যা দেখেছি যা বুঝেছি—১৯ || মনিরুল ইসলাম সাবেক রাষ্ট্রদূত

নিজের খোঁজে

কোষ/ ঈবষষ: পারিভাষিক অর্থে কোষ হল জীবদেহের গঠন তথা জীবনের মৌলিক একক (ইউনিট), যার মূলে আছে ডিএনএ আরএনএ, যা বংশপরম্পরায় প্রবাহিত হয়ে প্রাণীর বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে। মানবদেহে আছে দশ ট্রিলিয়ন কোষ, তবে মাত্র দুটি জননকোষ মিলেই শুরু হয় মানবশিশুর সৃষ্টি। জীবন উদ্ভবের ভিত্তি হিসাবে কোষের প্রথম সৃষ্টি হয় ৩৫০ কোটি বছর আগে। প্রাচীন জ্ঞানীরা মনে করতেন সকল কিছুর মূলে আছে পানি, পরে এল অণুপরমাণুর তত্ত্ব।

জন্ম/ ইরৎঃয: প্রাণ প্রাণী মানব জন্মের বিবর্তন প্রক্রিয়ায় সর্বশেষ ধাপ হল আধুনিক মানুষ। শুক্রাণুডিম্বাণুর মিলনে সৃষ্টি হয় এককোষী জাইগট, ভাঙাগড়ায় শুরু হয় জরায়ুতে চল্লিশ সপ্তাহের জন্মলাভ প্রক্রিয়া, যার সফল সমাপ্তিতে ভূপৃষ্ঠে আগমনকে বলি জন্মগ্রহণ।

মস্তিষ্ক/ ইৎধরহ: এটাকে বলা যায় প্রাণকেন্দ্র (ারঃধষ পবহঃৎব) মেরুরজ্জুর মাধ্যমে মস্তিষ্ক আমাদের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র তথা সমস্ত আচরণ, চিন্তা কর্মকে নিয়ন্ত্রণ সমন্বয় করে। সময়ের বিবর্তনে মস্তিষ্ক ক্রমবিকাশমান ক্রমক্ষীয়মান হয় এবং এর শক্তি কার্যকারিতা বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যে বিভিন্ন অনুপাতে বিরাজিত। এর বিভিন্ন অংশের বিভিন্ন কাজ থাকলেও সবাই সমন্বিতভাবে একটি ঢ়ৎড়পবংংড়ৎ হিসাবে কাজ করেÑনতুন ধারণা গ্রহণ করে পূর্বাভিজ্ঞতার সাথে যুক্ত করে মিলিয়ে দেখে। মস্তিষ্কের ক্ষমতা দক্ষতা অপরিমেয়ভাবে অসীম হলেও মানুষ তার সামান্যই ব্যবহার করে, কারণ সে প্রচলিত প্রতিষ্ঠিত ধারণার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখে, গন্ডির বাইরে যেতে ভয় পায়। স্টিফেন হকিংএর মতে মস্তিষ্ক হল কম্পিউটারের সিপিইউ, অকেজো হলেই ফেলনাÑমৃত্যু।

ইন্দ্রিয়/ ঝবহংবং: ইন্দ্রিয় দিয়ে প্রাণী বাহ্য বিষয় সম্বন্ধে উদ্দীপ্ত হয়ে স্নায়ুতন্ত্র দিয়ে মস্তিষ্কে তথ্য পাঠায় এবং মস্তিষ্কের মন হৃদয় প্রয়োজনানুযায়ী সাড়া দেয়। পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয়: বাক্ (কথন/বচন), পাণি (ধারণ), পাদ (চলন), পায়ু (নিঃসরণ) উপস্থ (মিলন); পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়: চক্ষু (দর্শন), কর্ণ (শ্রবণ), নাসা (গন্ধন), জিহ্বা (আস্বাদন) ত্বক (স্পর্শন) এবং চারটি অন্তরিন্দ্রিয়: মন (চিন্তন), বুদ্ধি (বোধন), অহঙ্কার (অহম্), চিত্ত (চেতন)

