আমেরিকার ২৫০ বছর প্রদীপের নিচে অন্ধকার
ইতালির নাবিক ক্রিস্টোফার কলাম্বাস হয়ত ভুল পথে আমেরিকা মহাদেশে তার পালের জাহাজ ভিড়িয়েছিলেন। স্পেনের রানি ইসাবেলা তাকে সবরকম পৃষ্ঠপোষকতা দেন। মধ্য আমেরিকায় যখন তার জাহাজ ভেড়ে তখন এই এলাকার মানুষ তাদের ফুলেল অভ্যর্থনা জানাননি। না জানানোই স্বাভাবিক। অন্য এলাকার মানুষ বিশাল জাহাজ তাদের এলাকায় ভিড়াবে এটা এত বছর আগেও অসমর্থনযোগ্য ছিল। কলাম্বাস ফিরে গিয়ে আবার আসেন আরো বড় দল নিয়ে। উদ্দেশ্য লুণ্ঠন করা। ফলে তাকে প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়। কিন্তু এই নতুন দেশের খবর তখন স্পেন হয়ে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানিতেও পৌঁছে যায়। ফলে কলাম্বাসের প্রায় সোয়া দুইশ বছর পরে ১৬২০ সালের ১১ নভেম্বর মে ফ্লাওয়ার নামের জাহাজ করে তীর্থযাত্রী নিয়ে ম্যাসাচুসেটসের কেপ কড হুকে নোঙর করে। এর আগে অবশ্য ইয়োরোপ থেকে আরো মানুষ বসবাসের উদ্দেশে আমেরিকার পূর্ব উপকূলে জাহাজ ভেড়ায়। দ্বিতীয় মে ফ্লাওয়ার জাহাজ ভেড়ে প্লিমুথ কলোনিতে এর ৯ বছর পরে ১৬২৯ সালে। এরপর এই ধারা অব্যাহত থাকে। প্রধানত ইয়োরোপের উপনিবেশবাদী দেশ থেকে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, সরকারী কর্মকর্তা এবং সামরিক বাহিনীর সদস্যরাও আসে। বিভিন্ন এলাকায় দেশভিত্তিক নিজ নিজ দেশের আধিপত্য বিস্তার করে।
এই যে এত বছর আগে ইয়োরোপীয় বসতি স্থাপনকারীরা এত পথ অতিক্রম করে আমেরিকায় এলো, তখন কি এই ভূমি মনুষ্যবিহীন খা খা প্রান্তর ছিল? মোটেও নয়। এই ভূমির নিজস্ব মানুষ ছিল। অবশ্য কোনো ভূমিরই কোনো নিজস্ব মানুষ বলে কিছু নেই। সকলেই বিভিন্ন এলাকা থেকে ইতিহাসের আদিকাল থেকে অন্যত্র গেছে বা এসেছে। বছরের পর বছর প্রজন্মান্তরে বসবাস করতে করতে সেই মাটির ছোঁয়ায়, বাতাসে নিঃশ্বাস নিয়ে, বৃষ্টি—জলে ভিজে একাত্ম হয়ে যায়। মানুষ ভাবতে শেখে এবং মানুষকে ভাবতে শেখানো হয় এটাই তার ভূমি। এটাই তার গ্রাম। এই গ্রামের বাঁশ ঝাড়ের নিচে, কলাগাছের পাশের নদীর পাড়ের বাড়িটি তার বাপ—দাদা ও তার দাদাদের। কিংবা চৌদ্দ পুরুষের।
পৃথিবীর সব বসতি স্থাপনকারীরা শুরুতে সেই ভূমির মানুষদের নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়। সেটাই স্বাভাবিক। কারণ কে কবে কাকে তার নিজের আঙিনা ছেড়ে দিয়েছে? ইয়োরোপীয়রা এসে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভয় দেখিয়ে, শক্তি প্রয়োগ করে, প্রয়োজনে মারধর করে এমন কি হত্যা করে তাদের উচ্ছেদ করে। পরে ইয়োরোপীয় বসতি স্থাপনকারীরা যার যত সৈন্যবল তা প্রয়োগ করে প্রতিপক্ষদের পরাজিত করার জন্য যুদ্ধ করে। সেই যুদ্ধ মোটামুটিভাবে পূর্ব উপকূলে শেষ হয় ১৭৮৩ সালে।
সরকার ব্যবস্থা চালুর পর এই স্থানীয় বাসিন্দাদের জমিজমা কেড়ে নেয়া শুরু হয় তথাকথিত আইনের আওতায়। তাদের ঠেলে দেয়া হয় দূরবতীর্ এলাকায়। আমেরিকার বসতি স্থাপনকারীরা এতটাই নিষ্ঠুর ছিল যে ১৮৩০ সালে তারা ‘ইন্ডিয়ান রিমুভাল এ্যাক্ট’ নামে একটি বিল পাশ করে আইনের আওতায় তাদের নিজেদের ভূমি থেকে সরিয়ে দেয়া হয়, তাদের ক্ষমতাহীন করা হয় এবং একেবারেই নগন্যসংখ্যক আদিবাসীকে প্রশাসনে সুযোগ দেয়া হয়। আমেরিকার পূর্বাঞ্চলে এই আদিবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী, শক্তিশালী ও উল্লেখযোগ্য ছিল চেরোকি। তাদের উচ্ছেদ করার পর যে করুণ দৃশ্যের অবতারণা হয়, আমেরিকানরা তার নাম দেয় ‘দ্য চেরোকি নেশন অন দ্য ট্রেইল অব টিয়ার্স’। অর্থাৎ ‘অশ্রম্নভেজা পথে চেরোকি জাতি’। এ সময় আদিবাসীদের গোষ্ঠিপতিদের সাথে শত শত চুক্তি করে সরকার, তাদের ভূমি ফিরিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রম্নতি দেয়া হয়, তাদের সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে দেয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু কোনো চুক্তি মান্য করা হয়নি, কোনো প্রতিশ্রম্নতি রক্ষা করা হয়নি।
