকে পাষান্ডরা না জানি কি কষ্ট দিচ্ছে।’
একজন দরিদ্র, বৃদ্ধ কৃষকের ব্যাকুল প্রার্থনা বিধাতা হয়তো শুনেছিলেন। অন্তত সাময়িকভাবে হলেও তাঁর আর্তি সফল হয়েছিল। দেশ স্বাধীন হয়েছিল। এবং বঙ্গবন্ধুও সুস্থ দেহে সবার মাঝে ফিরে এসেছিলেন। সেই বৃদ্ধ কৃষক কি তা জেনেছেন? তাঁর স্বাধীন দেশের বুকে দাঁড়িয়ে সেই স্বাধীনতার স্থপতি সপরিবারে যে নির্মম মৃত্যুবরণ করেছিলেন বৃদ্ধ কৃষক কি তা জানতে পেরেছিলেন? কিছু অস্ত্রধারী কাপুরুষ রাতের অন্ধকারে ঝাঁপিয়ে পড়ল নিরস্ত্র বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের ওপর। নাবালক সন্তানটি পর্যন্ত বাদ গেল না তাদের হত্যা পরিকল্পনা থেকে। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর নামে চিরকালের জন্য কাপুরুষ হত্যাকারির কলঙ্ক লেগে গেল। এতো বছরের মধ্যেও তাদের মধ্যে এমন বিবেকবান মুখপাত্র কেউ আসেননি যিনি এহেন ন্যাক্কারজনক কাজের জন্য সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে ক্ষমা চাইতে পারেন। বরং এর বিপরীতটাই ঘটেছে। স্বাধীনতার সর্বাগ্রে এঁটুলির মত লেগে আছে আজ স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক পাতিনেতাদের দল। রাজনীতি আজ দুর্নীতির অন্য নাম। পিতৃহীন বালিকার মত বাংলাদেশ আজ উদ্ভ্রান্ত। আজ খোড়ল ছেড়ে সরিসৃপের মত এক একজন তথাকথিত নেতা বেরিয়ে আসছেন স্বাধীনতার ঘোষক হয়ে, পতাকা উত্তোলক হয়ে, পতাকার বংশদন্ড ধারক হয়ে। কী অর্বাচিন হাস্যকর প্রতিযোগিতা। ইতিহাস কি বদলানো যায়? আমি আশাবাদি একদিন এসব কুটিল বিদ্যুৎভরা মেঘের স্তর সরে যাবে। সাময়িক মেঘাচ্ছন্নতা কেটে গিয়ে চারদিক ছড়িয়ে যাবে প্রখর সূর্যের আলো। এমনটা তো অহরহই হচ্ছে। অন্তত ইতিহাসের আকাশ জুড়ে তাই হয়। লেখাটি লিখেছিলাম নব্বই দশকের মাঝামাঝি। তারপর কেটে গেছে আরও তিন দশক। মহান স্বাধীনতা বিরোধীরা তাদের পরাজয়ের গ্লানি সঞ্চারিত করেছে তাদের বংশ পরম্পরায়। তাদের হিংস্রতা যত বেড়েছে প্রতিশোধের ষড়যন্ত্রে ততই পারদর্শী হয়ে উঠেছে। এইসব আলবদর রাজাকারদের মদদ দিয়েছে তাদের পাকিস্তানি প্রভুরা। আবারও ধর্মকে ব্যবহার করে সমৃদ্ধির পথে অগ্রসরমান আমাদের দেশটিকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছে এই দেশ বিরোধীরা। তারা ৭১ মুছে দিতে চায়, বঙ্গবন্ধু, ৭ মার্চ, ২৫/২৬ মার্চ, ১৫, ২১ আগস্ট, ১৬ ডিসেম্বরকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চলছে দেশে। মহান ভাষা আন্দোলনকে অবমাননা করা হয় পাকিস্তানের কাওয়ালী গাইয়ে আমদানী করে। সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত, মারমুখি মব সন্ত্রাসে জনগণ আতঙ্কিত। কিন্তু আজ আর বঙ্গবন্ধু নেই। বাংলাদেশের জনগণ তাঁকে ধারণ করতে পারেনি। এই সন্ত্রাস থেকে মুক্তি আসবে শুধুমাত্র মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অন্তরে লালন করতে পারলে।
তাজুল ইমাম মুক্তিযোদ্ধা, প্লাটুন ১০৮, সেক্টর ১