মন/ গরহফ: মন হল সচেতনতার উৎস (ঃযব ংবধঃ ড়ভ পড়হংপরড়ঁংহবংং), অন্তঃকরণ, যার মাধ্যমে প্রাণীর ধারণা কল্পনা চিন্তা অনুভূতি বিবেক বিচার স্মৃতি যুক্তি আচরণ প্রভাবিত হয়। প্রাণ হল হার্ডওয়্যার, মন হল সফটওয়্যার। যদিও সে মস্তিষ্কের উপর নির্ভর করে, তথাপি মনের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব আছে বলে অনেকের বিশ্বাস কিন্তু সকল প্রাণীর মন আছে কিনা সেটা এখনো বিতর্কিত। দেহ আত্মার সেতুবন্ধন হল মন, যা প্রত্যেকের নিজস্ব অনন্য। এক মনে জাগ্রত (সজাগপড়হংপরড়ঁং) লুক্কায়িত (স্বপ্নংঁনপড়হংপরড়ঁংদুই স্বত্ত্বা/জ্ঞান বিরাজ করতে পারে। যেমন, একই মনে সুখ ভাসিয়ে ধরে, দুঃখ ঢেকে রাখে। মনের মাধ্যমে প্রত্যেক জীবন্ত প্রাণীর রহহবৎ বীঢ়বৎরবহপব হয়। ধর্ম দর্শনে মনকে মৃত্যুপরবতীর্ জীবনের সাথেও সম্পর্কিত করা হয়। মৃত্যুর পর মন চলে যায় আত্মায়, আত্মা চলে যায় অন্য অস্তিত্বে, যেখানে সকল আত্মা সমবেত হয়েছে মহাআত্মা (ঈশ্বর)— সাথে।

মনন/ জবভষবপঃরড়হ: চিন্তা যখন মনের উপর প্রতিফলিত হয়ে তাকে একটি অর্থ দান করে। মন হল আয়না, আয়নার উপর যা দেখা যায় তা হল মনন। ফ্রয়েড মননকে তিনভাগে দেখেছেন: ইডÑযা নিজের সুখান্বেষণ মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে চায়; সুপারইগোÑএটি সমাজের ভালমন্দ বিচারে উন্নততর মূল্যবোধে তাড়িত করে; ইগোÑবিচারকের ভূমিকায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করে।

হৃদয়/ ঐবধৎঃ: গভীরতর আবেগ অনুভূতির উৎস। পাখিটার কষ্টে আমি যেখানে কষ্ট পাই, তার নাম হৃদয়। ইংরেজি শব্দহার্টবাংলাহৃদয়শব্দের গভীরতাকে ধারণ করে না। বামবুকে হাত দিয়েহৃদপিন্ডবুঝালেও আসলে হৃদয় থাকে মস্তিষ্কের সংবেদনে।

সংবেদন/ ঝবহংধঃরড়হ: সংবেদন হল উদ্দীপকের মাধ্যমে বাইরের জগৎ সম্পর্কে অবহিত হওয়া, যার বাহক হল ইন্দ্রিয়, অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের উত্তেজনাবশত স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে যেসকল উদ্দীপনা বা অনুভূতির সৃষ্টি হয়, সেটাই সংবেদন। যেমন: পাখি চোখে পড়ল। এটা অনুভূতির প্রথম সরল ধাপÑআচরণ, অভিজ্ঞতা জ্ঞানের মৌলিক উৎস। 

প্রত্যক্ষণ/ চবৎপবঢ়ঃরড়হ: সংবেদনের পরবতীর্ জটিল ধাপ বা অভিজ্ঞতাকে বলে প্রত্যক্ষণ, যখন আমরা বিষয়টি সম্পর্কে সক্রিয়ভাবে সচেতন হই, এর বৈশিষ্ট/গুণাবলী সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করি। যেমন: পাখিটা দেখলাম। প্রত্যক্ষণ হল সংবেদনের অর্থবোধ বা ব্যাখ্যাÑসংবেদন প্রতিক্রিয়ার মধ্যবর্তী মানসিক প্রক্রিয়া, যখন বিভিন্ন উদ্দীপকের পার্থক্য নির্ণয় করা হয়। 

অনুভূতি/ ঋববষরহম: সংবেদন প্রত্যক্ষণের পর প্রাণী যে প্রতিক্রিয়াকে ধারণ/প্রকাশ করে, তার নাম অনুভূতি। যেমন: পাখিটা সুন্দর। শোক সুখ প্রেম দুঃখ হল অনুভূতি।