আমরা স্মরণ করতে পারি, বাংলাদেশে ১৯৫২ সালে ভাষা কেড়ে নেয়ার যে অপচেষ্টা হয়, তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে বাঙালিরা রক্ত দিয়েছে। অথচ আমেরিকা এই গত উনিশ শতকের শেষ পর্ব থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ প্রায় ১০০ বছর আদিবাসী শিশুদের বলপূর্বক তাদের পরিবার থেকে কেড়ে নিয়ে কেবল তাদের জন্য নির্ধারিত বোর্ডিং স্কুলে পাঠায়। এইসব স্কুল পরিচালিত হতো ফেডারেল অর্থে। উক্ত বোর্ডিং স্কুলগুলোতে এইসব আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় কথা বলতে দেয়া হতো না। তাদের চুল কেটে দেয়া হতো, তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চা করতে দেয়া হতো না। ফেডারেল সরকার তাদের নিজস্ব ধর্ম পালন না করতে বাধ্য করত। যদিও আমেরিকার সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে এ বিষয়টি স্পষ্টত উল্লেখ আছে। বয়স্ক অধিবাসীদের ভোটাধিকার বঞ্চিত করা হয়েছে এবং নানাবিধ শর্তের জালে তাদের জড়িত করা হয়েছে যাতে তারা সাধারণ আমেরিকান সিটিজেনদের মত সুযোগ সুবিধা না পায়। আজ ভাবলে অবাক হতে হয়, তাদের ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হতো না। এবং বংশবৃদ্ধি যাতে না হয় তার জন্য নারীদের জোরপূর্বক স্টেরিলাইজেশন করা হতো। এমন কি ইউরেশিয়া ডিজিজ নামক এক ধরনের রোগের জীবণু ছড়িয়ে দিয়ে ৯০% নেটিভ আমেরিকান জনসংখ্যাকে মুছে ফেলা হয়। এইসব জীবাণুর মধ্যে ছিল স্মলপক্স, মিজল্স্, ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং ব্যুবোনিক প্লেগ।
১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট কার্টারের সময় আমেরিকান ইন্ডিয়ান রিলিজাস ফ্রিডম এ্যাক্ট, এবং ইন্ডিয়ান চাইল্ড ওয়েলফেয়ার এ্যাক্ট (ওঈডঅ) পাশ হওয়ার পর এই উদ্দেশ্যমূলক দমন, নিমূর্ল ও শোষণ বন্ধ হয়। তারপরও পুরো আমেরিকায় আজো বিভিন্ন এলাকায় আদিবাসীদের পৃথক ক্যাম্পাসে রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে নতুন প্রজন্মের সদস্যরা আজ বেরিয়ে এসেছে। মিশে গেছে আমেরিকান ধারায়। এটাকে মূলধারা বলা যায় কিনা তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু মেল্টিং পটের যে ‘আইডিয়া’ তা আসে বোর্ডিং স্কুল চালুর মধ্য দিয়ে। সেইসব স্কুল ছিল আদিবাসী শিশুদের শিকড় উপড়ে এনে আমেরিকান ধারায় গলিয়ে মিশিয়ে দেয়া।
যারা আজকের আমেরিকার চেহারা দেখে, ক্ষমতা দেখে, অর্থনৈতিক বিকাশ দেখে, জ্ঞান—বিজ্ঞানের মেধা দেখে গর্ব বোধ করে, তারা প্রদীপের নিচের উপরুক্ত অন্ধকারের কথা জানলে শিউরে উঠবেন। কারো ভাষা, সংস্কৃতি ও মাটির পরিচয় ভুলিয়ে দেয়াকে আর যাই বলা হোক, আধুনিকতা বলা যায় না।
আমরা অন্য দেশ থেকে এসে এদেশে বসবাস করছি। নিজ নিজ দেশের সংস্কৃতি চর্চা করছি। তথাপি আমাদের সন্তানরা আমেরিকার মেল্টিং পটে মিশে যাচ্ছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। তারপরও বিপা, বাফার মত সংগঠন আমাদের শিশুদের হৃদয়ে তাদের পূর্বপুরুষদের সংস্কৃতি জাগরুক রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে, এর জন্য তাদের প্রশংসা ও পৃষ্ঠপোষকতা করতেই হবে। অন্তত, যতদিন সম্ভব নতুন প্রজন্মের সন্তানদের বাঙালি করে রাখা যায়, ততদিনই ভাল। আশার কথা, আজ অবশ্য সেই অবদমন নেই আমেরিকায়, অন্তত নিউইয়র্কে।