প্রেষণা/ গড়ঃরাব: প্রেষণা তাড়না বা তাগিদ (ফৎরাব) হল প্রয়োজন ইচ্ছা থেকে সৃষ্ট চাহিদার উদ্রেক, যা প্রাণীকে কোনো বাসনায় বা কর্মে উদ্দীপ্ত প্রবৃত্ত বা চালনা করে। যেমন: পাখিটা চাই। এটি ক্ষণস্থায়ী, দীর্ঘস্থায়ী, জৈবিক (যৌন), মানসিক (স্নেহ) সামাজিক (খ্যাতি) হতে পারে। প্রাণীরা জীবনে যা কিছু করে, সবকিছুর মূলে রয়েছে প্রেষণা, এটা আচরণের চালিকাশক্তি/ফুয়েল।

চিন্তন/ ঞযরহশরহম: চিন্তন হল মস্তিষ্কের অনুক্ত বা প্রচ্ছন্ন বক্তব্য ধারণ করা, যা কোনো উদ্দীপক (সমস্যা) সমাধানমূলক আচরণের মধ্যবতীর্ পর্যায়ে ঘটে থাকে এবং কোনো বস্তুর ইমেজ, প্রচ্ছন্ন অঙ্গ সঞ্চালন, শব্দ বা বিমূর্ত ধারণার মাধ্যমে প্রকাশ পায়। যেমন: পাখিটা পুষব। নিজের বা জগৎ সম্পর্কে আমরা যা ভাবি, আমরা বা জগৎ তা অর্থাৎ নিজে/জগৎ সেভাবেই প্রকাশিত হয়। গৌতম বুদ্ধ তাই বলেন, ডযধঃ ুড়ঁ ঃযরহশ, ুড়ঁ নবপড়সব। চিন্তা মস্তিষ্কেরই একটি কাজ, সুতরাং মস্তিষ্ক শেষ তো চিন্তাও শেষÑকিন্তু অবস্তুগত মনও কি শেষ হয়ে যায়? মস্তিষ্ক মন একে অন্যের উপর প্রভাব ফেললেও এরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। যেমন, সম্মোহনের সময় শুধুমনকাজ করে, বিপদে পড়লেমস্তিষ্ককাজ করে। 

আচরণ/ ইবযধারড়ৎ: প্রাণীর ক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়া, যা উদ্দীপকের কারণে মাংশপেশী স্নায়ুতন্ত্র দ্বারা সম্পন্ন হয়। এর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক হল মস্তিষ্ক। যেমন: পাখিটা ধরছি। তবে আচরণের উপর বংশগতি (এবহব) পরিবেশের প্রভাব পড়ে। শিক্ষণ অভিজ্ঞানের মাধ্যমে এর বিবর্তন হতে পারে। চেতন অবচেতন মনে আমাদের চিন্তাপ্রেষণা জাগ্রত সুপ্ত থেকে আমাদের আচরণকে নিয়ন্ত্রিত করে। আমাদের ধারণা অভিজ্ঞতা স্মৃতি বা আবেগ যদি এতবেশি হয়, যা সচেতন মন ধারণ করতে পারে না, তখন তা অবদমিত করে চেপে রাখা হয় অবচেতন মনে, সেখানে থেকে ওরা নীরবে মাঝেমধ্যে ব্যক্তি আচরণকে প্রভাবিত করে। তাই কেউ অস্বাভাবিক আচরণ করলে তাকে দোষারোপ করো না, কারণ খঁুজো।

সামাজিকীকরণ/ ঝড়পরধষরুধঃরড়হ: যখন পারস্পরিক নিরাপত্তা, মৌলিক চাহিদাপূরণ, ভাববিনিময় বিনোদনের জন্য একটি নির্দিষ্ট মানবগোষ্ঠী তথা প্রাণীর দল একতাবদ্ধ হয়ে বসবাস করে, যেখানে সদস্যদের আচরণ বিশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কিছু সাধারণ নিয়মরীতিশৃঙ্খলা রয়েছে। যেমন: পাখিটা সঙ্গপ্রিয়। মানুষ তার ভাষা, বাসা, পোশাক, দক্ষতা ক্ষমতা দিয়ে সমাজের অন্য সদস্যদের মুগ্ধ/প্রভাবিত করতে চায় যেন সে তার সমাজে ভাল একটা স্থান পায়।


Related Posts